জ্বালানি সংকট নিরসনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হওয়া উচিত

প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪: ০০
স্ট্রিম গ্রাফিক

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থায় জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, বরং এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভূ-রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্ব পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বিশেষ করে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা ও চলাচলে প্রতিবন্ধকতা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে চরম অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ এই সংকটের সরাসরি শিকার। দেশের দ্রুত বর্ধনশীল উন্নয়নশীল অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষিত

বর্তমান বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ারও বটে। ওপেক প্লাসভুক্ত দেশগুলোর উৎপাদন হ্রাসের সিদ্ধান্ত এবং পশ্চিমা বিশ্বের রাশিয়ার ওপর জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সমন্বিত আঘাত হানে। সেই দ্বাদশ দিনের যুদ্ধ সাময়িক বিরতিতে থামলেও উত্তেজনার আগুন নেভেনি।

এরপর ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে পুনরায় উত্তেজনা ঘনীভূত হতে থাকে এবং জেনেভায় পারমাণবিক আলোচনা ভেঙে পড়ে। অবশেষে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে দ্বিতীয় দফা বিমান ও নৌ অভিযান শুরু করে। এই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হন এবং ইরান পাল্টা মিসাইল ও ড্রোন হামলায় ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় মার্কিন ঘাঁটিগুলো আক্রমণ করে। এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ পরিণতি হিসেবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের আইআরজিসি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে, বহু জাহাজে হামলা চালায় এবং প্রণালিতে সমুদ্রমাইন স্থাপন করে।

পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইরানের আইআরজিসি স্পষ্ট ঘোষণা করেছে, প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ‘আগের অবস্থায়’ ফিরবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বন্দরগামী জাহাজের চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার প্রধান এই সংকটকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

‘হরমুজ সংকট’ বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য একটি বড় ঝুঁকি, কারণ বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। ২০২৪ সালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া মোট তেল ও এলএনজির ৮৪ শতাংশ এশিয়ার বাজারে যেত; চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মিলে এই প্রবাহের ৬৯ শতাংশ গ্রহণ করত। ফলে এই সংকট মূলত এশিয়ার উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোকেই সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে এবং বাংলাদেশ সেই আঘাতের সম্মুখ সারিতে।

বাংলাদেশের বর্তমান চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের জন্য এই সংকটের প্রভাব বহুমাত্রিক। চলতি বছরের মার্চের শুরুতেই বাংলাদেশের তিনটি দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি সরবরাহকারীর একটি কাতারএনার্জি ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা দিয়ে সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। কয়েক দিনের মধ্যে অন্য দুই সরবরাহকারীও একই পথ অনুসরণ করে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মতে, জানুয়ারিতে যেখানে স্পট এলএনজির দাম ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ১০ ডলার, মার্চের মাঝামাঝি তা বেড়ে ২৮ দশমিক ২৮ ডলারে পৌঁছায়।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক টেকসই উন্নয়ন বিশ্লেষণ সংস্থা সোলেএবিলিটি ‘গালফ ক্রাইসিস ২০২৬: দ্যা ডেইলি কস্ট অব দ্য ক্লোজার অফ দ্য স্ট্রেইট অব হরমুজ’ শিরোনামে একটি অর্থনৈতিক প্রভাব মডেল প্রকাশ করেছে, যেখানে ৬৫টি দেশের ওপর হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হরমুজ সংকটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম, যেখানে জিডিপি ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত।

চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটারিং কার্যক্রমের জন্য প্রতিদিন যেখানে আড়াই লাখ লিটার ডিজেল দরকার, সেখানে সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র এক লাখ লিটারেরও কম। বাংলাদেশ ২০২৬ সালে সর্বোচ্চ ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানি করতে পারবে। তবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি সাপ্লাই চেইনের সংকটে এই আমদানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কমানো হয়েছে, ফলে পাঁচটি রাষ্ট্রীয় ইউরিয়া সার কারখানার চারটি অন্তত ১৫ দিনের জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট এখন ঘরে ঘরে অনুভূত একটি বাস্তবতা। সাধারণ মানুষের জীবনে সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে। একটি ১২ দশমিক ৫ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ১৯০০ টাকায় পৌঁছেছে।

একক উৎসের ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দুর্বলতাও সংকটকে গভীর করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যে আমদানির ডলার ব্যয় বেড়ে গেছে, যা রিজার্ভের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে এবং টাকার অবমূল্যায়ন মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই একটি দূরদর্শী, সক্রিয় এবং বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে জ্বালানি কূটনীতিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।

সংকট নিরসনে প্রস্তাবিত কৌশল

আমদানি উৎসের বিকল্পের সন্ধান হলো সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ। বর্তমান সংকটে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বিকল্পের সন্ধান শুরু করেছে। সরকার রাশিয়া থেকে পরিশোধিত জ্বালানি সংগ্রহে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ছাড়ের আবেদন করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ৬০ দিনের ছাড় দিয়েছে এবং চীন ও ভারতের কাছ থেকে জরুরি সরবরাহ নিচ্ছে। ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারির পাইপলাইন থেকে ৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি ইতিমধ্যে এসেছে এবং ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন থেকে আরও ৩০ হাজার মেট্রিক টনের আলোচনা চলছে। এই অভিজ্ঞতাই প্রমাণ করে, বিকল্প সরবরাহ উৎস গড়ে না তুললে প্রতিটি সংকটে হাতজোড় করে বসে থাকতে হবে।

জ্বালানি কূটনীতির ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি একটি কার্যকর হাতিয়ার। স্পট মার্কেট থেকে তেল কেনার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করা হলে মূল্য অস্থিরতার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

হরমুজ সংকট বাংলাদেশকে একটি নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি করেছে। একটি আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশের জন্য হাজার কিলোমিটার দূরের যুদ্ধ ঢাকার রাস্তায় জ্বালানির লাইন তৈরি করতে পারে, কৃষকের সার বন্ধ করে দিতে পারে এবং দরিদ্র পরিবারের রান্নাঘর নিভিয়ে দিতে পারে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জিডিপি ক্ষতি ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিমসটেক কাঠামো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি এবং পাইপলাইন সংযোগ এরই মধ্যে বাস্তব সুবিধা দিচ্ছে। যৌথ কৌশলগত তেল মজুদ সুবিধা আঞ্চলিকভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে যা সংকটময় পরিস্থিতিতে এই দেশগুলো উপকৃত হতে পারে।

নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে টেকসই সমাধান। বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৬১৬ মেগাওয়াটের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৬৯৪ মেগাওয়াট আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এবং ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে বিদেশি বিনিয়োগের ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ গেছে জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে। এই কাঠামো পরিবর্তন না করলে প্রতিটি মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাংলাদেশ একই ফাঁদে পড়বে। এই প্রেক্ষাপটে, প্রথাগত কূটনীতির গণ্ডি পেরিয়ে একটি সুদূরপ্রসারী ও কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতিই পারে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি

২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক রাজনীতির একটি মৌলিক সত্য উন্মোচন করেছে: তিনটি পরাশক্তি- যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া, জ্বালানি ভূ-রাজনীতিতে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আঘাত হেনেছে এবং হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার জন্য সামরিক চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে ইরান ঘোষণা করেছে, চীন, রাশিয়া, ভারত, ইরাক ও পাকিস্তানের পতাকাবাহী জাহাজ প্রণালি দিয়ে যেতে পারবে। এই তালিকাটি কেবল একটি নৌ-সুবিধার তালিকা নয়, এটি আসলে বৈশ্বিক মেরুকরণের একটি স্পষ্ট মানচিত্র। যে দেশগুলো পশ্চিমা শিবিরে নেই, তারা সংকটেও পথ পাচ্ছে। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে সেই মানচিত্রের কোথাও নেই। না পশ্চিমা জোটে, না পুবের অক্ষে। এই মধ্যবর্তী অবস্থান কখনো কখনো দুর্বলতা মনে হয়, কিন্তু সুচিন্তিত কূটনীতিতে এটিই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ নীতি আজকের বাস্তবতায় শুধু একটি আদর্শিক বাক্য নয়, এটি একটি জরুরি কৌশলগত নির্দেশিকা। এই নীতির অন্যতম দিক হলো, দরজা সব দিকে খোলা থাকে। যে দেশ কোনো একটি শিবিরে ঢুকে যায়, সে বিপরীত শিবিরের সুবিধা হারায়। ভারত যেভাবে রুশ তেল কিনছে এবং একই সাথে মার্কিন প্রযুক্তি ও বাজার সুবিধা নিচ্ছে, এটি সম্ভব হচ্ছে কারণ ভারত কোনো একটি জোটে সম্পূর্ণ আটকে যায়নি। বাংলাদেশও এই পথে হাঁটতে পারে। ‘আদর্শিক বাক্য’ থেকে ‘কৌশলগত নির্দেশিকা’ হিসেবে এই নীতির সুবিধা হলো প্রতিটি সম্পর্ক থেকে সুনির্দিষ্ট জ্বালানি সুবিধা আদায় করা, কোনো একটি শক্তির চাপে অন্য সম্পর্ক বিসর্জন না দেওয়া এবং নিরপেক্ষতাকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। অর্থাৎ আদর্শ যদি হয় ‘সবার বন্ধু হওয়া’, তাহলে কৌশল হলো ‘সবার বন্ধু থেকে সবার কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করা’।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করা

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার এবং তৈরি পোশাক খাতের বিশাল অংশ মার্কিন বাজারনির্ভর। এই বাণিজ্যিক নির্ভরতা সম্পর্ক মজবুত রাখার একটি বাস্তব কারণ। তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক মানেই নিঃশর্ত আনুগত্য নয়। জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কমপক্ষে তিনটি কংক্রিট সুবিধা আদায় করতে হবে। প্রথমত, রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার ছাড়, যার জন্য বাংলাদেশ ইতিমধ্যে আবেদন করেছে। ভারত ও চীনকে যদি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বাইরে রেখে রুশ তেল কিনতে দেওয়া হয়, তাহলে একটি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশও একই সুবিধার দাবিদার, এই যুক্তি ওয়াশিংটনে জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক; মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প হিসেবে আমেরিকান গ্যাসের দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ চুক্তি আমদানি বৈচিত্র্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে। তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য শক্তি প্রযুক্তি ও জলবায়ু অর্থায়নে মার্কিন সহায়তা আদায়ে সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে।

তবে বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে যেন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বা কোয়াড জোটে টেনে নেওয়ার মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার না হয়। এই ধরনের সামরিক-কৌশলগত জোটে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের জন্য চীন ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বিনষ্টের ঝুঁকি তৈরি করবে, যা জ্বালানি কূটনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক: অবকাঠামো থেকে জ্বালানি নিরাপত্তায়

২০২৪ সালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া মোট তেলের এক-তৃতীয়াংশ গেছে চীনে। ইরানের সঙ্গে চীনের ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি এবং রাশিয়া থেকে বিপুল তেল আমদানির ফলে বেইজিং বর্তমান সংকটেও তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক অবস্থানে আছে। এই অবস্থানই চীনকে বাংলাদেশের জ্বালানি কূটনীতিতে একটি অপরিহার্য অংশীদার করে তুলেছে।

বাংলাদেশের জন্য চীনের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতার তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তরে, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় বিদ্যমান বিনিয়োগ সম্পর্কের সুবাদে চীনা রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সিএনপিসি বা সিনোপেকের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। দ্বিতীয় স্তরে, চীন মধ্য এশিয়া ও রাশিয়া থেকে যে পাইপলাইন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, সেই নেটওয়ার্ককে ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিস্তারের আলোচনায় বাংলাদেশ সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। তৃতীয় স্তরে, চীনের সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি প্রযুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে সাশ্রয়ী, নবায়নযোগ্য শক্তির দ্রুত সম্প্রসারণে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে সহায়তা করবে।

তবে চীননির্ভরতা অতিমাত্রায় বাড়লে পশ্চিমা বিনিয়োগকারীরা সরে যেতে পারে এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। তাই চীনের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা হতে হবে পরিকল্পিত ও সীমারেখা স্পষ্ট রেখে।

রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক: ঐতিহাসিক বন্ধন থেকে জ্বালানি অংশীদারিত্বে

রাশিয়ার তেল এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে সাশ্রয়ী। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া ছাড় মূল্যে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বাস্তব সুযোগ। বাংলাদেশ সরাসরি রুশ তেল কিনতে গেলে তিনটি বাধার মুখে পড়তে পারে: মার্কিন সেকেন্ডারি স্যাংশন, ডলার-ভিত্তিক লেনদেনের জটিলতা এবং সরাসরি জাহাজ রুটের সংকট।

এই বাধাগুলো অতিক্রম করতে বাংলাদেশ একটি ‘ত্রিভুজ কূটনীতি’ অনুসরণ করতে পারে। ভারত বা চীনের মাধ্যমে পরিশোধিত রুশ জ্বালানি কেনা, যেখানে প্রত্যক্ষ নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থাকবে না। রুপি বা ইউয়ানে লেনদেনের সম্ভাবনাও অন্বেষণ করা যায়, যা ডলার রিজার্ভের চাপ কমাবে।

দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়া-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি ঐতিহাসিক উষ্ণতা কাজে লাগানোর সুযোগ আছে। রাশিয়ার রোসাটম বাংলাদেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে, যা দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতার একটি কংক্রিট ভিত্তি তৈরি করেছে। এই সম্পর্ককে আরও গভীর করে তেল ও গ্যাস সহযোগিতায় প্রসারিত করা সম্ভব।

তিন শক্তির মধ্যে ভারসাম্যের কৌশল

বাংলাদেশের জন্য কার্যকর কৌশল হবে একটি ‘ত্রিমুখী ভারসাম্য নীতি’, যেখানে তিনটি পরাশক্তির প্রত্যেকের সঙ্গে সম্পর্কের আলাদা মাত্রা ও ভিন্ন এজেন্ডা থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকবে বাণিজ্য, এলএনজি সরবরাহ, নিষেধাজ্ঞার ছাড় এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব। চীনের সঙ্গে থাকবে সমুদ্র অনুসন্ধান, সোলার বিনিয়োগ এবং মধ্য এশিয়ার জ্বালানি নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার। রাশিয়ার সঙ্গে থাকবে পারমাণবিক শক্তি সহযোগিতা এবং তৃতীয় দেশের মাধ্যমে ছাড় মূল্যে জ্বালানি আমদানির কাঠামো।

এই মডেলে বাংলাদেশ কোনো একটি শিবিরে আটকে না গিয়ে তিনটি শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গেই কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখবে। বর্তমান সংকটই প্রমাণ করেছে, যে দেশগুলো এই বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রেখেছে তারাই হরমুজ সংকটেও জ্বালানির পথ পাচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি স্বনির্ভরতা ও পররাষ্ট্রনীতির ভূমিকা

বঙ্গোপসাগরে ব্লু-ইকোনমি বাংলাদেশের জন্য একটি অপার সম্ভাবনার দুয়ার। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিজয়ের পর বাংলাদেশ প্রায় এক লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটারের সামুদ্রিক এলাকার মালিক হয়েছে। এই এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ আকর্ষণে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি পুনর্গঠনের মাধ্যমে আরও আকর্ষণীয় বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

বর্তমান সংকট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য উন্মোচন করেছে। দেশীয় জ্বালানি উৎস উন্নয়নে বিনিয়োগ সবচেয়ে নিরাপদ জ্বালানি নীতি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে এবং বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে জ্বালানি বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্রিয় কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।

হরমুজ সংকট বাংলাদেশকে একটি নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি করেছে। একটি আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশের জন্য হাজার কিলোমিটার দূরের যুদ্ধ ঢাকার রাস্তায় জ্বালানির লাইন তৈরি করতে পারে, কৃষকের সার বন্ধ করে দিতে পারে এবং দরিদ্র পরিবারের রান্নাঘর নিভিয়ে দিতে পারে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জিডিপি ক্ষতি ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই ক্ষতি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের নয়, এটি পূর্বানুমানযোগ্য ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির পরিণতি এবং সঠিক কূটনীতি থাকলে অনেকটাই এড়ানো সম্ভব ছিল।

তাই আমদানি উৎসের বৈচিত্র্যকরণ, দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি চুক্তি, আঞ্চলিক সহযোগিতা, নবায়নযোগ্য শক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ, তিন পরাশক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং বঙ্গোপসাগরের সম্পদ উন্নয়ন-এই ছয়টি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে তার জ্বালানি কূটনীতি পুনর্গঠন করতে হবে। বর্তমান সংকটই প্রমাণ করেছে, যে দেশ সময়মতো বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলে, সে-ই সংকটে টিকে থাকে। বাংলাদেশকে এই পাঠ থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই তার কূটনৈতিক কাঠামো পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে, কারণ পরবর্তী সংকট আসার আগেই প্রস্তুতি নেওয়াই হলো কার্যকর পদক্ষেপ। একটি সময়োপযোগী ও সাহসী পররাষ্ট্রনীতিই হবে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথে জ্বালানি সুরক্ষাকবচ।

লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

সম্পর্কিত