leadT1ad

২য় পর্ব

শিক্ষা বাজেট ও গবেষণা বরাদ্দ: স্বনির্ভর জাতি গঠনের কৌশল

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটে শিক্ষায় জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ দেশের শিক্ষাখাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. তোফাজ্জল ইসলামের মতে, শুধু অঙ্কের হিসাবে বরাদ্দ বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিক্ষার কাঠামোগত ও গুণগত সংস্কার। মেগা-প্রকল্প ও দালান নির্মাণের বদলে মৌলিক গবেষণায় সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ, মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং শিক্ষাঙ্গনকে দলীয় রাজনীতিমুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন লেখক। একটি বৈষম্যহীন, জ্ঞানভিত্তিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষাবাজেটের শতভাগ স্বচ্ছ ব্যবহার এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে শিল্পের সমন্বয়ের যে কৌশলগত রূপরেখা প্রয়োজন, তা-ই এই প্রবন্ধের মূল উপজীব্য। লেখাটির দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হলো-

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬, ১৯: ০৫
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় আমরা মেধার যত বড় ইমারতই বানাই না কেন, আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও মাদ্রাসা শিক্ষার শিকড় যদি মজবুত না হয়, তবে এই পুরো কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক স্বার্থ ও ঠিকাদারদের সুবিধার জন্য যত্রতত্র ভবন বানিয়ে এক ধরনেরা ‘আনুভূমিক সম্প্রসারণ' করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য কোনো 'উল্লম্ব উন্নয়ন' হয়নি। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এই নতুন বাংলাদেশে 'ভবনকেন্দ্রিক রাজনীতি'র ঠিকাদার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে সত্যিকারের 'মানুষ গড়ার' নীতি গ্রহণ করার সময় এসেছে।

এই কাঠামোগত অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে গ্রামীণ জনপদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। একসময় প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলগুলো থেকেই দেশের সেরা মেধা ও বুদ্ধিজীবীদের জন্ম হতো, যে ঐতিহ্য আমরা আজ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছি। দীর্ঘদিনের নীতিগত অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে এই গ্রামীণ ভিত্তি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সারা গ্রামে ব্যাঙের ছাতার মতো বাণিজ্যিক 'কিন্ডারগার্টেন' গড়ে উঠেছে। এই অপরিকল্পিত বাণিজ্যিকীকরণ গ্রামীণ, প্রান্তিক ও দরিদ্র অভিভাবকদের ওপর নিষ্ঠুর আর্থিক বোঝা চাপাচ্ছে, যা বহন করার সামর্থ্য তাদের নেই। তাই রাষ্ট্র যদি একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে চায়, তবে এই ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ সরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে সেই গৌরবময় অতীত, যেখানে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সাথে মেধার মেলবন্ধন ঘটত।

এই ভিত্তিকে আরও দুর্বল করেছে আরেকটি মৌলিক ত্রুটি। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেও বাংলাদেশ একটি সুনির্দিষ্ট, বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুগোপযোগী 'জাতীয় শিক্ষানীতি' স্থায়ীভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কুদরাত-এ-খুদা কমিশন থেকে শুরু করে অনেক কমিশন গঠন করা হলেও, প্রতিটি সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা চাপিয়ে দিয়েছে। বারবার সিলেবাস নিয়ে এই রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক পরীক্ষানিরীক্ষা আমাদের তরুণ প্রজন্মের আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক সৃজনশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতে পুরো সুশীল সমাজ গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছে। তাই, নতুন ঘোষিত ২ শতাংশ বরাদ্দের বড় অংশ শুধু দালানকোঠায় অপচয় না করে পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষক নিয়োগে ব্যয় করতে হবে। এর পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চালু করা এখন অত্যন্ত জরুরি, যাতে তারা সত্যিকারের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা পান।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন এবং সামনের বহুমুখী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই। এর জন্য উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত বিনিয়োগ প্রয়োজন।

একইসঙ্গে, মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন নিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটের ঘোষণা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার দর্শনে অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে এর বাস্তবায়নের গতানুগতিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার। শুধু ধর্মীয় শিক্ষার পাশে কয়েকটি সাধারণ বিজ্ঞান বা গণিতের বই ধরিয়ে দিলেই মাদ্রাসা শিক্ষার প্রকৃত আধুনিকায়ন হবে না। আধুনিক শ্রমবাজারেও এর কোনো উপযোগিতা তৈরি হবে না। এই বিশাল ও সম্ভাবনাময় জনসংখ্যাকে জাতীয় অর্থনীতির মূল স্রোতে যুক্ত করতে হলে, তাদের বাস্তবমুখী ও বাজার-চাহিদাভিত্তিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে যুক্ত করতে হবে। বর্ধিত বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ বিনিয়োগ করে তাদের দক্ষ ফ্রিল্যান্সার, আইটি টেকনিশিয়ান বা আধুনিক কারিগরি জনসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এতে দেশের শ্রমশীলতা বহুগুণ বাড়বে এবং তারা একটি সমতাভিত্তিক অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় কি শুধুই পড়ানোর জায়গা? জ্ঞান সৃষ্টি ও শিল্পের সঙ্গে সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন এবং সামনের বহুমুখী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই। এর জন্য উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত বিনিয়োগ প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার মূল চাকা ঘোরান পিএইচডি ও পোস্টডক্টরাল গবেষকরা। অথচ আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রূঢ় বাস্তবতা হলো, এখানে প্রাতিষ্ঠানিক পোস্টডক প্রোগ্রাম নেই বললেই চলে। আর বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পিএইচডি গবেষকও নেই। ফলে আমাদের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টির ক্ষেত্র হওয়ার বদলে সাধারণ ইন্টারমিডিয়েট কলেজের মতো তাত্ত্বিক 'শ্রেণিকক্ষ' বা শুধু পড়ানোর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যেখানে উচ্চতর গবেষণার জোয়ার থাকার কথা, সেখানে ইউজিসি পুরো দেশের জন্য বছরে মাত্র ১০টি পোস্টডক ফেলোশিপ বরাদ্দ দেয়! এটি অত্যন্ত অপ্রতুল এবং হতাশাজনক। এই অচলাবস্থা ভাঙতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বার্ষিক বাজেটে পিএইচডি ও পোস্টডক গবেষকদের মাধ্যমে মৌলিক ও ফলিত গবেষণার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বাধীন তহবিল বা 'থোক বরাদ্দ' নিশ্চিত করা জরুরি।

গবেষণার এই দৈন্যদশার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার অভাব। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (যা বাংলাদেশের একটি প্রকৃত রিসার্চ ইউনিভার্সিটি হিসেবে র‍্যাংকিংয়ে দারুণ সুনাম কুড়িয়েছে) এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো হাতেগোনা কয়েকটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা পরিচালনার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট বা আধুনিক কাঠামো নেই। আমরা ঐতিহাসিকভাবে এই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সুশাসনকে উপেক্ষা করেছি। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়তে হলে এখন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি সুসংগঠিত 'রিসার্চ সিস্টেম' এবং 'টেকনোলজি/নলেজ ট্রান্সফার অফিস' প্রতিষ্ঠা করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হবে ল্যাবরেটরি এবং সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা। গবেষণায় পাওয়া নতুন জ্ঞান বা প্রযুক্তি সরাসরি দেশের শিল্পখাতে বা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হবে এর কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় কেবল 'পড়ানোর কেন্দ্র' হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শুধু পড়ানোর জন্য দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক কলেজ এমনিতেই রয়েছে।

স্বাধীনতার পাঁচ দশকেও বাংলাদেশ একটি সুনির্দিষ্ট, বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুগোপযোগী 'জাতীয় শিক্ষানীতি' স্থায়ীভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কুদরাত-এ-খুদা কমিশন থেকে শুরু করে অনেক কমিশন গঠন করা হলেও, প্রতিটি সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা চাপিয়ে দিয়েছে।

এই একই সংকট দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিছক 'টিচিং ইউনিভার্সিটি' বা বাণিজ্যিক শ্রেণিকক্ষে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে উচ্চশিক্ষার ৬০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু সেখানকার শিক্ষকদের গবেষণার পরিবেশ খুবই প্রতিকূল। একজন শিক্ষককে প্রতি টার্ম বা সেমিস্টারে গড়ে অন্তত চারটি কোর্স পড়াতে হয়। ক্লাস নেওয়া, খাতা দেখা এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পর আন্তর্জাতিক মানের মৌলিক গবেষণা করার মতো সময় বা শক্তি তাদের থাকে না। এই চক্র ভাঙতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্পখাতের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর অংশীদারিত্বের কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে সরকারকে এখনই দৃশ্যমান আইনি ও কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হবে। এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করতে বাজেটের বর্ধিত অংশ থেকে বিশেষ প্রণোদনা বা ম্যাচিং ফান্ডের ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল কাগজভিত্তিক শিক্ষাসংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রকৃত গবেষণাকেন্দ্রে রূপান্তর করাই হওয়া উচিত এই বাজেটের প্রধান লক্ষ্য, যেখানে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হবে এবং তা সমাজে ছড়িয়ে পড়বে।

গবেষণার বাণিজ্যিকীকরণ: আধুনিক কৃষি ও শিল্পের মেলবন্ধন

এই ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কারের সুফল যদি আমরা জাতীয় অর্থনীতিতে কাজে লাগাতে চাই, তবে আমাদের কৃষি শিক্ষা ও উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি আমূল পরিবর্তন বা 'প্যারাডাইম শিফট' আনা অপরিহার্য। বাংলাদেশের মতো জলবায়ুর ঝুঁকিতে থাকা ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সনাতন কৃষির ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের 'সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক কৃষি' ব্যবস্থার সূচনা করতে হবে। বাজেটের বর্ধিত অংশ ল্যাবরেটরিতে আধুনিক প্রযুক্তির ফলিত গবেষণায় কাজে লাগাতে হবে। ইন্টারনেট অব থিংস, ড্রোন প্রযুক্তি, জিনোম এডিটিং এবং বায়োটেকনোলজির মতো চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তি ব্যবহার করে জলবায়ু-সহনশীল ও উচ্চ ফলনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন করে তা দ্রুত কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে।

উচ্চশিক্ষা ও কৃষির এই রূপান্তরের পাশাপাশি দেশের আরেকটি বড় ক্ষত হলো উচ্চশিক্ষিত বেকারের ক্রমবর্ধমান হার। এর মূল কারণ হলো বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্পকারখানার মধ্যে কোনো কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বা সমন্বয় না থাকা। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যা পড়ানো হচ্ছে, তার সাথে দেশি ও বৈশ্বিক শিল্পের বাস্তব চাহিদার কোনো মিল নেই। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার প্রথম শর্ত হলো ল্যাবরেটরির গবেষণালব্ধ ফলাফল ও জ্ঞানকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করা। সরকারের উচিত এমন একটি আইনি ও কৌশলগত কাঠামো তৈরি করা, যা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পকারখানাগুলোকে যৌথ গবেষণায় বাধ্য করবে। এই কার্যকর অংশীদারিত্বের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের আয় বাড়িয়ে স্বাবলম্বী হতে পারবে। আর আমাদের তরুণ প্রজন্ম বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য দক্ষ ও শক্তিশালী জনশক্তিতে পরিণত হবে। শিক্ষাকে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রধান ইঞ্জিন হিসেবে ব্যবহার করে কীভাবে প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হয়, চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাম্প্রতিক অগ্রগতি আজ তার সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক প্রমাণ।

আসল সাফল্য নির্ভর করে স্বচ্ছতা, দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ, দলীয় রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস এবং বিশ্বমানের আধুনিক পাঠ্যক্রমের ওপর। কেবল এসব উপাদানই আমাদেরকে একটি দক্ষ, স্বনির্ভর ও মর্যাদাবান জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।

নীতি-কৌশল ও জ্ঞানভিত্তিক নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার আগে একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে অর্থমন্ত্রী ও শিক্ষা উপদেষ্টার কাছে আমার একটি সুনির্দিষ্ট আহ্বান রয়েছে: শিক্ষাবাজেটের অন্তত ০.৫ শতাংশ জিডিপিকে 'গবেষণা ও উন্নয়ন'-এর জন্য আলাদা উপ-খাত হিসেবে ঘোষণা করুন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটে সরাসরি ও স্বাধীন 'থোক বরাদ্দ' নিশ্চিত করুন। একইসঙ্গে, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং মেধার ভিত্তিতে ফান্ডের বণ্টন তদারকি করতে বিজ্ঞানীদের দ্বারা পরিচালিত একটি 'জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা কাউন্সিল' গঠন করা এখন সময়ের দাবি। আগামী চার বছরের মধ্যে এই বাজেটকে ধাপে ধাপে ৫ শতাংশে উন্নীত করার একটি আইনি রূপরেখা ঘোষণাও অত্যন্ত জরুরি। এই ২ শতাংশ বরাদ্দের সঠিক ও মেধাভিত্তিক প্রয়োগ হবে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্নের প্রথম সফল পদক্ষেপ। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তির হার আরও ৩০-৪০ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে। গতানুগতিক সার্টিফিকেট-সর্বস্ব শিক্ষার বদলে বাজারমুখী বাস্তবসম্মত শিক্ষার ভিত্তি গড়বে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত পাঁচটি দেশি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান করে নিতে সাহায্য করবে।

পরিশেষে বলতে চাই, একটি জাতির জন্য শিক্ষার চেয়ে বড় কোনো বিনিয়োগ হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার যদি সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে এই বর্ধিত বাজেটের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারে, তবে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে। তবে শুধু আর্থিক বরাদ্দই যথেষ্ট নয়। আসল সাফল্য নির্ভর করে স্বচ্ছতা, দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ, দলীয় রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস এবং বিশ্বমানের আধুনিক পাঠ্যক্রমের ওপর। কেবল এসব উপাদানই আমাদেরকে একটি দক্ষ, স্বনির্ভর ও মর্যাদাবান জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে শিক্ষার এই গুণগত পরিবর্তনই হতে হবে একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের মূল ভিত্তি।

  • অধ্যাপক ড. তোফাজ্জল ইসলাম: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (আইবিজিই), গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250

সম্পর্কিত