প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্ঘটনায় মৃত্যু রোধ ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন জরুরি

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬, ২১: ০০
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা কারখানায় আগুন লেগে ঘুমের মধ্যে পুড়ে মারা গেছেন ১৬ জন বাংলাদেশি। তাঁদের ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাইয়ে; তিনজন নাটোরের নলডাঙ্গায়। এই মুহূর্তে সেসব গ্রামে শোকের যে ছায়া নেমেছে, তার ভার বহনের শক্তি কোনো পরিবারের নেই। যে মানুষটি হয়তো জমিজমা বিক্রি কিংবা ধারদেনা করে বিদেশ গিয়েছিলেন স্বজনদের মুখে হাসি ফোটাতে, তিনি ফিরবেন কফিনে। এই বেদনার কোনো ভাষা নেই।

শোকের পাশাপাশি কিছু কঠিন প্রশ্নও উঠছে, যেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একটি কারখানায় শ্রমিকেরা কেন কর্মস্থলেই ঘুমাচ্ছিলেন? অগ্নিনিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থা কি ছিল সেখানে? বের হওয়ার পথ কি যথেষ্ট ছিল? যদি একজন শ্রমিক বাইরে গিয়ে ফিরে এসে চিৎকার না করতেন, তাহলে কি নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ত? প্রশ্নগুলোর সদুত্তর প্রয়োজন। শুধু এই দুর্ঘটনার জন্য নয়; ভবিষ্যতে আর কোনো বাংলাদেশি শ্রমিককে যেন এভাবে প্রাণ দিতে না হয়, সেজন্যই প্রশ্নগুলোর সদুত্তর দরকার।

বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু নতুন ঘটনা নয়। প্রতিবছর শত শত প্রবাসী শ্রমিক কখনো দুর্ঘটনায় কিংবা অমানবিক পরিবেশে কাজের কারণে মারা যান। রোগে ভুগে মৃত্যুর ঘটনাও কম নয়। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর গড়ে তিন থেকে চার হাজার প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফেরে। এসব ক্ষেত্রে পরিবারগুলো যে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা, তাও কি পায়? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পায় না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দূতাবাসের উদাসীনতা ও প্রশাসনিক ধীরগতিতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও ক্ষতিপূরণ আসে না।

প্রবাসীদের ‘রেমিটেন্স যোদ্ধা’ বলে বর্ণনা করা হয়; দেশে তাঁদের অবদানের কথাও গর্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস এই মানুষগুলো। তাদের কারণে রিজার্ভের সংকট কেটে গিয়ে কিছুটা স্বস্তিও বিরাজ করছে অর্থনীতিতে। কিন্তু দেশের এই মানুষগুলো বিপদে পড়লে, মারা গেলে রাষ্ট্র কি যথেষ্ট আন্তরিকতায় পাশে এসে দাঁড়ায়? সরকারি শোকবার্তা মেলে; দূতাবাসের তৎপরতার আশ্বাসও আসে প্রতিটি দুর্ঘটনার পর। কিন্তু ক্ষতিপূরণ সহজে আসে না, জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না, ব্যবস্থারও ঘটে না পরিবর্তন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় রয়েছে দেশে। তারা প্রবাসীদের ‘কল্যাণে’ কতখানি নিবেদিত, সেটা কিন্তু খুব একটা জানা যায় না।

এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির পরিবর্তন চাইলে কয়েকটি বিষয়ে সরকারকে এখনই সক্রিয় হতে হবে। বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মপরিবেশ, বাসস্থান এবং বিশেষ করে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি চুক্তিতে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দূতাবাসের শ্রম উইংকে যথেষ্ট শক্তিশালী করে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ আদায়ে আইনি সহায়তা পুরোপুরি কার্যকর করা যায়। যেসব দেশ প্রবাসী শ্রমিকদের বড় গন্তব্য, বিশেষ করে সেগুলোয় এই কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। শ্রমিক প্রেরণকারী অন্যান্য দেশ এ ক্ষেত্রে কেমন কাজ করছে, সেটা তুলনা করে দেখাও জরুরি। দেশের ভেতরে ক্ষতিপূরণ বিতরণের প্রক্রিয়া সহজ আর দ্রুত করতে হবে, যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নিহতের পরিবারগুলোর ভোগান্তি অন্তত কমে। দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর ঘটনা কমিয়ে আনাটাও জরুরি।

রিয়াদের সেই কারখানায় এখন আর আগুন নেই। কিন্তু নওগাঁ ও নাটোরের ষোলোটি পরিবারে যে আগুন জ্বলছে, তা নেভানোর দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের। সৌদি কর্তৃপক্ষও যেন সেই কারখানার মালিকপক্ষকে কোনো ছাড় না দিয়ে দায়বদ্ধ করে, সেই লক্ষ্যে আমাদের দিক থেকে বাড়াতে হবে কার্যকর যোগাযোগ।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত