এসএসসি’র রেজাল্ট বিশ্লেষণ
রাজীব নন্দী

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের ফল গভীর উদ্বেগেরই এক কঠিন পরিসংখ্যান—গত ১৯ বছরের মধ্যে এবারই পাসের হার সর্বনিম্ন। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। কিন্তু দুশ্চিন্তার জায়গা শুধু পাসের হার কমে যাওয়ায় আটকে নেই। কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা, কমেছে ভালো ফল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও; উল্টো দিকে বেড়েছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। আর এই সামগ্রিক ফল বিপর্যয়ের ওপর আরও দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা। অর্থাৎ ফলাফলের সংখ্যাগুলো আলাদা আলাদা সংকটের কথা বলছে না; বরং একই সঙ্গে যেন জানান দিচ্ছে আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষার ভিতের কোথাও একটি বড় ফাটলের কথা।
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রসিকতার ছলে একটি কথা টাইমলাইনজুড়ে ঘুরেছিল— ‘সরকার ফেলতে হলে বইলেন, কিন্তু ক্লাস-পরীক্ষা-টিউটোরিয়াল দিতে পারুম না’। তখন সেটি ছিল মিম, আত্মপরিহাস আর আন্দোলনের উত্তাপের মধ্যে এক চিলতে হাসি। বছর দুয়েক পর সেই হাসির মধ্যেই যেন ঢুকে পড়েছে এক অদ্ভুত হরিষে বিষাদ। যে প্রজন্ম মুহূর্তে সংগঠিত হতে পারে, কয়েক মিনিটে বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে, প্রতিবাদকে ভাইরাল করতে পারে, জনমতের ঢেউ তুলতে পারে—সেই প্রজন্মেরই বড় একটি অংশ তিন ঘণ্টার নীরব পরীক্ষাকক্ষে এসে কেন হোঁচট খেল?
জেনজি নাকি মিথ্যা বলতে পছন্দ করে না, স্বচ্ছতা আর সরাসরি কথাতেই ওস্তাদ। তাহলে কি সেদিন মিমের ছলে তারা নিজেদের আজকের বাস্তবতারই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল? গ্রিক ট্র্যাজেডির ইডিপাসের মতো—যিনি ভবিষ্যদ্বাণী থেকে পালাতে গিয়েই অজান্তে সেটিকে সত্য করে তুলেছিলেন। এই অ্যালগরিদম প্রজন্মও কি নিজেদের রসিকতার ভেতর ভবিষ্যতের কোনো নির্মম ইঙ্গিত রেখে গিয়েছিল? নাকি সমস্যাটা আরও গভীরে স্ক্রিনে গড়ে ওঠা দ্রুত যোগাযোগের সমাজ আর এখনো খাতা-কলমনির্ভর অ্যানালগ পরীক্ষাব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান দূরত্বে?
চলুন তাহলে ডিজিটাল সোসাইটি, অ্যানালগ জেনারেশন ও যোগাযোগবিদ্যার পাটাতন থেকে আজকের বাংলাদেশের মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বিপর্যয়কে বোঝার চেষ্টা করি।
কেন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা পাস করছে বেশি, অথচ মানবিকের অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী আটকে যাচ্ছে? কেন এক বছরের ব্যবধানে এসএসসি ও সমমানের গড় পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে নেমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়াল?
কেন জিপিএ-৫ কমল ২২ হাজারের বেশি? এটি কি শুধু একটি পরীক্ষার খারাপ ফল, নাকি আমাদের শিক্ষা, সমাজ এবং নতুন প্রজন্মের মনোজগতের ভেতরে ঘটে যাওয়া বড় কোনো পরিবর্তনের ছোট্ট দৃশ্যমান চিহ্ন? আরও অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলো—যে প্রজন্ম কয়েক সেকেন্ডে ভিডিও ‘স্কিপ’ করে, এক স্ক্রলেই বিষয় বদলায়, নোটিফিকেশনের শব্দে মনোযোগ সরিয়ে নেয়, সেই প্রজন্মকে যখন তিন ঘণ্টা একটি বেঞ্চে বসিয়ে কলম দিয়ে দীর্ঘ উত্তর লিখতে বলা হচ্ছে, তখন পরীক্ষাপদ্ধতি ও প্রজন্মের যোগাযোগ-অভ্যাসের মধ্যে কি কোনো সংঘর্ষ তৈরি হচ্ছে?
১০ আগস্ট প্রকাশিত ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের ফল এই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এনেছে। সামগ্রিক পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ পয়েন্ট। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো বিভাগভিত্তিক পার্থক্য। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ, ব্যবসায় শিক্ষায় ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ, আর মানবিকে মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ মানবিকের অর্ধেকের বেশি পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এ ফলকে নিছক ‘ভালো ছাত্র–খারাপ ছাত্র’-এর গল্প বানালে আমরা সম্ভবত বড় সমস্যাটিই এড়িয়ে যাব।
যোগাযোগবিদ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো— মাধ্যম বদলালে মানুষের তথ্য গ্রহণের ধরনও বদলায়। আমরা কী বলছি, তার পাশাপাশি কোন মাধ্যমে বলছি, সেটিও মানুষের চিন্তার কাঠামোকে প্রভাবিত করে। আজকের কিশোর সকালে উঠে সংবাদপত্র খুলে দিন শুরু করে না; বরং তার সামনে প্রথমেই আসে ফোনের পর্দা। পড়ার বদলে দেখা, দীর্ঘ লেখার বদলে শর্ট ভিডিও, অধ্যায়ের বদলে ক্লিপ, ধারাবাহিক যুক্তির বদলে দ্রুত পরিবর্তিত দৃশ্য—এগুলো এখন তার প্রতিদিনের যোগাযোগ-পরিবেশ। ফলে এ প্রজন্মকে আমি এখানে বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা হিসেবে নয়, একটি যোগাযোগগত রূপক হিসেবে ‘অ্যালগরিদম প্রজন্ম’ বলছি। তারা কী দেখবে, কতক্ষণ দেখবে, এরপর কী দেখবে—তার একটি বড় অংশ নির্ধারণ করছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম।
তবে তাদের সবাইকে ‘Gen Z’ বলাও ঠিক হবে না। প্রজন্মের সীমানা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে একক মত নেই। পিউ রিসার্চ ১৯৯৭ সাল থেকে নতুন পোস্ট-মিলেনিয়াল বা Gen Z প্রজন্মের সূচনা ধরে, অন্যদিকে McCrindle Gen Z-কে ১৯৯৫–২০০৯ এবং Gen Alpha-কে ২০১০–২০২৪ জন্মসাল দিয়ে সংজ্ঞায়িত করে। আবার অনেক গবেষক Gen Z-এর শেষসীমা ২০১২ বা ২০১৩ পর্যন্ত ধরেন। ফলে ২০২৬ সালে সাধারণত ১৫–১৭ বছর বয়সে এসএসসি দেওয়া এই শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আসলে Gen Z ও Gen Alpha-র সীমান্তবর্তী—যাদের অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘Zalpha’ও বলা হয়। এই সীমান্তবর্তী প্রজন্মটির বিশেষত্ব হলো, তারা কম্পিউটার শিখে ডিজিটাল হয়নি; বরং স্মার্টফোন, ইউটিউব, ফেসবুক, শর্ট ভিডিও ও অ্যালগরিদমিক ফিডের মধ্যেই বড় হয়েছে।
এখানেই ২০২৬ সালের ফলকে যোগাযোগবিদ্যার চোখে দেখার জায়গা তৈরি হয়। পরীক্ষার খাতা এখনো মূলত অ্যানালগ, কিন্তু পরীক্ষার্থী ক্রমেই ডিজিটাল। পরীক্ষায় তাকে প্রশ্ন বুঝতে হবে, স্মৃতি থেকে তথ্য উদ্ধার করতে হবে, যুক্তির ক্রম সাজাতে হবে, তারপর হাত দিয়ে দীর্ঘ সময় লিখতে হবে। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে সে তথ্য সংরক্ষণ না করে ‘সার্চ’ করে, মনে রাখার বদলে ‘সেভ’ করে, সম্পূর্ণ লেখা পড়ার বদলে স্ক্যান করে, আর এক বিষয়ের ওপর দীর্ঘ সময় স্থির থাকার পরিবর্তে দ্রুত বিষয়ান্তরে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এখানে প্রযুক্তিকে দোষী বানানো যেমন ভুল, তেমনি এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করাও ভুল।
হাতে লেখা বনাম টাইপিং নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাও ভাবনার খোরাক দেয়। ২০২৪ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকলজি-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, হাতে লেখার সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের সংযোগ টাইপ করার তুলনায় বিস্তৃতভাবে সক্রিয় হয়; গবেষকেরা শেখা ও স্মৃতির জন্য এই সমন্বিত স্নায়বিক কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। জাপানের টকিও ইউনিভার্সিটির গবেষণাতেও কাগজে হাতে লিখে তথ্য নথিবদ্ধ করা অংশগ্রহণকারীদের পরে সেই তথ্য স্মরণ করার সময় বেশি মস্তিষ্কীয় সক্রিয়তার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে ‘মোবাইল চালালে পরীক্ষায় ফেল করবে’। এমন সরল সিদ্ধান্ত বিজ্ঞানসম্মত নয়। বরং প্রশ্নটি অন্য জায়গায়: যদি একজন কিশোরের পড়াশোনা ও যোগাযোগের বড় অংশই দ্রুত স্ক্রল, ছোট টেক্সট, ভিডিও এবং টাইপিংনির্ভর হয়, কিন্তু তার চূড়ান্ত মূল্যায়ন হয় তিন ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন মনযোগ, স্মৃতি জাগরুক চিন্তা এবং হস্তাক্ষর দক্ষতার মাধ্যমে— তবে এই দুই দক্ষতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে কি? বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এ প্রশ্নে বড় আকারের গবেষণা প্রয়োজন। বর্তমান ফল সেই গবেষণার প্রয়োজনীয়তাই আরও বাড়িয়েছে।
এখানে মানবিক বিভাগের ফল আরও চিন্তার। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সূত্র, সমস্যা সমাধান, অঙ্ক এবং ধাপে ধাপে অনুশীলনের একটি বাধ্যতামূলক কাঠামো থাকে। মানবিকের বহু বিষয়ে প্রয়োজন হয় দীর্ঘ পাঠ, ভাষার দক্ষতা, বিশ্লেষণ, কারণ–ফল ব্যাখ্যা এবং সুসংবদ্ধ লিখিত প্রকাশ। ফলে যদি পড়ার অভ্যাস ছোট হয়ে আসে, মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে এবং উত্তর লেখার অনুশীলন দুর্বল হয়, তার অভিঘাত মানবিকের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়তে পারে—এটি একটি যৌক্তিক অনুমান, প্রমাণিত কারণ নয়। কিন্তু মানবিকে পাসের হার যখন ৪৮.৭৪ শতাংশ এবং বিজ্ঞানে ৮০.৬৪ শতাংশ, তখন ব্যবধানটির গভীর অনুসন্ধান অবশ্যই প্রয়োজন।
তার সঙ্গে রয়েছে গত দুই বছরের বাংলাদেশের অস্বাভাবিক সামাজিক বাস্তবতা। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া ছাত্রবিক্ষোভ একসময় ব্যাপক রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়, ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত হয় এবং ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। Reuters-এর প্রতিবেদনেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হওয়ার তথ্য আছে। জুলাই ২০২৪-এ স্কুল-কলেজের শ্রেণি কার্যক্রম এবং বিভিন্ন পরীক্ষা বন্ধ হয়েছিল; শিক্ষাপঞ্জি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার কথাও তখন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে।
পরের বছরেও শিক্ষা পুরোপুরি স্থির ছিল না। ২০২৫ সালের শেষ দিকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কর্মবিরতিতে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থীর বার্ষিক ও প্রাক্-নির্বাচনী পরীক্ষা ব্যাহত হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষাক্রম পুনর্বিন্যাস, পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন ও বই ছাপায় বিলম্বও শিক্ষা-পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। এমনকি ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার আগেও কঠোর পরীক্ষানীতি ও পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের খবর প্রকাশিত হয়েছে। অতএব প্রশ্ন উঠতেই পারে— যে কিশোর বয়সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই বছর সামাজিক আন্দোলন, রাজনৈতিক পরিবর্তন, শিক্ষা-নীতির অস্থিরতা, পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক এবং অবিরাম অনলাইন উত্তেজনার মধ্যে কাটাল, সে কি সত্যিই নিরবচ্ছিন্ন একাডেমিক মনোযোগ পেয়েছে?
এই জায়গায় যোগাযোগবিদ্যা আরও একটি উত্তর দেয়। রাজনৈতিক ঘটনা এখন আর শুধু রাস্তায় ঘটে না; একই সঙ্গে ঘটে স্ক্রিনে। একটি আন্দোলনের ছবি, ভিডিও, স্লোগান, লাইভ, মন্তব্য, মিম—সবকিছু কিশোরের ফোনে প্রবেশ করে। ২০২৪ সালের বাংলাদেশের আন্দোলন নিয়ে পরবর্তী গবেষণায়ও ইউটিউবসহ ডিজিটাল পরিসরে আন্দোলনের আবেগ, রাজনৈতিক সংঘাত ও ডিজিটাল মুভমেন্টের শক্তিশালী উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীর মনোজগৎ তখন একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষ, রাজপথ এবং ডিজিটাল ফিড—তিনটি যোগাযোগক্ষেত্রের মধ্যে বিভক্ত ছিল। তাই ২০২৬ সালের ফলকে আমি অশনি সংকেত বলতে চাই—আতঙ্ক তৈরির জন্য নয়, সতর্ক হওয়ার জন্য। একটি দেশে এক বছরে পাসের হার ছয় শতাংশ পয়েন্টের বেশি কমা, মানবিকের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া এবং জিপিএ-৫ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া শুধু পরীক্ষার টেবিলের সংখ্যা নয়। এটি প্রশ্ন তুলছে আমাদের শেখার সংস্কৃতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা, মনোযোগের অভ্যাস, শিক্ষকতা, পারিবারিক তদারকি এবং ডিজিটাল জীবনের ভারসাম্য নিয়ে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হবে যদি আমরা এর উত্তর খুঁজি শুধু—“ছাত্ররা পড়েনি”—এই একটি বাক্যে।
বরং এখন কয়েকটি কাজ জরুরি। প্রথমত, শিক্ষা বোর্ডকে বিষয়ভিত্তিক ও প্রশ্নভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ প্রকাশ করা অবধি আমাদের আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে— মানবিকের শিক্ষার্থীরা ঠিক কোন বিষয়ে, কোন ধরনের প্রশ্নে বেশি ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ে আবার দীর্ঘপাঠ, হাতে লেখা, নির্দিষ্ট সময় স্ক্রিনবিহীন অধ্যয়ন এবং তিন ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষার অনুশীলন ফিরিয়ে আনতে হবে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল লিটারেসিকে শুধু ‘এসো কম্পিউটার শিখি’ হিসেবে না দেখে এটেনশন ম্যানেজমেন্ট কৌশল শেখাতে হবে—কখন ফোন বন্ধ রাখতে হয়, কীভাবে দীর্ঘ লেখা পড়তে হয়, কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়। চতুর্থত, মানবিককে ‘দুর্বল শিক্ষার্থীর বিভাগ’ হিসেবে দেখার সামাজিক প্রবণতা বদলাতে হবে; ভাষা, ইতিহাস, সমাজ, রাষ্ট্র ও মানব আচরণ বোঝার জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা দরকার, তা কোনোভাবেই দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা নয়। আর সর্বোপরি শিক্ষার নীতি ও পরীক্ষাব্যবস্থায় ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
আর যারা এবার অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের উদ্দেশেও একটি কথা জরুরি। একটি ফলাফল জীবনের চূড়ান্ত রায় নয়। পরীক্ষায় ব্যর্থতা মানে সামর্থ্যের মৃত্যু নয়; বরং কোথায় ঘাটতি আছে তার কঠিন একটি প্রতিবেদন। এই বয়সে এক বছর পিছিয়ে যাওয়া খুব বড় মনে হয়, কিন্তু একটি পূর্ণ জীবনের হিসাবে এটি খুব ছোট সময়। ফোনের স্ক্রিন থেকে কিছুটা সরে এসে বইয়ের সঙ্গে দীর্ঘ সময় বসা, প্রতিদিন হাতে লেখা, ভুলগুলো শনাক্ত করা এবং আবার চেষ্টা করার মধ্য দিয়েই ফিরে আসা সম্ভব। সমাজেরও দায়িত্ব তাদের ‘ফেল করা ছেলে-মেয়ে’ বলে অপমান না করে পুনরায় শেখার সুযোগ করে দেওয়া।
এরও আগে এই প্রজন্মের শৈশব-কৈশোরে আরেকটি বড় ‘পরীক্ষা’ নিয়ে এসেছিল করোনা মহামারী। যে বয়সে স্কুলের ঘণ্টা, বন্ধুদের হৈচৈ, শিক্ষকের বকুনি আর খাতায় লাল কালির দাগের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কথা, সে বয়সের একটি দীর্ঘ সময় তাদের কেটেছে লকডাউন, কোয়ারান্টাইন আর বন্ধ স্কুলের ভেতর। শ্রেণিকক্ষ ঢুকে পড়েছিল মোবাইলের পাঁচ-ছয় ইঞ্চি পর্দায়—শিক্ষক একদিকে পড়াচ্ছেন, অন্যদিকে হয়তো মেসেঞ্জারের নোটিফিকেশন, ইউটিউব-এর বেল আইকনের টুংটাং শব্দ কিংবা গেমের হাতছানি! এক অর্থে করোনা তাদের শুধু ‘অনলাইন ক্লাস’ শেখায়নি, স্ক্রিনকেই শ্রেণিকক্ষ বানিয়ে দিয়েছিল। ইউনেসকো, ইউনিসেফ ও বিশ্বব্যাংক-এর যৌথ প্রতিবেদনে মহামারিজনিত দীর্ঘ স্কুল-বন্ধের কারণে ‘লার্নিং লস’ এবং শিশু-কিশোরদের শেখার সংকটের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। ফলে আজকের এসএসসি ফল বিশ্লেষণের সময় প্রশ্নটি করতেই হয়—করোনাকালে তৈরি হওয়া সেই শিক্ষণ-ঘাটতি কি আমরা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পেরেছি? নাকি মজার ছলে বললে, করোনার সময় স্কুল ছুটি হয়েছিল, কিন্তু মোবাইলের স্কুল আর ছুটি নেয়নি! যে শিশুকে কয়েক বছর বলা হলো, ‘পড়াশোনা করতে হলে স্ক্রিনে তাকাও’, তাকে এখন হঠাৎ তিন ঘণ্টা ফোনবিহীন কক্ষে বসিয়ে বলা হচ্ছে—‘এবার স্ক্রিন নয়, স্মৃতি থেকে খাতায় লেখো।’ এই ডিজিটাল থেকে অ্যানালগ প্রত্যাবর্তনের ধাক্কাটিও তাই ২০২৬ সালের ফলের সম্ভাব্য সামাজিক-শিক্ষাগত পটভূমি হিসেবে অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
আজ যারা এসএসসির খাতায় তিন ঘণ্টা কলম চালাতে গিয়ে হিমশিম খেলো, করোনার সময় তাদের অনেকেই তখন চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণির শিশু। যে বয়সে হাতের লেখা সুন্দর করার কথা, শিক্ষককে দেখে হোমওয়ার্কের ভয় পাওয়ার কথা, সেই বয়সে তাদের শিক্ষক হয়ে উঠেছিল মোবাইলের স্ক্রিন। স্কুল বন্ধ ছিল, কিন্তু ইউটিউব-ফেসবুক খোলা ছিল চব্বিশ ঘণ্টা! এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। যে কিশোর কয়েক সেকেন্ডে একটি পোস্ট ভাইরাল করতে পারে, তাকে আমরা তিন ঘণ্টা ধরে একটি খাতায় যুক্তি নির্মাণ করতে বলছি। যে প্রজন্ম অ্যালগরিদমের গতিতে পৃথিবী দেখে, তাকে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে অ্যানালগ সময়ের কাঠামোয়। সমস্যা শুধু প্রজন্মের নয়, আবার শুধু পরীক্ষাব্যবস্থারও নয়; সমস্যা দুই জগতের ক্রমবর্ধমান দূরত্বে।
২০২৬ সালের এসএসসি ফল তাই কেবল স্মরণকালের সেরা বিপর্যয় বা শিক্ষার্থীদের রেকর্ড ফেলের হিসাব নয়। এটি আমাদের সামনে রাখা একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা কি শুধু ব্যর্থ পরীক্ষার্থীকে দেখব, নাকি দেখতে চেষ্টা করব বদলে যাওয়া একটি প্রজন্ম, অস্থির একটি সমাজ এবং এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থাকে—যার সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, অ্যালগরিদমের যুগে গভীরভাবে ভাবতে, মনে রাখতে এবং নিজের হাতে নিজের চিন্তা লিখতে পারে—এমন মানুষ তৈরি করা?

২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের ফল গভীর উদ্বেগেরই এক কঠিন পরিসংখ্যান—গত ১৯ বছরের মধ্যে এবারই পাসের হার সর্বনিম্ন। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। কিন্তু দুশ্চিন্তার জায়গা শুধু পাসের হার কমে যাওয়ায় আটকে নেই। কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা, কমেছে ভালো ফল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও; উল্টো দিকে বেড়েছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। আর এই সামগ্রিক ফল বিপর্যয়ের ওপর আরও দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা। অর্থাৎ ফলাফলের সংখ্যাগুলো আলাদা আলাদা সংকটের কথা বলছে না; বরং একই সঙ্গে যেন জানান দিচ্ছে আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষার ভিতের কোথাও একটি বড় ফাটলের কথা।
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রসিকতার ছলে একটি কথা টাইমলাইনজুড়ে ঘুরেছিল— ‘সরকার ফেলতে হলে বইলেন, কিন্তু ক্লাস-পরীক্ষা-টিউটোরিয়াল দিতে পারুম না’। তখন সেটি ছিল মিম, আত্মপরিহাস আর আন্দোলনের উত্তাপের মধ্যে এক চিলতে হাসি। বছর দুয়েক পর সেই হাসির মধ্যেই যেন ঢুকে পড়েছে এক অদ্ভুত হরিষে বিষাদ। যে প্রজন্ম মুহূর্তে সংগঠিত হতে পারে, কয়েক মিনিটে বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে, প্রতিবাদকে ভাইরাল করতে পারে, জনমতের ঢেউ তুলতে পারে—সেই প্রজন্মেরই বড় একটি অংশ তিন ঘণ্টার নীরব পরীক্ষাকক্ষে এসে কেন হোঁচট খেল?
জেনজি নাকি মিথ্যা বলতে পছন্দ করে না, স্বচ্ছতা আর সরাসরি কথাতেই ওস্তাদ। তাহলে কি সেদিন মিমের ছলে তারা নিজেদের আজকের বাস্তবতারই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল? গ্রিক ট্র্যাজেডির ইডিপাসের মতো—যিনি ভবিষ্যদ্বাণী থেকে পালাতে গিয়েই অজান্তে সেটিকে সত্য করে তুলেছিলেন। এই অ্যালগরিদম প্রজন্মও কি নিজেদের রসিকতার ভেতর ভবিষ্যতের কোনো নির্মম ইঙ্গিত রেখে গিয়েছিল? নাকি সমস্যাটা আরও গভীরে স্ক্রিনে গড়ে ওঠা দ্রুত যোগাযোগের সমাজ আর এখনো খাতা-কলমনির্ভর অ্যানালগ পরীক্ষাব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান দূরত্বে?
চলুন তাহলে ডিজিটাল সোসাইটি, অ্যানালগ জেনারেশন ও যোগাযোগবিদ্যার পাটাতন থেকে আজকের বাংলাদেশের মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বিপর্যয়কে বোঝার চেষ্টা করি।
কেন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা পাস করছে বেশি, অথচ মানবিকের অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী আটকে যাচ্ছে? কেন এক বছরের ব্যবধানে এসএসসি ও সমমানের গড় পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে নেমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়াল?
কেন জিপিএ-৫ কমল ২২ হাজারের বেশি? এটি কি শুধু একটি পরীক্ষার খারাপ ফল, নাকি আমাদের শিক্ষা, সমাজ এবং নতুন প্রজন্মের মনোজগতের ভেতরে ঘটে যাওয়া বড় কোনো পরিবর্তনের ছোট্ট দৃশ্যমান চিহ্ন? আরও অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলো—যে প্রজন্ম কয়েক সেকেন্ডে ভিডিও ‘স্কিপ’ করে, এক স্ক্রলেই বিষয় বদলায়, নোটিফিকেশনের শব্দে মনোযোগ সরিয়ে নেয়, সেই প্রজন্মকে যখন তিন ঘণ্টা একটি বেঞ্চে বসিয়ে কলম দিয়ে দীর্ঘ উত্তর লিখতে বলা হচ্ছে, তখন পরীক্ষাপদ্ধতি ও প্রজন্মের যোগাযোগ-অভ্যাসের মধ্যে কি কোনো সংঘর্ষ তৈরি হচ্ছে?
১০ আগস্ট প্রকাশিত ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের ফল এই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এনেছে। সামগ্রিক পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ পয়েন্ট। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো বিভাগভিত্তিক পার্থক্য। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ, ব্যবসায় শিক্ষায় ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ, আর মানবিকে মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ মানবিকের অর্ধেকের বেশি পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এ ফলকে নিছক ‘ভালো ছাত্র–খারাপ ছাত্র’-এর গল্প বানালে আমরা সম্ভবত বড় সমস্যাটিই এড়িয়ে যাব।
যোগাযোগবিদ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো— মাধ্যম বদলালে মানুষের তথ্য গ্রহণের ধরনও বদলায়। আমরা কী বলছি, তার পাশাপাশি কোন মাধ্যমে বলছি, সেটিও মানুষের চিন্তার কাঠামোকে প্রভাবিত করে। আজকের কিশোর সকালে উঠে সংবাদপত্র খুলে দিন শুরু করে না; বরং তার সামনে প্রথমেই আসে ফোনের পর্দা। পড়ার বদলে দেখা, দীর্ঘ লেখার বদলে শর্ট ভিডিও, অধ্যায়ের বদলে ক্লিপ, ধারাবাহিক যুক্তির বদলে দ্রুত পরিবর্তিত দৃশ্য—এগুলো এখন তার প্রতিদিনের যোগাযোগ-পরিবেশ। ফলে এ প্রজন্মকে আমি এখানে বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা হিসেবে নয়, একটি যোগাযোগগত রূপক হিসেবে ‘অ্যালগরিদম প্রজন্ম’ বলছি। তারা কী দেখবে, কতক্ষণ দেখবে, এরপর কী দেখবে—তার একটি বড় অংশ নির্ধারণ করছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম।
তবে তাদের সবাইকে ‘Gen Z’ বলাও ঠিক হবে না। প্রজন্মের সীমানা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে একক মত নেই। পিউ রিসার্চ ১৯৯৭ সাল থেকে নতুন পোস্ট-মিলেনিয়াল বা Gen Z প্রজন্মের সূচনা ধরে, অন্যদিকে McCrindle Gen Z-কে ১৯৯৫–২০০৯ এবং Gen Alpha-কে ২০১০–২০২৪ জন্মসাল দিয়ে সংজ্ঞায়িত করে। আবার অনেক গবেষক Gen Z-এর শেষসীমা ২০১২ বা ২০১৩ পর্যন্ত ধরেন। ফলে ২০২৬ সালে সাধারণত ১৫–১৭ বছর বয়সে এসএসসি দেওয়া এই শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আসলে Gen Z ও Gen Alpha-র সীমান্তবর্তী—যাদের অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘Zalpha’ও বলা হয়। এই সীমান্তবর্তী প্রজন্মটির বিশেষত্ব হলো, তারা কম্পিউটার শিখে ডিজিটাল হয়নি; বরং স্মার্টফোন, ইউটিউব, ফেসবুক, শর্ট ভিডিও ও অ্যালগরিদমিক ফিডের মধ্যেই বড় হয়েছে।
এখানেই ২০২৬ সালের ফলকে যোগাযোগবিদ্যার চোখে দেখার জায়গা তৈরি হয়। পরীক্ষার খাতা এখনো মূলত অ্যানালগ, কিন্তু পরীক্ষার্থী ক্রমেই ডিজিটাল। পরীক্ষায় তাকে প্রশ্ন বুঝতে হবে, স্মৃতি থেকে তথ্য উদ্ধার করতে হবে, যুক্তির ক্রম সাজাতে হবে, তারপর হাত দিয়ে দীর্ঘ সময় লিখতে হবে। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে সে তথ্য সংরক্ষণ না করে ‘সার্চ’ করে, মনে রাখার বদলে ‘সেভ’ করে, সম্পূর্ণ লেখা পড়ার বদলে স্ক্যান করে, আর এক বিষয়ের ওপর দীর্ঘ সময় স্থির থাকার পরিবর্তে দ্রুত বিষয়ান্তরে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এখানে প্রযুক্তিকে দোষী বানানো যেমন ভুল, তেমনি এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করাও ভুল।
হাতে লেখা বনাম টাইপিং নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাও ভাবনার খোরাক দেয়। ২০২৪ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকলজি-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, হাতে লেখার সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের সংযোগ টাইপ করার তুলনায় বিস্তৃতভাবে সক্রিয় হয়; গবেষকেরা শেখা ও স্মৃতির জন্য এই সমন্বিত স্নায়বিক কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। জাপানের টকিও ইউনিভার্সিটির গবেষণাতেও কাগজে হাতে লিখে তথ্য নথিবদ্ধ করা অংশগ্রহণকারীদের পরে সেই তথ্য স্মরণ করার সময় বেশি মস্তিষ্কীয় সক্রিয়তার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে ‘মোবাইল চালালে পরীক্ষায় ফেল করবে’। এমন সরল সিদ্ধান্ত বিজ্ঞানসম্মত নয়। বরং প্রশ্নটি অন্য জায়গায়: যদি একজন কিশোরের পড়াশোনা ও যোগাযোগের বড় অংশই দ্রুত স্ক্রল, ছোট টেক্সট, ভিডিও এবং টাইপিংনির্ভর হয়, কিন্তু তার চূড়ান্ত মূল্যায়ন হয় তিন ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন মনযোগ, স্মৃতি জাগরুক চিন্তা এবং হস্তাক্ষর দক্ষতার মাধ্যমে— তবে এই দুই দক্ষতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে কি? বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এ প্রশ্নে বড় আকারের গবেষণা প্রয়োজন। বর্তমান ফল সেই গবেষণার প্রয়োজনীয়তাই আরও বাড়িয়েছে।
এখানে মানবিক বিভাগের ফল আরও চিন্তার। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সূত্র, সমস্যা সমাধান, অঙ্ক এবং ধাপে ধাপে অনুশীলনের একটি বাধ্যতামূলক কাঠামো থাকে। মানবিকের বহু বিষয়ে প্রয়োজন হয় দীর্ঘ পাঠ, ভাষার দক্ষতা, বিশ্লেষণ, কারণ–ফল ব্যাখ্যা এবং সুসংবদ্ধ লিখিত প্রকাশ। ফলে যদি পড়ার অভ্যাস ছোট হয়ে আসে, মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে এবং উত্তর লেখার অনুশীলন দুর্বল হয়, তার অভিঘাত মানবিকের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়তে পারে—এটি একটি যৌক্তিক অনুমান, প্রমাণিত কারণ নয়। কিন্তু মানবিকে পাসের হার যখন ৪৮.৭৪ শতাংশ এবং বিজ্ঞানে ৮০.৬৪ শতাংশ, তখন ব্যবধানটির গভীর অনুসন্ধান অবশ্যই প্রয়োজন।
তার সঙ্গে রয়েছে গত দুই বছরের বাংলাদেশের অস্বাভাবিক সামাজিক বাস্তবতা। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া ছাত্রবিক্ষোভ একসময় ব্যাপক রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়, ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত হয় এবং ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। Reuters-এর প্রতিবেদনেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হওয়ার তথ্য আছে। জুলাই ২০২৪-এ স্কুল-কলেজের শ্রেণি কার্যক্রম এবং বিভিন্ন পরীক্ষা বন্ধ হয়েছিল; শিক্ষাপঞ্জি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার কথাও তখন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে।
পরের বছরেও শিক্ষা পুরোপুরি স্থির ছিল না। ২০২৫ সালের শেষ দিকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কর্মবিরতিতে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থীর বার্ষিক ও প্রাক্-নির্বাচনী পরীক্ষা ব্যাহত হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষাক্রম পুনর্বিন্যাস, পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন ও বই ছাপায় বিলম্বও শিক্ষা-পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। এমনকি ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার আগেও কঠোর পরীক্ষানীতি ও পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের খবর প্রকাশিত হয়েছে। অতএব প্রশ্ন উঠতেই পারে— যে কিশোর বয়সের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই বছর সামাজিক আন্দোলন, রাজনৈতিক পরিবর্তন, শিক্ষা-নীতির অস্থিরতা, পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক এবং অবিরাম অনলাইন উত্তেজনার মধ্যে কাটাল, সে কি সত্যিই নিরবচ্ছিন্ন একাডেমিক মনোযোগ পেয়েছে?
এই জায়গায় যোগাযোগবিদ্যা আরও একটি উত্তর দেয়। রাজনৈতিক ঘটনা এখন আর শুধু রাস্তায় ঘটে না; একই সঙ্গে ঘটে স্ক্রিনে। একটি আন্দোলনের ছবি, ভিডিও, স্লোগান, লাইভ, মন্তব্য, মিম—সবকিছু কিশোরের ফোনে প্রবেশ করে। ২০২৪ সালের বাংলাদেশের আন্দোলন নিয়ে পরবর্তী গবেষণায়ও ইউটিউবসহ ডিজিটাল পরিসরে আন্দোলনের আবেগ, রাজনৈতিক সংঘাত ও ডিজিটাল মুভমেন্টের শক্তিশালী উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীর মনোজগৎ তখন একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষ, রাজপথ এবং ডিজিটাল ফিড—তিনটি যোগাযোগক্ষেত্রের মধ্যে বিভক্ত ছিল। তাই ২০২৬ সালের ফলকে আমি অশনি সংকেত বলতে চাই—আতঙ্ক তৈরির জন্য নয়, সতর্ক হওয়ার জন্য। একটি দেশে এক বছরে পাসের হার ছয় শতাংশ পয়েন্টের বেশি কমা, মানবিকের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া এবং জিপিএ-৫ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া শুধু পরীক্ষার টেবিলের সংখ্যা নয়। এটি প্রশ্ন তুলছে আমাদের শেখার সংস্কৃতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা, মনোযোগের অভ্যাস, শিক্ষকতা, পারিবারিক তদারকি এবং ডিজিটাল জীবনের ভারসাম্য নিয়ে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হবে যদি আমরা এর উত্তর খুঁজি শুধু—“ছাত্ররা পড়েনি”—এই একটি বাক্যে।
বরং এখন কয়েকটি কাজ জরুরি। প্রথমত, শিক্ষা বোর্ডকে বিষয়ভিত্তিক ও প্রশ্নভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ প্রকাশ করা অবধি আমাদের আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে— মানবিকের শিক্ষার্থীরা ঠিক কোন বিষয়ে, কোন ধরনের প্রশ্নে বেশি ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ে আবার দীর্ঘপাঠ, হাতে লেখা, নির্দিষ্ট সময় স্ক্রিনবিহীন অধ্যয়ন এবং তিন ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষার অনুশীলন ফিরিয়ে আনতে হবে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল লিটারেসিকে শুধু ‘এসো কম্পিউটার শিখি’ হিসেবে না দেখে এটেনশন ম্যানেজমেন্ট কৌশল শেখাতে হবে—কখন ফোন বন্ধ রাখতে হয়, কীভাবে দীর্ঘ লেখা পড়তে হয়, কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়। চতুর্থত, মানবিককে ‘দুর্বল শিক্ষার্থীর বিভাগ’ হিসেবে দেখার সামাজিক প্রবণতা বদলাতে হবে; ভাষা, ইতিহাস, সমাজ, রাষ্ট্র ও মানব আচরণ বোঝার জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা দরকার, তা কোনোভাবেই দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা নয়। আর সর্বোপরি শিক্ষার নীতি ও পরীক্ষাব্যবস্থায় ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
আর যারা এবার অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের উদ্দেশেও একটি কথা জরুরি। একটি ফলাফল জীবনের চূড়ান্ত রায় নয়। পরীক্ষায় ব্যর্থতা মানে সামর্থ্যের মৃত্যু নয়; বরং কোথায় ঘাটতি আছে তার কঠিন একটি প্রতিবেদন। এই বয়সে এক বছর পিছিয়ে যাওয়া খুব বড় মনে হয়, কিন্তু একটি পূর্ণ জীবনের হিসাবে এটি খুব ছোট সময়। ফোনের স্ক্রিন থেকে কিছুটা সরে এসে বইয়ের সঙ্গে দীর্ঘ সময় বসা, প্রতিদিন হাতে লেখা, ভুলগুলো শনাক্ত করা এবং আবার চেষ্টা করার মধ্য দিয়েই ফিরে আসা সম্ভব। সমাজেরও দায়িত্ব তাদের ‘ফেল করা ছেলে-মেয়ে’ বলে অপমান না করে পুনরায় শেখার সুযোগ করে দেওয়া।
এরও আগে এই প্রজন্মের শৈশব-কৈশোরে আরেকটি বড় ‘পরীক্ষা’ নিয়ে এসেছিল করোনা মহামারী। যে বয়সে স্কুলের ঘণ্টা, বন্ধুদের হৈচৈ, শিক্ষকের বকুনি আর খাতায় লাল কালির দাগের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কথা, সে বয়সের একটি দীর্ঘ সময় তাদের কেটেছে লকডাউন, কোয়ারান্টাইন আর বন্ধ স্কুলের ভেতর। শ্রেণিকক্ষ ঢুকে পড়েছিল মোবাইলের পাঁচ-ছয় ইঞ্চি পর্দায়—শিক্ষক একদিকে পড়াচ্ছেন, অন্যদিকে হয়তো মেসেঞ্জারের নোটিফিকেশন, ইউটিউব-এর বেল আইকনের টুংটাং শব্দ কিংবা গেমের হাতছানি! এক অর্থে করোনা তাদের শুধু ‘অনলাইন ক্লাস’ শেখায়নি, স্ক্রিনকেই শ্রেণিকক্ষ বানিয়ে দিয়েছিল। ইউনেসকো, ইউনিসেফ ও বিশ্বব্যাংক-এর যৌথ প্রতিবেদনে মহামারিজনিত দীর্ঘ স্কুল-বন্ধের কারণে ‘লার্নিং লস’ এবং শিশু-কিশোরদের শেখার সংকটের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। ফলে আজকের এসএসসি ফল বিশ্লেষণের সময় প্রশ্নটি করতেই হয়—করোনাকালে তৈরি হওয়া সেই শিক্ষণ-ঘাটতি কি আমরা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পেরেছি? নাকি মজার ছলে বললে, করোনার সময় স্কুল ছুটি হয়েছিল, কিন্তু মোবাইলের স্কুল আর ছুটি নেয়নি! যে শিশুকে কয়েক বছর বলা হলো, ‘পড়াশোনা করতে হলে স্ক্রিনে তাকাও’, তাকে এখন হঠাৎ তিন ঘণ্টা ফোনবিহীন কক্ষে বসিয়ে বলা হচ্ছে—‘এবার স্ক্রিন নয়, স্মৃতি থেকে খাতায় লেখো।’ এই ডিজিটাল থেকে অ্যানালগ প্রত্যাবর্তনের ধাক্কাটিও তাই ২০২৬ সালের ফলের সম্ভাব্য সামাজিক-শিক্ষাগত পটভূমি হিসেবে অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
আজ যারা এসএসসির খাতায় তিন ঘণ্টা কলম চালাতে গিয়ে হিমশিম খেলো, করোনার সময় তাদের অনেকেই তখন চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণির শিশু। যে বয়সে হাতের লেখা সুন্দর করার কথা, শিক্ষককে দেখে হোমওয়ার্কের ভয় পাওয়ার কথা, সেই বয়সে তাদের শিক্ষক হয়ে উঠেছিল মোবাইলের স্ক্রিন। স্কুল বন্ধ ছিল, কিন্তু ইউটিউব-ফেসবুক খোলা ছিল চব্বিশ ঘণ্টা! এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। যে কিশোর কয়েক সেকেন্ডে একটি পোস্ট ভাইরাল করতে পারে, তাকে আমরা তিন ঘণ্টা ধরে একটি খাতায় যুক্তি নির্মাণ করতে বলছি। যে প্রজন্ম অ্যালগরিদমের গতিতে পৃথিবী দেখে, তাকে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে অ্যানালগ সময়ের কাঠামোয়। সমস্যা শুধু প্রজন্মের নয়, আবার শুধু পরীক্ষাব্যবস্থারও নয়; সমস্যা দুই জগতের ক্রমবর্ধমান দূরত্বে।
২০২৬ সালের এসএসসি ফল তাই কেবল স্মরণকালের সেরা বিপর্যয় বা শিক্ষার্থীদের রেকর্ড ফেলের হিসাব নয়। এটি আমাদের সামনে রাখা একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা কি শুধু ব্যর্থ পরীক্ষার্থীকে দেখব, নাকি দেখতে চেষ্টা করব বদলে যাওয়া একটি প্রজন্ম, অস্থির একটি সমাজ এবং এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থাকে—যার সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, অ্যালগরিদমের যুগে গভীরভাবে ভাবতে, মনে রাখতে এবং নিজের হাতে নিজের চিন্তা লিখতে পারে—এমন মানুষ তৈরি করা?
.png)
সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা কারখানায় আগুন লেগে ঘুমের মধ্যে পুড়ে মারা গেছেন ১৬ জন বাংলাদেশি। তাঁদের ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাইয়ে; তিনজন নাটোরের নলডাঙ্গায়। এই মুহূর্তে সেসব গ্রামে শোকের যে ছায়া নেমেছে, তার ভার বহনের শক্তি কোনো পরিবারের নেই।
১৮ ঘণ্টা আগে
জ্বালানি তেলের আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন ব্যবস্থার প্রশ্নকে কেবল ব্যবসার স্বাধীনতা, বাজারে প্রতিযোগিতা কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতার আলোকে বিচার করলে চলবে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, জনগণের জ্বালানি অধিকার এবং সর্বোপরি জ্বালানি সুবিচার।
২০ ঘণ্টা আগে
সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ৪ আগস্ট দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে। এদিন কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন। তার সারাংশ হলো—জনপ্রত্যাশা, জুলাই সনদ এবং বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে সংবিধান সংশোধন করা হবে।
২১ ঘণ্টা আগে
টেকসই গণতন্ত্রের জন্য ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির চেয়ে প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কে ক্ষমতায় আছেন বা কোন সাংবিধানিক পদে কে বসলেন তার চেয়ে বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা বেশি জরুরি।
১০ আগস্ট ২০২৬