একটি বল, তিনটি দেশ, একশ কোটি হৃদয়

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ যেভাবে ভাঙা পৃথিবীকে এক সুতোয় বাঁধছে

প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৬, ১৪: ২০
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

রাত জেগে খেলা দেখার অভ্যাসটা বাঙালির অনেক পুরনো। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপটা যেন একটু আলাদা। ঘড়ির কাঁটা ধরে হিসাব করলে ঢাকার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকোর সময়ের ব্যবধান এত বেশি যে অনেক ম্যাচ শুরুই হচ্ছে ভোররাতে। তবু চায়ের দোকান থেকে অফিসের করিডর, সবখানে একই আলোচনা—কাল রাতে মেসি খেললেন কেমন, ব্রাজিল-জাপান ম্যাচে শেষ মুহূর্তে কী হলো, নাকি জার্মানি কীভাবে হেরে গেল প্যারাগুয়ের কাছে। ফুটবল বিশ্বকাপ একটা খেলার আসর মাত্র নয়, এটা প্রতি চার বছর পরপর পৃথিবীর একটা বড় উৎসব, যেখানে রাজনীতি, অর্থনীতি আর মানুষের আবেগ একসঙ্গে মিশে যায়।

এবারের আসরটা ইতিহাসেই আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ মিলে আয়োজন করছে বিশ্বকাপ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকো। প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছে ৪৮টি দল, আগে যা ছিল ৩২টি। মানে আরও বেশি দেশ, আরও বেশি গল্প, আরও বেশি অঘটনের সুযোগ। ফিফা এই সম্প্রসারণকে বলছে ফুটবলকে সত্যিকার অর্থে বিশ্বজনীন করে তোলার চেষ্টা। সমালোচকরা বলছেন, এতে টুর্নামেন্ট লম্বা হয়ে যাচ্ছে, মানও কিছুটা পাতলা হচ্ছে। কিন্তু মাঠের লড়াই বলছে ভিন্ন কথা—এই বিশ্বকাপ এখন পর্যন্ত চমকে ভরা।

স্বাগতিকদের রূপকথা

কানাডার কথাই ধরা যাক। ফুটবল বিশ্বে কানাডা কখনো বড় নাম ছিল না, হকির দেশ বলেই তার পরিচিতি। অথচ নিজেদের মাটিতে এবার তারা দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোয় পা রেখেছে। এই মুহূর্তটা কানাডার জন্য শুধু একটা জয় নয়, এটা একটা জাতির ফুটবল-পরিচয় তৈরি হওয়ার মুহূর্ত। মেক্সিকোর গল্পটাও কম রোমাঞ্চকর নয়। আজতেকা স্টেডিয়ামে নিজেদের সমর্থকদের সামনে ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে হারিয়ে তারা টানা চল্লিশ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেয়েছে। ভাবুন তো, চল্লিশ বছর ধরে একটা জাতি অপেক্ষা করছিল এই একটা জয়ের জন্য! কিনিওনেস আর হিমেনেজের গোল দুটো তাই শুধু স্কোরবোর্ডে নাম্বার নয়, এক প্রজন্মের কান্না আর আনন্দের মিশ্রণ।

স্বাগতিক দেশ হওয়ার একটা বাড়তি সুবিধা আছে ঠিকই—নিজের মাঠ, নিজের দর্শক, নিজের আবহাওয়া। কিন্তু স্বাগতিক হয়েও ভালো খেলাটা মোটেও সহজ কাজ নয়। ইতিহাসে বহু স্বাগতিক দেশ প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিয়েছে চাপ সামলাতে না পেরে। কানাডা আর মেক্সিকো তাই যা করে দেখিয়েছে, তাকে বলা যায় মানসিক দৃঢ়তার এক বড় পরীক্ষায় পাস করা।

বড়দের পতন, ছোটদের জেগে ওঠা

বিশ্বকাপ মানেই তো অঘটনের আরেক নাম। এবার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লেগেছে জার্মান শিবিরে। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে প্যারাগুয়ের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করার পর টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিয়েছে। ফুটবলের ইতিহাসে জার্মানি মানেই নিখুঁত পরিকল্পনা আর স্নায়ুর জোর—অথচ সেই জার্মানিই এবার পেনাল্টি শুটআউটে ভেঙে পড়ল। এশিয়ার শক্তি দক্ষিণ কোরিয়ার গল্পটা আরও করুণ। গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার পর কোচ পদত্যাগ করেছেন, দেশটির প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত পুরো ব্যাপারটা নিয়ে তদন্তের দাবি তুলেছেন। এশিয়ার আরেক পরাশক্তি সৌদি আরব, যারা তিনবার এশিয়া চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তারা নিজেদের গ্রুপে সবার নিচে থেকে মাত্র দুই পয়েন্ট নিয়ে বিদায় নিয়েছে।

অন্যদিকে র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দশে থাকা দুই দল মরক্কো আর নেদারল্যান্ডস মুখোমুখি হয়েছে মেক্সিকোর মন্তেরেতে শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে—যা নিজেই একটা বিরল ঘটনা। মরক্কো গত বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে গোটা আফ্রিকাকে গর্বিত করেছিল, এবারও তারা প্রমাণ করছে সেটা কোনো এক আসরের চমক ছিল না, বরং একটা প্রজন্মের প্রতিভার ফসল। আফ্রিকান ফুটবল ধীরে ধীরে যে বিশ্বমঞ্চে নিজের জায়গা শক্ত করছে, মরক্কোর এই ধারাবাহিকতা তারই প্রমাণ।

যে ম্যাচ ভুলবে না কেউ

ব্রাজিল বনাম জাপান—হিউস্টনে হওয়া এই ম্যাচটা এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা লড়াই হিসেবে থেকে যাবে অনেক দিন। জাপান প্রথমার্ধে সানোর গোলে এগিয়ে গিয়েছিল, ব্রাজিলের বিপক্ষে যা প্রায় অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য। কাসেমিরো সমতা ফেরান দ্বিতীয়ার্ধে, কিন্তু ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে, নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মিনিট পরে, গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির গোলে জাপানের হৃদয় ভেঙে ব্রাজিল পার হয়ে যায় শেষ ষোলোয়। এই এক গোল বলে দেয় কেন ফুটবলকে বলা হয় অনিশ্চয়তার খেলা। নব্বই মিনিট পর্যন্ত এশিয়ার একটা দল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে কাঁপিয়ে দিতে পারে—এটাই তো আধুনিক ফুটবলের সৌন্দর্য, যেখানে টাকার অঙ্কে বড় দল আর ছোট দলের ফারাক কমে আসছে ক্রমশ।

ফ্রান্স আর নরওয়ের মতো ইউরোপীয় শক্তিগুলোও নিজেদের জাত চিনিয়েছে। এমবাপ্পের জোড়া গোলে সুইডেনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে ফ্রান্স। আর নরওয়ের আরলিং হালান্ড, যাকে বলা হচ্ছে এই প্রজন্মের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকার, গোল করে আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে দলকে তুলেছেন পরের রাউন্ডে।

ফুটবল যখন শুধু খেলা নয়

একটু ভাবুন—কেন একটা ফুটবল ম্যাচ নিয়ে গোটা দুনিয়া এত মাতামাতি করে, অথচ সেই দেশের সঙ্গে আমাদের সরাসরি কোনো সম্পর্কও নেই? উত্তরটা লুকিয়ে আছে ফুটবলের এক অদ্ভুত ক্ষমতায়—এটা মানুষকে একটা কল্পিত পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে দিতে পারে নিমেষে। বাংলাদেশের একটা গ্রামের ছেলে ব্রাজিলের জার্সি পরে উল্লাস করে, পতাকা ওড়ায় ছাদে, দেয়ালে আঁকে মেসি বা নেইমারের ছবি। এই ভালোবাসার পেছনে যুক্তি খুঁজতে যাওয়াই বৃথা—এটা নিছক আবেগ, আর সেই আবেগই ফুটবলকে বানিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ঘটনা।

অর্থনীতির হিসাবেও বিশ্বকাপ বিশাল ব্যাপার। তিন দেশ মিলে আয়োজক হওয়ার পেছনে যতটা না ফুটবলপ্রেম, তার চেয়ে বেশি কাজ করেছে অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ। হোটেল, বিমান পরিবহন, সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন—সব মিলিয়ে এই টুর্নামেন্ট থেকে শত শত কোটি ডলারের ব্যবসা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফিফা নিজেই এখন একটা বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে খেলার পাশাপাশি চলে রাজনীতি আর কূটনীতিও। কোন দেশ আয়োজক হবে, কোন সময়ে খেলা হবে, কোন সম্প্রচার সংস্থা স্বত্ব পাবে—এসবের পেছনে থাকে জটিল হিসাব-নিকাশ, যেখানে টাকার অঙ্কই শেষ কথা বলে।

আবার এই বিশ্বকাপ এটাও মনে করিয়ে দেয়, ভূরাজনীতির টানাপোড়েনের মধ্যেও খেলা কীভাবে মানুষকে একসঙ্গে বসিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের মধ্যে যুদ্ধ চলছে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত থামার নাম নেই, অথচ মাঠে নেমে যখন ইউক্রেনের কোনো খেলোয়াড় বল নিয়ে দৌড়ান, বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দল গোল করে উল্লাস করে, তখন কিছুক্ষণের জন্য হলেও সেই যুদ্ধের খবর সরে যায় পটভূমিতে। এটাই বোধহয় খেলার সবচেয়ে বড় শক্তি—এটা রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষকে মানুষ হিসেবে একত্র করতে পারে, অন্তত নব্বই মিনিটের জন্য।

বাংলাদেশ আর বিশ্বকাপ-জ্বর

আমাদের দেশ কখনো বিশ্বকাপে খেলেনি, নিকট ভবিষ্যতে খেলার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। তবু বাংলাদেশের মতো এত আবেগ নিয়ে বিশ্বকাপ উপভোগ করা দেশ পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। পাড়ায় পাড়ায় পতাকা ওড়ে, দেয়াল রঙিন হয় প্রিয় দলের রঙে, চায়ের আড্ডায় তর্ক হয় মেসি বড় না নেইমার। এই সংস্কৃতি একদিনে তৈরি হয়নি—দশকের পর দশক ধরে টেলিভিশনের পর্দায় বিশ্বকাপ দেখতে দেখতে এটা আমাদের সামাজিক জীবনেরই অংশ হয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো, দেশে ফুটবলের ঘরোয়া লিগ যখন দর্শকশূন্য মাঠে গড়ায়, তখনই বিশ্বকাপ এসে গোটা জাতিকে রাত জাগিয়ে দেয়। এই বৈপরীত্য নিয়ে হাসাহাসি হয় বটে, কিন্তু এটাও সত্যি যে বিশ্বকাপের এই উন্মাদনা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের মানুষ ফুটবলকে ভালোবাসতে জানে, শুধু সেই ভালোবাসাকে দেশের মাঠে ফেরানোর মতো বিনিয়োগ আর পরিকল্পনার অভাব রয়ে গেছে এত বছরেও।

এই সুযোগে একটা প্রশ্ন তোলাই যায়—আমরা কি কখনো নিজেদের ফুটবল খাতে সেই বিনিয়োগ করব, যা করছে জাপান, মরক্কো বা কানাডা? মরক্কো একসময় ছিল নিতান্তই সাধারণ একটা দল, পরিকল্পিত বিনিয়োগ আর প্রবাসী খেলোয়াড়দের কাজে লাগিয়ে তারা আজ বিশ্বমানের শক্তি। জাপানও নব্বইয়ের দশকে শুরু করেছিল প্রায় শূন্য থেকে, এখন তারা নিয়মিত বড় দলগুলোকে ভয় ধরায়। বাংলাদেশের সামনে এই মডেলগুলো একটা পথনির্দেশিকা হতে পারে, যদি সদিচ্ছা আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকে।

আবহাওয়া, বিতর্ক আর মাঠের বাইরের গল্প

এবারের বিশ্বকাপে ফুটবলের বাইরেও আলোচনায় এসেছে আরেকটা বিষয়—আবহাওয়া। মেক্সিকো সিটিতে মেক্সিকো বনাম ইকুয়েডর ম্যাচের আগে বজ্রঝড়ের কারণে খেলা শুরু করতেই দেরি হয়ে যায় বেশ কয়েক ঘণ্টা। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে গ্রীষ্মকালীন তীব্র গরমে খেলোয়াড়দের জন্য বাধ্যতামূলক পানি বিরতি রাখতে হয়েছে আয়োজকদের। তিনটি ভিন্ন দেশের একাধিক শহরে খেলা হওয়ায় আবহাওয়ার ভিন্নতা এবার একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে—কোনো দল হয়তো ঠান্ডা আবহাওয়ায় অভ্যস্ত, তাকে খেলতে হচ্ছে চল্লিশ ডিগ্রি তাপমাত্রায়, আবার কোনো দলকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে উচ্চতাজনিত শ্বাসকষ্টের সমস্যা। এসব বিষয় দর্শকের চোখে না পড়লেও, খেলোয়াড় আর কোচদের জন্য এগুলো ম্যাচ জেতা-হারার সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখছে।

৪৮ দলের এই নতুন ফরম্যাট নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। অনেক সাবেক খেলোয়াড় আর কোচ প্রশ্ন তুলেছেন, এত বেশি দল অংশ নেওয়ায় গ্রুপ পর্বের অনেক ম্যাচের মান পড়ে গেছে, ছোট দলগুলোর বিপক্ষে বড় দলগুলো সহজ জয় পাচ্ছে, যা দর্শকদের জন্য একঘেয়ে। আবার সমর্থকদের আরেকটা অংশ বলছেন, এই সম্প্রসারণের কারণেই তো কানাডা বা মরক্কোর মতো দেশগুলো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রতিভা দেখানোর সুযোগ পাচ্ছে, যা আগে হয়তো সম্ভব হতো না মাত্র বত্রিশ দলের কোটায়। এই বিতর্ক আসলে ফুটবলের একটা চিরন্তন টানাপোড়েনের প্রতিফলন—অভিজাততন্ত্র বনাম গণতন্ত্রীকরণ, মান বনাম সুযোগের সমতা।

মেয়েদের ফুটবল আর বদলে যাওয়া সংস্কৃতি

পুরুষদের বিশ্বকাপের উন্মাদনার আড়ালে একটা কথা প্রায়ই চাপা পড়ে যায়—গত এক দশকে মেয়েদের ফুটবলও এগিয়েছে বিস্ময়করভাবে। ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলো এখন নিজেদের নারী দলে বিনিয়োগ করছে সমান গুরুত্ব দিয়ে, স্টেডিয়াম ভরে যাচ্ছে মেয়েদের ম্যাচেও। বাংলাদেশেও এই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে—সাবিনা খাতুনদের মতো খেলোয়াড়েরা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে দেখিয়ে দিয়েছেন, সীমিত সম্পদ নিয়েও ইচ্ছাশক্তি থাকলে সাফল্য আসে। পুরুষদের বিশ্বকাপ চলাকালীন এই প্রসঙ্গ তোলার একটা কারণ আছে—ফুটবলের ভবিষ্যৎ শুধু পুরুষদের নিয়ে নয়, বরং দুই ধারার সমান্তরাল বিকাশের মধ্য দিয়েই এই খেলাটা সত্যিকার অর্থে সবার খেলায় পরিণত হবে।

মাঠের বাইরের রেফারি: প্রযুক্তি আর বিতর্কিত সিদ্ধান্ত

আধুনিক ফুটবলে ভিএআর বা ভিডিও সহায়ক রেফারি প্রযুক্তি এখন প্রতিটা বড় সিদ্ধান্তের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বিশ্বকাপেও একাধিক ম্যাচে পেনাল্টি আর অফসাইডের সিদ্ধান্ত নিয়ে তৈরি হয়েছে তুমুল বিতর্ক। কোনো কোনো সমর্থক বলছেন, প্রযুক্তি খেলার ন্যায্যতা বাড়িয়েছে, ভুল সিদ্ধান্তের সংখ্যা কমিয়েছে। আবার অনেকে অভিযোগ করছেন, বারবার খেলা থামিয়ে রিভিউ করার কারণে খেলার স্বতঃস্ফূর্ততা আর উত্তেজনা কিছুটা হলেও কমে যাচ্ছে। এই বিতর্ক নতুন নয়, প্রতিটা বিশ্বকাপেই কমবেশি ফিরে আসে। তবে একটা বিষয়ে প্রায় সবাই একমত—প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, শেষমেশ মানুষের চোখ আর বিচারবুদ্ধিই থেকে যায় খেলার সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে, আর সেখানেই মাঝেমধ্যে তৈরি হয় সবচেয়ে বড় বিতর্ক।

টাকার খেলা, স্বপ্নের খেলা

একটা পরিসংখ্যান দিয়েই বোঝা যায় বিশ্বকাপ ঠিক কতটা বড় ব্যবসা। ফিফা নিজেই বলছে, এবারের আসর থেকে আয়ের পরিমাণ ছাড়িয়ে যাবে আগের সব রেকর্ড। সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করে, বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে, টিকিট বিক্রি করে—এই তিন খাত থেকেই আসছে বিপুল অর্থ। প্রশ্ন হলো, এই টাকা শেষমেশ যায় কোথায়? একটা অংশ যায় সদস্য দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নে, একটা অংশ যায় আয়োজক দেশের অবকাঠামোয়। কিন্তু সমালোচকরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ফিফার আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন থেকে যায়। যে দেশে ফুটবলের প্রতি এত ভালোবাসা, সেই দেশেই কেন তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগ এত কম—এই প্রশ্নটা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক।

খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকের দিকে তাকালেও চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। একেকজন তারকা খেলোয়াড়ের বাৎসরিক আয় অনেক দেশের জাতীয় বাজেটের একটা অংশের সমান। অথচ এই তারকাদের অনেকেই উঠে এসেছেন একেবারে দরিদ্র পরিবার থেকে—রাস্তার ধারে বল খেলতে খেলতে যাদের ফুটবলজীবন শুরু। এই বৈপরীত্য—চরম দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা একজন মানুষের হাত ধরে তৈরি হওয়া বিলিয়ন ডলারের এক বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য—ফুটবলকে করে তুলেছে এক অনন্য গল্প বলার মাধ্যম। প্রতিটা বিশ্বকাপে তাই নতুন করে জন্ম নেয় এমন অনেক গল্প, যা মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়।

সমর্থকদের ভ্রমণ, শহরের অর্থনীতি

তিন দেশ মিলে আয়োজন করার আরেকটা মজার দিক হলো, সমর্থকদের এবার সীমান্ত পেরিয়ে ভ্রমণ করতে হচ্ছে খেলা দেখতে। কোনো সমর্থক হয়তো একটা ম্যাচ দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রে, পরের সপ্তাহে আরেকটা ম্যাচ দেখতে উড়ে যাচ্ছেন মেক্সিকো সিটি বা টরন্টোয়। এই ভ্রমণ-নির্ভর দর্শক সংস্কৃতি স্থানীয় অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব ফেলছে—হোটেল বুকিং, রেস্তোরাঁ ব্যবসা, স্থানীয় পরিবহন, স্মারক পণ্যের দোকান, সবখানেই বাড়তি আয়ের জোয়ার। আয়োজক শহরগুলোর ব্যবসায়ীরা এই একটা মাসের জন্য সারা বছরের প্রস্তুতি নিয়ে বসে থাকেন। আবার এই বিপুল জনসমাগম সামলাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করতে হয়েছে অভূতপূর্বভাবে, যা আয়োজক দেশগুলোর জন্য বাড়তি ব্যয় আর চ্যালেঞ্জ দুটোই তৈরি করেছে।

এখন খেলা গড়াচ্ছে শেষ ষোলোর দিকে। ব্রাজিল, জার্মানি বাদ পড়েও নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, ফ্রান্স, মেক্সিকো, কানাডার মতো দলগুলো লড়ছে শিরোপার স্বপ্ন নিয়ে। আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও অনেক চমক অপেক্ষা করছে, নিশ্চিত। কে চ্যাম্পিয়ন হবে, তা এখনই বলা কঠিন। কিন্তু এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, এই বিশ্বকাপ প্রমাণ করে দিচ্ছে ফুটবল ঠিক কতটা অপ্রত্যাশিত আর মানবিক একটা খেলা। যেখানে চল্লিশ বছরের অপেক্ষা এক রাতে ফুরিয়ে যায়, যেখানে চারবারের চ্যাম্পিয়ন একটা টাইব্রেকারে সব হারায়, যেখানে এশিয়ার এক ছোট দল পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়। এই অনিশ্চয়তা, এই আবেগ, এই আকস্মিকতাই তো ফুটবলকে বানিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। যুদ্ধ-বিগ্রহ, অর্থনৈতিক সংকট আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভরা এই পৃথিবীতে, মাসখানেকের জন্য হলেও, একটা গোলাকার চামড়ার বল আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আনন্দ করার, একসঙ্গে চিৎকার করার, আর ভাগাভাগি করে স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা আমরা এখনো হারিয়ে ফেলিনি।

  • এম এম মুসা: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক
Ad 300x250

সম্পর্কিত