তনভিয়া বড়ুয়া
-29ae21.png)
ছররা বন্দুক। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে থাকা ‘কম প্রাণঘাতী’ অস্ত্র। অথচ সেই অস্ত্রের একেকটি ছররা কেড়ে নিয়েছে মানুষের চোখ, পড়াশোনা, কাজ, স্বাভাবিক জীবন। কাশ্মীরে ২০১৬ সালে আন্দোলনের সময় কয়েক মাসের মধ্যে শত শত মানুষ চোখে ছররার আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কারও চোখের দৃষ্টি আর ফেরেনি, কারও চোখ অস্ত্রোপচার করে বাদ দিতে হয়েছে। ইনশা মুশতাক থেকে দেড় বছরের হিবা, ফারজান শেখ থেকে পারভেজ আহমেদ মীর—প্রতিটি গল্পই বলে, ‘কম প্রাণঘাতী’ শব্দটির আড়ালে কতটা গভীর ক্ষত লুকিয়ে থাকতে পারে।
আর সেই কাশ্মীরের ইতিহাসের সঙ্গেই যখন ২০২৬ সালের দিল্লির যন্তর মন্তরের ঘটনা এসে মিশে যায়, তখন প্রশ্নটি আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। পুলিশ পেলেট ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। কিন্তু আরটিআইয়ের জবাবে হাসপাতালের নথিতে উঠে আসে অন্তত ১০ জনের ছররার-আঘাতের তথ্য। প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ সাকেত গোখলের করা আরটিআইয়ের জবাবে লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ জানায়, ২০ জুলাই ছররার আঘাতে ৯ জন চিকিৎসা নিয়েছিলেন। সফদরজং হাসপাতাল জানায়, আরও একজন ছররার আঘাতে আহত হয়েছিলেন। অর্থাৎ, হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, অন্তত ১০ জনের ছররার-আঘাতের তথ্য সামনে এসেছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে দু'বছরে যত চোখের গুরুতর আঘাত নথিভুক্ত হয়েছিল, কাশ্মীরে মাত্র ৪ মাসে তার চেয়েও বেশি মানুষ একই ধরনের আঘাতের শিকার হয়েছিলেন। ইরাক ও আফগানিস্তান ছিল যুদ্ধক্ষেত্র। কাশ্মীরে তখন কোনো যুদ্ধ চলছিল না। তবু সেখানে মানুষের চোখে, শরীরে এবং জীবনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তার খেসারত আজও দিতে হচ্ছে। ছররার বন্দুকও আজও ব্যবহার হচ্ছে।
ভারত-শাসিত কাশ্মীরে বিক্ষোভ মোকাবিলায় প্রথমবার ছররা বন্দুক ব্যবহার করা হয় ২০১০ সালে। সেই সময় এটিকে মারণাস্ত্র নয়, বরং ‘কম প্রাণঘাতী’ বা ‘নন-লিথাল’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলিতে এই অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে।
ছররা বন্দুক দেখতে সাধারণ বন্দুকের মতো হলেও এর গুলি আলাদা। প্রতিটি শেলের মধ্যে থাকে ছোট ছোট ধাতব বল। একটি কার্তুজে প্রায় ৪৫০টি পর্যন্ত ধাতব দানা থাকতে পারে। বিশেষ পাম্প-অ্যাকশন শর্টগান থেকে এই শেল ছোড়া হলে বাইরের খোলস ফেটে যায় এবং তার ভিতরের ধাতব দানাগুলি একসঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একটি গুলি একই সঙ্গে শরীরের একাধিক অংশে আঘাত করতে পারে।
১৯ বছরের তরুণ সাহিল লোচাব। ২০২৬ সালের ২০ জুলাই যন্তর মন্তর থেকে সংসদ অভিমুখে পড়ুয়াদের মিছিলের সময় তিনি ছররার আঘাতে ডান চোখে গুরুতর জখম হন। তাঁকে দ্রুত দিল্লির AIIMS-এর জয়প্রকাশ নারায়ণ অ্যাপেক্স ট্রমা সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। ২১ জুলাই তাঁর চোখে অস্ত্রোপচার করে আটকে থাকা ছররার গুলি বের করা হয়। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, চোখের মণি বা pupil মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চিকিৎসকেরা দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ১ শতাংশ বলে জানিয়েছিলেন।
দিল্লির নাজফগড়ের বাসিন্দা সাহিল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওপেন লার্নিং-এর পড়ুয়া। তাঁর স্বপ্ন ছিল ভবিষ্যতে পুলিশে যোগ দেওয়া।
সাহিলের চোখের আঘাত তাই শুধু একজন তরুণের চিকিৎসার গল্প নয়। দিল্লির রাজপথে বিক্ষোভ সামলাতে ঠিক কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সেই ব্যবহারের দায় কার—এই প্রশ্নও তাঁর ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে।
যন্তর মন্তরে পড়ুয়াদের সংসদ অভিযান ঘিরে সংঘর্ষের সময় গুরুতর আহত হন ২৫ বছরের শেখ ইরশাদ মনসুরিও। বিক্ষোভের সময় তাঁর মুখ ও ঘাড়ে ছররার আঘাত লাগে। একাধিক ধাতব ছররা তাঁর শরীরে ঢুকে যায়। পরে তাঁকে দিল্লির লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ইরশাদের আঘাত ছিল মূলত মুখ, কপাল, গাল এবং নাকের আশপাশে। ছররার আঘাতে তাঁর মুখে একাধিক ক্ষত তৈরি হয়। চোখের বাঁ দিকটিও রক্তাক্ত হয়ে ফুলে যায়। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাঁর মুখ ও ঘাড় থেকে ছররা বের করার জন্য অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের পরও মুখের ক্ষত শুকোতে সময় লাগছিল এবং চোখের লালভাব পুরোপুরি কাটেনি।
প্রায় চার দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ইরশাদকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেও তাঁর শরীরে রয়ে যায় সেই দিনের আঘাতের চিহ্ন। কপাল, গাল ও নাকের ক্ষত তখনও পুরোপুরি শুকায়নি।
২০১৬ সালের জুলাই। বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর কাশ্মীরজুড়ে তখন তীব্র বিক্ষোভ চলছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রতিদিনই আহত হচ্ছিলেন বহু মানুষ। সেই সময় ছররার বন্দুকের আঘাতে চোখ হারানো মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে। এর মধ্যেই শ্রীনগরের হাসপাতালগুলিতে একের পর এক গুরুতর আহত মানুষ ভর্তি হচ্ছিলেন।
এই ছররা বন্দুকের ভয়াবহতার অন্যতম প্রতীক ইনশা মুশতাক। ২০১৬ সালের ১১ জুলাই। ইনশার বয়স তখন মাত্র ১৪ বছর। ইনশা কোনো প্রতিবাদে অংশ নেয়নি। অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষার পর পড়ছিল নিজের ঘরের জানালার পাশে বসে। সেই সময় নিরাপত্তারক্ষীদের ছোড়া একঝাঁক ছররা এসে তাঁর মুখ ও চোখে বিঁধে যায়। তাঁর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হয় অন্তত ১০০টি ছররার ক্ষত। একাধিক অস্ত্রোপচার করা হলেও তাঁর দু’চোখে দৃষ্টি আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
আজ ইনশার বয়স ২৪ বছর। সম্প্রতি দিল্লিতে ছররা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ যেভাবে সরব হয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর ক্ষোভের জায়গাটা স্পষ্ট। ইনশার কথায়, "দিল্লিতে যখন ছররা বন্দুক চালানো হলো, তখন সবাই সোচ্চার হলেন। কিন্তু যখন কাশ্মীরের হাজার হাজার শিশুর চোখ আর জীবন এই মরণাস্ত্র চিরতরে ধ্বংস করে দিল, তখন কিন্তু কারও গলা থেকে এমন আওয়াজ বের হয়নি।"
ইনশার প্রশ্ন আসলে শুধু নিজের জন্য নয়। তাঁর মতো কাশ্মীরের আরও বহু মানুষের জন্য।
সরকারের আর্থিক বা আইনি সহায়তার ক্ষেত্রেও কাশ্মীরের ছররা-আক্রান্তদের অধিকাংশের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। তৎকালীন মেহবুবা মুফতির নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার ইনশার বাবা মুশতাক আহমদকে একটি চাকরি দিয়েছিল। তাঁর নামে একটি গ্যাস এজেন্সি বরাদ্দের কাগজও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই বরাদ্দ আজও বাস্তবে কার্যকর হয়নি; কাগজকলমেই আটকে রয়েছে।
ছররার শিকারদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সিদের একজন ছিল মাত্র দেড় বছরের শিশু হিবা। ২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর, দক্ষিণ কাশ্মীরের শোপিয়ান জেলার কাপরান-বাটাগুন্ড এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের সময় মাত্র ১৮-২০ মাসের শিশু হিবা নিসার ছররার আঘাতে গুরুতর আহত হয়। ওই দিন এলাকায় একটি সশস্ত্র সংঘর্ষের পর বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল।
হিবা তখন নিজের বাড়িতেই ছিলেন। বাইরে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার কারণে ঘরের ভিতরে শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল বলে তাঁর মা মার্সালা জান দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোনোর চেষ্টা করেন। হিবা তখন তাঁর মায়ের কোলে ছিলেন। ঠিক সেই সময় ছররা ছোড়া হলে একটি ছররা এসে হিবার ডান চোখে আঘাত করে। তাঁর মায়ের হাতেও ছররার আঘাত লাগে।
ছররার আঘাতে হিবার চোখের কর্নিয়া ফুটো হয়ে যায় এবং চোখের ভিতরেই একটি ছররা আটকে ছিল। তাঁকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে শ্রীনগরের শ্রী মহারাজা হরি সিং (SMHS) হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা প্রথম অস্ত্রোপচারে চোখের ক্ষত পরীক্ষা ও চিকিৎসা করেন।
চিকিৎসকেরা শুরু থেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, হিবার আহত চোখের দৃষ্টিশক্তি হয়তো পুরোপুরি ফিরে নাও আসতে পারে। কারণ চোখের ভিতরে পেলেট আটকে থাকার পাশাপাশি কর্নিয়াতেও গুরুতর ক্ষতি হয়েছিল।
এরপর ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, হিবার দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকেরা প্রায় আড়াই ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে তাঁর ডান চোখের ভিতরে আটকে থাকা ছররাটি বের করে আনেন। কিন্তু ছররা বের করার পরেও চিকিৎসকেরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি যে তাঁর দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি ফিরে আসবে কি না। এখন তার কী পরিস্থিতি সেই সংক্রান্ত কোনো প্রমাণ্য নথি পাওয়া যায়নি।
চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা ছোট্ট হিবার ছবি কাশ্মীরে ছররা ব্যবহারের বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছিল।
হিবার পরিবার দাবি করেছিল, তারা পাথর ছোড়া বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছিল না। তাঁর মা জানিয়েছিলেন, কাঁদানে গ্যাসের কারণে তাঁরা বাড়ি থেকে বেরোনোর চেষ্টা করছিলেন, সেই সময়ই হিবা ছররার আঘাতে আহত হয়।
হিবার ঘটনার পর মানবাধিকারকর্মী মহম্মদ আহসান উন্তু SHRC-র কাছে তদন্ত এবং হিবার পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের আবেদন করেছিলেন। ২৭ নভেম্বর ২০১৮ SHRC শোপিয়ানের পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কাছে ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট চায়। তবে আলাদা করে SHRC-র নির্দেশে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল কি না, তার নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ৩০ নভেম্বর জম্মু ও কাশ্মীর সরকার হিবার পরিবারকে ১ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়।
কাশ্মীরে ছররা বন্দুকের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ফারজান শেখের ঘটনা আলাদা করে মনে রাখার মতো। একই বছর, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দু’বার ছররার গুলিতে আহত হন তিনি। প্রথমবার তাঁর বাঁ চোখের দৃষ্টি চলে যায়। দ্বিতীয়বার ছররার আঘাত লাগে ডান চোখে।
২০১৭ সালের ২৮ মার্চ। শ্রীনগরের বাড়িতে বসে নবম শ্রেণির অঙ্কের পড়া করছিলেন ১৬ বছরের ফারজান। বাইরে একটি শবযাত্রা যাচ্ছিল। বাইরে কী হচ্ছে তা দেখতে কৌতূহলবশত তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন। হঠাৎ সেখানে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ও ছররা ছুড়ে ভিড় ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
ফারজানের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি বাড়ির দিকে দৌড়ে ফিরছিলেন। সেই সময় তিনি এক পুলিশকর্মীকে তাঁর দিকে বন্দুক তাক করতে দেখেন। এরপরই তাঁর বাঁ চোখে পেলেট লাগে। সেটিই ছিল শেষবার, যখন তিনি ওই চোখে দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁর মুখ, ঘাড় ও পেটের বিভিন্ন অংশেও অসংখ্য ছররার আঘাত লাগে। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় শ্রীনগরের এসএমএইচএস হাসপাতালে।
প্রায় দু’মাস চিকিৎসার পর ফারজান আবার পড়াশোনায় ফেরার চেষ্টা করেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই আবার ঘটে একই ঘটনা।
৭ অগাস্ট রাতে তাঁর বাড়ির দোতলার ঘরে রাস্তার আলো সরাসরি এসে পড়ছিল। সাধারণত তাঁর বাবা বাইরে গিয়ে সেই আলো বন্ধ করে দিতেন। সেদিন বাবা বাড়িতে ছিলেন না। রাত প্রায় ১১টার সময় ফারজান নিজেই বাইরে বেরিয়ে আলোটি বন্ধ করতে যান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তখন সেখানে কোনো বিক্ষোভ চলছিল না। রাস্তার ওপারে একটি সিআরপিএফ গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। আচমকাই সেখান থেকে ছররা ছোড়া হয়। এবার আঘাত লাগে তাঁর ডান চোখে।
ফারজান আবার হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসার পর তাঁর ডান চোখের দৃষ্টি পুরোপুরি চলে যায়। বাঁ চোখেও দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে কমে যায়। তিনবার ডান চোখ এবং চারবার বাঁ চোখে অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা আশা করেছিলেন, ভবিষ্যতে আরও চিকিৎসায় বাঁ চোখে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দৃষ্টি ফিরতে পারে। কিন্তু তিনি আর আগের মতো দেখতে পারেননি।
এই আঘাতের পর থেকে ফারজান আর নিয়মিত স্কুলে যেতে পারেননি। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বাড়িতেই অন্যের সাহায্যে পড়া শুনে মনে রাখার চেষ্টা করতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পরিবারের ছোট দোকানের দায়িত্বও নেন। চোখের চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সমস্যার জন্যও তাঁকে চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হয়েছিল। তাঁর রাগ, হতাশা এবং আচরণগত পরিবর্তনও হয়।
Kashmir Observer-এর ১৫ জুলাই ২০১৬-র প্রতিবেদনে তাঁর ঘটনা তুলে ধরা হয়েছিল। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—Blinded by pellet guns, victims reveal horror tales (ছররা বন্দুকে অন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষের আতঙ্কের অভিজ্ঞতা)।
১৩ জুলাই দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ কুপওয়ারার ক্রালপোরা এলাকার ২৭ বছরের শ্রমিক পারভেজ নিজের বাড়িতে বসেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সময় পুলিশ ও সিআরপিএফের একটি দল তাঁদের গ্রামে ঢোকে। গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনী গ্রামবাসীদের লক্ষ্য করে ছররা ছুড়তে শুরু করে। পারভেজের মনে থাকা শেষ দৃশ্য—একজন পুলিশকর্মী তাঁর দিকে ছররা বন্দুক তাক করে রয়েছেন। কিছু বোঝার আগেই একঝাঁক ধাতব ছররা তাঁর মুখে এসে লাগে।
তীব্র যন্ত্রণায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন পারভেজ। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি জ্ঞান হারান। পরে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় শ্রীনগরের এসএমএইচএস হাসপাতালে।
হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা তাঁকে জানান, তাঁর ডান চোখটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেটি আর রাখা সম্ভব নয়। অস্ত্রোপচার করে চোখটি বাদ দিতে হয়েছে। চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় চিকিৎসকদের কথা শুনে পারভেজ বুঝতে পারেন, তাঁর জীবন আর আগের মতো থাকবে না।
আমার জীবন তাহলে চিরদিনের জন্য বদলে গেল। আমি কীভাবে কঠিন পরিশ্রম করব? কীভাবে আমার পরিবারকে খাওয়াব?
চিকিৎসকদের কাছে প্রশ্ন করেন তিনি। পারভেজ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর স্ত্রী এবং দুই ছোট সন্তান রয়েছে।
২০১৬ সালের ১৭ জুলাই, শ্রীনগরের রেইনাওয়ারি এলাকার ২৪ বছরের দানিশ রাজব জাট সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানের কাছে বসেছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, কারফিউ ওঠার পর তাঁরা বাইরে বেরিয়েছিলেন। আচমকাই নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ি সেখানে আসে এবং প্রায় ১০ মিটার দূর থেকে ছররা ছোড়া হয়। এক মুহূর্তেই দানিশের মুখ ও দু’চোখ রক্তাক্ত হয়ে যায়।
ছররার আঘাত এতটাই ভয়াবহ ছিল একটি পুরো কার্তুজ তাঁর বাঁ চোখের মধ্যে ঢুকে যায়। চোখের ভিতরের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসকদের শেষ পর্যন্ত তাঁর বাঁ চোখটি অস্ত্রোপচার করে বাদ দিতে হয় এবং সেখানে কৃত্রিম চোখ বসানো হয়। তাঁর ডান চোখেও বহু ছররা ঢুকে গিয়েছিল। দানিশের শরীর, মুখ ও মাথায় প্রায় ৯০টিরও বেশি ছররা আটকে ছিল বলে আলজাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দানিশ আগে শ্রীনগরে একটি দুগ্ধজাত পণ্য বিক্রয়কারী সংস্থায় মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে কাজ করতেন। তিনিই ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। চোখ হারানোর পর সেই কাজ আর রাখা সম্ভব হয়নি। একসময় যিনি নিজে রোজগার করতেন, তিনি ধীরে ধীরে অন্যের সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাঁর এমন পরিস্থিতি হয় যে বাড়ির বাইরে হাঁটতেও পরিবারের সাহায্য নিতে হয়।
চিকিৎসার খরচও পরিবারের উপর বড় চাপ তৈরি করে। দানিশের পরিবার তাঁর অস্ত্রোপচারের জন্য প্রায় ৪ লক্ষ টাকা নিজেদের সঞ্চয় থেকে খরচ করেছিল। পরে তিনি সরকারের কাছ থেকে ২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই অর্থ তাঁর হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টি বা কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে পারেনি।
একসময় ডান চোখে সামান্য দৃষ্টি ছিল। কিন্তু একাধিক অস্ত্রোপচারের পরও দৃষ্টি ক্রমে হারিয়ে যায়। তথ্য অনুযায়ী, তিনি এখন কেবল সামনে ছায়ার মতো কিছু দেখতে পান। তাঁর বাঁ চোখে কৃত্রিম চোখ বসানো হয়েছে।
২০১৬ সালে হিজবুল মুজাহিদিন কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর কাশ্মীরে যে অশান্তি শুরু হয়েছিল, তা ছিল ১৯৮৯ সালে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর উপত্যকার দেখা সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সময়গুলির অন্যতম।
২০২২ সালে ইন্ডিয়ান জার্নাল অব অফথ্যালমোলজি-তে প্রকাশিত একটি গবেষণা সেই ক্ষয়ক্ষতির একটি স্পষ্ট ছবি সামনে আনে। গবেষণায় বলা হয়, মাত্র চার মাসের মধ্যে চোখে ছররার আঘাত নিয়ে ৭৭৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁদের একটি বড় অংশ কোনো না কোনো মাত্রায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন। প্রায় ৮০ শতাংশ আক্রান্তের দৃষ্টিশক্তি এতটাই কমে গিয়েছিল যে তাঁরা শুধু খুব কাছ থেকে আঙুল দেখলে তার সংখ্যা বুঝতে পারতেন।
ইন্ডিয়ান জার্নাল অব অফথ্যালমোলজি এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রের তুলনাও টেনেছে।
২০১০ সালে প্রকাশিত ইরাক ও আফগানিস্তানে ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর উপর একটি গবেষণায় চোখে আঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। সেই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ইরাকে ২০০৩ সালের মার্চ থেকে ২০০৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত, প্রায় ৩৪ মাসে ৭৯৭টি গুরুতর চোখের আঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ১১৬টি চোখ বাদ দিতে হয়েছিল। অন্যদিকে, কাশ্মীরে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে নভেম্বরে, মাত্র চার মাসে পেলেটের আঘাতে চোখে গুরুতর চোট নিয়ে ৭৭৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
যুদ্ধক্ষেত্রের এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে কাশ্মীরের ঘটনাকে তুলনা করলে ছররার ব্যবহারের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ছররার ব্যবহার কতটা ব্যাপক ছিল, তার আরেকটি ছবি পাওয়া যায় ২০১৬ সালের একটি মামলায়। ছররা বন্দুক নিষিদ্ধ করার দাবিতে কাশ্মীর বার অ্যাসোসিয়েশন জম্মু ও কাশ্মীর হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছিল। সেই মামলার জবাবে সিআরপিএফ আদালতকে জানিয়েছিল, তারা ৩,৭৬৫টি কার্তুজ ছুড়েছিল। প্রতিটি কার্তুজে যদি প্রায় ৪৫০টি ধাতব বল থাকে, তাহলে হিসাবটা সহজ। ৩,৭৬৫টি কার্তুজে মোট প্রায় ১৭ লক্ষ ছররা।
অর্থাৎ, নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে পাথর ছোড়া বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে প্রায় ১৭ লক্ষ ধাতব ছররা ছোড়া হয়েছিল।
২০১৬ সালের সেই অশান্ত সময়ে কাশ্মীরের হাসপাতালগুলিতে ছিল বিরাট চাপ। মুম্বইয়ের বিশিষ্ট রেটিনা সার্জন ড. সুন্দরম নটরাজন ২০১৬ সালের জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে পাঁচবার শ্রীনগরে গিয়েছিলেন। আরও দুই সার্জনের সঙ্গে তিনি ৫৫০টিরও বেশি প্রাথমিক চোখের অস্ত্রোপচার এবং ৩৭০টিরও বেশি ভিট্রিওরেটিনাল সার্জারি করতে সাহায্য করেছিলেন।
বর্তমানে কাশ্মীরে ছররা বন্দুক ব্যবহার বন্ধ থাকলেও আজও শত শত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সেই শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। নতুন কোনো তদন্ত বা সরকারের নজরদারির আশঙ্কায় তাঁদের অনেকেই নিজেদের পরিচয় প্রকাশ্যে আনতেও ইতস্তত করেন।
তবে তাদের জীবন থেমে থাকেনি। মানুষ ধাপে ধাপে নিজেদের জীবন নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁদের শরীর এবং স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছে সেই দিনের ক্ষত।
দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের উপর ছররা বন্দুক ব্যবহারের অভিযোগ প্রথমে অস্বীকার করেছিল দিল্লি পুলিশ। তবে পরে সিআরপিএফের তদন্তেও উঠে আসে ভিন্ন তথ্য। তদন্তে জানা যায়, সিআরপিএফের অধীনস্থ র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (RAF) এক জওয়ান দিল্লির কনট প্লেস এলাকায় ছররা বন্দুক ব্যবহার করেছিলেন।সংসদ মার্গ থানার পুলিশের নথিতেও এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দিল্লি পুলিশের এক ডেপুটি কমিশনারের নির্দেশে র্যাফ ‘অ্যান্টি-রায়ট গান’ থেকে গুলি চালায়। ওই অস্ত্রের ব্যবহৃত ব্যালিস্টিক কার্তুজে প্লাস্টিকের ছররা ছিল। পাশাপাশি, ৫৫ রাউন্ড নন-ইলেকট্রিক্যাল শেল এবং ১৫ রাউন্ড ইলেকট্রিক্যাল শেলও ছোড়া হয়েছিল।
এই অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে ২০ জুলাই পড়ুয়াদের সংসদ অভিযান ঘিরে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে ছররা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়। পরে ৩০ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দেয়, ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।
সূত্র:
‘হোয়াই ওয়াজ আই শট?’ স্টোরি অফ আ স্কুল স্টুডেন্ট, ব্লাইন্ডেড বাই পেলেট গানস, রিভিলস কাশ্মীরি লাইভস এরেজড বাই নিউ ফিল্ম — আর্টিকেল ১৪
সিভিয়ার আই ইনজুরিজ ইন দ্য ওয়ার ইন ইরাক, ২০০৩–২০০৫ — ইন্ডিয়ান জার্নাল অব অফথ্যালমোলজি
ব্লাইন্ড ইন কাশ্মীর উইথ ১০০ পেলেটস লজড ইন হিজ হেড — আলজাজিরা
কাশ্মীর: আ স্টোরি অব ডিফায়েন্স অ্যামিড গ্রিফ — আলজাজিরা
ব্লাইন্ডেড বাই পেলেট গানস, ভিক্টিমস রিভিল হরর টেলস — কাশ্মীর অবজারভার
-29ae21.png)
ছররা বন্দুক। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে থাকা ‘কম প্রাণঘাতী’ অস্ত্র। অথচ সেই অস্ত্রের একেকটি ছররা কেড়ে নিয়েছে মানুষের চোখ, পড়াশোনা, কাজ, স্বাভাবিক জীবন। কাশ্মীরে ২০১৬ সালে আন্দোলনের সময় কয়েক মাসের মধ্যে শত শত মানুষ চোখে ছররার আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কারও চোখের দৃষ্টি আর ফেরেনি, কারও চোখ অস্ত্রোপচার করে বাদ দিতে হয়েছে। ইনশা মুশতাক থেকে দেড় বছরের হিবা, ফারজান শেখ থেকে পারভেজ আহমেদ মীর—প্রতিটি গল্পই বলে, ‘কম প্রাণঘাতী’ শব্দটির আড়ালে কতটা গভীর ক্ষত লুকিয়ে থাকতে পারে।
আর সেই কাশ্মীরের ইতিহাসের সঙ্গেই যখন ২০২৬ সালের দিল্লির যন্তর মন্তরের ঘটনা এসে মিশে যায়, তখন প্রশ্নটি আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। পুলিশ পেলেট ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। কিন্তু আরটিআইয়ের জবাবে হাসপাতালের নথিতে উঠে আসে অন্তত ১০ জনের ছররার-আঘাতের তথ্য। প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ সাকেত গোখলের করা আরটিআইয়ের জবাবে লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ জানায়, ২০ জুলাই ছররার আঘাতে ৯ জন চিকিৎসা নিয়েছিলেন। সফদরজং হাসপাতাল জানায়, আরও একজন ছররার আঘাতে আহত হয়েছিলেন। অর্থাৎ, হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, অন্তত ১০ জনের ছররার-আঘাতের তথ্য সামনে এসেছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে দু'বছরে যত চোখের গুরুতর আঘাত নথিভুক্ত হয়েছিল, কাশ্মীরে মাত্র ৪ মাসে তার চেয়েও বেশি মানুষ একই ধরনের আঘাতের শিকার হয়েছিলেন। ইরাক ও আফগানিস্তান ছিল যুদ্ধক্ষেত্র। কাশ্মীরে তখন কোনো যুদ্ধ চলছিল না। তবু সেখানে মানুষের চোখে, শরীরে এবং জীবনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তার খেসারত আজও দিতে হচ্ছে। ছররার বন্দুকও আজও ব্যবহার হচ্ছে।
ভারত-শাসিত কাশ্মীরে বিক্ষোভ মোকাবিলায় প্রথমবার ছররা বন্দুক ব্যবহার করা হয় ২০১০ সালে। সেই সময় এটিকে মারণাস্ত্র নয়, বরং ‘কম প্রাণঘাতী’ বা ‘নন-লিথাল’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলিতে এই অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে।
ছররা বন্দুক দেখতে সাধারণ বন্দুকের মতো হলেও এর গুলি আলাদা। প্রতিটি শেলের মধ্যে থাকে ছোট ছোট ধাতব বল। একটি কার্তুজে প্রায় ৪৫০টি পর্যন্ত ধাতব দানা থাকতে পারে। বিশেষ পাম্প-অ্যাকশন শর্টগান থেকে এই শেল ছোড়া হলে বাইরের খোলস ফেটে যায় এবং তার ভিতরের ধাতব দানাগুলি একসঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একটি গুলি একই সঙ্গে শরীরের একাধিক অংশে আঘাত করতে পারে।
১৯ বছরের তরুণ সাহিল লোচাব। ২০২৬ সালের ২০ জুলাই যন্তর মন্তর থেকে সংসদ অভিমুখে পড়ুয়াদের মিছিলের সময় তিনি ছররার আঘাতে ডান চোখে গুরুতর জখম হন। তাঁকে দ্রুত দিল্লির AIIMS-এর জয়প্রকাশ নারায়ণ অ্যাপেক্স ট্রমা সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। ২১ জুলাই তাঁর চোখে অস্ত্রোপচার করে আটকে থাকা ছররার গুলি বের করা হয়। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, চোখের মণি বা pupil মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চিকিৎসকেরা দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ১ শতাংশ বলে জানিয়েছিলেন।
দিল্লির নাজফগড়ের বাসিন্দা সাহিল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওপেন লার্নিং-এর পড়ুয়া। তাঁর স্বপ্ন ছিল ভবিষ্যতে পুলিশে যোগ দেওয়া।
সাহিলের চোখের আঘাত তাই শুধু একজন তরুণের চিকিৎসার গল্প নয়। দিল্লির রাজপথে বিক্ষোভ সামলাতে ঠিক কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সেই ব্যবহারের দায় কার—এই প্রশ্নও তাঁর ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে।
যন্তর মন্তরে পড়ুয়াদের সংসদ অভিযান ঘিরে সংঘর্ষের সময় গুরুতর আহত হন ২৫ বছরের শেখ ইরশাদ মনসুরিও। বিক্ষোভের সময় তাঁর মুখ ও ঘাড়ে ছররার আঘাত লাগে। একাধিক ধাতব ছররা তাঁর শরীরে ঢুকে যায়। পরে তাঁকে দিল্লির লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ইরশাদের আঘাত ছিল মূলত মুখ, কপাল, গাল এবং নাকের আশপাশে। ছররার আঘাতে তাঁর মুখে একাধিক ক্ষত তৈরি হয়। চোখের বাঁ দিকটিও রক্তাক্ত হয়ে ফুলে যায়। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাঁর মুখ ও ঘাড় থেকে ছররা বের করার জন্য অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের পরও মুখের ক্ষত শুকোতে সময় লাগছিল এবং চোখের লালভাব পুরোপুরি কাটেনি।
প্রায় চার দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ইরশাদকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেও তাঁর শরীরে রয়ে যায় সেই দিনের আঘাতের চিহ্ন। কপাল, গাল ও নাকের ক্ষত তখনও পুরোপুরি শুকায়নি।
২০১৬ সালের জুলাই। বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর কাশ্মীরজুড়ে তখন তীব্র বিক্ষোভ চলছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রতিদিনই আহত হচ্ছিলেন বহু মানুষ। সেই সময় ছররার বন্দুকের আঘাতে চোখ হারানো মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে। এর মধ্যেই শ্রীনগরের হাসপাতালগুলিতে একের পর এক গুরুতর আহত মানুষ ভর্তি হচ্ছিলেন।
এই ছররা বন্দুকের ভয়াবহতার অন্যতম প্রতীক ইনশা মুশতাক। ২০১৬ সালের ১১ জুলাই। ইনশার বয়স তখন মাত্র ১৪ বছর। ইনশা কোনো প্রতিবাদে অংশ নেয়নি। অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষার পর পড়ছিল নিজের ঘরের জানালার পাশে বসে। সেই সময় নিরাপত্তারক্ষীদের ছোড়া একঝাঁক ছররা এসে তাঁর মুখ ও চোখে বিঁধে যায়। তাঁর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হয় অন্তত ১০০টি ছররার ক্ষত। একাধিক অস্ত্রোপচার করা হলেও তাঁর দু’চোখে দৃষ্টি আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
আজ ইনশার বয়স ২৪ বছর। সম্প্রতি দিল্লিতে ছররা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ যেভাবে সরব হয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর ক্ষোভের জায়গাটা স্পষ্ট। ইনশার কথায়, "দিল্লিতে যখন ছররা বন্দুক চালানো হলো, তখন সবাই সোচ্চার হলেন। কিন্তু যখন কাশ্মীরের হাজার হাজার শিশুর চোখ আর জীবন এই মরণাস্ত্র চিরতরে ধ্বংস করে দিল, তখন কিন্তু কারও গলা থেকে এমন আওয়াজ বের হয়নি।"
ইনশার প্রশ্ন আসলে শুধু নিজের জন্য নয়। তাঁর মতো কাশ্মীরের আরও বহু মানুষের জন্য।
সরকারের আর্থিক বা আইনি সহায়তার ক্ষেত্রেও কাশ্মীরের ছররা-আক্রান্তদের অধিকাংশের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। তৎকালীন মেহবুবা মুফতির নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার ইনশার বাবা মুশতাক আহমদকে একটি চাকরি দিয়েছিল। তাঁর নামে একটি গ্যাস এজেন্সি বরাদ্দের কাগজও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই বরাদ্দ আজও বাস্তবে কার্যকর হয়নি; কাগজকলমেই আটকে রয়েছে।
ছররার শিকারদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সিদের একজন ছিল মাত্র দেড় বছরের শিশু হিবা। ২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর, দক্ষিণ কাশ্মীরের শোপিয়ান জেলার কাপরান-বাটাগুন্ড এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের সময় মাত্র ১৮-২০ মাসের শিশু হিবা নিসার ছররার আঘাতে গুরুতর আহত হয়। ওই দিন এলাকায় একটি সশস্ত্র সংঘর্ষের পর বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল।
হিবা তখন নিজের বাড়িতেই ছিলেন। বাইরে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার কারণে ঘরের ভিতরে শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল বলে তাঁর মা মার্সালা জান দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোনোর চেষ্টা করেন। হিবা তখন তাঁর মায়ের কোলে ছিলেন। ঠিক সেই সময় ছররা ছোড়া হলে একটি ছররা এসে হিবার ডান চোখে আঘাত করে। তাঁর মায়ের হাতেও ছররার আঘাত লাগে।
ছররার আঘাতে হিবার চোখের কর্নিয়া ফুটো হয়ে যায় এবং চোখের ভিতরেই একটি ছররা আটকে ছিল। তাঁকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে শ্রীনগরের শ্রী মহারাজা হরি সিং (SMHS) হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা প্রথম অস্ত্রোপচারে চোখের ক্ষত পরীক্ষা ও চিকিৎসা করেন।
চিকিৎসকেরা শুরু থেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, হিবার আহত চোখের দৃষ্টিশক্তি হয়তো পুরোপুরি ফিরে নাও আসতে পারে। কারণ চোখের ভিতরে পেলেট আটকে থাকার পাশাপাশি কর্নিয়াতেও গুরুতর ক্ষতি হয়েছিল।
এরপর ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, হিবার দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকেরা প্রায় আড়াই ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে তাঁর ডান চোখের ভিতরে আটকে থাকা ছররাটি বের করে আনেন। কিন্তু ছররা বের করার পরেও চিকিৎসকেরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি যে তাঁর দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি ফিরে আসবে কি না। এখন তার কী পরিস্থিতি সেই সংক্রান্ত কোনো প্রমাণ্য নথি পাওয়া যায়নি।
চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা ছোট্ট হিবার ছবি কাশ্মীরে ছররা ব্যবহারের বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছিল।
হিবার পরিবার দাবি করেছিল, তারা পাথর ছোড়া বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছিল না। তাঁর মা জানিয়েছিলেন, কাঁদানে গ্যাসের কারণে তাঁরা বাড়ি থেকে বেরোনোর চেষ্টা করছিলেন, সেই সময়ই হিবা ছররার আঘাতে আহত হয়।
হিবার ঘটনার পর মানবাধিকারকর্মী মহম্মদ আহসান উন্তু SHRC-র কাছে তদন্ত এবং হিবার পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের আবেদন করেছিলেন। ২৭ নভেম্বর ২০১৮ SHRC শোপিয়ানের পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কাছে ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট চায়। তবে আলাদা করে SHRC-র নির্দেশে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল কি না, তার নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ৩০ নভেম্বর জম্মু ও কাশ্মীর সরকার হিবার পরিবারকে ১ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়।
কাশ্মীরে ছররা বন্দুকের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ফারজান শেখের ঘটনা আলাদা করে মনে রাখার মতো। একই বছর, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দু’বার ছররার গুলিতে আহত হন তিনি। প্রথমবার তাঁর বাঁ চোখের দৃষ্টি চলে যায়। দ্বিতীয়বার ছররার আঘাত লাগে ডান চোখে।
২০১৭ সালের ২৮ মার্চ। শ্রীনগরের বাড়িতে বসে নবম শ্রেণির অঙ্কের পড়া করছিলেন ১৬ বছরের ফারজান। বাইরে একটি শবযাত্রা যাচ্ছিল। বাইরে কী হচ্ছে তা দেখতে কৌতূহলবশত তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন। হঠাৎ সেখানে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ও ছররা ছুড়ে ভিড় ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
ফারজানের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি বাড়ির দিকে দৌড়ে ফিরছিলেন। সেই সময় তিনি এক পুলিশকর্মীকে তাঁর দিকে বন্দুক তাক করতে দেখেন। এরপরই তাঁর বাঁ চোখে পেলেট লাগে। সেটিই ছিল শেষবার, যখন তিনি ওই চোখে দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁর মুখ, ঘাড় ও পেটের বিভিন্ন অংশেও অসংখ্য ছররার আঘাত লাগে। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় শ্রীনগরের এসএমএইচএস হাসপাতালে।
প্রায় দু’মাস চিকিৎসার পর ফারজান আবার পড়াশোনায় ফেরার চেষ্টা করেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই আবার ঘটে একই ঘটনা।
৭ অগাস্ট রাতে তাঁর বাড়ির দোতলার ঘরে রাস্তার আলো সরাসরি এসে পড়ছিল। সাধারণত তাঁর বাবা বাইরে গিয়ে সেই আলো বন্ধ করে দিতেন। সেদিন বাবা বাড়িতে ছিলেন না। রাত প্রায় ১১টার সময় ফারজান নিজেই বাইরে বেরিয়ে আলোটি বন্ধ করতে যান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তখন সেখানে কোনো বিক্ষোভ চলছিল না। রাস্তার ওপারে একটি সিআরপিএফ গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। আচমকাই সেখান থেকে ছররা ছোড়া হয়। এবার আঘাত লাগে তাঁর ডান চোখে।
ফারজান আবার হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসার পর তাঁর ডান চোখের দৃষ্টি পুরোপুরি চলে যায়। বাঁ চোখেও দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে কমে যায়। তিনবার ডান চোখ এবং চারবার বাঁ চোখে অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা আশা করেছিলেন, ভবিষ্যতে আরও চিকিৎসায় বাঁ চোখে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দৃষ্টি ফিরতে পারে। কিন্তু তিনি আর আগের মতো দেখতে পারেননি।
এই আঘাতের পর থেকে ফারজান আর নিয়মিত স্কুলে যেতে পারেননি। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বাড়িতেই অন্যের সাহায্যে পড়া শুনে মনে রাখার চেষ্টা করতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পরিবারের ছোট দোকানের দায়িত্বও নেন। চোখের চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সমস্যার জন্যও তাঁকে চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হয়েছিল। তাঁর রাগ, হতাশা এবং আচরণগত পরিবর্তনও হয়।
Kashmir Observer-এর ১৫ জুলাই ২০১৬-র প্রতিবেদনে তাঁর ঘটনা তুলে ধরা হয়েছিল। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—Blinded by pellet guns, victims reveal horror tales (ছররা বন্দুকে অন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষের আতঙ্কের অভিজ্ঞতা)।
১৩ জুলাই দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ কুপওয়ারার ক্রালপোরা এলাকার ২৭ বছরের শ্রমিক পারভেজ নিজের বাড়িতে বসেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সময় পুলিশ ও সিআরপিএফের একটি দল তাঁদের গ্রামে ঢোকে। গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনী গ্রামবাসীদের লক্ষ্য করে ছররা ছুড়তে শুরু করে। পারভেজের মনে থাকা শেষ দৃশ্য—একজন পুলিশকর্মী তাঁর দিকে ছররা বন্দুক তাক করে রয়েছেন। কিছু বোঝার আগেই একঝাঁক ধাতব ছররা তাঁর মুখে এসে লাগে।
তীব্র যন্ত্রণায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন পারভেজ। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি জ্ঞান হারান। পরে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় শ্রীনগরের এসএমএইচএস হাসপাতালে।
হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা তাঁকে জানান, তাঁর ডান চোখটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেটি আর রাখা সম্ভব নয়। অস্ত্রোপচার করে চোখটি বাদ দিতে হয়েছে। চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় চিকিৎসকদের কথা শুনে পারভেজ বুঝতে পারেন, তাঁর জীবন আর আগের মতো থাকবে না।
আমার জীবন তাহলে চিরদিনের জন্য বদলে গেল। আমি কীভাবে কঠিন পরিশ্রম করব? কীভাবে আমার পরিবারকে খাওয়াব?
চিকিৎসকদের কাছে প্রশ্ন করেন তিনি। পারভেজ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর স্ত্রী এবং দুই ছোট সন্তান রয়েছে।
২০১৬ সালের ১৭ জুলাই, শ্রীনগরের রেইনাওয়ারি এলাকার ২৪ বছরের দানিশ রাজব জাট সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের দোকানের কাছে বসেছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, কারফিউ ওঠার পর তাঁরা বাইরে বেরিয়েছিলেন। আচমকাই নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ি সেখানে আসে এবং প্রায় ১০ মিটার দূর থেকে ছররা ছোড়া হয়। এক মুহূর্তেই দানিশের মুখ ও দু’চোখ রক্তাক্ত হয়ে যায়।
ছররার আঘাত এতটাই ভয়াবহ ছিল একটি পুরো কার্তুজ তাঁর বাঁ চোখের মধ্যে ঢুকে যায়। চোখের ভিতরের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসকদের শেষ পর্যন্ত তাঁর বাঁ চোখটি অস্ত্রোপচার করে বাদ দিতে হয় এবং সেখানে কৃত্রিম চোখ বসানো হয়। তাঁর ডান চোখেও বহু ছররা ঢুকে গিয়েছিল। দানিশের শরীর, মুখ ও মাথায় প্রায় ৯০টিরও বেশি ছররা আটকে ছিল বলে আলজাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দানিশ আগে শ্রীনগরে একটি দুগ্ধজাত পণ্য বিক্রয়কারী সংস্থায় মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে কাজ করতেন। তিনিই ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। চোখ হারানোর পর সেই কাজ আর রাখা সম্ভব হয়নি। একসময় যিনি নিজে রোজগার করতেন, তিনি ধীরে ধীরে অন্যের সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাঁর এমন পরিস্থিতি হয় যে বাড়ির বাইরে হাঁটতেও পরিবারের সাহায্য নিতে হয়।
চিকিৎসার খরচও পরিবারের উপর বড় চাপ তৈরি করে। দানিশের পরিবার তাঁর অস্ত্রোপচারের জন্য প্রায় ৪ লক্ষ টাকা নিজেদের সঞ্চয় থেকে খরচ করেছিল। পরে তিনি সরকারের কাছ থেকে ২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই অর্থ তাঁর হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টি বা কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে পারেনি।
একসময় ডান চোখে সামান্য দৃষ্টি ছিল। কিন্তু একাধিক অস্ত্রোপচারের পরও দৃষ্টি ক্রমে হারিয়ে যায়। তথ্য অনুযায়ী, তিনি এখন কেবল সামনে ছায়ার মতো কিছু দেখতে পান। তাঁর বাঁ চোখে কৃত্রিম চোখ বসানো হয়েছে।
২০১৬ সালে হিজবুল মুজাহিদিন কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর কাশ্মীরে যে অশান্তি শুরু হয়েছিল, তা ছিল ১৯৮৯ সালে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর উপত্যকার দেখা সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সময়গুলির অন্যতম।
২০২২ সালে ইন্ডিয়ান জার্নাল অব অফথ্যালমোলজি-তে প্রকাশিত একটি গবেষণা সেই ক্ষয়ক্ষতির একটি স্পষ্ট ছবি সামনে আনে। গবেষণায় বলা হয়, মাত্র চার মাসের মধ্যে চোখে ছররার আঘাত নিয়ে ৭৭৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁদের একটি বড় অংশ কোনো না কোনো মাত্রায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন। প্রায় ৮০ শতাংশ আক্রান্তের দৃষ্টিশক্তি এতটাই কমে গিয়েছিল যে তাঁরা শুধু খুব কাছ থেকে আঙুল দেখলে তার সংখ্যা বুঝতে পারতেন।
ইন্ডিয়ান জার্নাল অব অফথ্যালমোলজি এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রের তুলনাও টেনেছে।
২০১০ সালে প্রকাশিত ইরাক ও আফগানিস্তানে ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর উপর একটি গবেষণায় চোখে আঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। সেই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ইরাকে ২০০৩ সালের মার্চ থেকে ২০০৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত, প্রায় ৩৪ মাসে ৭৯৭টি গুরুতর চোখের আঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ১১৬টি চোখ বাদ দিতে হয়েছিল। অন্যদিকে, কাশ্মীরে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে নভেম্বরে, মাত্র চার মাসে পেলেটের আঘাতে চোখে গুরুতর চোট নিয়ে ৭৭৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
যুদ্ধক্ষেত্রের এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে কাশ্মীরের ঘটনাকে তুলনা করলে ছররার ব্যবহারের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ছররার ব্যবহার কতটা ব্যাপক ছিল, তার আরেকটি ছবি পাওয়া যায় ২০১৬ সালের একটি মামলায়। ছররা বন্দুক নিষিদ্ধ করার দাবিতে কাশ্মীর বার অ্যাসোসিয়েশন জম্মু ও কাশ্মীর হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছিল। সেই মামলার জবাবে সিআরপিএফ আদালতকে জানিয়েছিল, তারা ৩,৭৬৫টি কার্তুজ ছুড়েছিল। প্রতিটি কার্তুজে যদি প্রায় ৪৫০টি ধাতব বল থাকে, তাহলে হিসাবটা সহজ। ৩,৭৬৫টি কার্তুজে মোট প্রায় ১৭ লক্ষ ছররা।
অর্থাৎ, নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে পাথর ছোড়া বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে প্রায় ১৭ লক্ষ ধাতব ছররা ছোড়া হয়েছিল।
২০১৬ সালের সেই অশান্ত সময়ে কাশ্মীরের হাসপাতালগুলিতে ছিল বিরাট চাপ। মুম্বইয়ের বিশিষ্ট রেটিনা সার্জন ড. সুন্দরম নটরাজন ২০১৬ সালের জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে পাঁচবার শ্রীনগরে গিয়েছিলেন। আরও দুই সার্জনের সঙ্গে তিনি ৫৫০টিরও বেশি প্রাথমিক চোখের অস্ত্রোপচার এবং ৩৭০টিরও বেশি ভিট্রিওরেটিনাল সার্জারি করতে সাহায্য করেছিলেন।
বর্তমানে কাশ্মীরে ছররা বন্দুক ব্যবহার বন্ধ থাকলেও আজও শত শত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সেই শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। নতুন কোনো তদন্ত বা সরকারের নজরদারির আশঙ্কায় তাঁদের অনেকেই নিজেদের পরিচয় প্রকাশ্যে আনতেও ইতস্তত করেন।
তবে তাদের জীবন থেমে থাকেনি। মানুষ ধাপে ধাপে নিজেদের জীবন নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁদের শরীর এবং স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছে সেই দিনের ক্ষত।
দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের উপর ছররা বন্দুক ব্যবহারের অভিযোগ প্রথমে অস্বীকার করেছিল দিল্লি পুলিশ। তবে পরে সিআরপিএফের তদন্তেও উঠে আসে ভিন্ন তথ্য। তদন্তে জানা যায়, সিআরপিএফের অধীনস্থ র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (RAF) এক জওয়ান দিল্লির কনট প্লেস এলাকায় ছররা বন্দুক ব্যবহার করেছিলেন।সংসদ মার্গ থানার পুলিশের নথিতেও এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দিল্লি পুলিশের এক ডেপুটি কমিশনারের নির্দেশে র্যাফ ‘অ্যান্টি-রায়ট গান’ থেকে গুলি চালায়। ওই অস্ত্রের ব্যবহৃত ব্যালিস্টিক কার্তুজে প্লাস্টিকের ছররা ছিল। পাশাপাশি, ৫৫ রাউন্ড নন-ইলেকট্রিক্যাল শেল এবং ১৫ রাউন্ড ইলেকট্রিক্যাল শেলও ছোড়া হয়েছিল।
এই অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে ২০ জুলাই পড়ুয়াদের সংসদ অভিযান ঘিরে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে ছররা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়। পরে ৩০ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দেয়, ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।
সূত্র:
‘হোয়াই ওয়াজ আই শট?’ স্টোরি অফ আ স্কুল স্টুডেন্ট, ব্লাইন্ডেড বাই পেলেট গানস, রিভিলস কাশ্মীরি লাইভস এরেজড বাই নিউ ফিল্ম — আর্টিকেল ১৪
সিভিয়ার আই ইনজুরিজ ইন দ্য ওয়ার ইন ইরাক, ২০০৩–২০০৫ — ইন্ডিয়ান জার্নাল অব অফথ্যালমোলজি
ব্লাইন্ড ইন কাশ্মীর উইথ ১০০ পেলেটস লজড ইন হিজ হেড — আলজাজিরা
কাশ্মীর: আ স্টোরি অব ডিফায়েন্স অ্যামিড গ্রিফ — আলজাজিরা
ব্লাইন্ডেড বাই পেলেট গানস, ভিক্টিমস রিভিল হরর টেলস — কাশ্মীর অবজারভার
.png)

সরকারের সামনে যে বাংলাদেশ, তা জিয়াউর রহমানের সময়ের বাংলাদেশ নয়, খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময়ের বাংলাদেশও নয়। আজকের বাংলাদেশ জনসংখ্যা, অর্থনীতি, শিল্প, নগরায়ণ, প্রযুক্তি, রপ্তানি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের দিক থেকে অনেক বড়। একই সঙ্গে সংকটও বহুমাত্রিক।
৪ ঘণ্টা আগে
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণবিক্ষোভ, বিপ্লব, সামরিক অভ্যুত্থান, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক বিদ্রোহের মুখে বহু শাসক ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। কেউ বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন, কেউ আবার রাজনৈতিকভাবে পুনরুত্থান ঘটিয়েছেন। কিন্তু একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে গণআন্দোলনে পতন, দেশত্যাগ, বিদেশে অবস্থান
১৫ আগস্ট ২০২৬
একজন নেতার মৃত্যু একটি দলের জন্য শোকের ঘটনা। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক পরীক্ষাও। নেতা চলে যাওয়ার পর দলটি কী করে, সেটিই প্রমাণ করে সেই নেতার উত্তরাধিকার কতটা গভীর ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপিও এমন এক পরীক্ষার সামনে। জন্মদিনে দলটি তাঁকে স্মরণ করবে। শ্রদ্ধা জানাবে।
১৫ আগস্ট ২০২৬
দেশে গত দুই মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব বলছে, এ সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে। বাজার বাস্তবতা ও সরকারি পরিসংখ্যানের এই ব্যবধান বিবিএসের তথ্যের মান, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে পুরনো বিতর্ক উসকে দিয়েছে।