সুমন সুবহান

গত ৭ ও ৮ জুলাই তুরস্কের আঙ্কারায় বেশতেপে প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সামিটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্ককে এফ-৩৫ স্টিলথ যুদ্ধবিমান প্রোগ্রামে পুনরায় যুক্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এতে আঙ্কারার নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতার অভাবনীয় উত্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে।
ওয়াশিংটন ও আঙ্কারার এই সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সমঝোতা এবং তুরস্কের নিজস্ব সামরিক মেগা প্রকল্পগুলো তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে চরম অস্বস্তি ও নিরাপত্তা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গাজা ও সিরিয়া সংকটের পটভূমিতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আগ্রাসী অবস্থান ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সামরিক ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ফলশ্রুতিতে, ভূমধ্যসাগর থেকে শুরু করে দামেস্কের আকাশসীমা পর্যন্ত উভয় দেশের মধ্যে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত যুদ্ধ শুরু হয়েছে, যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে বদলে দেওয়ার আভাস দিচ্ছে।
তুরস্ককে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রজন্মের এফ-৩৫ লাইটনিং-২ যুদ্ধবিমান প্রকল্পে ফিরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ওয়াশিংটনের এই নীতিগত নমনীয়তা ইসরায়েলকে এক চরম বিব্রতকর ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের মধ্যকার বৈঠকের পর এফ-৩৫ বিক্রির সম্ভাবনা নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নেতানিয়াহু বলেছেন, তুরস্কের কাছে এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বিক্রি করা হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যের অপূরণীয় ক্ষতি করবে। হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো মার্কিনবিরোধী ও ইসরায়েলবিরোধী সংগঠনের সাথে আঙ্কারার গভীর সম্পর্ক রয়েছে, যার ফলে এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন তুরস্ককে কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েহিয়েল লাইটার আঙ্কারার এই প্রত্যাবর্তনকে ‘সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক গালিয়া লিন্ডেনস্ট্রস উল্লেখ করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল সবসময় তার ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বা গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে চায়, যা তুরস্ক এফ-৩৫ বিমান পেলে ক্ষুণ্ণ হবে। লিন্ডেনস্ট্রসের মতে, এটি কেবল একটি বিমান চুক্তি নয়, বরং এটি আঙ্কারার কাছে ভবিষ্যতে আরও উন্নত মার্কিন অস্ত্র বিক্রির পথ প্রশস্ত করবে, যা ৭ অক্টোবরের পরবর্তী নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের জন্য গভীর চিন্তার কারণ।
এফ-৩৫ নিয়ে আলোচনার সমান্তরালে, তুর্কি প্রযুক্তিতে তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’-এর জন্য মার্কিন এফ-১১০ ইঞ্জিন বিক্রির প্রস্তাবটি কংগ্রেসের ১৫ দিনের বাধ্যতামূলক পর্যালোচনা শেষে গত ৯ জুলাই কোনো বাধা ছাড়াই পাস হয়। ২৪ জুন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব উত্থাপনের পর দিনা টাইটাস, ব্র্যাড শারম্যান এবং ক্রিস প্যাপাসের মতো আর্মেনীয়, গ্রিক ও ইসরায়েলি ৯ জন লবিপন্থী ডেমোক্র্যাট সদস্য এটি আটকে দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা সিনেট বা প্রতিনিধি পরিষদে ভোটের মুখ দেখেনি। ফলে জেনারেল ইলেকট্রিকের তৈরি এফ-১১০-জিই-১২৯ই/এফ মডেলের ইঞ্জিনগুলো কানের সাথে যুক্ত করার কারিগরি ও বাণিজ্যিক আলোচনার পথ এখন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।
৭৫ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের এই সফল চুক্তি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম আকাশে ওড়া কান যুদ্ধবিমানকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক রূপ দিতে যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তুরস্কের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, যা ন্যাটো জোটের এই দুই মিত্রের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক।
নিজেদের আকাশসীমাকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীলতামুক্ত করতে তুরস্ক ‘স্টিল ডোম’ নামে একটি যুগান্তকারী প্রতিরক্ষা প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার জন্য আঙ্কারা ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে অতিরিক্ত ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করেছে।
তুর্কি প্রতিরক্ষাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘উলুসাভুন্মা’-এর তথ্যমতে, স্টিল ডোম কোনো একক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নয়, এটি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক এইসা রাডার প্রযুক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক ব্যবস্থার মহাপদ্ধতি। এই বিশাল স্থাপত্যের স্তরগুলো হচ্ছে:
অতি স্বল্প দূরত্ব: রাডার-নিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় ক্যানন সমৃদ্ধ ‘কোরকুট’ ব্যবস্থা, যা ড্রোন ও স্বল্প পাল্লার হুমকি ধ্বংস করবে।
স্বল্প ও মাঝারি পাল্লা: এই স্তরে নিয়োজিত থাকবে তুরস্কের নিজস্ব ‘হিসার-এ+’ এবং ‘হিসার-ও+’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।
দীর্ঘ পাল্লা ও ব্যালিস্টিক প্রতিরোধ: সর্বোচ্চ স্তরের সুরক্ষায় মোতায়েন করা হচ্ছে তুরস্কের অত্যাধুনিক ‘সিপার’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।
বহুস্তরবিশিষ্ট এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলো আসেলসান, রকেটসান এবং টুবিটাক সেজ। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই ঝাঁক বেঁধে আসা ড্রোন বা স্যাচুরেশন অ্যাটাক রিয়েল টাইমে শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবচেয়ে উপযোগী ইন্টারসেপ্টরটি বেছে নেবে। এরদোয়ান ঘোষণা করেছেন যে, ২০৩০ সালের মধ্যে তুরস্ক তার জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করবে, যা ন্যাটোর বেঁধে দেওয়া ২০৩৫ সালের সময়সীমার চেয়ে পাঁচ বছর এগিয়ে।
তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যকার তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এখন আর কেবল তাদের নিজস্ব ভৌগোলিক সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা প্রতিবেশী সিরিয়ার আকাশসীমায় ছায়া যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। এর কারণ আঙ্কারার সাম্প্রতিক সামরিক ও কৌশলগত পদক্ষেপগুলো এখন সরাসরি সিরিয়ার আকাশে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর অবাধ বিমান হামলার স্বাধীনতাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এই ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই চলতি বছরে সিরিয়ার দামেস্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আসেলসানের তৈরি ‘এইচটিআরএস-১০০’ এয়ার সার্ভাইল্যান্স রাডার মোতায়েন করা হয়েছে।
আঙ্কারার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হয়েছে, এই রাডারটি কেবলই সিরিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও সুরক্ষার সুবিধার্থে দেওয়া হয়েছে। তবে তুর্কিদের এই বেসামরিক বিমান নিরাপত্তার যুক্তিকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না তেল আবিবের নীতিনির্ধারকেরা। ফলশ্রুতিতে, দামেস্কের এই এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল রাডারটি এখন দুই দেশের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা এই রাডার মোতায়েনের তীব্র বিরোধিতা করে দাবি করেছেন যে, এটি আদতে কোনো সাধারণ বেসামরিক রাডার নয়। তাদের মতে এই অত্যাধুনিক রাডারে মিলিটারি গ্রেডের ‘আইডেন্টিফিকেশন ফ্রেন্ড অর ফো’ টেকনোলজি এবং ‘ডিস্ট্রিবিউটেড অ্যাক্টিভ হট স্ট্যান্ডবাই কনফিগারেশন’ রয়েছে। এই ধরণের সোফিস্টিকেটেড ও উচ্চপ্রযুক্তির সিস্টেম সাধারণত বিশ্বজুড়ে বেসামরিক এভিয়েশনে ব্যবহৃত রাডারসমূহে একেবারেই দেখা যায় না। ইসরায়েলি থিংক ট্যাংকগুলোর গভীর উদ্বেগ, এই রাডারটি সিরিয়ার আকাশসীমায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য বন্ধ করে দিতে পারে। তাদের আশঙ্কা, রাডারটির উন্নত ট্র্যাকিং ক্ষমতা তেল আবিবের যেকোনো আকস্মিক বিমান হামলা বা রিয়েল-টাইম অপারেশনাল সক্ষমতাকে সম্পূর্ণ পঙ্গু ও নস্যাৎ করে দেবে।
তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ঐতিহাসিকভাবে একটি পরম রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ছিল, যা ‘রেড বুক’ নামে পরিচিত। তবে ২০২৪ সালে প্রকাশিত চার বছরব্যাপী আনুষ্ঠানিক জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নথির সারসংক্ষেপে ইসরায়েলকে সিরিয়া ও গাজা অঞ্চলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রধান বাধা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০২৪ সালের এক জনসভায় এরদোয়ান সরাসরি হুশিয়ারি দিয়েছিলেন, কারাবাখ এবং লিবিয়ার মতো তুরস্ক ফিলিস্তিনের সুরক্ষায় ইসরায়েলেও প্রবেশ করতে পারে। এই ধরনের বক্তব্য এবং কিছু তুর্কি সামরিক বিশেষজ্ঞের ‘৭২ ঘণ্টার মধ্যে তেল আবিব দখল’ করার মতো মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব ইসরায়েলকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। লিন্ডেনস্ট্রাউস সহ ইসরায়েলি গবেষকদের মতে, এরদোয়ান ২০২৮ সালের নির্বাচনে পুনরায় নির্বাচিত হলে এবং তুরস্কের স্টিল ডোম ও কান যুদ্ধবিমান প্রকল্পগুলো পূর্ণতা পেলে, এই অঞ্চলে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।
তুরস্কের সামরিক আধুনিকায়ন, মার্কিন ইঞ্জিন সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং স্টিল ডোমের মতো মেগা প্রতিরক্ষা প্রকল্প মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় ইসরায়েলের একক আধিপত্যের যুগের অবসান ঘটাচ্ছে।
আঙ্কারার এই উত্থান কেবল প্রতিরক্ষামূলক নয়, বরং দামেস্কে রাডার মোতায়েন কিংবা এফ-৩৫ অর্জনের চেষ্টার মাধ্যমে এটি ইসরায়েলকে কৌশলগতভাবে অবরুদ্ধ করার একটি দীর্ঘমেয়াদী ভূরাজনৈতিক দাবার চাল। ওয়াশিংটন ও ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে চতুরতার সাথে ব্যবহার করে এরদোয়ান যেভাবে নিজের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এগিয়ে নিচ্ছেন, তা তেল আবিবের জন্য এক অস্তিত্ব সংকটের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
আগামী ২০২৮ সাল নাগাদ এই দুই আঞ্চলিক পরাশক্তির মধ্যকার প্রযুক্তিগত ও সামরিক প্রতিযোগিতা যদি কোনো কূটনৈতিক সমাধানের দিকে না যায়, তবে মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন প্রত্যক্ষ সংঘাতের সাক্ষী হতে পারে।

গত ৭ ও ৮ জুলাই তুরস্কের আঙ্কারায় বেশতেপে প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সামিটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্ককে এফ-৩৫ স্টিলথ যুদ্ধবিমান প্রোগ্রামে পুনরায় যুক্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এতে আঙ্কারার নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতার অভাবনীয় উত্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে।
ওয়াশিংটন ও আঙ্কারার এই সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সমঝোতা এবং তুরস্কের নিজস্ব সামরিক মেগা প্রকল্পগুলো তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে চরম অস্বস্তি ও নিরাপত্তা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গাজা ও সিরিয়া সংকটের পটভূমিতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আগ্রাসী অবস্থান ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সামরিক ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ফলশ্রুতিতে, ভূমধ্যসাগর থেকে শুরু করে দামেস্কের আকাশসীমা পর্যন্ত উভয় দেশের মধ্যে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত যুদ্ধ শুরু হয়েছে, যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে বদলে দেওয়ার আভাস দিচ্ছে।
তুরস্ককে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রজন্মের এফ-৩৫ লাইটনিং-২ যুদ্ধবিমান প্রকল্পে ফিরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ওয়াশিংটনের এই নীতিগত নমনীয়তা ইসরায়েলকে এক চরম বিব্রতকর ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের মধ্যকার বৈঠকের পর এফ-৩৫ বিক্রির সম্ভাবনা নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নেতানিয়াহু বলেছেন, তুরস্কের কাছে এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বিক্রি করা হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যের অপূরণীয় ক্ষতি করবে। হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো মার্কিনবিরোধী ও ইসরায়েলবিরোধী সংগঠনের সাথে আঙ্কারার গভীর সম্পর্ক রয়েছে, যার ফলে এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন তুরস্ককে কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েহিয়েল লাইটার আঙ্কারার এই প্রত্যাবর্তনকে ‘সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক গালিয়া লিন্ডেনস্ট্রস উল্লেখ করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল সবসময় তার ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বা গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে চায়, যা তুরস্ক এফ-৩৫ বিমান পেলে ক্ষুণ্ণ হবে। লিন্ডেনস্ট্রসের মতে, এটি কেবল একটি বিমান চুক্তি নয়, বরং এটি আঙ্কারার কাছে ভবিষ্যতে আরও উন্নত মার্কিন অস্ত্র বিক্রির পথ প্রশস্ত করবে, যা ৭ অক্টোবরের পরবর্তী নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের জন্য গভীর চিন্তার কারণ।
এফ-৩৫ নিয়ে আলোচনার সমান্তরালে, তুর্কি প্রযুক্তিতে তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’-এর জন্য মার্কিন এফ-১১০ ইঞ্জিন বিক্রির প্রস্তাবটি কংগ্রেসের ১৫ দিনের বাধ্যতামূলক পর্যালোচনা শেষে গত ৯ জুলাই কোনো বাধা ছাড়াই পাস হয়। ২৪ জুন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব উত্থাপনের পর দিনা টাইটাস, ব্র্যাড শারম্যান এবং ক্রিস প্যাপাসের মতো আর্মেনীয়, গ্রিক ও ইসরায়েলি ৯ জন লবিপন্থী ডেমোক্র্যাট সদস্য এটি আটকে দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা সিনেট বা প্রতিনিধি পরিষদে ভোটের মুখ দেখেনি। ফলে জেনারেল ইলেকট্রিকের তৈরি এফ-১১০-জিই-১২৯ই/এফ মডেলের ইঞ্জিনগুলো কানের সাথে যুক্ত করার কারিগরি ও বাণিজ্যিক আলোচনার পথ এখন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।
৭৫ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের এই সফল চুক্তি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম আকাশে ওড়া কান যুদ্ধবিমানকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক রূপ দিতে যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তুরস্কের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, যা ন্যাটো জোটের এই দুই মিত্রের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক।
নিজেদের আকাশসীমাকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীলতামুক্ত করতে তুরস্ক ‘স্টিল ডোম’ নামে একটি যুগান্তকারী প্রতিরক্ষা প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার জন্য আঙ্কারা ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে অতিরিক্ত ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করেছে।
তুর্কি প্রতিরক্ষাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘উলুসাভুন্মা’-এর তথ্যমতে, স্টিল ডোম কোনো একক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নয়, এটি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক এইসা রাডার প্রযুক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক ব্যবস্থার মহাপদ্ধতি। এই বিশাল স্থাপত্যের স্তরগুলো হচ্ছে:
অতি স্বল্প দূরত্ব: রাডার-নিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় ক্যানন সমৃদ্ধ ‘কোরকুট’ ব্যবস্থা, যা ড্রোন ও স্বল্প পাল্লার হুমকি ধ্বংস করবে।
স্বল্প ও মাঝারি পাল্লা: এই স্তরে নিয়োজিত থাকবে তুরস্কের নিজস্ব ‘হিসার-এ+’ এবং ‘হিসার-ও+’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।
দীর্ঘ পাল্লা ও ব্যালিস্টিক প্রতিরোধ: সর্বোচ্চ স্তরের সুরক্ষায় মোতায়েন করা হচ্ছে তুরস্কের অত্যাধুনিক ‘সিপার’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।
বহুস্তরবিশিষ্ট এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলো আসেলসান, রকেটসান এবং টুবিটাক সেজ। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই ঝাঁক বেঁধে আসা ড্রোন বা স্যাচুরেশন অ্যাটাক রিয়েল টাইমে শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবচেয়ে উপযোগী ইন্টারসেপ্টরটি বেছে নেবে। এরদোয়ান ঘোষণা করেছেন যে, ২০৩০ সালের মধ্যে তুরস্ক তার জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করবে, যা ন্যাটোর বেঁধে দেওয়া ২০৩৫ সালের সময়সীমার চেয়ে পাঁচ বছর এগিয়ে।
তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যকার তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এখন আর কেবল তাদের নিজস্ব ভৌগোলিক সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা প্রতিবেশী সিরিয়ার আকাশসীমায় ছায়া যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। এর কারণ আঙ্কারার সাম্প্রতিক সামরিক ও কৌশলগত পদক্ষেপগুলো এখন সরাসরি সিরিয়ার আকাশে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর অবাধ বিমান হামলার স্বাধীনতাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এই ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই চলতি বছরে সিরিয়ার দামেস্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আসেলসানের তৈরি ‘এইচটিআরএস-১০০’ এয়ার সার্ভাইল্যান্স রাডার মোতায়েন করা হয়েছে।
আঙ্কারার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হয়েছে, এই রাডারটি কেবলই সিরিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও সুরক্ষার সুবিধার্থে দেওয়া হয়েছে। তবে তুর্কিদের এই বেসামরিক বিমান নিরাপত্তার যুক্তিকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না তেল আবিবের নীতিনির্ধারকেরা। ফলশ্রুতিতে, দামেস্কের এই এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল রাডারটি এখন দুই দেশের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা এই রাডার মোতায়েনের তীব্র বিরোধিতা করে দাবি করেছেন যে, এটি আদতে কোনো সাধারণ বেসামরিক রাডার নয়। তাদের মতে এই অত্যাধুনিক রাডারে মিলিটারি গ্রেডের ‘আইডেন্টিফিকেশন ফ্রেন্ড অর ফো’ টেকনোলজি এবং ‘ডিস্ট্রিবিউটেড অ্যাক্টিভ হট স্ট্যান্ডবাই কনফিগারেশন’ রয়েছে। এই ধরণের সোফিস্টিকেটেড ও উচ্চপ্রযুক্তির সিস্টেম সাধারণত বিশ্বজুড়ে বেসামরিক এভিয়েশনে ব্যবহৃত রাডারসমূহে একেবারেই দেখা যায় না। ইসরায়েলি থিংক ট্যাংকগুলোর গভীর উদ্বেগ, এই রাডারটি সিরিয়ার আকাশসীমায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য বন্ধ করে দিতে পারে। তাদের আশঙ্কা, রাডারটির উন্নত ট্র্যাকিং ক্ষমতা তেল আবিবের যেকোনো আকস্মিক বিমান হামলা বা রিয়েল-টাইম অপারেশনাল সক্ষমতাকে সম্পূর্ণ পঙ্গু ও নস্যাৎ করে দেবে।
তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ঐতিহাসিকভাবে একটি পরম রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ছিল, যা ‘রেড বুক’ নামে পরিচিত। তবে ২০২৪ সালে প্রকাশিত চার বছরব্যাপী আনুষ্ঠানিক জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নথির সারসংক্ষেপে ইসরায়েলকে সিরিয়া ও গাজা অঞ্চলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রধান বাধা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০২৪ সালের এক জনসভায় এরদোয়ান সরাসরি হুশিয়ারি দিয়েছিলেন, কারাবাখ এবং লিবিয়ার মতো তুরস্ক ফিলিস্তিনের সুরক্ষায় ইসরায়েলেও প্রবেশ করতে পারে। এই ধরনের বক্তব্য এবং কিছু তুর্কি সামরিক বিশেষজ্ঞের ‘৭২ ঘণ্টার মধ্যে তেল আবিব দখল’ করার মতো মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব ইসরায়েলকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। লিন্ডেনস্ট্রাউস সহ ইসরায়েলি গবেষকদের মতে, এরদোয়ান ২০২৮ সালের নির্বাচনে পুনরায় নির্বাচিত হলে এবং তুরস্কের স্টিল ডোম ও কান যুদ্ধবিমান প্রকল্পগুলো পূর্ণতা পেলে, এই অঞ্চলে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।
তুরস্কের সামরিক আধুনিকায়ন, মার্কিন ইঞ্জিন সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং স্টিল ডোমের মতো মেগা প্রতিরক্ষা প্রকল্প মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় ইসরায়েলের একক আধিপত্যের যুগের অবসান ঘটাচ্ছে।
আঙ্কারার এই উত্থান কেবল প্রতিরক্ষামূলক নয়, বরং দামেস্কে রাডার মোতায়েন কিংবা এফ-৩৫ অর্জনের চেষ্টার মাধ্যমে এটি ইসরায়েলকে কৌশলগতভাবে অবরুদ্ধ করার একটি দীর্ঘমেয়াদী ভূরাজনৈতিক দাবার চাল। ওয়াশিংটন ও ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে চতুরতার সাথে ব্যবহার করে এরদোয়ান যেভাবে নিজের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এগিয়ে নিচ্ছেন, তা তেল আবিবের জন্য এক অস্তিত্ব সংকটের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
আগামী ২০২৮ সাল নাগাদ এই দুই আঞ্চলিক পরাশক্তির মধ্যকার প্রযুক্তিগত ও সামরিক প্রতিযোগিতা যদি কোনো কূটনৈতিক সমাধানের দিকে না যায়, তবে মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন প্রত্যক্ষ সংঘাতের সাক্ষী হতে পারে।
.png)

১৭৮৯ সালের ১৪ই জুলাই। দমবন্ধ করা মধ্যগ্রীষ্মের দাবদাহে প্যারিস তখন স্থবির। চরম হতাশা, পদ্ধতিগত অনাহার আর পুঞ্জীভূত অপমানের তীব্র ক্ষোভে সাধারণ নাগরিকের এক বিশাল জনস্রোত ধেয়ে চলল বাস্তিল দুর্গের পানে।
৪ ঘণ্টা আগে
মিনিট দশেক স্ক্রল করতেই বেশ কয়েকটি ভিডিও আর ছবি দেখা হলো। একটি ছেলে হাঁটুসমান পানি ভেঙে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাচ্ছে। হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেল। ছিটকে উঠল নোংরা পানি। পুরো শরীর ডুবে গেলেও হাতে ধরা অ্যাডমিট কার্ডের ফাইলটা কোনোমতে হাত উঁচিয়ে রক্ষা করল ছেলেটা।
৪ ঘণ্টা আগে
বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে—যেমন চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের জেলাগুলোতে ঘনঘন যে ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে, তা চরম উদ্বেগের। ২০২৪ সালে আমরা একটি বড় বন্যা দেখেছি, ২০২৬ সালেও শঙ্কা বাড়ছে।
২০ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে ছোট্ট একটি গ্যাসসমৃদ্ধ রাষ্ট্রকে বৈশ্বিক কূটনীতি, গণমাধ্যম ও অর্থনীতির অন্যতম প্রভাবশালী শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি। কাতারের আধুনিক রাষ্ট্রপরিচয়ের সঙ্গে যার নাম প্রায় সমার্থক।
১ দিন আগে