ইনবক্সের বাইরে-৯

পরীক্ষা মাস্ট গো অন

স্ট্রিম গ্রাফিক

বন্যার পানিতে শুধু রাস্তা ডোবে না, কখনো কখনো রাষ্ট্রের বিবেকও ডোবে। কথাটা মনে পড়ল পাবলিক বাসে চেপে অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে।

ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় বাসে উঠেই বসার সিট পেয়েছিলাম। এক ভদ্রলোকের পাশে বসে আজকের দিনের মতো প্রথমবার ফেসবুকে ঢুকলাম।

মিনিট দশেক স্ক্রল করতেই বেশ কয়েকটি ভিডিও আর ছবি দেখা হলো। একটি ছেলে হাঁটুসমান পানি ভেঙে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাচ্ছে। হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেল। ছিটকে উঠল নোংরা পানি। পুরো শরীর ডুবে গেলেও হাতে ধরা অ্যাডমিট কার্ডের ফাইলটা কোনোমতে হাত উঁচিয়ে রক্ষা করল ছেলেটা। তার অবচেতন মন জানে, এই মুহূর্তে শরীরের চেয়ে কাগজটা নিরাপদ রাখা বেশি জরুরি। জানবে না-ই বা কেন, ছোটবেলা থেকে তাকে শেখানো হয়েছে, তোমার জীবনের চেয়ে পরীক্ষাটা বেশি মূল্যবান। তাই তো পরীক্ষা খারাপ হলে এই একুশ শতকেও এই পোড়ার দেশের ছেলেমেয়েরা আত্মহত্যা করে। কী বিস্ময়কর!

আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেল (ভিডিওটি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের সামনের রাস্তার), শিক্ষার্থীদের নৌকায় করে পরীক্ষার হলে নেওয়া হচ্ছে। পিচঢালা রাস্তায় কোমরসমান পানিতে নৌকা চলছে। দৃশ্যটি এতটাই অদ্ভুত, কারও কারও মনে হতে পারে, চোখের সামনে বুঝি মাকোন্দো গ্রাম উঠে এসেছে। পানির ভেতর ছপ ঝপ আওয়াজ তুলে হেঁটে বেড়াচ্ছে হোসে আরকাদিও বুয়েন্দিয়ার বংশধরেরা!

কিন্তু না। এটিই বাস্তব। বাস্তবতা কখনো কখনো এতটাই রূঢ় হয়, তা পরাবাস্তব উপন্যাসকেও হার মানায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম।

পাশের ভদ্রলোক এতক্ষণ আড়চোখে আমার মোবাইল স্ক্রল করা দেখছিলেন। তিনি হঠাৎ লম্বা নিশ্বাস নিয়ে বললেন, নদীমাতৃক দেশে মানুষ নৌকায় চলাচল করবে, এতে তো আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, নৌকাগুলো স্বাভাবিক নৌপথে চলছে না, চলছে শহরের রাস্তায়। যাচ্ছে পরীক্ষার হলে। ভাবখানা এমন, সভ্যতার শেষ কাজটি বাকি আছে, এক্ষুণি গিয়ে কালো কালি দিয়ে গোল্লাগুলো ভরাট করতে হবে!

কখনো কখনো নিদারুণ কষ্টেও হাসি পায়। ভদ্রলোক বিষাদমাখা হাসি হেসে বললেন, আমার মেয়ে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। গত পরশু ভিজতে ভিজতে পরীক্ষা দিতে গেছে, ভেজা কাপড়ে তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিয়েছে, পরীক্ষা শেষে আবার ভিজতে ভিজতে বাসায় ফিরেছে। রাতে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছে মেয়েটার। সেই জ্বর নিয়ে আজ আবার পরীক্ষা দিয়েছে।

বসার জায়গা না পেয়ে আমাদের মাথার ওপরে রড ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক ভদ্রলোক। আমাদের দুঃখের সঙ্গে নিজের দুঃখের সংগতি খুঁজে পেয়ে যোগ দিলেন গল্পে। বললেন, আমার ভাতিজা এবার পরীক্ষা দিচ্ছে। থাকে নাটোরে। ওদের ঘরের ভেতর পানি ঢুকে গেছে। সারা রাত খাটের তলায় ইট দিয়ে দিয়ে খাট উঁচু করেছে। পড়বে কখন? ভেবেছিল, পরীক্ষাটা স্থগিত হবে। সকালে উঠে শোনে, শিক্ষামন্ত্রী বলতেছে, এসব সমস্যা ব্যক্তিগত। এ জন্য পরীক্ষা স্থগিত হবে না। কোনো টাল্টিবাল্টি না করে যাও পরীক্ষা দিতে।

কী আর বলব! আমার মনে পড়ল, পৃথিবীর বহু দেশে ঝড়, বন্যা, তুষারঝড় বা দাবানলের সময় পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া হয়। জাপানে টাইফুন সতর্কতা জারি হলে বা ট্রেন-বাস বন্ধ হয়ে গেলে পরীক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত হয়ে যায়। কোনো বিজ্ঞপ্তির জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। কোনো মন্ত্রীর সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। সকাল সাড়ে ছয়টার আগে সতর্কতা উঠে গেলে স্বাভাবিক নিয়মে পরীক্ষা হবে। না উঠলে পরীক্ষা বাতিল। এটুকুই নিয়ম।

আমাদের রাষ্ট্রই একটা বিশাল পরীক্ষার হল, বুঝলেন ভাই। এখানে নাগরিকদের সারাজীবন পরীক্ষা দিতে হয়। জন্মের পর নিবন্ধন করতে গিয়ে পরীক্ষা, স্কুলে পরীক্ষা, কলেজে পরীক্ষা, চাকরিতে পরীক্ষা। শুধু রাষ্ট্রের নিজের কোনো পরীক্ষা দিতে হয় না। তাকে কেউ জিজ্ঞেস করতে পারে না, দুর্যোগের দিনে তুমি কেমন আচরণ করেছিলে হে?

আমেরিকায় তুষারপাত হলে ‘স্নো ডে’ ঘোষণা হয়। বাসের চাকা রাস্তায় চলতে না পারলে, হেঁটে স্কুলে আসা বিপজ্জনক হলে স্কুল বন্ধ। শিক্ষার্থীর জীবন আগে, পরীক্ষা পরে।

ফিলিপাইনে টাইফুন সিগন্যাল জারি হলে সরকারি স্কুলের ক্লাস ও পরীক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল। অনলাইনেও না। সব বন্ধ। এমনকি পাশের দেশ ভারতেও এই তো কয়েকদিন আগে (৬ জুলাই) বন্যার কারণে মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়। ওই সব দেশে মানুষ আগে, পরীক্ষা পরে।

আর আমরা? উল্টোপথে হাঁটছি। আমাদের এখানে পরীক্ষার্থী প্রথমে পরীক্ষার্থী, পরে মানুষ। এই কারণেই বন্যার পানি যখন পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢুকে পড়ে, তখনও রুটিন বদলায় না।

পাশের ভদ্রলোক আবার মুখ খুললেন— আমাদের রাষ্ট্রই একটা বিশাল পরীক্ষার হল, বুঝলেন ভাই। এখানে নাগরিকদের সারাজীবন পরীক্ষা দিতে হয়। জন্মের পর নিবন্ধন করতে গিয়ে পরীক্ষা, স্কুলে পরীক্ষা, কলেজে পরীক্ষা, চাকরিতে পরীক্ষা। শুধু রাষ্ট্রের নিজের কোনো পরীক্ষা দিতে হয় না। তাকে কেউ জিজ্ঞেস করতে পারে না, দুর্যোগের দিনে তুমি কেমন আচরণ করেছিলে হে?

আমার বাস থেকে নামার সময় হয়ে এল। ‘আসি ভাই’ বলে নেমে পড়লাম। এখন বাসা পর্যন্ত যেতে আবার রিকশা নিতে হবে। কিন্তু চাইলেই কী আর রিকশা পাওয়া যায়? এটাও আরেক পরীক্ষা।

রিকশার জন্য অপেক্ষা করতে করতে আবার ফেসবুকে ঢুকলাম। আমার মন বলছিল, শিক্ষামন্ত্রী সেনসিবল মানুষ, নিশ্চয় সরিটরি বলে কোনো একটা বার্তা দিয়েছেন এতক্ষণে।

ওমা! কীসের কী! তাঁর পেজে ঢুকে দেখি, সাত ঘণ্টা আগের একটি পোস্ট। মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের একটি অনুষ্ঠানে হাসিমুখে বক্তৃতা দিচ্ছেন।

হাসিমুখে বক্তৃতা দেওয়া তাঁর কাজ। সেটা সমস্যা নয়। সমস্যাটি দৃশ্যের মধ্যে। একদিকে নৌকায় চেপে জামাকাপড় ভিজিয়ে পরীক্ষা দিতে যাওয়া ছেলেমেয়ে, অন্যদিকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলরুমে বক্তৃতা। একদিকে অ্যাডমিট কার্ড বাঁচানোর সংগ্রাম, অন্যদিকে গমগমে মাইক্রোফোন।

দুটি বাংলাদেশ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তারা একে অপরকে দেখতে পাচ্ছে না।

এত দুঃখ এই পোড়া দেশটার কপালে! এখানে যারা শিক্ষাব্যবস্থা চালায়, তাদের ছেলেমেয়েরা কেউ এখানে পড়ে না। তারা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ে যেখানে বন্যার পানিতে ভিজে পরীক্ষা দিতে হয় না। ফলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কোনো সম্পর্ক নেই। যে কষ্ট নিজের ঘরে ঢোকে না, সেই কষ্ট সহসা বোঝা যায় না। আশিবিষে দংশন না করলে যাতনা কি বোঝা যায়?

এই ছেলেমেয়েরা একদিন বড় হবে। কেউ শিক্ষক হবে, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ রাজনীতিবিদ, এমনকি শিক্ষামন্ত্রীও। তারা হয়তো প্রশ্নপত্রের উত্তর ভুলে যাবে। কোন বছরে কোন পরীক্ষা হয়েছিল, সেটাও ভুলে যাবে। কিন্তু তারা মনে রাখবে, এক বর্ষার সকালে রাষ্ট্র তাদের সঙ্গে কী আচরণ করেছিল।

রাষ্ট্র বলেছিল, তোমার চারপাশে পানি থাকতে পারে, তোমার জ্বর থাকতে পারে, তোমার ঘর ডুবে যেতে পারে—কিন্তু পরীক্ষা মাস্ট গো অন।

  • মারুফ ইসলাম: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
Ad 300x250

সম্পর্কিত