সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ

১৭৮৯ সালের ১৪ই জুলাই। দমবন্ধ করা মধ্যগ্রীষ্মের দাবদাহে প্যারিস তখন স্থবির। চরম হতাশা, পদ্ধতিগত অনাহার আর পুঞ্জীভূত অপমানের তীব্র ক্ষোভে সাধারণ নাগরিকের এক বিশাল জনস্রোত ধেয়ে চলল বাস্তিল দুর্গের পানে।
সেই মধ্যযুগীয় দুর্গটি কেবল কোনো অস্ত্রাগার ছিল না; সেটি ছিল বোরবন রাজবংশের নির্মম স্বৈরাচারের এক মূর্ত প্রতীক—এক পাথুরে প্রহরী, যা আগলে রাখত এমন এক শাসকগোষ্ঠীকে যারা সাধারণ জনগণকে দেখত চরম উদাসীনতা ও বিচ্ছিন্নতার দৃষ্টিতে। সেদিন বিকেলে যখন সেই দুর্গের পতন ঘটল, তা প্রমাণ করে দিল, সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তির আঘাতে পরম ক্ষমতার কাঠামোগত স্থাপত্যও গুঁড়িয়ে ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।
এবার দ্রুত ফিরে আসা যাক ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। এক ভিন্ন ধরনের উত্তাপ তখন ভর করেছিল ঢাকা শহরের বুকে। সেখানে আক্রমণ করার মতো কোনো পাথুরে দুর্গ ছিল না, ছিল না এমন কোনো দৃশ্যমান কেল্লা যা ধরে রেখেছিল স্বৈরাচারী রানির রাজত্বের চাবিকাঠি। তার বদলে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণকে লড়াই করতে হয়েছিল এক অদৃশ্য বাস্তিলের বিরুদ্ধে—যা ছিল ডিজিটাল নজরদারি, রাজনৈতিক চাটুকারিতা, বিচারবহির্ভূত নিপীড়ন আর একটি বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক বহুমাত্রিক নজরবন্দিশালা, যা প্রজাতন্ত্রের সরকারি চাকরিকে একটি দলীয় উত্তরাধিকারে পরিণত করেছিল। তবুও, জেন-জি শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকেরা যখন রাজপথে নেমে এল, তারা সূচনা করল এক আধুনিক ‘বর্ষা বিপ্লবের’, যা চিরস্থায়ী মনে হওয়া এক স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটাতে বাধ্য করেছিল।
১৭৮৯ সালের প্যারিস এবং ২০২৪ সালের ঢাকার এই ঐতিহাসিক মেলবন্ধন স্বৈরাচারের পতনের নেপথ্য রসায়ন নিয়ে এক গভীর শিক্ষা দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শতাব্দী আর ভূগোলের সীমানা ছাড়িয়েও পরম ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ সব সময় একই রকম ত্রুটিপূর্ণ হয়। স্বৈরশাসকেরা বরাবরই আত্মমর্যাদা-বঞ্চিত একটি জনগোষ্ঠীর ধৈর্যের শেষ সীমানা আঁচ করতে ভুল করে।
এই দুই বিপ্লবের মধ্যকার কাঠামোগত সাদৃশ্যগুলো সত্যিই চোখ ধাঁধানো। ফরাসি বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল ‘তিন এস্টেট’ বা সমাজ-স্তরের চরম বৈষম্য থেকে; যেখানে যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায় সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত, আর জনসংখ্যার আটানব্বই শতাংশ নিয়ে গঠিত ‘তৃতীয় এস্টেট’ সাম্রাজ্যের সমস্ত আর্থিক ও সামাজিক বোঝা একাই বহন করত। বাংলাদেশের অদৃশ্য বাস্তিলটিও ঠিক একই রকম একটি ছকের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছিল। সরকারি চাকরির কোটাকে যেভাবে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তা কেবল কোনো প্রশাসনিক নীতি ছিল না; বরং তা ছিল একটি কৃত্রিম জাতিভেদ প্রথা, যা যোগ্য যুবসমাজকে বঞ্চিত করে কেবল শাসকের অনুগতদের পুরস্কৃত করার জন্য তৈরি হয়েছিল। এটি প্রজাতন্ত্রকে সুবিধাভোগী গুটি কয়েক এবং অধিকারবঞ্চিত এক বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্ত করে দিয়েছিল।
উভয় ইতিহাসেই, জনগণের প্রাথমিক দাবিগুলো ছিল অত্যন্ত বিনম্র এবং সংস্কারমুখী। ফরাসিরা ১৪ জুলাই কোনো রাজাকে ফাঁসি দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেনি, কিংবা শাহবাগের শিক্ষার্থীরাও শুরুতে সরকার পতনের আন্দোলনে নামেনি। তারা কেবল চেয়েছিল কাঠামোগত ন্যায্যতা, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে নিজেদের অধিকারের স্বীকৃতি।
এই সংস্কার আন্দোলনগুলো পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবে রূপ নেওয়ার পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল একই মারাত্মক ভুল—অহংকারী, রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সহিংসতা। ফরাসি রাজতন্ত্র যখন বিদেশি ভাড়াটে সৈন্য দিয়ে প্যারিসকে অবরুদ্ধ করেছিল, তখনই তারা নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলেছিল। ঠিক তেমনি, ঢাকার স্বৈরাচারী প্রশাসন যখন নিজের দেশের নিরস্ত্র তরুণদের ওপর দলীয় ক্যাডার এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে লেলিয়ে দিয়েছিল, তখন তা একটি স্থানীয় বিক্ষোভকে দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত করে। প্রথম বুলেটটি ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই সরকারের নৈতিক বৈধতা বিলীন হয়ে গিয়েছিল।
প্যারিসের ইতিহাস থেকে একটি চমৎকার ঘটনা জানা যায়। বাস্তিল পতনের রাতে রাজা ষোড়শ লুই তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন ‘Rien’ (কিছুই না)—যা আসলে সেদিন শিকারে কোনো সাফল্য না পাওয়ার হতাশা ছিল। তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন যে ততক্ষণে তার চেনা পৃথিবীটা চিরতরে বদলে গেছে। রাজকীয় বিচ্ছিন্নতার এই প্রতিধ্বনি বেদনাদায়কভাবে দৃশ্যমান ছিল ঢাকাতেও, যেখানে রাজনৈতিক অভিজাতরা সুরক্ষিত বুদবুদের মধ্যে অবরুদ্ধ থেকে ‘জেন-জি’ ইন্টারনেট প্রজন্মকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছিল; ঠিক সেই মুহূর্তটি পর্যন্ত, যতক্ষণ না জনতার জোয়ার একটি অপ্রতিরোধ্য স্রোতে পরিণত হয়েছিল।
তবে বাস্তিল দিবসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি দুর্গ ভাঙার উল্লাসের মধ্যে লুকিয়ে নেই, বরং লুকিয়ে আছে তার পরের দিনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে। বাস্তিল দুর্গ ভাঙার পরপরই কোনো স্থিতিশীল প্রজাতন্ত্র গড়ে ওঠেনি; একটি গণতান্ত্রিক ভিত্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে দেশটিকে এক দশকের প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন, অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস এবং উপদলীয় অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল।
বাংলাদেশ যখন তার ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দ্বারপ্রান্তে, তখন দেশটি ঠিক এমনই এক রূপান্তরমূলক অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্বৈরাচার পালিয়েছে, স্বৈরতন্ত্রের দৃশ্যমান প্রতীকগুলো মুছে ফেলা হয়েছে এবং একটি নবনির্বাচিত সরকার অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল পথ পাড়ি দিচ্ছে। সংবিধান কাটা-ছেঁড়া, বিচারবিভাগীয় পুনর্গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই এখনকার নতুন যুদ্ধক্ষেত্র।
একটি দুর্গ ভেঙে ফেলা—তা প্যারিসের পাথর দিয়েই তৈরি হোক কিংবা স্বৈরাচারীর ভয়ের দেয়াল দিয়ে—তা সম্মিলিত সাহসের একটি একক বহিঃপ্রকাশ মাত্র। কিন্তু তার ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলা এক অবিরাম, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের সংগ্রাম। বর্ষা বিপ্লব প্রমাণ করেছে যে রাজপথ একটি একনায়কতন্ত্রকে উপড়ে ফেলতে পারে। এখনকার আসল চ্যালেঞ্জ হলো এটি নিশ্চিত করা যেন নতুনভাবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোনো রাজনৈতিক ত্রুটির নতুন রঙে হামাগুড়ি দিয়ে ফিরে আসাকে রুখে দেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়।
১৭৮৯ সালের ফ্রান্সের জুলাইয়ের চেতনা এবং ২০২৪ সালের বাংলাদেশের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের চেতনা একই বৈশ্বিক মানবিক ইতিহাসের অংশ। যারা ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে শাসন করতে চায়, চিরস্থায়ী হবার স্বপ্ন দেখে, তাদের জন্য এগুলো একটি চিরন্তন সতর্কবার্তা। কোনো দুর্গই চিরস্থায়ী নয় যখন একটি জাতি তার আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার পণ করে।

১৭৮৯ সালের ১৪ই জুলাই। দমবন্ধ করা মধ্যগ্রীষ্মের দাবদাহে প্যারিস তখন স্থবির। চরম হতাশা, পদ্ধতিগত অনাহার আর পুঞ্জীভূত অপমানের তীব্র ক্ষোভে সাধারণ নাগরিকের এক বিশাল জনস্রোত ধেয়ে চলল বাস্তিল দুর্গের পানে।
সেই মধ্যযুগীয় দুর্গটি কেবল কোনো অস্ত্রাগার ছিল না; সেটি ছিল বোরবন রাজবংশের নির্মম স্বৈরাচারের এক মূর্ত প্রতীক—এক পাথুরে প্রহরী, যা আগলে রাখত এমন এক শাসকগোষ্ঠীকে যারা সাধারণ জনগণকে দেখত চরম উদাসীনতা ও বিচ্ছিন্নতার দৃষ্টিতে। সেদিন বিকেলে যখন সেই দুর্গের পতন ঘটল, তা প্রমাণ করে দিল, সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তির আঘাতে পরম ক্ষমতার কাঠামোগত স্থাপত্যও গুঁড়িয়ে ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।
এবার দ্রুত ফিরে আসা যাক ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। এক ভিন্ন ধরনের উত্তাপ তখন ভর করেছিল ঢাকা শহরের বুকে। সেখানে আক্রমণ করার মতো কোনো পাথুরে দুর্গ ছিল না, ছিল না এমন কোনো দৃশ্যমান কেল্লা যা ধরে রেখেছিল স্বৈরাচারী রানির রাজত্বের চাবিকাঠি। তার বদলে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণকে লড়াই করতে হয়েছিল এক অদৃশ্য বাস্তিলের বিরুদ্ধে—যা ছিল ডিজিটাল নজরদারি, রাজনৈতিক চাটুকারিতা, বিচারবহির্ভূত নিপীড়ন আর একটি বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক বহুমাত্রিক নজরবন্দিশালা, যা প্রজাতন্ত্রের সরকারি চাকরিকে একটি দলীয় উত্তরাধিকারে পরিণত করেছিল। তবুও, জেন-জি শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকেরা যখন রাজপথে নেমে এল, তারা সূচনা করল এক আধুনিক ‘বর্ষা বিপ্লবের’, যা চিরস্থায়ী মনে হওয়া এক স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটাতে বাধ্য করেছিল।
১৭৮৯ সালের প্যারিস এবং ২০২৪ সালের ঢাকার এই ঐতিহাসিক মেলবন্ধন স্বৈরাচারের পতনের নেপথ্য রসায়ন নিয়ে এক গভীর শিক্ষা দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শতাব্দী আর ভূগোলের সীমানা ছাড়িয়েও পরম ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ সব সময় একই রকম ত্রুটিপূর্ণ হয়। স্বৈরশাসকেরা বরাবরই আত্মমর্যাদা-বঞ্চিত একটি জনগোষ্ঠীর ধৈর্যের শেষ সীমানা আঁচ করতে ভুল করে।
এই দুই বিপ্লবের মধ্যকার কাঠামোগত সাদৃশ্যগুলো সত্যিই চোখ ধাঁধানো। ফরাসি বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল ‘তিন এস্টেট’ বা সমাজ-স্তরের চরম বৈষম্য থেকে; যেখানে যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায় সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত, আর জনসংখ্যার আটানব্বই শতাংশ নিয়ে গঠিত ‘তৃতীয় এস্টেট’ সাম্রাজ্যের সমস্ত আর্থিক ও সামাজিক বোঝা একাই বহন করত। বাংলাদেশের অদৃশ্য বাস্তিলটিও ঠিক একই রকম একটি ছকের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছিল। সরকারি চাকরির কোটাকে যেভাবে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তা কেবল কোনো প্রশাসনিক নীতি ছিল না; বরং তা ছিল একটি কৃত্রিম জাতিভেদ প্রথা, যা যোগ্য যুবসমাজকে বঞ্চিত করে কেবল শাসকের অনুগতদের পুরস্কৃত করার জন্য তৈরি হয়েছিল। এটি প্রজাতন্ত্রকে সুবিধাভোগী গুটি কয়েক এবং অধিকারবঞ্চিত এক বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্ত করে দিয়েছিল।
উভয় ইতিহাসেই, জনগণের প্রাথমিক দাবিগুলো ছিল অত্যন্ত বিনম্র এবং সংস্কারমুখী। ফরাসিরা ১৪ জুলাই কোনো রাজাকে ফাঁসি দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেনি, কিংবা শাহবাগের শিক্ষার্থীরাও শুরুতে সরকার পতনের আন্দোলনে নামেনি। তারা কেবল চেয়েছিল কাঠামোগত ন্যায্যতা, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে নিজেদের অধিকারের স্বীকৃতি।
এই সংস্কার আন্দোলনগুলো পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবে রূপ নেওয়ার পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল একই মারাত্মক ভুল—অহংকারী, রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সহিংসতা। ফরাসি রাজতন্ত্র যখন বিদেশি ভাড়াটে সৈন্য দিয়ে প্যারিসকে অবরুদ্ধ করেছিল, তখনই তারা নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলেছিল। ঠিক তেমনি, ঢাকার স্বৈরাচারী প্রশাসন যখন নিজের দেশের নিরস্ত্র তরুণদের ওপর দলীয় ক্যাডার এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে লেলিয়ে দিয়েছিল, তখন তা একটি স্থানীয় বিক্ষোভকে দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত করে। প্রথম বুলেটটি ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই সরকারের নৈতিক বৈধতা বিলীন হয়ে গিয়েছিল।
প্যারিসের ইতিহাস থেকে একটি চমৎকার ঘটনা জানা যায়। বাস্তিল পতনের রাতে রাজা ষোড়শ লুই তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন ‘Rien’ (কিছুই না)—যা আসলে সেদিন শিকারে কোনো সাফল্য না পাওয়ার হতাশা ছিল। তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন যে ততক্ষণে তার চেনা পৃথিবীটা চিরতরে বদলে গেছে। রাজকীয় বিচ্ছিন্নতার এই প্রতিধ্বনি বেদনাদায়কভাবে দৃশ্যমান ছিল ঢাকাতেও, যেখানে রাজনৈতিক অভিজাতরা সুরক্ষিত বুদবুদের মধ্যে অবরুদ্ধ থেকে ‘জেন-জি’ ইন্টারনেট প্রজন্মকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছিল; ঠিক সেই মুহূর্তটি পর্যন্ত, যতক্ষণ না জনতার জোয়ার একটি অপ্রতিরোধ্য স্রোতে পরিণত হয়েছিল।
তবে বাস্তিল দিবসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি দুর্গ ভাঙার উল্লাসের মধ্যে লুকিয়ে নেই, বরং লুকিয়ে আছে তার পরের দিনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে। বাস্তিল দুর্গ ভাঙার পরপরই কোনো স্থিতিশীল প্রজাতন্ত্র গড়ে ওঠেনি; একটি গণতান্ত্রিক ভিত্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে দেশটিকে এক দশকের প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন, অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস এবং উপদলীয় অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল।
বাংলাদেশ যখন তার ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দ্বারপ্রান্তে, তখন দেশটি ঠিক এমনই এক রূপান্তরমূলক অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্বৈরাচার পালিয়েছে, স্বৈরতন্ত্রের দৃশ্যমান প্রতীকগুলো মুছে ফেলা হয়েছে এবং একটি নবনির্বাচিত সরকার অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল পথ পাড়ি দিচ্ছে। সংবিধান কাটা-ছেঁড়া, বিচারবিভাগীয় পুনর্গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই এখনকার নতুন যুদ্ধক্ষেত্র।
একটি দুর্গ ভেঙে ফেলা—তা প্যারিসের পাথর দিয়েই তৈরি হোক কিংবা স্বৈরাচারীর ভয়ের দেয়াল দিয়ে—তা সম্মিলিত সাহসের একটি একক বহিঃপ্রকাশ মাত্র। কিন্তু তার ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলা এক অবিরাম, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের সংগ্রাম। বর্ষা বিপ্লব প্রমাণ করেছে যে রাজপথ একটি একনায়কতন্ত্রকে উপড়ে ফেলতে পারে। এখনকার আসল চ্যালেঞ্জ হলো এটি নিশ্চিত করা যেন নতুনভাবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোনো রাজনৈতিক ত্রুটির নতুন রঙে হামাগুড়ি দিয়ে ফিরে আসাকে রুখে দেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়।
১৭৮৯ সালের ফ্রান্সের জুলাইয়ের চেতনা এবং ২০২৪ সালের বাংলাদেশের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের চেতনা একই বৈশ্বিক মানবিক ইতিহাসের অংশ। যারা ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে শাসন করতে চায়, চিরস্থায়ী হবার স্বপ্ন দেখে, তাদের জন্য এগুলো একটি চিরন্তন সতর্কবার্তা। কোনো দুর্গই চিরস্থায়ী নয় যখন একটি জাতি তার আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার পণ করে।
.png)

মিনিট দশেক স্ক্রল করতেই বেশ কয়েকটি ভিডিও আর ছবি দেখা হলো। একটি ছেলে হাঁটুসমান পানি ভেঙে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাচ্ছে। হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেল। ছিটকে উঠল নোংরা পানি। পুরো শরীর ডুবে গেলেও হাতে ধরা অ্যাডমিট কার্ডের ফাইলটা কোনোমতে হাত উঁচিয়ে রক্ষা করল ছেলেটা।
১ ঘণ্টা আগে
বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে—যেমন চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের জেলাগুলোতে ঘনঘন যে ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে, তা চরম উদ্বেগের। ২০২৪ সালে আমরা একটি বড় বন্যা দেখেছি, ২০২৬ সালেও শঙ্কা বাড়ছে।
১৭ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে ছোট্ট একটি গ্যাসসমৃদ্ধ রাষ্ট্রকে বৈশ্বিক কূটনীতি, গণমাধ্যম ও অর্থনীতির অন্যতম প্রভাবশালী শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি। কাতারের আধুনিক রাষ্ট্রপরিচয়ের সঙ্গে যার নাম প্রায় সমার্থক।
১৯ ঘণ্টা আগে
ড. সাজ্জাদ জহির অর্থনীতিবিদ এবং গবেষক। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯ ঘণ্টা আগে