এ কে এম সাইফুল ইসলাম

বাংলাদেশে বর্ষাকালে বন্যা একটি স্বাভাবিক ও চিরায়ত ঘটনা। ভাটির দেশ হিসেবে উজান থেকে নেমে আসা নদ-নদীর জলরাশি এই জনপদ হয়েই সমুদ্রে পতিত হয়। তাছাড়া আমাদের বার্ষিক বৃষ্টিপাতের ৭০ শতাংশেরও বেশি হয়ে থাকে বর্ষা মৌসুমে। তাই প্রতি বছর বন্যা বা পানি বৃদ্ধির সঙ্গে আমাদের একটা পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি আমরা যে বন্যা পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছি, তা আর আগের মতো কেবল স্বাভাবিক 'নদী প্লাবিত বন্যা' বা 'বর্ষার পানি'র মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
দেশে, বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে—যেমন চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের জেলাগুলোতে ঘনঘন যে ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে, তা চরম উদ্বেগের বিষয়। ২০২৪ সালে আমরা একটি বড় বন্যা দেখেছি, ২০২৬ সালেও শঙ্কা বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দী, অনেক উপজেলা পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
এই বন্যাগুলো মূলত কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়—নদীর পানি উপচে পড়া বন্যা, পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) এবং নগর বন্যা (আর্বান ফ্লাডিং)। বৃষ্টি হয়ে তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে গেলে সেটি স্বাভাবিক, কিন্তু বর্তমানে ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে সামান্য বৃষ্টিতেই যে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, তা জনজীবনকে রীতিমতো অচল করে দিচ্ছে। এর পেছনে প্রকৃতি ও মানবসৃষ্ট—উভয় কারণই সমানভাবে দায়ী।
প্রথমত, বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরনও চরম আকার ধারণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি চট্টগ্রামে টানা তিন দিনে প্রায় ৮৫৫ মিলিমিটার এবং এক দিনেই ৪১৩ মিলিমিটারের মতো অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবার ঢাকায় মাত্র ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট তলিয়ে কোমর সমান পানি হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাতাসে জলীয় বাষ্প ধারণক্ষমতা বেড়েছে, যার ফলে অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় বা দীর্ঘস্থায়ী নিম্নচাপের মতো চরম আবহাওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এল নিনো বা লা নিনার প্রভাবে যখন খরা হওয়ার কথা, তখনও আমরা অতিবৃষ্টি দেখছি।
দ্বিতীয়ত, আমাদের নিজেদের তৈরি করা মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে আমরা শহরের প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সিস্টেম বা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলেছি। একসময় যেসব জায়গায় জলাশয়, পুকুর বা খাল ছিল, সেগুলো ভরাট করে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন ও রাস্তাঘাট। খোলা জায়গা বা পার্কগুলো কংক্রিটে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি সরাসরি মাটিতে শোষিত হওয়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের চরম অব্যবস্থাপনা ও অসচেতনতা। ঢাকা বা চট্টগ্রাম শহরে প্রতিদিন যে কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়, তার ৫০ শতাংশও ঠিকমতো সংগ্রহ করা হয় না। বাসা-বাড়ি, স্কুল-কলেজ বা বাজারের পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ছে ড্রেন ও খালে। ফলে খাল ও ড্রেনগুলোর পানি বহনের সক্ষমতা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। পানি নিষ্কাশনের এই পথগুলো বছরের পর বছর অবৈধ দখলে ছোট হয়ে গেছে। বর্ষার আগে এগুলো পরিষ্কার করার যে উদ্যোগ নেওয়ার কথা, তা যথাযথভাবে হচ্ছে না। ঢাকা শহরে পাম্প স্টেশন বা চট্টগ্রামে স্লুইস গেট তৈরি হলেও সেগুলোর পুরোপুরি ব্যবহার বা সঠিক ব্যবস্থাপনা আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
গ্রামাঞ্চলেও নদীর তলদেশ পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। যত্রতত্র মাছের ঘের তৈরি করা, অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা বা কালভার্ট নির্মাণ করে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ (ফ্লাড প্লেন) আটকে দেওয়া হচ্ছে। পাহাড়ি অঞ্চলে অবৈধভাবে পাহাড় ও গাছ কাটার ফলে মাটির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ফলে ভারী বৃষ্টি হলেই ভয়াবহ ভূমিধস বা ল্যান্ডস্লাইড হচ্ছে। চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা আমাদের এই নির্মম বাস্তবতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষ পাহাড়ের ঢালে চরম ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে, অথচ এটি প্রতিরোধে প্রশাসনের কঠোরতা দৃশ্যমান নয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের দুর্যোগ পূর্বাভাস বা 'আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম' আরও উন্নত ও কার্যকর করা প্রয়োজন। বর্তমানে তিন থেকে পাঁচ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হলেও, সেটি স্থানভিত্তিক এবং সুনির্দিষ্ট হওয়া জরুরি। বান্দরবানের মতো পর্যটন এলাকায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলে আগে থেকেই পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ করা বা স্থানীয়দের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় আমাদের যেমন একটি শক্তিশালী প্রস্তুতি থাকে, বন্যার ক্ষেত্রেও তেমন শেল্টার বা আশ্রয়কেন্দ্র এবং পূর্বপ্রস্তুতি থাকা অত্যাবশ্যক। বুক সমান পানির মধ্যে স্কুল-কলেজের পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলো প্রমাণ করে যে, দুর্যোগকালে আমাদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা দুর্বল।
বর্তমানে বন্যা দুর্গত এলাকাগুলোতে, বিশেষ করে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অঞ্চলে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। অনেক মানুষ ঘরের টিনের চালে আশ্রয় নিয়ে দিন পার করছে। আমাদের 'স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার (এসওডি)'-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ বিতরণে যে ভূমিকা রাখছে, তা প্রশংসনীয়। তবে শুধু সাময়িক শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি বা স্যালাইন দেওয়াই শেষ কথা নয়। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর শুরু হবে আসল সংগ্রাম। রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ও কৃষির যে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, তা পুষিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে এখন থেকেই স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
সর্বোপরি, এই দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে। নিউমার্কেটের মতো বাণিজ্যিক এলাকায় পানি ঢুকে কোটি কোটি টাকার যে ক্ষতি হচ্ছে, তা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে যে, প্রকৃতিকে বাধাগ্রস্ত করে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। জলাশয় ভরাট, খাল দখল ও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। জোনিং আইন কঠোরভাবে মেনে ল্যান্ড ইউজ প্ল্যানিং করতে হবে।
পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আমাদের জোরালোভাবে কথা বলতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ দায়ী না হলেও, আমরা এর অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী। তাই আইপিসিসি-এর প্রতিবেদন ও 'ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান' অনুযায়ী আন্তর্জাতিক 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড' থেকে আমাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।
১৯৮৮, ১৯৯৮ বা ২০২৪ সালের বন্যায় এদেশের মানুষ যেভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছিল, আজ আবারও সেই সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগের প্রয়োজন। বন্যায় হা-হুতাশ না করে, এখন প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা। নইলে সামনের দিনগুলোতে প্রকৃতির এই রুদ্ররোষ থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে না।
লেখক: পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ; বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট (আইডাব্লিউএফএম)–এর অধ্যাপক

বাংলাদেশে বর্ষাকালে বন্যা একটি স্বাভাবিক ও চিরায়ত ঘটনা। ভাটির দেশ হিসেবে উজান থেকে নেমে আসা নদ-নদীর জলরাশি এই জনপদ হয়েই সমুদ্রে পতিত হয়। তাছাড়া আমাদের বার্ষিক বৃষ্টিপাতের ৭০ শতাংশেরও বেশি হয়ে থাকে বর্ষা মৌসুমে। তাই প্রতি বছর বন্যা বা পানি বৃদ্ধির সঙ্গে আমাদের একটা পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি আমরা যে বন্যা পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছি, তা আর আগের মতো কেবল স্বাভাবিক 'নদী প্লাবিত বন্যা' বা 'বর্ষার পানি'র মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
দেশে, বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে—যেমন চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের জেলাগুলোতে ঘনঘন যে ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে, তা চরম উদ্বেগের বিষয়। ২০২৪ সালে আমরা একটি বড় বন্যা দেখেছি, ২০২৬ সালেও শঙ্কা বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দী, অনেক উপজেলা পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
এই বন্যাগুলো মূলত কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়—নদীর পানি উপচে পড়া বন্যা, পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) এবং নগর বন্যা (আর্বান ফ্লাডিং)। বৃষ্টি হয়ে তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে গেলে সেটি স্বাভাবিক, কিন্তু বর্তমানে ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে সামান্য বৃষ্টিতেই যে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, তা জনজীবনকে রীতিমতো অচল করে দিচ্ছে। এর পেছনে প্রকৃতি ও মানবসৃষ্ট—উভয় কারণই সমানভাবে দায়ী।
প্রথমত, বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরনও চরম আকার ধারণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি চট্টগ্রামে টানা তিন দিনে প্রায় ৮৫৫ মিলিমিটার এবং এক দিনেই ৪১৩ মিলিমিটারের মতো অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবার ঢাকায় মাত্র ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট তলিয়ে কোমর সমান পানি হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাতাসে জলীয় বাষ্প ধারণক্ষমতা বেড়েছে, যার ফলে অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় বা দীর্ঘস্থায়ী নিম্নচাপের মতো চরম আবহাওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এল নিনো বা লা নিনার প্রভাবে যখন খরা হওয়ার কথা, তখনও আমরা অতিবৃষ্টি দেখছি।
দ্বিতীয়ত, আমাদের নিজেদের তৈরি করা মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে আমরা শহরের প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সিস্টেম বা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলেছি। একসময় যেসব জায়গায় জলাশয়, পুকুর বা খাল ছিল, সেগুলো ভরাট করে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন ও রাস্তাঘাট। খোলা জায়গা বা পার্কগুলো কংক্রিটে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি সরাসরি মাটিতে শোষিত হওয়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের চরম অব্যবস্থাপনা ও অসচেতনতা। ঢাকা বা চট্টগ্রাম শহরে প্রতিদিন যে কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়, তার ৫০ শতাংশও ঠিকমতো সংগ্রহ করা হয় না। বাসা-বাড়ি, স্কুল-কলেজ বা বাজারের পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ছে ড্রেন ও খালে। ফলে খাল ও ড্রেনগুলোর পানি বহনের সক্ষমতা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। পানি নিষ্কাশনের এই পথগুলো বছরের পর বছর অবৈধ দখলে ছোট হয়ে গেছে। বর্ষার আগে এগুলো পরিষ্কার করার যে উদ্যোগ নেওয়ার কথা, তা যথাযথভাবে হচ্ছে না। ঢাকা শহরে পাম্প স্টেশন বা চট্টগ্রামে স্লুইস গেট তৈরি হলেও সেগুলোর পুরোপুরি ব্যবহার বা সঠিক ব্যবস্থাপনা আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
গ্রামাঞ্চলেও নদীর তলদেশ পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। যত্রতত্র মাছের ঘের তৈরি করা, অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা বা কালভার্ট নির্মাণ করে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ (ফ্লাড প্লেন) আটকে দেওয়া হচ্ছে। পাহাড়ি অঞ্চলে অবৈধভাবে পাহাড় ও গাছ কাটার ফলে মাটির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ফলে ভারী বৃষ্টি হলেই ভয়াবহ ভূমিধস বা ল্যান্ডস্লাইড হচ্ছে। চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা আমাদের এই নির্মম বাস্তবতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষ পাহাড়ের ঢালে চরম ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে, অথচ এটি প্রতিরোধে প্রশাসনের কঠোরতা দৃশ্যমান নয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের দুর্যোগ পূর্বাভাস বা 'আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম' আরও উন্নত ও কার্যকর করা প্রয়োজন। বর্তমানে তিন থেকে পাঁচ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হলেও, সেটি স্থানভিত্তিক এবং সুনির্দিষ্ট হওয়া জরুরি। বান্দরবানের মতো পর্যটন এলাকায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলে আগে থেকেই পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ করা বা স্থানীয়দের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় আমাদের যেমন একটি শক্তিশালী প্রস্তুতি থাকে, বন্যার ক্ষেত্রেও তেমন শেল্টার বা আশ্রয়কেন্দ্র এবং পূর্বপ্রস্তুতি থাকা অত্যাবশ্যক। বুক সমান পানির মধ্যে স্কুল-কলেজের পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলো প্রমাণ করে যে, দুর্যোগকালে আমাদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা দুর্বল।
বর্তমানে বন্যা দুর্গত এলাকাগুলোতে, বিশেষ করে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অঞ্চলে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। অনেক মানুষ ঘরের টিনের চালে আশ্রয় নিয়ে দিন পার করছে। আমাদের 'স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার (এসওডি)'-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ বিতরণে যে ভূমিকা রাখছে, তা প্রশংসনীয়। তবে শুধু সাময়িক শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি বা স্যালাইন দেওয়াই শেষ কথা নয়। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর শুরু হবে আসল সংগ্রাম। রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ও কৃষির যে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, তা পুষিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে এখন থেকেই স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
সর্বোপরি, এই দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে। নিউমার্কেটের মতো বাণিজ্যিক এলাকায় পানি ঢুকে কোটি কোটি টাকার যে ক্ষতি হচ্ছে, তা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে যে, প্রকৃতিকে বাধাগ্রস্ত করে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। জলাশয় ভরাট, খাল দখল ও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। জোনিং আইন কঠোরভাবে মেনে ল্যান্ড ইউজ প্ল্যানিং করতে হবে।
পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আমাদের জোরালোভাবে কথা বলতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ দায়ী না হলেও, আমরা এর অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী। তাই আইপিসিসি-এর প্রতিবেদন ও 'ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান' অনুযায়ী আন্তর্জাতিক 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড' থেকে আমাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।
১৯৮৮, ১৯৯৮ বা ২০২৪ সালের বন্যায় এদেশের মানুষ যেভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছিল, আজ আবারও সেই সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগের প্রয়োজন। বন্যায় হা-হুতাশ না করে, এখন প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা। নইলে সামনের দিনগুলোতে প্রকৃতির এই রুদ্ররোষ থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে না।
লেখক: পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ; বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট (আইডাব্লিউএফএম)–এর অধ্যাপক
.png)

মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে ছোট্ট একটি গ্যাসসমৃদ্ধ রাষ্ট্রকে বৈশ্বিক কূটনীতি, গণমাধ্যম ও অর্থনীতির অন্যতম প্রভাবশালী শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি। কাতারের আধুনিক রাষ্ট্রপরিচয়ের সঙ্গে যার নাম প্রায় সমার্থক।
৮ ঘণ্টা আগে
ড. সাজ্জাদ জহির অর্থনীতিবিদ এবং গবেষক। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
৮ ঘণ্টা আগে
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু হয়েছিল। সেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সংসদেই ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া হয় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে।
৯ ঘণ্টা আগে
বন্যার সময় মানুষের দুর্ভোগের সঙ্গে গোঁদের ওপর বিষফোঁড়া হিসেবে হাজির হয় পণ্যবাজারের উল্লম্ফন। চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তত সাতটি জেলায় সপ্তাহজুড়ে টানা বৃষ্টি ও বন্যায় এবারও সেই চিত্র ফিরে এসেছে। রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বলা যায়।
৯ ঘণ্টা আগে