জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

নতুন সংসদ: পপুলিজম নয়, চাই কার্যকর আইন প্রণয়ন ও জবাবদিহি

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ১৬: ৪৪
স্ট্রিম কোলাজ

দীর্ঘ ১৬ বছরের আওয়ামী স্বৈরশাসন, জুলাইয়ের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান এবং দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসন শেষে আজ শুরু হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাসে আজকের দিনটির তাৎপর্য অভাবনীয়।

দীর্ঘকাল পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত এই সংসদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই জনমানুষের প্রত্যাশার পারদ এখন আকাশচুম্বী। অতীতের পুঞ্জীভূত সংকট ও সমস্যাগুলো এই সংসদের মাধ্যমেই দূরীভূত হবে—এমনটিই আমাদের বিশ্বাস। তবে এই প্রত্যাশা পূরণে সংসদ, সরকার ও বিরোধী দলকে কিছু সুনির্দিষ্ট জায়গায় দায়িত্বশীলতার প্রমাণ দিতে হবে।

উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো আমাদের সংসদেও নির্বাহী বিভাগ তথা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সার্বক্ষণিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নব্বইয়ের দশক থেকে আমরা দেখে আসছি, সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়নে পর্যাপ্ত সময় বা মনোযোগ দেন না। একটি বিল পাসের আগে যে ধরনের প্রস্তুতি ও পড়াশোনা (হোমওয়ার্ক) থাকা প্রয়োজন, তার তীব্র ঘাটতি থাকে।

সংসদ সদস্যদের স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে হবে যে, তাদের মূল দায়িত্ব দুটি—আইন প্রণয়ন এবং সরকারের কাজের তদারকি করা। কোথায় রাস্তাঘাট খারাপ, কোথায় ট্রাফিক জ্যাম—এগুলো নিয়ে সংসদে অহেতুক হইচই করা সংসদ সদস্যদের কাজ নয়। সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন, নিজের ব্যবসা বা ক্যারিয়ারের দিকে মনোযোগ না দিয়ে তাদের সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বেশি সময় দিতে হবে। নয়তো সংসদ তার কার্যকারিতা হারাবে।

ত্রয়োদশ সংসদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সংসদ নেতা (প্রধানমন্ত্রী) থেকে শুরু করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপসহ এর অধিকাংশ সদস্যই একেবারেই নতুন। তাই সংসদীয় বিতর্ক ও সংসদীয় কমিটির কার্যক্রমে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখার জন্য তাদের প্রচুর অধ্যয়ন প্রয়োজন। সংবিধান, কার্যপ্রণালি বিধি এবং আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাদের সম্যক ধারণা থাকতে হবে। এ জন্য নতুন সংসদ সদস্যদের অতি দ্রুত সংসদীয় রীতিনীতির ওপর প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

সংসদ সদস্যদের স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে হবে যে, তাদের মূল দায়িত্ব দুটি—আইন প্রণয়ন এবং সরকারের কাজের তদারকি করা। কোথায় রাস্তাঘাট খারাপ, কোথায় ট্রাফিক জ্যাম—এগুলো নিয়ে সংসদে অহেতুক হইচই করা সংসদ সদস্যদের কাজ নয়। তাদের সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বেশি সময় দিতে হবে, নয়তো সংসদ তার কার্যকারিতা হারাবে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রথমত, ধুকতে থাকা ব্যাংকিং খাতে কঠোরভাবে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতের মতো বড় জায়গাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম দূর করে কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা দরকার। এর পাশাপাশি সবচেয়ে জরুরি হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ‘মব জাস্টিস’-এর নামে যে ব্যক্তিগত আক্রোশ বা প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, নির্বাহী বিভাগকে তা শক্ত হাতে দমন করতে হবে।

আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই নির্বাচনে বিরোধী দলের আসনে প্রথমবারের মতো বসেছে জামায়াতে ইসলামী। সংসদে অন্য দলগুলোর উপস্থিতি থাকলেও তাদের ভূমিকা খুব বেশি নির্ণায়ক হওয়ার সুযোগ কম। তাই প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সরকারের প্রতিটি কর্মকাণ্ড ও নীতি যথাযথভাবে তদারকি করার মূল দায়িত্বটি এখন জামায়াতে ইসলামীর কাঁধেই।

বিরোধীদলীয় নেতাসহ দলটির প্রতিটি সদস্যকে নিয়মিত সংসদে উপস্থিত থেকে গঠনমূলক সমালোচনা ও বিকল্প নীতি প্রস্তাবের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের শূন্যতা পূরণ করতে হবে।

আমরা দীর্ঘ একটি স্বৈরাচারী শাসনকাল পার করে এসেছি। ভবিষ্যতে যেন কোনো স্বৈরাচারের জন্ম না হয়, সেজন্য কেবল আইন দিয়ে কাজ হবে না; প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতার সংস্কার। ব্রিটেনের সংসদীয় ব্যবস্থা সে দেশে চমৎকার কাজ করলেও আমাদের দেশে করে না। এর মূল কারণ, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব। কোনো রাজনৈতিক দল যদি ব্যক্তিসম্পত্তিতে পরিণত হয়, তবে সেখানে স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবেই। তাই দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করা ছাড়া স্বৈরাচার দমন অসম্ভব।

বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের অনেকগুলো কাজ ও অধ্যাদেশ রেখে গেছে। নির্বাচিত নতুন সরকারকে এই নীতি ও অধ্যাদেশগুলো সরাসরি বা অন্ধভাবে গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। সংসদে আলোচনার মাধ্যমে এগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। যেসব অধ্যাদেশ অপ্রয়োজনীয়, সেগুলো এমনিতেই বাতিল হয়ে যাবে; আর যেগুলো বিতর্কিত, সেগুলোকে বাদ দিতে হবে। সরকারকে নিজস্ব ম্যান্ডেট ও চিন্তাধারায় দেশ পরিচালনা করতে হবে, তবে তা হতে হবে যৌক্তিক আলোচনার ভিত্তিতে।

দীর্ঘদিন পর দেশের মানুষ অত্যন্ত আনন্দ ও স্বস্তির সঙ্গে একটি প্রকৃত সংসদের অধিবেশন দেখছেন। আজকের অধিবেশনে যে গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ দেখা গেছে, আগামী দিনগুলোতেও তা অব্যাহত থাকলে তা বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক রূপান্তর হিসেবে বিবেচিত হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ হয়ে উঠুক জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনার এক অনন্য কেন্দ্রবিন্দু।

লেখক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক

সম্পর্কিত