ড. মো. আবু সালেহ

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্টের উত্থান এবং ২০১১ সালে তৃণমূলের ক্ষমতা দখলের পর এই ফলাফল বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে তৃতীয় বড় বাঁক। পনেরো বছরের তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি প্রথমবারের মতো নবান্ন দখল করেছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি সব সময়ই নিজস্ব ধারায় চলেছে। এই রাজ্যে একবার ক্ষমতা পেলে দলগুলো দীর্ঘদিন টিকে থাকে, বামফ্রন্ট টানা ৩৪ বছর শাসন করেছে। কিন্তু ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্বের সাথে সাথে আসে অবক্ষয়, দুর্নীতি এবং অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি ইস্যু। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিক এই অ্যান্টি-ইনকামবেন্সিকে ব্যবহার করে বামফ্রন্টকে উচ্ছেদ করেছিলেন। ২০২৬ সালে সেই ইতিহাস আবার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। বিজেপির এই বিজয় কেবল একটি নির্বাচনী জয় নয়। এটি বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক এপিস্টেম বা চিন্তা কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
হিন্দু ভোটের ঐতিহাসিক একত্রীকরণ
পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জনসংখ্যা প্রায় ৭০ শতাংশ হলেও এই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনো একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়নি। বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি ঐতিহাসিকভাবে শ্রেণি, ভাষা ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক ছিল, ধর্মীয় পরিচয় এখানে ভোটের প্রধান নির্ধারক ছিল না। বামফ্রন্টের তিন দশকের শাসনে হিন্দু কৃষক, হিন্দু শ্রমিক, হিন্দু বুদ্ধিজীবী, সবাই একই লাল পতাকার নিচে ভোট দিয়েছেন। তৃণমূলের আমলেও এই বিভাজন অব্যাহত ছিল। ২০২৬ সালে এই সমীকরণ আমূল বদলে গেছে। তবে এই পরিবর্তন হঠাৎ আসেনি। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি, সুচিন্তিত এবং বহুস্তরীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল।
প্রথম স্তর
সাংস্কৃতিক রাজনীতির নতুন অধ্যায় তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। বিজেপির সবচেয়ে চতুর কৌশল ছিল ধর্মীয় উৎসবকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করা এবং এটি করা হয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে। রামনবমীর রাজনীতি এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দশ বছর আগেও পশ্চিমবঙ্গে রামনবমীর মিছিল এতটা দৃশ্যমান ছিল না। বিজেপি এই উৎসবকে একটি শক্তিপ্রদর্শনের মঞ্চ করে তুলেছে। অস্ত্রসহ মিছিল, লাউডস্পিকারে জয়ধ্বনি, পথে পথে তোরণ, এই দৃশ্যমানতা হিন্দু ভোটারের মধ্যে একটি বার্তা দিয়েছে, ‘আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, আমাদের কণ্ঠস্বর আছে।’
দুর্গাপূজার রাজনীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূল সরকার দুর্গাপূজা কমিটিগুলোকে ভর্তুকি দিত এবং পূজাকে নিজেদের রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ করেছিল। বিজেপি এই ধারায় প্রতিযোগিতা না করে পূজাকে একটি হিন্দু সাংস্কৃতিক গর্বের প্রতীক হিসেবে পুনর্নির্মাণ করেছে। ‘আমাদের পূজা, আমাদের উৎসব’ এই ন্যারেটিভ তৃণমূলের 'ব্র্যান্ডেড পূজা’র বিপরীতে অনেক বেশি আবেগী আবেদন তৈরি করেছে।
এছাড়া হনুমান জয়ন্তী, কালীপূজা, সরস্বতী পূজা প্রতিটি হিন্দু উৎসবে বিজেপির সক্রিয় উপস্থিতি একটি ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক উপস্থিতি তৈরি করেছে, যা দলটিকে হিন্দু জীবনযাত্রার স্বাভাবিক অংশ করে তুলেছে।
দ্বিতীয় স্তর
'বাঙালি হিন্দু' বনাম 'হিন্দু ভারতীয়' পরিচয়ের নতুন সংজ্ঞা প্রদান করেছে। এটি ছিল বিজেপির সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। বাংলার হিন্দু ভোটারের মধ্যে একটি শক্তিশালী বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়বোধ আছে; রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মাছ-ভাত, বাংলা সাহিত্য। তৃণমূল ও বামপন্থীরা সব সময় এই পরিচয়কে ব্যবহার করে বিজেপিকে "হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান" দলের তকমা দিয়েছে।
বিজেপি এই ফাঁদ এড়িয়েছে একটি চতুর দ্বৈত কৌশলে। একদিকে স্থানীয় নেতৃত্বকে সামনে রেখেছে। শুভেন্দু অধিকারী, দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার, এরা সবাই বাঙালি, বাংলায় কথা বলেন, বাংলার মাটির মানুষ। অন্যদিকে বার্তা দিয়েছে যে বাঙালি হওয়া এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী হওয়া পরস্পরবিরোধী নয়। রবীন্দ্রনাথও হিন্দু ছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্রের 'বন্দে মাতরম' হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতীক, এই ঐতিহাসিক যুক্তি বাংলার হিন্দু মধ্যবিত্তের কাছে কার্যকর হয়েছে।
তৃতীয় স্তর
বঞ্চনার রাজনীতি 'আমরা কি কম পাচ্ছি?' এই ধারণাকে উসকে দিয়েছে। তৃণমূল সরকারের কিছু নীতি হিন্দু ভোটারদের মধ্যে বঞ্চনার একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি তৈরি করেছিল। ইমামদের ভাতা একটি প্রতীকী ইস্যু হয়ে উঠেছিল। ২০১২ সালে তৃণমূল সরকার রাজ্যের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানি প্রদান শুরু করে। এর পাল্টা হিন্দু পুরোহিতদের জন্য কোনো সমতুল্য ব্যবস্থা না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে "মন্দিরের পুরোহিত কি রাষ্ট্রের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ?" বিজেপি এই প্রশ্নকে ভোটের আবেদনে পরিণত করেছে। রাজ্যের সরকারি মাদ্রাসাগুলো পর্যাপ্ত অনুদান পেলেও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃত টোলগুলো অবহেলিত ছিল। হিন্দু সংগঠনগুলো এই বৈষম্যকে দীর্ঘদিন প্রচার করে এসেছে। ঈদে রাস্তা বন্ধ, কিন্তু রথযাত্রায় বাধা, এই ধরনের স্থানীয় ঘটনাগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে এবং হিন্দু ভোটারের মধ্যে ‘আমাদের ধর্ম নিরাপদ নেই’ — এই আশঙ্কা তৈরি করেছে।
চতুর্থ স্তর
বিজেপির হিন্দু ভোট একত্রীকরণে ডিজিটাল প্রচারণা একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে ছড়ানো বার্তা, ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিও, ইউটিউবে ধর্মীয় বক্তব্য, এই ডিজিটাল প্রচারণা হিন্দু পরিচয়ের রাজনীতিকে গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শহরের মধ্যবিত্ত পরিবার পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ‘হিন্দু বিপদে আছে’ ন্যারেটিভ। বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের ন্যারেটিভ, সীমান্তবর্তী এলাকায় সাম্প্রদায়িক ঘটনার প্রচার, এগুলো বাংলার হিন্দু ভোটারের মধ্যে একটি অস্তিত্বের সংকটবোধ তৈরি করেছে। এই মনোভাবকে ভোটে রূপান্তরিত করতে বিজেপি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।
পঞ্চম স্তর
হিন্দু ভোটের একত্রীকরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাতিভেদ প্রথার বিভাজন অতিক্রম করা। ঐতিহাসিকভাবে বাংলায় উচ্চবর্ণের হিন্দু এবং তফশিলি হিন্দু, এই দুই গোষ্ঠী আলাদাভাবে ভোট দিত। বামপন্থীরা তফশিলি ভোট পেত, উচ্চবর্ণ ছিল কংগ্রেস বা তৃণমূলমুখী।
বিজেপি এই বিভাজন ভেঙেছে মতুয়া সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে। নমশূদ্র সম্প্রদায়ের বিশাল অংশ, যারা দেশভাগের পর বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তু, এরা নাগরিকত্বের প্রশ্নে বিজেপির কাছে প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এই জনগোষ্ঠীর কাছে একটি ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির পূরণ হিসেবে দেখা গেছে। রাজবংশী, কোচ এবং অন্যান্য তফশিলি হিন্দু সম্প্রদায়গুলোও বিজেপির এই হিন্দু ঐক্যের বয়ানে সাড়া দিয়েছে। বিজেপি যা করেছে তা হলো ৭০ শতাংশ হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন অসন্তোষ, আশঙ্কা, বঞ্চনা এবং পরিচয়বোধকে একটি সুসংহত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা। ধর্মীয় উৎসব, সোশ্যাল মিডিয়া, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রীয় বয়ানের সমন্বয়ে তারা প্রমাণ করেছে, সংখ্যা মানেই শক্তি নয়, কিন্তু সংগঠিত সংখ্যাই আসল শক্তি।
তফশিলি ও উপজাতি ভোটের বিপ্লব
পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭-৩০ শতাংশ তফশিলি জাতি ও উপজাতি। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী ও আদিবাসী সমাজ থেকে শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গলমহল (পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম) এই বিস্তীর্ণ বলয়টি একসময় বামফ্রন্ট এবং পরে তৃণমূলের শক্তিশালী দুর্গ ছিল। ২০২৬-এর নির্বাচনে এই বলয়টি প্রায় সম্পূর্ণভাবে গেরুয়া শিবিরে রূপান্তরিত হয়েছে। এটি কেবল রাজনৈতিক স্থানান্তর নয়, এটি একটি ভৌগোলিক বিদ্রোহ, যেখানে প্রান্তিক অঞ্চলগুলো নবান্নের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে নিজেদের রায় দিয়েছে।
তৃণমূলের রাজনীতি মূলত প্রত্যক্ষ সুবিধা প্রদান বা 'ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার' এর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ বা ‘স্বাস্থ্যসাথী’র মতো প্রকল্পগুলো সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট কিছুটা দূর করলেও, তা ছিল মূলত 'দয়া' বা 'সহায়তা'নির্ভর।
তফশিলি ও আদিবাসী সমাজ কেবল অর্থ চায়নি, তারা চেয়েছিল রাজনৈতিক অংশীদারত্ব এবং সামাজিক সম্মান। তৃণমূলের নেতৃত্ব কাঠামোতে দীর্ঘ সময় ধরে ‘ভদ্রলোক’ বা উচ্চবর্ণের আধিপত্য বজায় থাকায় এই প্রান্তিক মানুষগুলো নিজেদের অবহেলিত মনে করেছে। বিজেপি তাদের মধ্যে এই বোধটি জাগিয়ে তুলতে পেরেছে যে, তারা কেবল সরকারি সুবিধার বেনিফিশিয়ারি নয়, তারা এই রাজ্যের ‘নির্ণায়ক শক্তি’।
বিজেপির জয়ের পেছনে কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচি ‘পিএম জনজাতি আদিবাসী ন্যায় মহাঅভিযান' কর্মসূচিটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে জঙ্গলমহল ও উত্তরবঙ্গের দুর্গম এলাকার আদিবাসী পরিবারগুলো পাকা বাড়ি, পরিচ্ছন্ন পানীয় জল, বিদ্যুৎ এবং উন্নত সড়ক ব্যবস্থার মতো মৌলিক পরিকাঠামো পেয়েছে। এটি প্রান্তিক ভোটারদের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি করেছে যে, দিল্লি তাদের কথা শুনছে।
বিজেপি অত্যন্ত সুকৌশলে তফশিলি ও আদিবাসী সংস্কৃতিকে হিন্দুত্বের বৃহত্তর কাঠামোর সাথে যুক্ত করতে পেরেছে। উত্তরবঙ্গে রাজবংশী নেতা বা জঙ্গলমহলে আদিবাসী বীরদের (যেমন বিরসা মুণ্ডা) প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের মাধ্যমে তারা এই জনগোষ্ঠীর 'সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা'র গ্যারান্টি দিয়েছে। অন্যদিকে, তৃণমূলের রাজনীতি অনেক সময় সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ায়, তফশিলি ও উপজাতিদের একাংশ মনে করেছে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয় সংকটের মুখে। এই নিরাপত্তাহীনতাই তাদের বিজেপির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবেই কলকাতা-কেন্দ্রিক 'ভদ্রলোক' বা উচ্চবর্ণের বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বাম আমল থেকে তৃণমূল আমল পর্যন্ত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব ছিল সীমিত। বিজেপির সংগঠন নিচুতলার এই মানুষগুলোকে নেতৃত্বের সামনের সারিতে নিয়ে এসেছে (যেমন—বিজেপির টিকিটে অনেক ভূমিপুত্র ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জয়)। এই প্রতিনিধিত্বের গণতন্ত্র তৃণমূলের পতনকে ত্বরান্বিত করেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও সাধারণ মানুষের বিচ্ছিন্নতা
তৃণমূলের পতনের সবচেয়ে গভীর কারণ হলো দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, যেখানে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে নিয়োগ হয়েছে বলে অভিযোগ, সেটি শুধু চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষুব্ধ করেনি, তাদের পরিবার ও সমাজকেও বিক্ষুব্ধ করেছে। স্থানীয় স্তরে 'কাট মানি' সংস্কৃতি, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতেও তৃণমূলের ক্যাডারকে ঘুষ দেওয়ার এই অভিজ্ঞতা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল।
হাবেরমাসের পাবলিক স্ফেয়ার তত্ত্বের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, তৃণমূলের ক্যাডার-ভিত্তিক শাসন বাংলার মুক্ত নাগরিক আলোচনার পরিসরকে সংকুচিত করে রেখেছিল। বিরোধী মত প্রকাশে ভয়, সাংবাদিকতায় চাপ এই পরিবেশ অসন্তোষকে ভেতরে ভেতরে জমতে দিয়েছে। নির্বাচন সেই দমিত কণ্ঠস্বরগুলোকে একসাথে বেরিয়ে আসার সুযোগ দিয়েছে।
আর জি কর কাণ্ড ও নাগরিক সমাজের জাগরণ
২০২৪ সালের আগস্টে আর জি কর মেডিকেল কলেজে একজন তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা বাংলার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। কলকাতার রাস্তায় মধ্যরাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ নেমে এসেছিলেন। বিক্ষোভ শুধু কলকাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এই আন্দোলন শুধু ন্যায়বিচারের দাবিতে ছিল না। এটি ছিল তৃণমূলের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি সামাজিক রায়। হাসপাতালে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়ায় অসংবেদনশীলতার অভিযোগ, এগুলো মিলিয়ে এক বিশাল মধ্যবিত্ত অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সেই অসন্তোষ ব্যালট বাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে।
ডাবল-ইঞ্জিন তত্ত্ব ও কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সরাসরি প্রভাব
বিজেপির জয়ের আরেকটি বড় কারণ হলো কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সরাসরি সুবিধাভোগীদের ভোট। উজ্জ্বলা যোজনার বিনামূল্যে গ্যাস সংযোগ, আয়ুষ্মান ভারত-এর স্বাস্থ্যবিমা, পিএম আবাস যোজনার গৃহনির্মাণ সহায়তা, এই প্রকল্পগুলোর সুবিধা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে গেছে। কোনো তৃণমূল মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন হয়নি।
'ডাবল-ইঞ্জিন' স্লোগান অর্থাৎ কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার, এই যুক্তিকে সরলভাবে উপস্থাপন করেছে। রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে, এই বার্তা গ্রামের ভোটারদের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে গেছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন ও বুথ ব্যবস্থাপনায় সাংগঠনিক দক্ষতা
স্পেশাল ইনটেন্সিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা সংশোধন নির্বাচনের আগে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়েছিল। প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম কর্তনের অভিযোগ উঠেছিল, তৃণমূলের দাবি ছিল এটি তাদের ভোটারদের টার্গেট করা হয়েছে। বুথ ব্যবস্থাপনায় বিজেপির দক্ষতাও ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি বুথে নিবেদিত কর্মী, ভোটারদের পোলিং বুথ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা, এবং ভোটের আগে প্রতিটি পরিবারের সাথে যোগাযোগ, এই সূক্ষ্ম সাংগঠনিক কাজ তৃণমূলের অনেক এলাকায় বিজেপিকে এগিয়ে দিয়েছে।
বিজেপির জয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকাও অস্বীকার করা যাবে না। শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলের একদা বিশ্বস্ত নেতা, তাঁর দলবদল এবং পরে নন্দীগ্রাম থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানো ২০২১ সালেই বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছিল। ২০২৬ সালে শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরে মমতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এবং জিতেছেন। এই প্রতীকী বিজয় বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। মমতার নিজের রাজনৈতিক দুর্গে এই পরাজয় পুরো নির্বাচনের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত।
সংখ্যালঘু ভোটের বিভাজন
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতার অন্যতম স্তম্ভ ছিল তাদের একচেটিয়া সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই 'অটল' দুর্গে বড় ধরনের ফাটল লক্ষ করা গেছে, যা দলটির পরাজয়ের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে মালদহ ও মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলোয়, যেখানে সংখ্যালঘু ভোটাররা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেন, সেখানে তৃণমূলের একক আধিপত্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
এই ভোট বিভাজনের পেছনে প্রথম ও প্রধান কারণ হলো তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও দুর্নীতি। আবাস যোজনা, ১০০ দিনের কাজ এবং বিশেষ করে নিয়োগ দুর্নীতির প্রভাব গ্রামীণ সংখ্যালঘু সমাজের শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছিল। সাধারণ মানুষ দেখেছেন যে, উন্নয়নের সুবিধা প্রকৃত অভাবীর চেয়ে শাসকদলের ঘনিষ্ঠদের কাছে বেশি পৌঁছাচ্ছে। এই বঞ্চনাবোধ থেকে তৈরি হওয়া ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ বা সরকারবিরোধী মনোভাব তৃণমূলকে তাদের নিরাপদ ভোটব্যাংক থেকে বিচ্যুত করেছে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বিকল্পের সন্ধান। একসময় মনে করা হতো বিজেপিকে রুখতে তৃণমূলই একমাত্র শক্তি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বামপন্থী ও কংগ্রেস জোটের কিছুটা পুনরুজ্জীবন এবং ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট এর মতো দলগুলোর সক্রিয়তা সংখ্যালঘু ভোটারদের সামনে নতুন বিকল্প তৈরি করে দিয়েছে। মুসলমান ভোটাররা আর কেবল ‘বিজেপির ভয়’ থেকে তৃণমূলকে ভোট দেওয়ার চিরাচরিত কৌশল অনুসরণ না করে, স্থানীয় উন্নয়ন ও স্বচ্ছতার নিরিখে ভোট ভাগ করে দিয়েছেন। ফলে ভোট কাটাকাটির সমীকরণে তৃণমূলের শক্তিক্ষয় হয়েছে এবং অনেক আসনে বিজেপির জয়ের পথ প্রশস্ত হয়েছে। এই বিভাজন প্রমাণ করেছে যে, সংখ্যালঘু ভোটাররা এখন আর কোনো নির্দিষ্ট দলের ‘বাঁধা’ সম্পদ নন, বরং তারা অনেক বেশি বিচারশীল ও দাবিদাওয়ার প্রশ্নে আপসহীন।
মেরুকরণের নতুন বিন্যাস ও পরিচয়ের রাজনীতি
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে রাজনৈতিক মেরুকরণের যে নতুন বিন্যাস দেখা গেছে, তা মূলত দুটি বিপরীতধর্মী পরিচয়সত্তার সংঘাত। তৃণমূল কংগ্রেস ‘বাঙালি অস্মিতা’কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ বা ‘হিন্দি বলয়ের দল’ হিসেবে চিত্রিত করতে চেয়েছিল। তাদের রাজনৈতিক বয়ান ছিল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এবং বাঙালির উদারবাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু এই কৌশলটি এবার ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, বাংলার হিন্দু ভোটারদের একটি বিশাল অংশ তাঁদের ‘বাঙালি’ পরিচয় এবং ‘হিন্দু ভারতীয়’ পরিচয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ খুঁজে পাননি। বরং তাঁরা নিজেদের সাংস্কৃতিক শেকড় এবং ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে একই সমান্তরালে মেলাতে পেরেছেন, যা বিজেপির রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে ত্বরান্বিত করেছে।
এই পরিবর্তনের গভীরতা বুঝতে মিশেল ফুকো ও আন্তোনিও গ্রামসির তাত্ত্বিক কাঠামো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ফুকোর ‘গভর্নমেন্টালিটি’ তত্ত্ব অনুযায়ী, তৃণমূলের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো (লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী) মানুষকে রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছিল। এই ‘জনমোহিনী রাজনীতি’ সাময়িকভাবে দারিদ্র্য বিমোচন করলেও মানুষের বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষা; যেমন মানসম্পন্ন শিক্ষা, বৃহৎ শিল্পায়ন এবং স্থায়ী কর্মসংস্থান পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের উত্তর না থাকায় মানুষ কেবল ‘নির্ভরশীলতা’ নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের পথ বেছে নিয়েছে।
অন্যদিকে, গ্রামসির ‘হেজেমনি’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের তত্ত্ব অনুযায়ী, বিজেপি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলে আসা বাম ও তৃণমূলী রাজনৈতিক বয়ানকে সফলভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে। তারা হিন্দু ধর্মীয় উৎসবের সামাজিকীকরণ, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং উন্নয়নের এক নতুন ‘সাংস্কৃতিক আখ্যান’ তৈরি করেছে। এই নতুন বয়ানটি তৃণমূলের তৈরি করা ‘আঞ্চলিক অস্মিতা’র গণ্ডি ভেঙে একটি শক্তিশালী বিকল্প আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। মূলত পুরনো রাজনৈতিক হেজেমনি ভেঙে গিয়ে এক নতুন জাতীয়তাবাদী ও উন্নয়নমুখী চেতনার জয়জয়কারই এই নির্বাচনের মূল নির্যাস।
বিজেপির আগামীর চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
বিজেপির এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর নতুন সরকারের সামনে এখন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ ও অগ্নিপরীক্ষা। বাংলার মতো একটি জটিল ও বহুমাত্রিক রাজ্যে শাসনভার গ্রহণ করা যেমন সম্মানের, তেমনি তা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। নতুন সরকারের প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার সংকট দূর করা। নির্বাচনের তীব্র মেরুকরণ এবং উত্তর-নির্বাচনী সহিংসতার প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা দূর করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখাই হবে প্রকৃত সুশাসনের প্রথম পরিচয়। শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নয়নের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ। তৃণমূলের পতন মূলত ঘটেছে কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদী অভাবের কারণে। তাই বিজেপিকে কেবল ‘ডাবল-ইঞ্জিন’ সরকারের স্লোগান দিলে চলবে না; বরং বাস্তবে বৃহৎ শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। মানুষ যদি দ্রুত পরিবর্তনের ছোঁয়া না পায়, তবে ২০২৬ সালের এই প্রবল জনজোয়ার খুব শীঘ্রই পরবর্তী নির্বাচনের ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ বা সরকারবিরোধী ঢেউয়ে পরিণত হতে পারে।
জাতীয় রাজনীতিতেও এই ফলাফলের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি লোকসভা আসন এখন বিজেপির প্রধান শক্তিতে পরিণত হওয়ায় ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ কে তাদের কৌশল সম্পূর্ণ নতুন করে সাজাতে হবে। এছাড়া, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এটি একটি নতুন মোড়। সীমান্ত সুরক্ষা, তিস্তা পানি বণ্টন এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের নতুন নেতৃত্বের ভূমিকা দিল্লির পররাষ্ট্রনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাবে। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষী, মানুষ যেমন দুহাত ভরে আশীর্বাদ করতে জানে, মৌলিক আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হলে তেমনি নির্মমভাবে প্রত্যাখ্যান করতেও দ্বিধা করে না। তাই বিজেপির প্রকৃত পরীক্ষা কেবল জয়লাভেই শেষ নয়, বরং কার্যকর শাসনের মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস ধরে রাখার মধ্যেই নিহিত।
লেখক: শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্টের উত্থান এবং ২০১১ সালে তৃণমূলের ক্ষমতা দখলের পর এই ফলাফল বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে তৃতীয় বড় বাঁক। পনেরো বছরের তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি প্রথমবারের মতো নবান্ন দখল করেছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি সব সময়ই নিজস্ব ধারায় চলেছে। এই রাজ্যে একবার ক্ষমতা পেলে দলগুলো দীর্ঘদিন টিকে থাকে, বামফ্রন্ট টানা ৩৪ বছর শাসন করেছে। কিন্তু ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্বের সাথে সাথে আসে অবক্ষয়, দুর্নীতি এবং অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি ইস্যু। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিক এই অ্যান্টি-ইনকামবেন্সিকে ব্যবহার করে বামফ্রন্টকে উচ্ছেদ করেছিলেন। ২০২৬ সালে সেই ইতিহাস আবার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। বিজেপির এই বিজয় কেবল একটি নির্বাচনী জয় নয়। এটি বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক এপিস্টেম বা চিন্তা কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
হিন্দু ভোটের ঐতিহাসিক একত্রীকরণ
পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জনসংখ্যা প্রায় ৭০ শতাংশ হলেও এই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনো একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়নি। বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি ঐতিহাসিকভাবে শ্রেণি, ভাষা ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক ছিল, ধর্মীয় পরিচয় এখানে ভোটের প্রধান নির্ধারক ছিল না। বামফ্রন্টের তিন দশকের শাসনে হিন্দু কৃষক, হিন্দু শ্রমিক, হিন্দু বুদ্ধিজীবী, সবাই একই লাল পতাকার নিচে ভোট দিয়েছেন। তৃণমূলের আমলেও এই বিভাজন অব্যাহত ছিল। ২০২৬ সালে এই সমীকরণ আমূল বদলে গেছে। তবে এই পরিবর্তন হঠাৎ আসেনি। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি, সুচিন্তিত এবং বহুস্তরীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল।
প্রথম স্তর
সাংস্কৃতিক রাজনীতির নতুন অধ্যায় তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। বিজেপির সবচেয়ে চতুর কৌশল ছিল ধর্মীয় উৎসবকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করা এবং এটি করা হয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে। রামনবমীর রাজনীতি এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দশ বছর আগেও পশ্চিমবঙ্গে রামনবমীর মিছিল এতটা দৃশ্যমান ছিল না। বিজেপি এই উৎসবকে একটি শক্তিপ্রদর্শনের মঞ্চ করে তুলেছে। অস্ত্রসহ মিছিল, লাউডস্পিকারে জয়ধ্বনি, পথে পথে তোরণ, এই দৃশ্যমানতা হিন্দু ভোটারের মধ্যে একটি বার্তা দিয়েছে, ‘আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, আমাদের কণ্ঠস্বর আছে।’
দুর্গাপূজার রাজনীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূল সরকার দুর্গাপূজা কমিটিগুলোকে ভর্তুকি দিত এবং পূজাকে নিজেদের রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ করেছিল। বিজেপি এই ধারায় প্রতিযোগিতা না করে পূজাকে একটি হিন্দু সাংস্কৃতিক গর্বের প্রতীক হিসেবে পুনর্নির্মাণ করেছে। ‘আমাদের পূজা, আমাদের উৎসব’ এই ন্যারেটিভ তৃণমূলের 'ব্র্যান্ডেড পূজা’র বিপরীতে অনেক বেশি আবেগী আবেদন তৈরি করেছে।
এছাড়া হনুমান জয়ন্তী, কালীপূজা, সরস্বতী পূজা প্রতিটি হিন্দু উৎসবে বিজেপির সক্রিয় উপস্থিতি একটি ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক উপস্থিতি তৈরি করেছে, যা দলটিকে হিন্দু জীবনযাত্রার স্বাভাবিক অংশ করে তুলেছে।
দ্বিতীয় স্তর
'বাঙালি হিন্দু' বনাম 'হিন্দু ভারতীয়' পরিচয়ের নতুন সংজ্ঞা প্রদান করেছে। এটি ছিল বিজেপির সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। বাংলার হিন্দু ভোটারের মধ্যে একটি শক্তিশালী বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়বোধ আছে; রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মাছ-ভাত, বাংলা সাহিত্য। তৃণমূল ও বামপন্থীরা সব সময় এই পরিচয়কে ব্যবহার করে বিজেপিকে "হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান" দলের তকমা দিয়েছে।
বিজেপি এই ফাঁদ এড়িয়েছে একটি চতুর দ্বৈত কৌশলে। একদিকে স্থানীয় নেতৃত্বকে সামনে রেখেছে। শুভেন্দু অধিকারী, দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার, এরা সবাই বাঙালি, বাংলায় কথা বলেন, বাংলার মাটির মানুষ। অন্যদিকে বার্তা দিয়েছে যে বাঙালি হওয়া এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী হওয়া পরস্পরবিরোধী নয়। রবীন্দ্রনাথও হিন্দু ছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্রের 'বন্দে মাতরম' হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতীক, এই ঐতিহাসিক যুক্তি বাংলার হিন্দু মধ্যবিত্তের কাছে কার্যকর হয়েছে।
তৃতীয় স্তর
বঞ্চনার রাজনীতি 'আমরা কি কম পাচ্ছি?' এই ধারণাকে উসকে দিয়েছে। তৃণমূল সরকারের কিছু নীতি হিন্দু ভোটারদের মধ্যে বঞ্চনার একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি তৈরি করেছিল। ইমামদের ভাতা একটি প্রতীকী ইস্যু হয়ে উঠেছিল। ২০১২ সালে তৃণমূল সরকার রাজ্যের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানি প্রদান শুরু করে। এর পাল্টা হিন্দু পুরোহিতদের জন্য কোনো সমতুল্য ব্যবস্থা না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে "মন্দিরের পুরোহিত কি রাষ্ট্রের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ?" বিজেপি এই প্রশ্নকে ভোটের আবেদনে পরিণত করেছে। রাজ্যের সরকারি মাদ্রাসাগুলো পর্যাপ্ত অনুদান পেলেও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃত টোলগুলো অবহেলিত ছিল। হিন্দু সংগঠনগুলো এই বৈষম্যকে দীর্ঘদিন প্রচার করে এসেছে। ঈদে রাস্তা বন্ধ, কিন্তু রথযাত্রায় বাধা, এই ধরনের স্থানীয় ঘটনাগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে এবং হিন্দু ভোটারের মধ্যে ‘আমাদের ধর্ম নিরাপদ নেই’ — এই আশঙ্কা তৈরি করেছে।
চতুর্থ স্তর
বিজেপির হিন্দু ভোট একত্রীকরণে ডিজিটাল প্রচারণা একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে ছড়ানো বার্তা, ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিও, ইউটিউবে ধর্মীয় বক্তব্য, এই ডিজিটাল প্রচারণা হিন্দু পরিচয়ের রাজনীতিকে গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শহরের মধ্যবিত্ত পরিবার পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ‘হিন্দু বিপদে আছে’ ন্যারেটিভ। বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের ন্যারেটিভ, সীমান্তবর্তী এলাকায় সাম্প্রদায়িক ঘটনার প্রচার, এগুলো বাংলার হিন্দু ভোটারের মধ্যে একটি অস্তিত্বের সংকটবোধ তৈরি করেছে। এই মনোভাবকে ভোটে রূপান্তরিত করতে বিজেপি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।
পঞ্চম স্তর
হিন্দু ভোটের একত্রীকরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাতিভেদ প্রথার বিভাজন অতিক্রম করা। ঐতিহাসিকভাবে বাংলায় উচ্চবর্ণের হিন্দু এবং তফশিলি হিন্দু, এই দুই গোষ্ঠী আলাদাভাবে ভোট দিত। বামপন্থীরা তফশিলি ভোট পেত, উচ্চবর্ণ ছিল কংগ্রেস বা তৃণমূলমুখী।
বিজেপি এই বিভাজন ভেঙেছে মতুয়া সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে। নমশূদ্র সম্প্রদায়ের বিশাল অংশ, যারা দেশভাগের পর বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তু, এরা নাগরিকত্বের প্রশ্নে বিজেপির কাছে প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এই জনগোষ্ঠীর কাছে একটি ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির পূরণ হিসেবে দেখা গেছে। রাজবংশী, কোচ এবং অন্যান্য তফশিলি হিন্দু সম্প্রদায়গুলোও বিজেপির এই হিন্দু ঐক্যের বয়ানে সাড়া দিয়েছে। বিজেপি যা করেছে তা হলো ৭০ শতাংশ হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন অসন্তোষ, আশঙ্কা, বঞ্চনা এবং পরিচয়বোধকে একটি সুসংহত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা। ধর্মীয় উৎসব, সোশ্যাল মিডিয়া, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রীয় বয়ানের সমন্বয়ে তারা প্রমাণ করেছে, সংখ্যা মানেই শক্তি নয়, কিন্তু সংগঠিত সংখ্যাই আসল শক্তি।
তফশিলি ও উপজাতি ভোটের বিপ্লব
পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭-৩০ শতাংশ তফশিলি জাতি ও উপজাতি। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী ও আদিবাসী সমাজ থেকে শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গলমহল (পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম) এই বিস্তীর্ণ বলয়টি একসময় বামফ্রন্ট এবং পরে তৃণমূলের শক্তিশালী দুর্গ ছিল। ২০২৬-এর নির্বাচনে এই বলয়টি প্রায় সম্পূর্ণভাবে গেরুয়া শিবিরে রূপান্তরিত হয়েছে। এটি কেবল রাজনৈতিক স্থানান্তর নয়, এটি একটি ভৌগোলিক বিদ্রোহ, যেখানে প্রান্তিক অঞ্চলগুলো নবান্নের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে নিজেদের রায় দিয়েছে।
তৃণমূলের রাজনীতি মূলত প্রত্যক্ষ সুবিধা প্রদান বা 'ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার' এর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ বা ‘স্বাস্থ্যসাথী’র মতো প্রকল্পগুলো সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট কিছুটা দূর করলেও, তা ছিল মূলত 'দয়া' বা 'সহায়তা'নির্ভর।
তফশিলি ও আদিবাসী সমাজ কেবল অর্থ চায়নি, তারা চেয়েছিল রাজনৈতিক অংশীদারত্ব এবং সামাজিক সম্মান। তৃণমূলের নেতৃত্ব কাঠামোতে দীর্ঘ সময় ধরে ‘ভদ্রলোক’ বা উচ্চবর্ণের আধিপত্য বজায় থাকায় এই প্রান্তিক মানুষগুলো নিজেদের অবহেলিত মনে করেছে। বিজেপি তাদের মধ্যে এই বোধটি জাগিয়ে তুলতে পেরেছে যে, তারা কেবল সরকারি সুবিধার বেনিফিশিয়ারি নয়, তারা এই রাজ্যের ‘নির্ণায়ক শক্তি’।
বিজেপির জয়ের পেছনে কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচি ‘পিএম জনজাতি আদিবাসী ন্যায় মহাঅভিযান' কর্মসূচিটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে জঙ্গলমহল ও উত্তরবঙ্গের দুর্গম এলাকার আদিবাসী পরিবারগুলো পাকা বাড়ি, পরিচ্ছন্ন পানীয় জল, বিদ্যুৎ এবং উন্নত সড়ক ব্যবস্থার মতো মৌলিক পরিকাঠামো পেয়েছে। এটি প্রান্তিক ভোটারদের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি করেছে যে, দিল্লি তাদের কথা শুনছে।
বিজেপি অত্যন্ত সুকৌশলে তফশিলি ও আদিবাসী সংস্কৃতিকে হিন্দুত্বের বৃহত্তর কাঠামোর সাথে যুক্ত করতে পেরেছে। উত্তরবঙ্গে রাজবংশী নেতা বা জঙ্গলমহলে আদিবাসী বীরদের (যেমন বিরসা মুণ্ডা) প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের মাধ্যমে তারা এই জনগোষ্ঠীর 'সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা'র গ্যারান্টি দিয়েছে। অন্যদিকে, তৃণমূলের রাজনীতি অনেক সময় সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ায়, তফশিলি ও উপজাতিদের একাংশ মনে করেছে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয় সংকটের মুখে। এই নিরাপত্তাহীনতাই তাদের বিজেপির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবেই কলকাতা-কেন্দ্রিক 'ভদ্রলোক' বা উচ্চবর্ণের বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বাম আমল থেকে তৃণমূল আমল পর্যন্ত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সত্যিকারের প্রতিনিধিত্ব ছিল সীমিত। বিজেপির সংগঠন নিচুতলার এই মানুষগুলোকে নেতৃত্বের সামনের সারিতে নিয়ে এসেছে (যেমন—বিজেপির টিকিটে অনেক ভূমিপুত্র ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জয়)। এই প্রতিনিধিত্বের গণতন্ত্র তৃণমূলের পতনকে ত্বরান্বিত করেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও সাধারণ মানুষের বিচ্ছিন্নতা
তৃণমূলের পতনের সবচেয়ে গভীর কারণ হলো দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, যেখানে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে নিয়োগ হয়েছে বলে অভিযোগ, সেটি শুধু চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষুব্ধ করেনি, তাদের পরিবার ও সমাজকেও বিক্ষুব্ধ করেছে। স্থানীয় স্তরে 'কাট মানি' সংস্কৃতি, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতেও তৃণমূলের ক্যাডারকে ঘুষ দেওয়ার এই অভিজ্ঞতা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল।
হাবেরমাসের পাবলিক স্ফেয়ার তত্ত্বের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, তৃণমূলের ক্যাডার-ভিত্তিক শাসন বাংলার মুক্ত নাগরিক আলোচনার পরিসরকে সংকুচিত করে রেখেছিল। বিরোধী মত প্রকাশে ভয়, সাংবাদিকতায় চাপ এই পরিবেশ অসন্তোষকে ভেতরে ভেতরে জমতে দিয়েছে। নির্বাচন সেই দমিত কণ্ঠস্বরগুলোকে একসাথে বেরিয়ে আসার সুযোগ দিয়েছে।
আর জি কর কাণ্ড ও নাগরিক সমাজের জাগরণ
২০২৪ সালের আগস্টে আর জি কর মেডিকেল কলেজে একজন তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা বাংলার ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। কলকাতার রাস্তায় মধ্যরাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ নেমে এসেছিলেন। বিক্ষোভ শুধু কলকাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এই আন্দোলন শুধু ন্যায়বিচারের দাবিতে ছিল না। এটি ছিল তৃণমূলের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি সামাজিক রায়। হাসপাতালে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়ায় অসংবেদনশীলতার অভিযোগ, এগুলো মিলিয়ে এক বিশাল মধ্যবিত্ত অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সেই অসন্তোষ ব্যালট বাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে।
ডাবল-ইঞ্জিন তত্ত্ব ও কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সরাসরি প্রভাব
বিজেপির জয়ের আরেকটি বড় কারণ হলো কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সরাসরি সুবিধাভোগীদের ভোট। উজ্জ্বলা যোজনার বিনামূল্যে গ্যাস সংযোগ, আয়ুষ্মান ভারত-এর স্বাস্থ্যবিমা, পিএম আবাস যোজনার গৃহনির্মাণ সহায়তা, এই প্রকল্পগুলোর সুবিধা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে গেছে। কোনো তৃণমূল মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন হয়নি।
'ডাবল-ইঞ্জিন' স্লোগান অর্থাৎ কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার, এই যুক্তিকে সরলভাবে উপস্থাপন করেছে। রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে, এই বার্তা গ্রামের ভোটারদের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে গেছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন ও বুথ ব্যবস্থাপনায় সাংগঠনিক দক্ষতা
স্পেশাল ইনটেন্সিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা সংশোধন নির্বাচনের আগে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়েছিল। প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম কর্তনের অভিযোগ উঠেছিল, তৃণমূলের দাবি ছিল এটি তাদের ভোটারদের টার্গেট করা হয়েছে। বুথ ব্যবস্থাপনায় বিজেপির দক্ষতাও ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি বুথে নিবেদিত কর্মী, ভোটারদের পোলিং বুথ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা, এবং ভোটের আগে প্রতিটি পরিবারের সাথে যোগাযোগ, এই সূক্ষ্ম সাংগঠনিক কাজ তৃণমূলের অনেক এলাকায় বিজেপিকে এগিয়ে দিয়েছে।
বিজেপির জয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকাও অস্বীকার করা যাবে না। শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলের একদা বিশ্বস্ত নেতা, তাঁর দলবদল এবং পরে নন্দীগ্রাম থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানো ২০২১ সালেই বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছিল। ২০২৬ সালে শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরে মমতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এবং জিতেছেন। এই প্রতীকী বিজয় বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। মমতার নিজের রাজনৈতিক দুর্গে এই পরাজয় পুরো নির্বাচনের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত।
সংখ্যালঘু ভোটের বিভাজন
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতার অন্যতম স্তম্ভ ছিল তাদের একচেটিয়া সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই 'অটল' দুর্গে বড় ধরনের ফাটল লক্ষ করা গেছে, যা দলটির পরাজয়ের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে মালদহ ও মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলোয়, যেখানে সংখ্যালঘু ভোটাররা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেন, সেখানে তৃণমূলের একক আধিপত্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
এই ভোট বিভাজনের পেছনে প্রথম ও প্রধান কারণ হলো তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও দুর্নীতি। আবাস যোজনা, ১০০ দিনের কাজ এবং বিশেষ করে নিয়োগ দুর্নীতির প্রভাব গ্রামীণ সংখ্যালঘু সমাজের শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছিল। সাধারণ মানুষ দেখেছেন যে, উন্নয়নের সুবিধা প্রকৃত অভাবীর চেয়ে শাসকদলের ঘনিষ্ঠদের কাছে বেশি পৌঁছাচ্ছে। এই বঞ্চনাবোধ থেকে তৈরি হওয়া ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ বা সরকারবিরোধী মনোভাব তৃণমূলকে তাদের নিরাপদ ভোটব্যাংক থেকে বিচ্যুত করেছে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বিকল্পের সন্ধান। একসময় মনে করা হতো বিজেপিকে রুখতে তৃণমূলই একমাত্র শক্তি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বামপন্থী ও কংগ্রেস জোটের কিছুটা পুনরুজ্জীবন এবং ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট এর মতো দলগুলোর সক্রিয়তা সংখ্যালঘু ভোটারদের সামনে নতুন বিকল্প তৈরি করে দিয়েছে। মুসলমান ভোটাররা আর কেবল ‘বিজেপির ভয়’ থেকে তৃণমূলকে ভোট দেওয়ার চিরাচরিত কৌশল অনুসরণ না করে, স্থানীয় উন্নয়ন ও স্বচ্ছতার নিরিখে ভোট ভাগ করে দিয়েছেন। ফলে ভোট কাটাকাটির সমীকরণে তৃণমূলের শক্তিক্ষয় হয়েছে এবং অনেক আসনে বিজেপির জয়ের পথ প্রশস্ত হয়েছে। এই বিভাজন প্রমাণ করেছে যে, সংখ্যালঘু ভোটাররা এখন আর কোনো নির্দিষ্ট দলের ‘বাঁধা’ সম্পদ নন, বরং তারা অনেক বেশি বিচারশীল ও দাবিদাওয়ার প্রশ্নে আপসহীন।
মেরুকরণের নতুন বিন্যাস ও পরিচয়ের রাজনীতি
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে রাজনৈতিক মেরুকরণের যে নতুন বিন্যাস দেখা গেছে, তা মূলত দুটি বিপরীতধর্মী পরিচয়সত্তার সংঘাত। তৃণমূল কংগ্রেস ‘বাঙালি অস্মিতা’কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ বা ‘হিন্দি বলয়ের দল’ হিসেবে চিত্রিত করতে চেয়েছিল। তাদের রাজনৈতিক বয়ান ছিল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এবং বাঙালির উদারবাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু এই কৌশলটি এবার ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, বাংলার হিন্দু ভোটারদের একটি বিশাল অংশ তাঁদের ‘বাঙালি’ পরিচয় এবং ‘হিন্দু ভারতীয়’ পরিচয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ খুঁজে পাননি। বরং তাঁরা নিজেদের সাংস্কৃতিক শেকড় এবং ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে একই সমান্তরালে মেলাতে পেরেছেন, যা বিজেপির রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে ত্বরান্বিত করেছে।
এই পরিবর্তনের গভীরতা বুঝতে মিশেল ফুকো ও আন্তোনিও গ্রামসির তাত্ত্বিক কাঠামো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ফুকোর ‘গভর্নমেন্টালিটি’ তত্ত্ব অনুযায়ী, তৃণমূলের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো (লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী) মানুষকে রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছিল। এই ‘জনমোহিনী রাজনীতি’ সাময়িকভাবে দারিদ্র্য বিমোচন করলেও মানুষের বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষা; যেমন মানসম্পন্ন শিক্ষা, বৃহৎ শিল্পায়ন এবং স্থায়ী কর্মসংস্থান পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের উত্তর না থাকায় মানুষ কেবল ‘নির্ভরশীলতা’ নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের পথ বেছে নিয়েছে।
অন্যদিকে, গ্রামসির ‘হেজেমনি’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের তত্ত্ব অনুযায়ী, বিজেপি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলে আসা বাম ও তৃণমূলী রাজনৈতিক বয়ানকে সফলভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে। তারা হিন্দু ধর্মীয় উৎসবের সামাজিকীকরণ, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং উন্নয়নের এক নতুন ‘সাংস্কৃতিক আখ্যান’ তৈরি করেছে। এই নতুন বয়ানটি তৃণমূলের তৈরি করা ‘আঞ্চলিক অস্মিতা’র গণ্ডি ভেঙে একটি শক্তিশালী বিকল্প আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। মূলত পুরনো রাজনৈতিক হেজেমনি ভেঙে গিয়ে এক নতুন জাতীয়তাবাদী ও উন্নয়নমুখী চেতনার জয়জয়কারই এই নির্বাচনের মূল নির্যাস।
বিজেপির আগামীর চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
বিজেপির এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর নতুন সরকারের সামনে এখন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ ও অগ্নিপরীক্ষা। বাংলার মতো একটি জটিল ও বহুমাত্রিক রাজ্যে শাসনভার গ্রহণ করা যেমন সম্মানের, তেমনি তা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। নতুন সরকারের প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার সংকট দূর করা। নির্বাচনের তীব্র মেরুকরণ এবং উত্তর-নির্বাচনী সহিংসতার প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা দূর করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখাই হবে প্রকৃত সুশাসনের প্রথম পরিচয়। শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নয়নের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ। তৃণমূলের পতন মূলত ঘটেছে কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদী অভাবের কারণে। তাই বিজেপিকে কেবল ‘ডাবল-ইঞ্জিন’ সরকারের স্লোগান দিলে চলবে না; বরং বাস্তবে বৃহৎ শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। মানুষ যদি দ্রুত পরিবর্তনের ছোঁয়া না পায়, তবে ২০২৬ সালের এই প্রবল জনজোয়ার খুব শীঘ্রই পরবর্তী নির্বাচনের ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ বা সরকারবিরোধী ঢেউয়ে পরিণত হতে পারে।
জাতীয় রাজনীতিতেও এই ফলাফলের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি লোকসভা আসন এখন বিজেপির প্রধান শক্তিতে পরিণত হওয়ায় ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ কে তাদের কৌশল সম্পূর্ণ নতুন করে সাজাতে হবে। এছাড়া, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এটি একটি নতুন মোড়। সীমান্ত সুরক্ষা, তিস্তা পানি বণ্টন এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের নতুন নেতৃত্বের ভূমিকা দিল্লির পররাষ্ট্রনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাবে। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষী, মানুষ যেমন দুহাত ভরে আশীর্বাদ করতে জানে, মৌলিক আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হলে তেমনি নির্মমভাবে প্রত্যাখ্যান করতেও দ্বিধা করে না। তাই বিজেপির প্রকৃত পরীক্ষা কেবল জয়লাভেই শেষ নয়, বরং কার্যকর শাসনের মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস ধরে রাখার মধ্যেই নিহিত।
লেখক: শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

বেশ কিছু বছর লেখা বন্ধ ছিল। আবার শুরু করলাম। কারণ এখন আমরা সবাই একটা নতুন কালে আছি। সেই সময়ের সূচনাকে খুব সামনাসামনি থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। আর এখনও খুব কাছাকাছি বসেই দেখতে পাচ্ছি। আমি মনে করি এসব রেকর্ডেড থাকা উচিত। কে জানে, কারো যদি ৫০ বছর পর কাজে লেগে যায়।
২ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর দীর্ঘকালীন তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ অঞ্চলে বৈশাখের প্রথম থেকে তৃতীয় সপ্তাহজুড়ে ভারি বৃষ্টিপাত হওয়াটাই স্বাভাবিকতা, যা কখনো কখনো বৈশাখের শেষ পর্যন্ত প্রলম্বিত হয়। যেমনটি এ বছর হয়েছে। চৈত্রের দাবদাহ কাটিয়ে উঠতে এ বৃষ্টি মানুষের জীবনে প্রশান্তিও বয়ে আনছে।
২০ ঘণ্টা আগে
গত ৩ মে মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে রাজধানীতে আয়োজিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীন সাংবাদিকতার নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা। সেদিনই বিশ্বের ১৩১টি দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর চালানো এক জরিপের ফল প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্যালাপ’ দাবি করেছে, বিশ্বের ৬৪ শতাংশ গণমাধ্যমকর্মী নিজ দেশে স্বাধীনভা
১ দিন আগে
ইরান এমন একটি দেশ যা বহুবার অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিদেশি পরাশক্তির হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, হাজার বছরের আগ্রাসন সত্ত্বেও ইরান কখনোই কারও স্থায়ী উপনিবেশে পরিণত হয়নি।
১ দিন আগে