হাওরের ধান কেন পানিতে তলায়

প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬, ২০: ৩৮
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর দীর্ঘকালীন তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ অঞ্চলে বৈশাখের প্রথম থেকে তৃতীয় সপ্তাহজুড়ে ভারি বৃষ্টিপাত হওয়াটাই স্বাভাবিকতা, যা কখনো কখনো বৈশাখের শেষ পর্যন্ত প্রলম্বিত হয়। যেমনটি এ বছর হয়েছে। চৈত্রের দাবদাহ কাটিয়ে উঠতে এ বৃষ্টি মানুষের জীবনে প্রশান্তিও বয়ে আনছে। তবে এটি নির্মম সত্য যে, বৈশাখের সেই স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত কৃষকদের একাংশের জীবনে, বিশেষত হাওর অঞ্চলে এক ধরনের দুর্যোগ বয়ে আনে।

হাওর, বিল ও এ জাতীয় প্লাবনভূমিতে যে বছর ভালো ফলনের আভাস পাওয়া যায়, সে বছর মাঠের কাঁচা ধান দেখেই কৃষকের মন আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। পরক্ষণেই একটা অজানা আশঙ্কাও তাকে পেয়ে বসে যে, আকাশ থেকে পড়া বৃষ্টি, নিচ থেকে আসা জোয়ারের পানি আর নেমে আসা পাহাড়ি ঢল—এই তিন পক্ষকে মোকাবেলা করে স্বপ্নের পাকা ধান শেষ পর্যন্ত তার উঠানে উঠবে তো? গোলায় উঠবে কিনা, সেটি অবশ্য আরেক প্রশ্ন। সেখানে যুক্ত রয়েছে ফঁড়িয়া ও মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া অগ্রিম ঋণের বাধা।

তো শেষ পর্যন্ত এটাই সর্বজনস্বীকৃত ঘটনা যে, প্রতিবছর না হোক, অধিকাংশ বছর কৃষকের ওই সোনালি স্বপ্নের বেশির ভাগটুকু নীরবে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। কাঁচা ধানে ভরা সবুজ মাঠ পাকা ফসলের আভায় সোনালি হয়ে ওঠার আগেই তা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে এবং সেই আধপাকা ধানের একটি বড় অংশ কৃষককে হাওরের পানির নিচে বিসর্জন দিয়ে গামছায় চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, বছরের পর বছর এই যে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি, এর শেষ কোথায়? কেন সেই ধারা একইভাবে চলছে? রাষ্ট্র তাহলে কাকে নিয়ে ব্যস্ত? হাওরের কৃষকের কষ্ট, বঞ্চনা পেছনে ফেলে কার স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি বাস্তবায়ন তাহলে অগ্রাধিকার পাচ্ছে? বিষয়গুলো একটু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

হাওরের যে কৃষকেরা প্রায় প্রতি বছরের বৈশাখে তাদের আধপাকা ধান ঢলে-জোয়ারে-বৃষ্টিতে বিসর্জন দিচ্ছেন, সেটির চারা তারা সাধারণত রোপণ করেন মাঘের শেষ সপ্তাহে। চৈত্রের তৃতীয় সপ্তাহে তাতে ধানের থোড় গজায় এবং পাকে বৈশাখের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরু থেকে তৃতীয় সপ্তাহের শেষ নাগাদ। অর্থাৎ এর আবাদকালের মেয়াদ হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ দিন। অন্যদিকে বৃষ্টি, জোয়ার ও ঢলের উৎপাতও শুরু হয় ধান পাকতে শুরু করার সময় থেকে। সমস্যা হচ্ছে, সব ধান পাকার আগেই পানির তীব্রতায় আধপাকা ধানের একটি অংশ তলিয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীরা যদি উক্ত বোরো ধান আবাদের এমন এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে পারতেন, যার আওতায় চারা রোপণের কাজটি ১৫ দিন এগিয়ে এনে মাঘের দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু করা যাবে, তাহলে নির্ধারিত ৯০ দিনের আবাদকাল পূর্ণ করেই পরিপূর্ণ পাকা ধান বৈশাখের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে কেটে ফেলা সম্ভব হতো। সে ক্ষেত্রে এ ধানকে আর পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার শিকার হতে হতো না। বিজ্ঞানীরা উক্ত ধানের এমন এক প্রজাতি উদ্ভাবনের কথাও ভাবতে পারেন, যার আবাদকালের মেয়াদ ৯০ দিনের স্থলে ৭৫-৮০ দিন হবে, তাহলেও বর্তমান রীতি অনুযায়ী মাঘের শেষ সপ্তাহে চারা লাগিয়ে বৈশাখের শুরুতে পাকা ধান কেটে তোলা সম্ভব হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, উল্লিখিত দুই বিকল্প প্রস্তাবের (নতুন চাষ পদ্ধতি অথবা নতুন প্রজাতি উদ্ভাবন) মধ্যে কোনটি সম্ভব কিংবা আদৌ সম্ভব কিনা, সেটি বিজ্ঞানীরাই বলতে পারবেন। তবে বিশ্বজুড়ে উদ্ভাবনের নানা ঘটনা দেখে সাধারণ মানুষ মনে করে, এটি সম্ভব। গত সাড়ে ৫ দশকে এ দেশে কৃষিবিজ্ঞানীদের অনেক সাফল্য রয়েছে। সেই ধারায় হাওর এলাকার লাখ লাখ কৃষককে তাদের যুগ-যুগান্তরের কষ্ট থেকে মুক্তিদানের লক্ষ্যে কেন তারা এ ক্ষেত্রেও এগিয়ে আসবেন না? প্রয়োজনে তারা আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইআরআরআই) কিংবা অন্যান্য দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীদের সহায়তা নিতে পারেন। সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশের জটিল ও স্বার্থান্বেষী আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাজটি সহজ নয় মোটেও। হয়তো দেখা যাবে, ভিন্ন কোনো দেশের এতদসংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা কার্যক্রম পরিদর্শনের জন্য ৫ সদস্যের বিজ্ঞানী দল প্রেরণের ক্ষেত্রে সেখানে ৩ জনই ঢুকে পড়েছেন প্রশাসনিক আমলা। তারপরও বলবো, এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আগ্রহ থাক বা না থাক কিংবা আমলাতান্ত্রিক সহযোগিতা মিলুক বা না মিলুক, কাজটি হওয়া দরকার এবং সে যোগ্যতা বাংলাদেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের যথেষ্টই রয়েছে মনে করি।

এবার আসা যাক, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের মতো ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত কিভাবে হাওরের কৃষকদের টিকিয়ে রাখা যাবে। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাব হচ্ছে, উল্লিখিত বোরো ধানের চারা কৃষকেরা বর্তমানে যেখানে মাঘের শেষ সপ্তাহে রোপণ করেন, সেখানে কাজটি আরও এক সপ্তাহ এগিয়ে আনতে ও সেজন্য বীজতলা আরও এক সপ্তাহ আগে তৈরি করতে হবে। সে ক্ষেত্রে বীজতলা তৈরির উপযুক্ত জমি পাওয়া হয়তো একটু কঠিন হবে। তারপরও বাংলাদেশের সৃজনশীল কৃষকেরা এর একটি বিহিত করে ফেলতে পারবেন বলেই বিশ্বাস করি। আর বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণের কাজ এক সপ্তাহ করে এগিয়ে আনতে কোনো বৈজ্ঞানিক পরামর্শ বা ছাড়পত্রের প্রয়োজন নেই। কৃষক তার অভিজ্ঞতা দিয়েই এই এক সপ্তাহের সময়কালটি সমন্বয় করে নিতে পারবেন। অন্যদিকে এক সপ্তাহ আগে চারা লাগিয়ে প্রথম থেকেই পরিচর্যা অব্যাহত রাখতে পারলে থোড়ও এক সপ্তাহ আগেই গজাবে বলে আশা করা যায়। সে ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ পাকা ধান বৈশাখের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই কেটে ফেলা সম্ভব হবে বলে ধারণা।

কৃষিসহ বাংলাদেশের অন্য সব খাতের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে, যা একটি লুণ্ঠনমূলক ব্যবস্থা ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ স্থানীয় সরকারকে স্বনির্ভর ও শক্তিশালী করে গড়ে তোলার মাধ্যমে এ উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো সহজেই তার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যেত।

সমস্যা হচ্ছে, মাঘের শেষ সপ্তাহে চারা রোপণে অভ্যস্ত কৃষক কাজটি হঠাৎ করেই এক সপ্তাহ আগে থেকে শুরু করতে কতোটা উৎসাহ বোধ করবেন, সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। কারণ স্বভাবে আত্মপ্রচারবিমুখ কৃষক মুখে কিছু না বললেও নিজ অভিজ্ঞতাকে সহজে বিসর্জন দিতে রাজি হবেন বলে মনে হয় না। সে ক্ষেত্রে হয় তার সামনে পরিবর্তনের পক্ষে প্রামাণ্য দৃষ্টান্ত দিতে হবে, যা অনেকটাই সময়সাপেক্ষ; কিংবা তাকে বুঝিয়ে রাজি করতে হবে, যেটি করতে পারেন বিএডিসি বা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাঠকর্মীরা। অন্যদিকে কৃষককে অন্তত ৯০ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানাতে হবে, যাতে তারা সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারেন। কিন্তু আমাদের কৃষি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এ ব্যাপারে একেবারেই প্রস্তুত নয়। আর আবহাওয়া অধিদপ্তরের সামর্থ্যও এ ক্ষেত্রে সীমিত। তারপরও বলবো, কৃষিতে এ পর্যন্ত নানামাত্রিক অগ্রগতি হওয়া সত্ত্বেও উৎপাদনশীলতার বৈশ্বিক মানদণ্ডে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে আছে। অতএব সে বিবেচনা থেকে এবং একইসঙ্গে হাওরের কৃষককে বাঁচাবার প্রয়োজনে কৃষি আবহাওয়া ব্যবস্থার উন্নতি সাধন বাংলাদেশকে করতেই হবে।

ঢল, বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি থেকে হাওরের কৃষককে বাঁচানোর নামে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হয়। দুর্নীতি ও শৈথিল্যে ঘেরা এসব প্রকল্প প্রায়ই সময়মতো ও কাম্য মান অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয় না। ফলে এসব প্রকল্প থেকে যে উপকার কৃষকের পাওয়ার কথা, তার সামান্যই তাদের ভাগ্যে জোটে। অন্যদিকে এসব প্রকল্পের আওতায় এমন কিছু কাজ আছে, যেগুলো সময়মতো বাস্তবায়িত হলে সীমিত পরিসরে হলেও কৃষকের ধানকে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা যেত। কিন্তু প্রকল্পগুলোর বিলম্বিত ও অদক্ষ বাস্তবায়নের কারণে আর সেটি হয়ে ওঠে না। এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কাজটি তাই কিভাবে ত্বরান্বিত করা যাবে, তা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।

কৃষিসহ বাংলাদেশের অন্য সব খাতের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে, যা একটি লুণ্ঠনমূলক ব্যবস্থা ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ স্থানীয় সরকারকে স্বনির্ভর ও শক্তিশালী করে গড়ে তোলার মাধ্যমে এ উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো সহজেই তার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যেত। তা করতে পারলে এগুলোর বাস্তবায়ন একদিকে যেমন বর্ধিত কার্যকারিতা খুঁজে পেত, অন্যদিকে এতে অর্থ ব্যয়ও কম হতো। আর কৃষির ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার, বিশেষত এর ইউনিয়ন পরিষদকে যুক্ত করার তো কোনো বিকল্পই নেই। রাষ্ট্রের সংবিধানও (সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৯) সে নির্দেশনাই দিচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনীতিক ও আমলা উভয়েই গোষ্ঠীগত স্বার্থে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী হতে দিতে চান না, যা অন্যান্য খাতের মতো বাংলাদেশের কৃষিকেও অনেকখানি পিছিয়ে রেখেছে। হাওরের পানিতে ধান ডুবে যাওয়াটা সেই পিছিয়ে পড়ারই অংশ।

পরিশেষে এটুকুই বলব, রাষ্ট্রীয় সম্পদের বিলিবণ্টনে ক্ষমতা-কেন্দ্রের চারপাশে থাকা সুবিধাভোগী শ্রেণিটি এখন পর্যন্ত অগ্রাধিকারে থাকলেও দুর্দিনে প্রান্তবর্তী কৃষকই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও এর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে কোনোরকমে হলেও টিকিয়ে রেখেছে। সত্যি বলতে, বিগত ৫৫ বছরের প্রতিটি অর্থনৈতিক সংকটে কৃষিই হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রাষ্ট্রের মূল পরিত্রাতা, যা ২০০৭-০৮কালীন বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, ২০২০ সালের করোনা মহামারী ও ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে প্রমাণ হয়েছে। ফলে কৃষকের স্বার্থে না হোক; রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও তাদের ঘিরে থাকা সুবিধাভোগী শ্রেণির স্বার্থে হলেও কৃষি তথা হাওরের কৃষককে বাঁচান। তারা বাঁচলেই দেশ বাঁচবে। আর বিদ্যমান ব্যবস্থায় তাতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও তাদের সহযোগীরা। কৃষকদের লাভ সেখানে শুধু এটুকু যে, উপরের বিশাল পাত্র থেকে চুইয়ে পড়া ছিটেফোঁটা লভ্যাংশ হয়তো কোনোরকমে তাকে টিকে থাকতে সাহায্য করবে।

  • আবু তাহের খান: আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষক
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত