বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা: সংকট ও উত্তরণের উপায়

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ৩২
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কৃষি। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কৃষির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকে আমাদের কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। উন্নত জাতের ফসল, সেচ, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন ও প্রযুক্তির ব্যবহার এই সাফল্যের পেছনের মূল কারণ। আর এর বড় কৃতিত্ব দেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর।

তবে আমাদের কৃষি এখন একটি জটিল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির ক্ষয়, কৃষিজমি কমে যাওয়া, পানির অভাব, নতুন রোগবালাই এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির মতো নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। এর পাশাপাশি মানুষের পুষ্টির চাহিদাও বদলাচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষকদের এখন আরও আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই প্রযুক্তি দরকার।

কিন্তু আমাদের বর্তমান কৃষি গবেষণা ব্যবস্থা বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক, আর্থিক ও মানবসম্পদ-সংক্রান্ত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই দুর্বলতাগুলো দ্রুত সমাধান না করলে ভবিষ্যতে কৃষির উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। কৃষি গবেষণাকে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থায় পরিণত করতে আমাদের বেশ কিছু বিষয়ে নজর দিতে হবে।

মানবসম্পদ সংকট ও পদোন্নতিতে ধীরগতি

যেকোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর বিজ্ঞানীরা। শুধু বড় ভবন বা যন্ত্রপাতি দিয়ে গবেষণা হয় না, দরকার দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ গবেষক। কিন্তু বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানেই জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের পদ শূন্য পড়ে আছে। স্থায়ী নিয়োগের বদলে অনেক সময় ‘ভারপ্রাপ্ত’ দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দ্রুত এসব পদ পূরণ করা জরুরি।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিজ্ঞানীদের পদোন্নতিতে দীর্ঘসূত্রতা। বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও অনেকে পদোন্নতি পাচ্ছেন না। এতে তরুণ ও মেধাবী বিজ্ঞানীরা হতাশ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বেসরকারি খাতে চলে যাচ্ছেন। তাই শুধু চাকরির বয়সের ওপর নির্ভর না করে মেধা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণার মানের ওপর ভিত্তি করে পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে।

গবেষণার পরিবেশ, তহবিল ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা

আধুনিক কৃষি গবেষণা এখন অনেক বেশি প্রযুক্তি নির্ভর। এর জন্য উন্নত ল্যাবরেটরি, যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ডেটাবেজ, বায়োটেকনোলজি ও জলবায়ু মডেলিংয়ের মতো সুবিধা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের অনেক গবেষকই এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত। গবেষণার অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়াকে খরচ না ভেবে, জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। শুধু দামি যন্ত্রপাতি কিনলেই হবে না, সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও পর্যাপ্ত বাজেট থাকতে হবে।

গবেষণা তহবিল বরাদ্দের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা থাকা দরকার। জাতীয় সমস্যার সমাধানে যারা উদ্ভাবনী প্রস্তাব দেবেন, তাদের প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে তহবিল দেওয়া উচিত। পাশাপাশি, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যাপ্ত প্রশাসনিক স্বাধীনতা দিতে হবে। অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক সময় মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা বা যন্ত্রপাতি কেনায় দেরি হয়, যা মোটেও কাম্য নয়।

বাংলাদেশের কৃষির বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো অতীতের চেয়ে একেবারেই আলাদা। এখন আর শুধু ছোটখাটো উন্নয়ন দিয়ে কাজ হবে না। জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটাতে আমাদের নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তির প্রয়োজন।

কৃষি গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কৃষকের সমস্যার সমাধান করা। ভবিষ্যৎ গবেষণায় কিছু বিষয়ে বেশি জোর দিতে হবে। যেমন—জলবায়ু সহনশীল কৃষি, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, সার ও পানির সঠিক ব্যবহার, খরা ও লবণাক্ততা মোকাবিলা, কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার, ফসল সংরক্ষণের উপায় এবং পুষ্টি নিরাপত্তা।

গবেষকদের কাজ শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সেই জ্ঞান কৃষকের মাঠে কতটা কাজে লাগছে এবং কৃষকের আয় বাড়াতে সাহায্য করছে কি না, সেটাই হওয়া উচিত আসল মূল্যায়ন।

বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়

আমাদের দেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের মধ্যে একধরনের দূরত্ব রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মৌলিক গবেষণায় ভালো, আর গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের অভিজ্ঞতা বেশি। এই দুইয়ের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধ তৈরি করতে হবে। যৌথ গবেষণা, ল্যাবরেটরি ভাগাভাগি করে ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের যৌথ তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে এই সমন্বয় বাড়ানো সম্ভব।

মেধাবী তরুণদের কৃষি গবেষণায় আকৃষ্ট করতে হলে এই পেশাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। তাদের জন্য ফেলোশিপ, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং আধুনিক ল্যাবরেটরির ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বায়োটেকনোলজি, প্রিসিশন কৃষি ও জলবায়ু বিজ্ঞানের মতো নতুন বিষয়গুলোতে তরুণদের কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

প্রস্তাবিত সংস্কার রূপরেখা

২০৩০-২০৫০ সালের জন্য আমাদের একটি ‘জাতীয় কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবন কৌশল’ প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এই কৌশলের মূল ভিত্তিগুলো হতে পারে: মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও দ্রুত পদোন্নতি, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ, প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা তহবিল গঠন, গবেষণার সঙ্গে কৃষকের সরাসরি সংযোগ স্থাপন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌথ কাজ।

এছাড়া এআই এবং বায়োটেকনোলজির মতো নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার করার দিকে যেতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে অংশীদারত্ব বাড়াতে হবে এবং কাজের জবাবদিহি ও বিজ্ঞানীদের কাজের স্বাধীন মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের কৃষির বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো অতীতের চেয়ে একেবারেই আলাদা। এখন আর শুধু ছোটখাটো উন্নয়ন দিয়ে কাজ হবে না। জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটাতে আমাদের নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তির প্রয়োজন।

কৃষি গবেষণাকে তাই একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আসল বিষয় শুধু কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলো তা নয়, বরং দেশের মেধাকে কতটা কাজে লাগানো গেল, সেটাই মুখ্য। বিজ্ঞানীদের মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে কাজের স্বাধীনতা ও সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ একটি বিশ্বমানের কৃষি গবেষণা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে।

কৃষিপ্রধান একটি দেশের জন্য শক্তিশালী গবেষণা ব্যবস্থা কোনো বিলাসীতা নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য একটি বিনিয়োগ। এই সংস্কারগুলো করতে পারলে আমাদের বিজ্ঞানীরা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই কৃষিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবেন।

  • ড. মো. শহিদুল ইসলাম: কৃষিবিজ্ঞানী ও নীতি বিশ্লেষক; সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত