যেমন দেখেছিলাম হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগর, কতটা বদল ঘটল

মো. বায়েজিদ সরোয়ার
মো. বায়েজিদ সরোয়ার

প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৯: ০৭
ছবি: সংগৃহীত

আমরা এখন পারস্য উপসাগরের নীল জলে। কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিলিটারি কনটিনজেন্টের একদল সামরিক কর্মকর্তা ফেরিতে করে কুয়েত থেকে ২০ কিলোমিটার দূরবর্তী ফাইলাকা দ্বীপে ভ্রমণে চলেছি। ২০১০-এর জানুয়ারি। আমাদের পূর্ব দিকে ইরান। সেই দেশ থেকে উড়ে এসে একদল সাদা সীগাল আমাদের স্বাগত জানায়। ফাইলাকার উত্তরে ইরাক। কিছু দূরে ইরাকের উমকাসর বন্দর থেকে বিশাল অয়েল ট্যাঙ্কার যাচ্ছে হরমুজ প্রণালি হয়ে নিজ গন্তব্য। শান্ত পারস্য উপসাগরের নীল জল কেটে আমাদের ফেরিটি চলেছে ফাইলাকা দ্বীপের দিকে।

কুয়েতে থাকার সময়ে লেখা ডায়েরির পাতা থেকে পড়ছিলাম। ১৬ বছর আগে দেখা সেই হরমুজ প্রণালিতে এখন যুদ্ধের ছায়া।

কর্মসূত্রে একটা দীর্ঘ সময় ধরে পারস্য উপসাগরের তীরে (কুয়েত শহর) বসবাস করেছি। কুয়েতে এটি ‘আরব উপসাগর’ বা শুধু উপসাগর (গালফ) নামে পরিচিত।

আমার দেখা সুন্দর ও শান্ত সমুদ্রে (গালফ অব পারসিয়া) এখন প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস। তবে প্রাকৃতিক নয়, রাজনৈতিক-সামরিক সাইক্লোন। যুদ্ধে পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে পারে: হরমুজ প্রণালি, খার্গ দ্বীপ ও বন্দর আব্বাস। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার কথা বলছেন এবং ৬ এপ্রিল পর্যন্ত ইরানে আক্রমণ হবে না বলে জানিয়েছেন। এটা বলার পরদিনই অবশ্য হামলা করেছে মার্কিন বাহিনী।

হরমুজ প্রণালি এখন নিজেই অস্ত্র

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় শুরু হওয়া যুদ্ধ দিন দিন ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে। যুদ্ধের ২য় সপ্তাহ থেকেই, তেহরান ও তেল আবিবের সীমানা ছাড়িয়ে চলমান সংঘাত এখন সরাসরি আঘাত হেনেছে বৈশ্বিক জ্বালানির লাইফ লাইন হরমুজ প্রণালিতে।

পারস্য উপসাগরের দক্ষিণের এই প্রণালি এখন ইরানের ভূ-সামুদ্রিক অস্ত্র। মাত্র ২২ মাইল প্রশস্ত-সংকীর্ণ এই জলপথ এখন যুদ্ধের মোড় ও বৈশ্বিক মেরুকরণ বদলের চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের খার্গ দ্বীপ ও বন্দর আব্বাস, যেখানে ইরানের প্রধান বন্দর ও নৌঘাঁটি অবস্থিত।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত তেল ও গ্যাস পরিবহনের পথ, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। মাত্র ৩৯ কিলোমিটার বা ২২ মাইল সরু এই প্রণালীর উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান (মুসানদাম পেনিনসুলা) ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অবস্থিত। হরমুজ প্রণালির দৈর্ঘ প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার। এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে প্রতিদিনে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল (প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেল) ও এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ (বছরে প্রায় ১২২ বিলিয়ন ঘনমিটার তরলীকিত গ্যাস) চলাচল করে। এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য ২টি লেন রয়েছে এর প্রতিটি লেন দুই মাইল প্রশস্ত। হরমুজের উপকূল প্রাকৃতিক দূর্গের মতো। এর ইরানি উপকূল পাথরের পাহাড়ে ঘিরে রাখা।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার পরও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে যুদ্ধে নিজেদের প্রভাব বজায় রেখেছে ইরান। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধে যেকোনো দর কষাকষিতে হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করতে পারে তেহরান।

ইরান এ কৌশলগত রুটটিতেই সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে। তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও তাদের অংশীদারদের কাছে এক ফোঁটা তেলও পৌঁছাতে দেবে না ইরান। পারস্য সাগরের এই ‘জ্বালানি যুদ্ধ’ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকেই রীতিমতো এলোমেলো করে দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ প্রায় বন্ধ থাকায় তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌছেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আরব সাগর, হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগরে প্রায় ২০টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস। ইরানের ১৬টি নৌযান ধ্বংসের দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

নাবিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের স্মৃতিতে হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগর

হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগর নিয়ে সাম্প্রতিককালে কয়েকজন নাবিক, নৌ-কর্মকর্তা, সেনাকর্মকর্তা ও রাষ্ট্রদুতের সঙ্গে কথা হয়। ক্যাপ্টেন দেওয়ান নেকার আহমেদের দীর্ঘ ৪৫ বছরের নাবিক জীবনের স্মৃতিমূলক গ্রন্থ ‘পৃথিবী ভ্রমণ: নাবিক জীবনের গল্প’। তিনি ২০০৮ সালের জুনে একটি অয়েল ট্যাঙ্কার নিয়ে ইরানের বন্দর আব্বাস থেকে বাহরাইন যান। এরপর কুয়েত থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে কলকাতা। অবশেষে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌছেন। অভিজ্ঞ এই নাবিক সম্প্রতি এই নিবন্ধকারের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ‘২০০ মিটার দীর্ঘ ওয়েল ট্যাঙ্কার নিয়ে আমরা পারস্য উপসাগর থেকে ওমান উপসাগরে যাচ্ছি। বিশাল পারস্য উপসাগর হরমুজ প্রণালিতে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। হাতের বামে ইরান আর ডানে ওমান। ইরানের দিকে উচু পাহাড়। দুইটি সমুদ্র লেন বা সী লেনে জাহাজ চলছে।’

ক্যাপ্টেন হাশেম আহমেদের নাবিক জীবন শুরু হয় ১৯৮০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে। দীর্ঘ নাবিক জীবনে অনেকবার তিনি হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগরে জাহাজ নিয়ে এসেছেন। হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগর নিয়ে তিনি স্মৃতিচারণ করেন, ‘ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ে (১৯৮০-১৯৮৮) পারস্য উপসাগরে জাহাজ চালানো খুব ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এই সময় উভয় পক্ষের আক্রমণে ইরাক ও ইরানের অসংখ্য তেলবাহী ট্যাঙ্কার ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এটি ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’ নামে পরিচিত ছিল। ২০০৩-২০০৪ এর দিকে এই সাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ বাণিজ্যিক জাহাজের খোঁজখবর নিত। হরমুজ প্রণালীর একপাশে ইরানের জাগ্রোস পর্বতমালা। অনেক সময় ভিএইচএফ চ্যানেল ১৬-তে ইরান ও আরব আমিরাতের বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ হতো।’

ড. মুমিত আল রশিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি ২০১৯ সালে তেহরানের তারবিয়্যাত মোদাররেস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেছেন। এই ইরান বিশেষজ্ঞ দেশের অনেক জায়গায় (২০১৩-২০১৯) ভ্রমণ করছেন। গিয়েছেন বন্দর আব্বাস, হরমুজ প্রণালি, হরমুজ দ্বীপ ও কেশম দ্বীপে। এই সব বর্ণনা উঠে এসেছে তাঁর অনবদ্য গ্রন্থ ‘ইরানের পথে প্রান্তরে’। ইরানে এক সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন মো. শামীম আহসান। তিনি পারস্য উপসাগরের সুন্দর দ্বীপ ‘কিশ’ ভ্রমণ করেন।

হরমুজ প্রণালিকে ইরান যেভাবে প্রতিরক্ষায় ব্যবহার করছে

ইরান দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে: উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, সাবমেরিন ও নৌ মাইন, ভূ-গর্ভস্থ টানেল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও দ্রুতগামী নৌ-বহর।

এই কৌশলকে সামরিক ভাষায় বলা হয় ‘এরিয়া ডিনায়ল’—যার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশ বা নিরাপদে অবস্থান করা থেকে বিরত রাখা। এর ফলে হরমুজ প্রণালি এখন শুধু একটি বাণিজ্যিক পথ নয়, এটি হয়ে উঠেছে এই সংঘাতের সবচেয়ে ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র। মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, তেল নিয়ন্ত্রণ মানেই জাতিকে নিয়ন্ত্রণ। এই মন্তব্য সময়ের সঙ্গে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। ইরানের নেতৃত্ব এই শিক্ষাকে স্পষ্টভাবেই গ্রহণ করেছে এবং তার ওপর ভিত্তি করেই সামরিক মতবাদ গড়ে তুলেছে।

ইরান সরাসরি পুরো প্রণালি বন্ধ না করেও এমন এক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিটি জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ছোট ছোট হামলা, মাইন স্থাপন এবং নজরদারির মাধ্যমে তারা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যাতে বাজারে ভয় ছড়িয়ে পড়ে এবং তেলের দাম বেড়ে যায়। এই ‘নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা’ই তাদের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।

এর ফলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তেলের দাম বাড়ছে, সরবরাহ ব্যহত হচ্ছে এবং পরিবহন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ নয়; খাদ্য, শিল্প উৎপাদন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃ্ঙ্খলও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক এটিকে ১৯৭৩ সালের তেল সংকট বা অয়েল ক্রাইসিস এর সঙ্গে তুলনা করেছেন, তবে বর্তমান বিশ্বায়নের কারণে এর প্রভাব আরও দ্রুত ও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ প্রায় বন্ধ থাকায় তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌছেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আরব সাগর, হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগরে প্রায় ২০টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস।

সাংবাদিক-লেখক টিম মার্শাল হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব নিয়ে লিখেছেন ‘ইরানের হাতে আছে ইস্কাপনের টেক্কা, হরমুজ প্রণালি। অত্যন্ত সংকীর্ণ এই প্রণালিটি যদি কিছুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পুরো বিশ্ব এর ভুক্তভোগী হবে। তেলের দাম আকাশ ছোঁবে। এই বিশাল ক্ষতি প্রথম বিশ্বের কোনো শিল্পোন্নত দেশই মেনে নিতে চাইবে না।’ (প্রিজনার্স অব জিওগ্রাফি)

খার্গ দ্বীপ: সম্ভাব্য মার্কিন লক্ষ্যবস্তু?

পারস্য উপসাগরের অগভীর জলরাশিতে অবস্থিত ক্ষুদ্র পাথুরে ভূখণ্ড ‘খার্গ দ্বীপ’ আজ বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডে একটি বিপজ্জনক ‘ফ্ল্যাশপয়েন্ট’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশের নিয়ন্ত্রক এই দ্বীপটি কেবল একটি টার্মিনাল নয়, বরং তেহরানের অর্থনীতির প্রধান ধমনি। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই দ্বীপকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থল অভিযান এবং ইরানের পাল্টা বিধ্বংসী হুমকির ফলে মধ্যপ্রাচ্য এক নজিরবিহীন জ্বালানি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।

ওয়াশিংটন যখন কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ বা সরাসরি সামরিক দখলের ছক কষছে, তেহরান তখন পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে খার্গে আঘাত মানেই পুরো অঞ্চলের মার্কিন প্রভাবিত তেল স্থাপনাগুলোর সলিল সমাধি।

গত ১৪ মার্চ মার্কিন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী খার্গ দ্বীপে ৯৫টিরও বেশি কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে হামলা চালিয়েছে। এই ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্বীপটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার স্টেশন এবং ডোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া।

ইরানের বন্দর আব্বাস রক্ষায় বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তা

ইরানে আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফসল। ১৯৮০ দশক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের স্টাফ কলেজসহ সামরিক প্রতিষ্ঠানে এই বিষয়টি নিয়ে অনুশীলন ও চর্চা হয়েছে। আমেরিকার মেরিন কোর কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ (সিএসসি), ভার্জিনিয়ার কোয়ান্টিকায় অবস্থিত।

১৯৯৩ সালের কথা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকস কর্মকর্তা মেজর এ টি এম জিয়াউল হাসান (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, লেখক, বিশ্লেষক) এই স্টাফ কলেজে এসেছেন। স্টাফ কলেজে একসময় পরিচালিত ‘কমান্ড পোস্ট এক্সারসাইজ’ এর বিষয় ছিলো ইরানের বন্দর আব্বাস এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ। উল্লেখ্য, বন্দরটি হরমুজ প্রণালির তীরে কৌশলগত অবস্থানে অবস্থিত এবং এখানে রয়েছে ইরানি নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি।

বাংলাদেশের এই কর্মকর্তার এ্যাপোয়েন্টমেন্ট ছিল ‘কমান্ডার, ইরানিয়ান ফোর্স’। মেজরের দায়িত্ব হলো কমান্ডার বা অধিনায়ক হিসেবে মার্কিন মেরিন কোরের আক্রমণ থেকে ইরানের বন্দর আব্বাস রক্ষা করা। মেরিন স্টাফ কলেজের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের সক্ষমতা যাচাই করা এবং ইউএস মেরিন কোরের দুর্বলতা চিহ্নিত করা। যাতে পরে তাদের পরিকল্পনায় পরিবর্তন করা যায়।

মেজর জিয়া খুব চমৎকারভাবে মার্কিন আক্রমণের মুখে সম্ভাব্য পরিকল্পনা (বন্দর আব্বাস রক্ষা) গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের এই তরুণ ও মেধাবী কর্মকর্তার বন্দর আব্বাস রক্ষার পরিকল্পনা দারুণভাবে প্রসংশিত হয়েছিল।

সাম্প্রতিকালে চলমান ইরান যুদ্ধের ওপর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম জিয়াউল হাসান লিখেছেন, ‘প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইরানের ক্ষয়-ক্ষতির কৌশল: ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে একটি বিশ্লেষণ’। এই নিবন্ধে মেরিন স্টাফ কলেজে জেনারেল জিয়ার অনন্য অভিজ্ঞতার কথা চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। মেরিন স্টাফ কলেজের কাল্পনিক যুদ্ধটি কি ৩৩ বছর পর বাস্তব হতে চলেছে?

বিদেশি সৈনিকদের লাশে ভরা ইরানের পাহাড়

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষিতে মার্কিন মেরিন ফোর্সের মাধ্যমে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একটি সূত্র মতে, পেন্টাগণ ৩-৪ হাজার সৈন্য পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এর আগে ২০ মার্চ কয়েক হাজার মেরিন, নৌসেনাসহ যুদ্ধ জাহাজ ইউএসএস বক্সারকে ওই অঞ্চলে পাঠানো সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্র। পেন্টাগণের একাধিক সূত্র বলছে- মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত ৮২ তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের কয়েক হাজার সেনাকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ণমাত্রার স্থল অভিযানের পরিবর্তে মার্কিন মেরিন ফোর্স নির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত লক্ষ্যে কাজ করতে পারে:

হরমুজ প্রণালির সুরক্ষা: বিশ্বের ২০% তেল সরবরাহ নিশ্চিত করত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া মার্কিন মেরিনদের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে।

খার্গ দ্বীপ দখল: ইরানের ৯১% তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমে হয়। কৌশলগত সুবিধা পেতে যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বীপটি মেরিনদের মাধ্যমে কবজায় নেওয়ার কথা ভাবতে পারে।

বন্দর আব্বাস দখল: এছাড়াও ইরানের এই গুরুত্বপুর্ণ সমুদ্র বন্দর ও নৌ ঘাঁটিটি আক্রমনের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানে স্থল অভিযান চালানো হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইরানের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন হামলা এবং ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে সেখানে স্থল আক্রমণ ‘সুইসাইড মিশন’ বা আত্মঘাতী অভিযানের মতো হতে পারে। মধ্যপ্রচ্যের নতুন কোনো যুদ্ধে না জড়ানোর নির্বাচনি প্রস্তুতি এবং জনমতের বিরোধী হওয়ার কারণে স্থল সেনা পাঠানোর এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০০০ সালের দিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের শাসনামলে সরকারের উগ্রপন্থি একটি অংশ প্রেসিডেন্টকে ইরান আক্রমনের উশকানি দিয়েছিল। তবে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট, জেনারেল কলিন পাওয়েল এতে বাধা দিয়েছিলেন। কলিন পাওয়াল বলেন, ‘আমরা মরুভূমিতে যুদ্ধ করি, কিন্তু পাহাড়ে নয়।’ বলা হয়, ইরানের ইতিহাসে বিভিন্ন সময় সেদেশের পাহাড়গুলোতে বিদেশি সৈনিকদের অসংখ্য লাশ ছড়ানো রয়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার পরও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে যুদ্ধে নিজেদের প্রভাব বজায় রেখেছে ইরান। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধে যেকোনো দর কষাকষিতে হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করতে পারে তেহরান।

ইরান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতার কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, ইরান সমুদ্র উপকূলে আরও কয়েক হাজার মার্কিন সেনা ও জাহাজ পৌছানোর পথে। কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, ‘ইরানে একটি শক্তিশালি অভিযান পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছেন।

এখন দেখার বিষয়, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের এসব কৌশলকে কীভাবে মোকাবেলা করে। আমার দেখা, একসময়ের শান্ত পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে কি প্রচণ্ড শক্তিশালী সাইক্লোন আঘাত করতে যাচ্ছে?

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল; গবেষক ও বিশ্লেষক

সম্পর্কিত