শামীম হোসেন

অস্ট্রেলিয়ায় আমার কর্মস্থলে লাঞ্চ ব্রেকে ঘটে যাওয়া একটি ছোট্ট ঘটনা আমাকে বাংলাদেশের একটি বড় বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
লাঞ্চ সেরে বাইরে বের হচ্ছি রোদে একটু হাঁটার জন্য। অফিস থেকে ঢুকতে বা বের হতে রিসিপশন পার হতে হয়, সেখানে বসার জন্য সোফা পাতা থাকে, বাইরের কেউ এলে সেখানে বসে। তো আনমনে বের হচ্ছিলাম, হঠাৎ করে কানে বাজলো বাংলা কথা হচ্ছে কোথাও। একটা অফিসে স্বাভাবিকের চাইতে স্বরটাও একটু উঁচু। ২৫/২৬ বছরের এক যুবক ছেলে রিসিপশনের সেই সোফায় বসে কারো সাথে মোবাইলে কথা বলছে। সম্ভবত এখানে তার কোনো ফ্রেন্ডের সঙ্গে।
আমি বাইরে বের না হয়ে একটু দাঁড়ালাম। মোবাইলে যুবকের কথা শেষ হলো কয়েক মিনিটের মধ্যে। কথা শেষ হলে তাকে আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বাংলাদেশ থেকে? আমার মুখেও বাংলা শুনে যুবক ছেলেটি মনে হলো বেশ খুশিই হলো। বললেন, জি, ভাই। কয়েক মাস হলো পড়তে এসেছি এখানে। মাস্টার্স করছি। পার্ট টাইম একটা কাজ খুঁজতেছিলাম। এক বড় ভাই এখানে রেফার করেছে। আজ এখানে ডেকেছিল। তবে কথা বলে মনে হলো আমাকে নিবে না।’
এক নিশ্বাসে তরুণটি কথাগুলো বললেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন নিবেনা? এদের লোক দরকার হলে নিবে না কেন? জানালো যে সে ড্রাইভিং পারে না, ড্রাইভিং না পারলে আর নিজের গাড়ি না থাকলে উনারা কাজে নিবে না। শিফটিং ওয়ার্ক আওয়ার, পাবলিক ট্রান্সপোর্টের উপর ভরসা করে এখানে কাজ করা যাবে না।
বললাম, হ্যাঁ, সেটাই তো হয় এখানে। একেক দিন একেক সময় কাজ থাকবে, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সব সময় উপযোগী হয় না। সময়মতো কাজে আসতে হলে নিজের গাড়ি নিজে ড্রাইভ করে আসতে হবে। আর নিজের গাড়ি থাকলে যেকোনো শিফটেই কাজ করা যায়। আপনি বরং ড্রাইভিংটা দ্রুত শিখে ফেলেন, কাজ পেতে সুবিধা হবে।
বাইরে বের হলাম। ছেলেটিও তার কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে আমার পেছন পেছন আসতে থাকল। হাঁটতে হাঁটতে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই কীভাবে লাইসেন্স নেয়া যায়। আমি তো ড্রাইভিং পারি না। ড্রাইভিং লাইসেন্স নেয়ার সব ধাপ একে একে বলে দিলাম তাকে। কথা শুনে তরুণটি হতাশ হয়ে বললেন, লাইসেন্স পাওয়া তো খুব কঠিন মনে হচ্ছে, সময়ও লাগবে অনেক, টাকাও লাগবে অনেক। ভাই, অন্য কোন শর্টকাট উপায় কী আছে?
বললাম, কেমন শর্টকাটের কথা বলছেন?
ইতস্তত করে কিঞ্চিৎ মুচকি হাসির বাহানায় তরুণ বলেই বসলেন, ভাই টাকা পয়সা দিয়ে ম্যানেজ করা কী সম্ভব হবে?
আমি তো অবাক! কী বলে এই ছেলে!
জানিয়ে দিলাম, এখানে এসব হবে না, ভাই। এরকম চিন্তা করে নিজেও বিপদে পড়বেন, অন্যদেরও বিপদে ফেলবেন। এখানে কোনো ব্যাপারেই কোনো অনিয়ম চলে না। সিস্টেমের বাইরে কোনো কিছুই হয় না। আর কেউ করেও না। এসব চিন্তা বাদ দিয়ে যা যা স্টেপ আছে তা যদি ফলো করতে পারেন, তাহলে নিয়ম অনুযায়ীই সব হবে।
আমার এমন কথা শুনে যুবক ছেলেটি আবারও হতাশ হলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘‘ভাই, এটা তো খুব কঠিন মনে হচ্ছে। সময় লাগবে, টাকা লাগবে। কোনো শর্টকাট নাই? মানে… টাকাপয়সা দিয়ে ম্যানেজ করা যায় না?”
তার প্রশ্নটি ছিল শান্ত, লাজুক, কিন্তু গভীর। এটি শুধু একজন তরুণের ব্যক্তিগত চিন্তা নয়—এটি বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক প্রতিফলন। এমন একটি সমাজ যেখানে শর্টকাট শুধু প্রলোভন নয়, বরং টিকে থাকার কৌশল। যেখানে নিয়ম মানা দুর্বলতা, আর নিয়ম ভাঙা দক্ষতা হিসেবে দেখা হয়।
বাংলাদেশের দুর্নীতির সমস্যা গল্প নয়—তা পরিমাপযোগ্য, একইসঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী। আর তা বেড়েও চলেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স (সিপিআই) ২০২৪ অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫১তম অবস্থানে; স্কোর ২৩/১০০—যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থান। ২০২৫ সালে স্কোর সামান্য বেড়ে ২৪ হলেও অবস্থান ১৫০তম, অর্থাৎ বিশ্বের ১৩টি সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এটাই বাস্তবতা।
দেশের ভিতরের জনমতও প্রায় একই কথা বলে। যেখানে শতকরা ৭২ ভাগ বাংলাদেশি মনে করেন সরকারে দুর্নীতি ব্যাপক, ২৪ ভাগ মানুষ গত এক বছরে কোনো না কোনো সরকারি সেবায় ঘুস দিয়েছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর গৃহস্থালি জরিপে আরো দেখা যায় যে ৮১ দশমিক ৬ ভাগ পরিবার সরকারি সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছে।
বাংলাদেশ রোড এন্ড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটি (বিআরটিএ)—যারা আবার ড্রাইভিং লাইসেন্স কর্তৃপক্ষ এবং পাসপোর্ট অফিস দুর্নীতির সবচেয়ে বেশি অভিযোগপ্রাপ্ত সেক্টর।
অর্থাৎ যে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নিয়ে ওই তরুণ প্রশ্ন করেছিল, সেটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। তাই তার প্রশ্ন—“টাকায় ম্যানেজ করা যায়?” এই প্রশ্ন আসলে তার বেড়ে ওঠার পরিবেশেরই প্রতিফলন।
বাংলাদেশে দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি কাঠামোগত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে এসব দুর্নীতির কারণগুলো উল্লেখ আছে। যেমন—দুর্বল সংস্কার প্রক্রিয়া, মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনিক দুর্নীতি, অস্বচ্ছ সরকারি ক্রয়, জবাবদিহির অভাব। প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বারবার ব্যর্থ হয়, নাগরিকরা তখন একটি মানসিকতা গড়ে তোলে যে, “নিয়মের পথে গেলে হবে না। অন্য পথ খুঁজতে হবে।”
এমন মানসিকতা যতটা না অপরাধ, তারচেয়ে অনেক বেশি অভিযোজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে “ম্যানেজ করা”র ধারণাটি আসলে দুর্নীতির সমার্থক নয়; বরং এটি যেন একধরনের দক্ষতার প্রতীক। এটি এমন একটি সমাজের ভাষা, যেখানে নিয়ম মানলে কাজ হয় না, আর নিয়ম ভাঙলে কাজ হয়।
তরুণটির প্রশ্ন তাই অস্ট্রেলিয়ার নিয়ম ভাঙার চেষ্টা নয়—এটি বাংলাদেশের নিয়মের প্রতিফলন।
বাংলাদেশ থেকে যারা উন্নত দেশগুলো—যেমন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা ইউরোপে যান, প্রথমেই তারা একটি বড় ধাক্কার মুখোমুখি হয়ে থাকেন। কারণ সেসব দেশে নিয়ম কাজ করে, সিস্টেম স্বচ্ছ, ঘুষ বিরল এবং কোনো শর্টকাট নেই।
বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় বেড়ে ওঠা একজনের কাছে এসব প্রায় অবিশ্বাস্য। তারা ধরে নেন, প্রতিটি সিস্টেমেরই একটি লুকানো দরজা আছে। কারণ দেশে প্রতিটি সিস্টেমের লুকানো দরজা তাদের অভিজ্ঞতায় আছে, তাদের মস্তিস্কেও আছে। তাই তরুণটির হতাশা আসলে কেবলি ড্রাইভিং নিয়ে নয়। তা ছিল আসলে একটি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে প্রথম সংঘর্ষ।
দুর্নীতি শুধু প্রতিষ্ঠানকে নষ্ট করে না—জনগণের মানসিকতাকেও নষ্ট করে। এটি মানুষকে শেখায় সিস্টেমকে বিশ্বাস না করতে, ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কে নির্ভর করতে, প্রতিটি নিয়মের পেছনে একটি শর্টকাট খুঁজতে এবং মনে করতে যে টাকা সব সমস্যার সমাধান।
এই মানসিকতা সীমান্ত পেরিয়ে অন্য সীমান্তেও পাড়ি জমায়। পাসপোর্টের পাতায় তা থামে না। মূলত মস্তিষ্কে গেঁথে থাকে। তাই প্রবাসে গিয়ে অনেকেই নিয়মভিত্তিক সমাজে মানিয়ে বেশ নিতে হিমশিম খায়।
বাংলাদেশের তরুণরা মেধাবী, পরিশ্রমী এবং বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় সক্ষম। কিন্তু শর্টকাটের মানসিকতা নিয়ে তারা নিয়মনির্ভর সমাজে টিকে থাকতে পারে না। কারণ, এতে আইনি ঝুঁকি থাকে, সাংস্কৃতিক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়, পেশাগত ক্ষতি হয়, এবং দেশের ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু প্রাতিষ্ঠানিক হিসেবে বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। মোটাদাগে তা সাংস্কৃতিক; আর তাই, দুর্নীতি বিরোধী লড়াই নাগরিকের মানসিকতার পরিবর্তন এবং বিশ্বাসেরও পুনর্গঠনেরও লড়াই।
“ভাই, টাকায় ম্যানেজ করা যায় না?” — এই ছোট প্রশ্নটি বাংলাদেশের একটি বড় সংকটকে উন্মোচন করে। পরিসংখ্যান এই সংকটকে প্রমাণ করে আর প্রতিদিনের জীবন তা আরও স্পষ্ট করে তোলে।
বাংলাদেশের দুর্নীতি শুধু রাজনীতি বা প্রশাসনের সমস্যা নয়। এটি মানুষের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসের সমস্যা। এটি সেই নীরব ধারণা যে নিয়ম মানলে কাজ হয় না। দেশের জনগণের এমন বিশ্বাস বদলানোই হবে কঠিনতম সংস্কার।

অস্ট্রেলিয়ায় আমার কর্মস্থলে লাঞ্চ ব্রেকে ঘটে যাওয়া একটি ছোট্ট ঘটনা আমাকে বাংলাদেশের একটি বড় বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
লাঞ্চ সেরে বাইরে বের হচ্ছি রোদে একটু হাঁটার জন্য। অফিস থেকে ঢুকতে বা বের হতে রিসিপশন পার হতে হয়, সেখানে বসার জন্য সোফা পাতা থাকে, বাইরের কেউ এলে সেখানে বসে। তো আনমনে বের হচ্ছিলাম, হঠাৎ করে কানে বাজলো বাংলা কথা হচ্ছে কোথাও। একটা অফিসে স্বাভাবিকের চাইতে স্বরটাও একটু উঁচু। ২৫/২৬ বছরের এক যুবক ছেলে রিসিপশনের সেই সোফায় বসে কারো সাথে মোবাইলে কথা বলছে। সম্ভবত এখানে তার কোনো ফ্রেন্ডের সঙ্গে।
আমি বাইরে বের না হয়ে একটু দাঁড়ালাম। মোবাইলে যুবকের কথা শেষ হলো কয়েক মিনিটের মধ্যে। কথা শেষ হলে তাকে আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বাংলাদেশ থেকে? আমার মুখেও বাংলা শুনে যুবক ছেলেটি মনে হলো বেশ খুশিই হলো। বললেন, জি, ভাই। কয়েক মাস হলো পড়তে এসেছি এখানে। মাস্টার্স করছি। পার্ট টাইম একটা কাজ খুঁজতেছিলাম। এক বড় ভাই এখানে রেফার করেছে। আজ এখানে ডেকেছিল। তবে কথা বলে মনে হলো আমাকে নিবে না।’
এক নিশ্বাসে তরুণটি কথাগুলো বললেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন নিবেনা? এদের লোক দরকার হলে নিবে না কেন? জানালো যে সে ড্রাইভিং পারে না, ড্রাইভিং না পারলে আর নিজের গাড়ি না থাকলে উনারা কাজে নিবে না। শিফটিং ওয়ার্ক আওয়ার, পাবলিক ট্রান্সপোর্টের উপর ভরসা করে এখানে কাজ করা যাবে না।
বললাম, হ্যাঁ, সেটাই তো হয় এখানে। একেক দিন একেক সময় কাজ থাকবে, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সব সময় উপযোগী হয় না। সময়মতো কাজে আসতে হলে নিজের গাড়ি নিজে ড্রাইভ করে আসতে হবে। আর নিজের গাড়ি থাকলে যেকোনো শিফটেই কাজ করা যায়। আপনি বরং ড্রাইভিংটা দ্রুত শিখে ফেলেন, কাজ পেতে সুবিধা হবে।
বাইরে বের হলাম। ছেলেটিও তার কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে আমার পেছন পেছন আসতে থাকল। হাঁটতে হাঁটতে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই কীভাবে লাইসেন্স নেয়া যায়। আমি তো ড্রাইভিং পারি না। ড্রাইভিং লাইসেন্স নেয়ার সব ধাপ একে একে বলে দিলাম তাকে। কথা শুনে তরুণটি হতাশ হয়ে বললেন, লাইসেন্স পাওয়া তো খুব কঠিন মনে হচ্ছে, সময়ও লাগবে অনেক, টাকাও লাগবে অনেক। ভাই, অন্য কোন শর্টকাট উপায় কী আছে?
বললাম, কেমন শর্টকাটের কথা বলছেন?
ইতস্তত করে কিঞ্চিৎ মুচকি হাসির বাহানায় তরুণ বলেই বসলেন, ভাই টাকা পয়সা দিয়ে ম্যানেজ করা কী সম্ভব হবে?
আমি তো অবাক! কী বলে এই ছেলে!
জানিয়ে দিলাম, এখানে এসব হবে না, ভাই। এরকম চিন্তা করে নিজেও বিপদে পড়বেন, অন্যদেরও বিপদে ফেলবেন। এখানে কোনো ব্যাপারেই কোনো অনিয়ম চলে না। সিস্টেমের বাইরে কোনো কিছুই হয় না। আর কেউ করেও না। এসব চিন্তা বাদ দিয়ে যা যা স্টেপ আছে তা যদি ফলো করতে পারেন, তাহলে নিয়ম অনুযায়ীই সব হবে।
আমার এমন কথা শুনে যুবক ছেলেটি আবারও হতাশ হলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘‘ভাই, এটা তো খুব কঠিন মনে হচ্ছে। সময় লাগবে, টাকা লাগবে। কোনো শর্টকাট নাই? মানে… টাকাপয়সা দিয়ে ম্যানেজ করা যায় না?”
তার প্রশ্নটি ছিল শান্ত, লাজুক, কিন্তু গভীর। এটি শুধু একজন তরুণের ব্যক্তিগত চিন্তা নয়—এটি বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক প্রতিফলন। এমন একটি সমাজ যেখানে শর্টকাট শুধু প্রলোভন নয়, বরং টিকে থাকার কৌশল। যেখানে নিয়ম মানা দুর্বলতা, আর নিয়ম ভাঙা দক্ষতা হিসেবে দেখা হয়।
বাংলাদেশের দুর্নীতির সমস্যা গল্প নয়—তা পরিমাপযোগ্য, একইসঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী। আর তা বেড়েও চলেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স (সিপিআই) ২০২৪ অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫১তম অবস্থানে; স্কোর ২৩/১০০—যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থান। ২০২৫ সালে স্কোর সামান্য বেড়ে ২৪ হলেও অবস্থান ১৫০তম, অর্থাৎ বিশ্বের ১৩টি সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এটাই বাস্তবতা।
দেশের ভিতরের জনমতও প্রায় একই কথা বলে। যেখানে শতকরা ৭২ ভাগ বাংলাদেশি মনে করেন সরকারে দুর্নীতি ব্যাপক, ২৪ ভাগ মানুষ গত এক বছরে কোনো না কোনো সরকারি সেবায় ঘুস দিয়েছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর গৃহস্থালি জরিপে আরো দেখা যায় যে ৮১ দশমিক ৬ ভাগ পরিবার সরকারি সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছে।
বাংলাদেশ রোড এন্ড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটি (বিআরটিএ)—যারা আবার ড্রাইভিং লাইসেন্স কর্তৃপক্ষ এবং পাসপোর্ট অফিস দুর্নীতির সবচেয়ে বেশি অভিযোগপ্রাপ্ত সেক্টর।
অর্থাৎ যে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নিয়ে ওই তরুণ প্রশ্ন করেছিল, সেটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। তাই তার প্রশ্ন—“টাকায় ম্যানেজ করা যায়?” এই প্রশ্ন আসলে তার বেড়ে ওঠার পরিবেশেরই প্রতিফলন।
বাংলাদেশে দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি কাঠামোগত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে এসব দুর্নীতির কারণগুলো উল্লেখ আছে। যেমন—দুর্বল সংস্কার প্রক্রিয়া, মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনিক দুর্নীতি, অস্বচ্ছ সরকারি ক্রয়, জবাবদিহির অভাব। প্রতিষ্ঠানগুলো যখন বারবার ব্যর্থ হয়, নাগরিকরা তখন একটি মানসিকতা গড়ে তোলে যে, “নিয়মের পথে গেলে হবে না। অন্য পথ খুঁজতে হবে।”
এমন মানসিকতা যতটা না অপরাধ, তারচেয়ে অনেক বেশি অভিযোজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে “ম্যানেজ করা”র ধারণাটি আসলে দুর্নীতির সমার্থক নয়; বরং এটি যেন একধরনের দক্ষতার প্রতীক। এটি এমন একটি সমাজের ভাষা, যেখানে নিয়ম মানলে কাজ হয় না, আর নিয়ম ভাঙলে কাজ হয়।
তরুণটির প্রশ্ন তাই অস্ট্রেলিয়ার নিয়ম ভাঙার চেষ্টা নয়—এটি বাংলাদেশের নিয়মের প্রতিফলন।
বাংলাদেশ থেকে যারা উন্নত দেশগুলো—যেমন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা ইউরোপে যান, প্রথমেই তারা একটি বড় ধাক্কার মুখোমুখি হয়ে থাকেন। কারণ সেসব দেশে নিয়ম কাজ করে, সিস্টেম স্বচ্ছ, ঘুষ বিরল এবং কোনো শর্টকাট নেই।
বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় বেড়ে ওঠা একজনের কাছে এসব প্রায় অবিশ্বাস্য। তারা ধরে নেন, প্রতিটি সিস্টেমেরই একটি লুকানো দরজা আছে। কারণ দেশে প্রতিটি সিস্টেমের লুকানো দরজা তাদের অভিজ্ঞতায় আছে, তাদের মস্তিস্কেও আছে। তাই তরুণটির হতাশা আসলে কেবলি ড্রাইভিং নিয়ে নয়। তা ছিল আসলে একটি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে প্রথম সংঘর্ষ।
দুর্নীতি শুধু প্রতিষ্ঠানকে নষ্ট করে না—জনগণের মানসিকতাকেও নষ্ট করে। এটি মানুষকে শেখায় সিস্টেমকে বিশ্বাস না করতে, ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কে নির্ভর করতে, প্রতিটি নিয়মের পেছনে একটি শর্টকাট খুঁজতে এবং মনে করতে যে টাকা সব সমস্যার সমাধান।
এই মানসিকতা সীমান্ত পেরিয়ে অন্য সীমান্তেও পাড়ি জমায়। পাসপোর্টের পাতায় তা থামে না। মূলত মস্তিষ্কে গেঁথে থাকে। তাই প্রবাসে গিয়ে অনেকেই নিয়মভিত্তিক সমাজে মানিয়ে বেশ নিতে হিমশিম খায়।
বাংলাদেশের তরুণরা মেধাবী, পরিশ্রমী এবং বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় সক্ষম। কিন্তু শর্টকাটের মানসিকতা নিয়ে তারা নিয়মনির্ভর সমাজে টিকে থাকতে পারে না। কারণ, এতে আইনি ঝুঁকি থাকে, সাংস্কৃতিক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়, পেশাগত ক্ষতি হয়, এবং দেশের ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু প্রাতিষ্ঠানিক হিসেবে বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। মোটাদাগে তা সাংস্কৃতিক; আর তাই, দুর্নীতি বিরোধী লড়াই নাগরিকের মানসিকতার পরিবর্তন এবং বিশ্বাসেরও পুনর্গঠনেরও লড়াই।
“ভাই, টাকায় ম্যানেজ করা যায় না?” — এই ছোট প্রশ্নটি বাংলাদেশের একটি বড় সংকটকে উন্মোচন করে। পরিসংখ্যান এই সংকটকে প্রমাণ করে আর প্রতিদিনের জীবন তা আরও স্পষ্ট করে তোলে।
বাংলাদেশের দুর্নীতি শুধু রাজনীতি বা প্রশাসনের সমস্যা নয়। এটি মানুষের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসের সমস্যা। এটি সেই নীরব ধারণা যে নিয়ম মানলে কাজ হয় না। দেশের জনগণের এমন বিশ্বাস বদলানোই হবে কঠিনতম সংস্কার।
.png)

দলীয় ছাত্র সংগঠনগুলির গতানুগতিক কর্মকাণ্ডকে পাশ কাটিয়ে তরুণরা এবার স্বতঃস্ফূর্ত, বিকেন্দ্রীভূত ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তুলেছে, যার প্রভাব আগামী দিনের রাজনৈতিক অভিমুখ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
২ ঘণ্টা আগে
উচ্চশিক্ষার পরিমাণগত সম্প্রসারণ এবং গুণগত উৎকর্ষের মধ্যে এখনও বড় ধরনের ব্যবধান রয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক গবেষণাগার, বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং উদ্ভাবনী সংস্কৃতি সেই অনুপাতে বিকশিত হয়নি।
৫ ঘণ্টা আগে
রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রকৃত তাৎপর্য কেবল সংবিধানের বিধান বিশ্লেষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতিদের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক ভূমিকা এবং ক্ষমতা থেকে বিদায়ের প্রেক্ষাপটেও এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।
২০ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে নতুন করে যে শুল্ক আরোপ হয়েছে, তাতে পরিস্থিতি আগের মতোই থাকল। আগে যে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপিত ছিল, সেটাই অন্য ধারায় বহাল রেখেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। ‘জোরপূর্বক শ্রমবিরোধী নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে ব্যর্থতা’র অভিযোগে ৬০টি দেশের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্
২১ ঘণ্টা আগে