জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইরানের জয় নাকি পতন, কী চায় তুরস্ক

লেখা:
লেখা:
সিনান উলগেন

প্রতীকী ছবি

যেকোনো অস্থিরতার সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের দেশের স্বার্থ রক্ষায় কঠিন সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এসব সিদ্ধান্ত প্রায়ই ঐতিহাসিক শিক্ষা থেকে আসে। আজকের তুরস্কের ক্ষেত্রেও যা সত্য।

তুরস্ক ও ইরান আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি নিয়ে শতাব্দীপ্রাচীন বোঝাপড়ার মধ্যে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে এই দুই দেশের সীমান্তই হলো সবচেয়ে পুরোনো ও স্বীকৃত সীমান্ত। ১৬৩৯ সাল থেকে দুই দেশ একে অপরের পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করছে।

অবশ্য তুরস্ক ও ইরান মিত্র নয়। বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দুই দেশের স্বার্থদ্বন্দ্ব নিয়মিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তারা আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রায়ই ‘জিরো-সাম’ বা একপাক্ষিক জয়ে বিশ্বাসী প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। কিন্তু তাদের কৌশলগত রেষারেষি সবসময় পরোক্ষভাবেই চলেছে। দুই পক্ষই আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে আনার চেষ্টা করলেও সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে গেছে।

সিরিয়ায় এই বিষয়ের স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাবে। ২০১১ সালে বাশার আল-আসাদের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ শুরু হলে তুরস্ক প্রকাশ্যে সিরিয়ার সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনে সমর্থন দেয়। উল্টোদিকে ইরান বাশার আল-আসাদের গুরুত্বপূর্ণ মিত্রে পরিণত হয়। ইরানের সাহায্যেই আসাদ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধে টিকে থাকতে পেরেছিলেন। ২০২২ সালের শেষের দিকে ইরানের প্রভাব দুর্বল হওয়ার পরেই বিরোধী বাহিনী যুদ্ধের মোড় ঘোরাতে সক্ষম হয়। তখন তুরস্কের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত আসাদ রাজবংশের পতন ঘটে।

সরাসরি সংঘাত এড়ানোর নীতি

বর্তমানে তুরস্ক ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়াতে এতটাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে তারা ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলার ঘটনাও চেপে গেছে। অভিযোগ আছে ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে ওই মিসাইল তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলের ইনসিরলিক বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানত।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরানে সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট আপত্তি আছে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ধীরস্থির কৌশলগত পরিকল্পনায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনিই সিরিয়ায় সরকার পরিবর্তনে ধৈর্য দেখাতে পারেননি। তাহলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশৃঙ্খল প্রশাসন ইরানে কীভাবে সফল হবে? এমনকি যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানি সরকারকে হটাতেও পারে তবুও সেখানে সুশৃঙ্খল ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার সম্ভাবনা কম।

তুরস্কের জন্য ইরানে রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়া হলো সবচেয়ে খারাপ দৃশ্যপট বা ‘ওয়ার্স্ট কেস সিনারিও’। এর পরেই আছে সিরিয়া স্টাইলের সহিংসতা। যেখানে এক সরকারের বিরুদ্ধে লড়বে এমন এক বিরোধী পক্ষ যারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেও জেতার মতো শক্তিশালী নয়।

শরণার্থী ও অর্থনীতির ঝুঁকি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যে জঞ্জালই তৈরি করুক না কেন তার ফল তুরস্ককেই ভোগ করতে হবে। এর মধ্যে বড় আকারের শরণার্থীর ঢল অন্যতম। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব থেকে ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক সিরিয়া গৃহযুদ্ধ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তুরস্কের প্রতিবেশী অঞ্চলে সরকার পরিবর্তন বা ব্যর্থ চেষ্টা দেশটির ওপর নিরাপত্তা ও মানবিক বোঝা চাপিয়েছে। কেবল সিরিয়া থেকেই প্রায় ৩২ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে তুরস্ক। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী আশ্রয়দাতা। ইরানের জনসংখ্যা ৯ কোটির বেশি, যা সিরিয়ার প্রায় চার গুণ।

ইরান থেকে শরণার্থীর ঢল তুরস্কের অর্থনীতির ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে। দেশটি লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। এরদোয়ান সরকার গত আড়াই বছরে মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ২০২৮ সালের পরবর্তী নির্বাচনের আগে তারা একে এক অঙ্কের ঘরে বা সিঙ্গেল ডিজিটে নামাতে চায়। ইরানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তেলের দাম বাড়িয়ে এবং আন্তর্জাতিক পুঁজি বাজারে ঝুঁকি তৈরির মাধ্যমে এই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

তুরস্কের কূটনৈতিক তৎপরতা

এই ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে সচেতন থেকেই তুরস্ক বর্তমান সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলে ওমান এগিয়ে আসে। এরপর আলোচনা সুইজারল্যান্ডে স্থানান্তরিত হয়। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে গোপন চ্যানেল বা ব্যাক চ্যানেল হিসেবে কাজ করছে। এখন তুরস্ক ইরানি সরকারের পতন ঘটার আগেই দ্রুত সহিংসতা বন্ধে সাহায্য করতে চাইছে।

তুরস্কের পছন্দের ফলাফল

দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও ইরানের ভাঙন এড়ানো তুরস্কের স্বার্থের জন্য যেমন জরুরি, তেমনি যুদ্ধের শেষে যেন বর্তমান সরকারের বিজয় না হয় তাও নিশ্চিত করা দরকার। বিজয়ী ইসলামি প্রজাতন্ত্র নিঃসন্দেহে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি থেকে সরে আসবে। তারা পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র বা অন্তত ‘নিউক্লিয়ার থ্রেশহোল্ড’ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করবে। পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন ইরান আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নষ্ট করে দেবে। বর্তমানে এই ভারসাম্য তুরস্কের দিকেই ঝুঁকে আছে।

তাই তুরস্কের পছন্দের ফলাফল হলো ইরানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সক্ষমতার একটি ‘নিয়ন্ত্রিত পতন’ বা ম্যানেজড ডিগ্রেডেশন। এ ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলার নজির কাজে লাগতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যখন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সরিয়ে দেয় তখন তারা বিরোধী দলকে ক্ষমতায় বসায়নি। বরং তারা বর্তমান সরকারের ভেতর থেকেই একটি নমনীয় অংশকে দায়িত্ব নিতে দিয়েছে।

ইরানেও একই পদ্ধতি নেওয়া যেতে পারে। পরবর্তী নেতারা যদি সরকারের ভেতর থেকেই আসেন তবে তারা দেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক এস্টাবলিশমেন্টের সমর্থন ধরে রাখতে পারবেন। তাদের যথেষ্ট বৈধতা থাকবে। এর ফলে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ ও ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক প্রক্সিদের অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ড থামানোর মতো কঠিন শর্ত মেনে নিতে পারবেন।

আগামী সপ্তাহগুলোতে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্ভবত ইরানের ভেতরের এমন মূল খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করবে যারা এই শর্তের সঙ্গে খাপ খায়। সময়মতো তুরস্ক এই ব্যক্তিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের যোগাযোগ ঘটিয়ে দিতে পারে। এর মাধ্যমে সংঘাতের দ্রুত ও টেকসই সমাপ্তির পথ তৈরি হতে পারে।

লেখক: ইস্তাম্বুলভিত্তিক থিংক ট্যাংক এডাম-এর পরিচালক এবং কার্নেগি ইউরোপের জ্যেষ্ঠ পলিসি ফেলো।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনূদিত

সম্পর্কিত