সেলিম জাহান
কথা হচ্ছিল তরুণ এক সাংবাদিকের সঙ্গে সহিংসতার সংস্কৃতি প্রসঙ্গে। আলাপের এক পর্যায়ে তিনি বললেন, ‘এই যে নতুন এক মব সহিংসতার বিস্তার ঘটছে’। ‘না’, থামিয়ে দিলাম তাঁকে, ‘যে মব সহিংসতার কথা বললেন, এটা নতুন নয়’, বলি আমার তরুণ সাংবাদিক বন্ধুটিকে। ‘আমাদের যৌবনে স্বাধীনতার পরে পরেই ঢাকার রাস্তায় মব সহিংসতা দেখেছি আমরা’, খোলাসা করি তাঁর কাছে।
একটা ঘটনার কথা মনে আছে। ১৯৭২ সালের প্রথম দিককার কথা। বায়তুল মোকাররমের পাশে রাস্তার ওপরের ঘটনা। আমি সবে জিপিওতে একটা চিঠি ফেলে রাস্তায় নেমেছি, ঠিক তখনই পল্টনের দিক থেকে ‘ধর, ধর, মার, মার’ শোরগোল শোনা গেল। তাকিয়ে দেখি, ১৮-১৯ বছরের এক তরুণ প্রাণপণে মসজিদের দিকে দৌড়াচ্ছে। আর তাঁর পেছনে একদল লোক ছুটছে। এক পলক তাকিয়ে দেখি, ছেলেটির নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে, গায়ের শার্ট শতচ্ছিন্ন, মাথার চুলগুলো ধুলো মাখা। বুঝলাম, ছেলেটি প্রাণভয়ে মব থেকে পালাতে চাইছে। পেছনের লোকগুলো কত দূরে আছে, সেটা বুঝতে একবার শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, আর তখনই মব চিৎকার করে উঠলো, ‘মার, মার শালাকে। ধর হারামজাদাটাকে। মার বিহারিটাকে’।
হঠাৎ করে ঠোক্কর খেয়ে ছেলেটা মাটিতে পড়ে গেল। আর তাঁর ওপর লাঠি, ইট আর ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো একদল হিংস্র উন্মত্ত দানব। কিছুক্ষণ পরে দেখি একটি রক্তাক্ত মানুষের প্রাণহীন দেহ রাস্তার ওপরে। তাই বলছিলাম, মব সহিংসতা নতুন নয়, অর্ধ শতাব্দী আগে আমি নিজে তা দেখেছি। আমি সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে কথা শেষ করি এই বলে, ‘আসলে কি জানেন, মানুষের দানবীয় পাশবিকতা মরে না, তারা শুধু ভোল পাল্টায়’।
আমার কথা শেষ হলে অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে আসে সারা ঘরে। আমার তরুণ সাংবাদিক বন্ধুটি একটু নড়েচড়ে বসেন। একটু অস্বস্তি নিয়ে এদিক-ওদিক তাকান। আমি হাতে ধরা চায়ের পেয়ালাটি প্রায় নিঃশব্দে টেবিলের ওপরে নামিয়ে রাখি। কিন্তু আলাপ আর জমে না। কিছুক্ষণ এটা-ওটা ছুটকো কথার পরে কাগজপত্র গুছিয়ে তিনি উঠে পড়েন। আমি তাঁকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেই।
ফিরে এসে চেয়ারে বসতে বসতে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, কেন এই মব সহিংসতা ঘটে। এটা তো কোন দুজন ব্যক্তির দ্বিপাক্ষিক সহিংসতা নয়। এটি একটি যূথবদ্ধ আক্রমণ। এমনকি দ্বিপাক্ষিক সহিংসতা হলেও, একটি পক্ষ অন্যদের ‘মবিলাইজ’ করে, তাঁতিয়ে তোলে। তারপর আক্রান্ত ব্যক্তি বা স্থাপনার ওপরে আক্রমণ চালায়। যারা জড়ো হয়, তারাও ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে না, ভালো-মন্দ বিচার করে না, কোনো যুক্তির ধার ধারে না। উত্তেজিত হয়ে, রোষ এবং জোশ উভয়ের বশেই তারা সহিংস কাজটি করে। কিন্তু কেন?
আশপাশের সব কিছু দেখে, কিছু কথা খুবই মনে হয়। তবে এগুলো আমার একেবারেই নিজস্ব ব্যাখ্যা। এগুলো ভ্রান্তও হতে পারে, অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তার ওপরে আমি কোনো মনস্তত্ত্ববিদ কিংবা অপরাধবিজ্ঞানীও নই। আমার কথাগুলো সমাজ-সচেতন সাধারণ একজন নাগরিকের কথা। মব সহিংসতার ঘটনাগুলো দেখে মনে হয়, এর কিছু পূর্বপরিকল্পিত, কিছু স্বতঃস্ফূর্ত। নিজের কোনো অপ-উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে কেউ মব সহিংসতা ঘটান। একা করতে পারবেন না কিংবা তার নিজস্ব দায় থাকবে না বলে তিনি অন্যদের মবিলাইজ করেন। তাছাড়া পন্থা হিসেবে এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং পুরনো শত্রুতার কারণে, কারো বা কোন কিছুর ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে, কিংবা স্রেফ লুটপাটের জন্যে মব সহিংসতার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন ঘটানো হয়।
অন্যেরা কেন যোগ দেন? হয় হুজুগে কিংবা ফাঁকতালে তাদের কোনো ইচ্ছে পূরণের জন্যে। এই যেমন, লুটপাট হলে তারাও কিছু নিতে পারবেন; ঘটনায় নারীরা সম্পৃক্ত থাকলে তাঁদের গায়ে হাত দিতে পারবেন, কিংবা ভাঙচুরের আনন্দে শরিক হতে পারবেন।
পরিকল্পিত মব সহিংসতার একটি উৎস থাকে ধর্ম, অন্যটি রাজনীতি। ধর্মের অবমাননা করা হয়েছে— এই যুক্তি কিংবা ধর্মীয় সংঘাত বিভিন্ন দেশে মব সহিংসতার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্যেও মব সহিংসতা পন্থা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। স্বতঃস্ফূর্ত মব সহিংসতায় কোনো নেতা বা পরিকল্পনাকারী থাকে না। কোনো ঘটনা বরদাস্ত না করতে পারলে বা যে কোনো কারণে অন্যকে শায়েস্তা করার জন্যেই যৌথভাবে সহিংস আক্রমণ চালানো হয়। স্বতঃস্ফূর্ত মব সহিংসতায় কারা যোগ দেয়? যোগ দেয় ‘মব জনতা’—যারা কর্মহীন, দরিদ্র, শিক্ষারহিত, পেটোয়া। এরা বেশিরভাগেরই বয়স ধারণা করি, ১৫ থেকে ২০ এর মধ্যে। মবের অংশ হওয়া এদের নেশা এবং পেশা দুটোই।
স্বতঃস্ফূর্ত মব সহিংসতার পেছনে কি জাতীয় মানসিকতা কাজ করে? আমার মনে হয়, তিন ধরনের মানসিকতা। প্রথমটি হচ্ছে ক্ষোভের। যাপিত-জীবনের নানান দিকে বহু নানান বঞ্চনা, সমাজে ন্যায্যতার অভাব, অসাম্য ও বৈষম্য মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। বিশেষত যখন এই জাতীয় বঞ্চনা, অন্যায়, অসাম্য ও বৈষম্য শুধু বঞ্চিত মানুষের অর্থনৈতিক জীবনেই দেখা যায় না, তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনেও ব্যাপ্ত। এই জাতীয় ক্ষোভ একটু একটু করে পুঞ্জীভূত হয়ে বঞ্চিত মানুষকে একদম খাদের কিনারে নিয়ে যায়। সুতরাং বঞ্চিত মানুষের বহুদিনের জমানো ক্ষোভ ফেটে পড়ে মব সহিংসতার মধ্যে। যৌথভাবে এটা করে বলে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের মধ্যে এক ধরনের সংহতি অনুভব করে।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে ক্ষমতায়ণের। বঞ্চিত মানুষ কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা ভোগ করে না, তাঁদের মতপ্রকাশের কোনো ক্ষেত্র নেই। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা প্রান্তিক অবস্থানে থাকে। একটা ক্ষমতাহীনতার অসহায়ত্ব তাদের কুরে কুরে খায়। মবের অংশ হিসেবে তারা যখন তাদের যা ইচ্ছে তা করতে পারে, সেটার মাধ্যমে সারা জীবনের বঞ্চিত মানুষেরা এক ধরনের ক্ষমতা অনুভব করে। মব সহিংসতার মাধ্যমে বঞ্চিত মানুষেরা ক্ষমতায়নের একটি স্বাদ পায়।
তৃতীয়টি হচ্ছে শ্রেণি-চেতনার। আমাদের সমাজে শ্রেণি-বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট—আয় ও সম্পদের বৈষম্য, সামাজিক অবস্থানের অসমতা, জীবন ধারার অসাম্য, সুযোগের ফারাক এত বেশি যে, সমাজে একটি তীব্র মেরুকরণ বিদ্যমান। যখন বঞ্চিত মানুষ দেখে যে ধনিক শ্রেণির এত কিছু আছে এবং তাঁদের কিছুই নেই। যেখানে ধনিক শ্রেণি বিলাসবহুল এক জীবনযাপন করছে, অথচ তাঁদের যাপিত-জীবন মানবেতর। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের কারণে অসমতার বিস্তার আর গভীরতা বঞ্চিত শ্রেণির কাছে আরও পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান। এর পরিপ্রেক্ষিতে, ধনিক শ্রেণির বিরুদ্ধে এক ধরনের বিদ্বেষ-বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মনে জন্ম নেয়। মব সহিংসতা ক্ষেত্র বিশেষে সে শ্রেণি-বৈষম্যের প্রতিফলনও হতে পারে। শ্রেণি-চেতনাও সেখানে একটি ভূমিকা পালন করতে পারে।
শেষের কথা বলি। মব ভায়োলেন্সকে ‘মব জাস্টিস’ বলে যৌক্তিকতা দানের প্রচেষ্টা পরিপূর্ণভাবে অন্যায়। ন্যায্যতা অনেক উঁচু মার্গের বিষয়। সহিংসতার মত বিকৃত একটি পন্থা দিয়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সমাজে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্যে যৌক্তিক, অর্থবহ, এবং প্রাসঙ্গিক অনেক পন্থা আছে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজের সেগুলোর ব্যবহার ও বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে ‘মব ভায়োলেন্সকে’ কিছুতেই ‘মবোক্রেসির’ সমার্থক বলা যায় না। একটি হিংসাত্মক প্রক্রিয়াকে ‘ডেমোক্রেসির’ সঙ্গে তুলনা করা অন্যায়। চূড়ান্ত বিচারে, ‘মব ভায়োলেন্স’ হিংস্র সহিংসতা ভিন্ন কিছুই নয়।
লেখক: জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগের ভূতপূর্ব পরিচালক
কথা হচ্ছিল তরুণ এক সাংবাদিকের সঙ্গে সহিংসতার সংস্কৃতি প্রসঙ্গে। আলাপের এক পর্যায়ে তিনি বললেন, ‘এই যে নতুন এক মব সহিংসতার বিস্তার ঘটছে’। ‘না’, থামিয়ে দিলাম তাঁকে, ‘যে মব সহিংসতার কথা বললেন, এটা নতুন নয়’, বলি আমার তরুণ সাংবাদিক বন্ধুটিকে। ‘আমাদের যৌবনে স্বাধীনতার পরে পরেই ঢাকার রাস্তায় মব সহিংসতা দেখেছি আমরা’, খোলাসা করি তাঁর কাছে।
একটা ঘটনার কথা মনে আছে। ১৯৭২ সালের প্রথম দিককার কথা। বায়তুল মোকাররমের পাশে রাস্তার ওপরের ঘটনা। আমি সবে জিপিওতে একটা চিঠি ফেলে রাস্তায় নেমেছি, ঠিক তখনই পল্টনের দিক থেকে ‘ধর, ধর, মার, মার’ শোরগোল শোনা গেল। তাকিয়ে দেখি, ১৮-১৯ বছরের এক তরুণ প্রাণপণে মসজিদের দিকে দৌড়াচ্ছে। আর তাঁর পেছনে একদল লোক ছুটছে। এক পলক তাকিয়ে দেখি, ছেলেটির নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে, গায়ের শার্ট শতচ্ছিন্ন, মাথার চুলগুলো ধুলো মাখা। বুঝলাম, ছেলেটি প্রাণভয়ে মব থেকে পালাতে চাইছে। পেছনের লোকগুলো কত দূরে আছে, সেটা বুঝতে একবার শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, আর তখনই মব চিৎকার করে উঠলো, ‘মার, মার শালাকে। ধর হারামজাদাটাকে। মার বিহারিটাকে’।
হঠাৎ করে ঠোক্কর খেয়ে ছেলেটা মাটিতে পড়ে গেল। আর তাঁর ওপর লাঠি, ইট আর ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো একদল হিংস্র উন্মত্ত দানব। কিছুক্ষণ পরে দেখি একটি রক্তাক্ত মানুষের প্রাণহীন দেহ রাস্তার ওপরে। তাই বলছিলাম, মব সহিংসতা নতুন নয়, অর্ধ শতাব্দী আগে আমি নিজে তা দেখেছি। আমি সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে কথা শেষ করি এই বলে, ‘আসলে কি জানেন, মানুষের দানবীয় পাশবিকতা মরে না, তারা শুধু ভোল পাল্টায়’।
আমার কথা শেষ হলে অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে আসে সারা ঘরে। আমার তরুণ সাংবাদিক বন্ধুটি একটু নড়েচড়ে বসেন। একটু অস্বস্তি নিয়ে এদিক-ওদিক তাকান। আমি হাতে ধরা চায়ের পেয়ালাটি প্রায় নিঃশব্দে টেবিলের ওপরে নামিয়ে রাখি। কিন্তু আলাপ আর জমে না। কিছুক্ষণ এটা-ওটা ছুটকো কথার পরে কাগজপত্র গুছিয়ে তিনি উঠে পড়েন। আমি তাঁকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেই।
ফিরে এসে চেয়ারে বসতে বসতে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, কেন এই মব সহিংসতা ঘটে। এটা তো কোন দুজন ব্যক্তির দ্বিপাক্ষিক সহিংসতা নয়। এটি একটি যূথবদ্ধ আক্রমণ। এমনকি দ্বিপাক্ষিক সহিংসতা হলেও, একটি পক্ষ অন্যদের ‘মবিলাইজ’ করে, তাঁতিয়ে তোলে। তারপর আক্রান্ত ব্যক্তি বা স্থাপনার ওপরে আক্রমণ চালায়। যারা জড়ো হয়, তারাও ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে না, ভালো-মন্দ বিচার করে না, কোনো যুক্তির ধার ধারে না। উত্তেজিত হয়ে, রোষ এবং জোশ উভয়ের বশেই তারা সহিংস কাজটি করে। কিন্তু কেন?
আশপাশের সব কিছু দেখে, কিছু কথা খুবই মনে হয়। তবে এগুলো আমার একেবারেই নিজস্ব ব্যাখ্যা। এগুলো ভ্রান্তও হতে পারে, অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তার ওপরে আমি কোনো মনস্তত্ত্ববিদ কিংবা অপরাধবিজ্ঞানীও নই। আমার কথাগুলো সমাজ-সচেতন সাধারণ একজন নাগরিকের কথা। মব সহিংসতার ঘটনাগুলো দেখে মনে হয়, এর কিছু পূর্বপরিকল্পিত, কিছু স্বতঃস্ফূর্ত। নিজের কোনো অপ-উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে কেউ মব সহিংসতা ঘটান। একা করতে পারবেন না কিংবা তার নিজস্ব দায় থাকবে না বলে তিনি অন্যদের মবিলাইজ করেন। তাছাড়া পন্থা হিসেবে এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং পুরনো শত্রুতার কারণে, কারো বা কোন কিছুর ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে, কিংবা স্রেফ লুটপাটের জন্যে মব সহিংসতার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন ঘটানো হয়।
অন্যেরা কেন যোগ দেন? হয় হুজুগে কিংবা ফাঁকতালে তাদের কোনো ইচ্ছে পূরণের জন্যে। এই যেমন, লুটপাট হলে তারাও কিছু নিতে পারবেন; ঘটনায় নারীরা সম্পৃক্ত থাকলে তাঁদের গায়ে হাত দিতে পারবেন, কিংবা ভাঙচুরের আনন্দে শরিক হতে পারবেন।
পরিকল্পিত মব সহিংসতার একটি উৎস থাকে ধর্ম, অন্যটি রাজনীতি। ধর্মের অবমাননা করা হয়েছে— এই যুক্তি কিংবা ধর্মীয় সংঘাত বিভিন্ন দেশে মব সহিংসতার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্যেও মব সহিংসতা পন্থা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। স্বতঃস্ফূর্ত মব সহিংসতায় কোনো নেতা বা পরিকল্পনাকারী থাকে না। কোনো ঘটনা বরদাস্ত না করতে পারলে বা যে কোনো কারণে অন্যকে শায়েস্তা করার জন্যেই যৌথভাবে সহিংস আক্রমণ চালানো হয়। স্বতঃস্ফূর্ত মব সহিংসতায় কারা যোগ দেয়? যোগ দেয় ‘মব জনতা’—যারা কর্মহীন, দরিদ্র, শিক্ষারহিত, পেটোয়া। এরা বেশিরভাগেরই বয়স ধারণা করি, ১৫ থেকে ২০ এর মধ্যে। মবের অংশ হওয়া এদের নেশা এবং পেশা দুটোই।
স্বতঃস্ফূর্ত মব সহিংসতার পেছনে কি জাতীয় মানসিকতা কাজ করে? আমার মনে হয়, তিন ধরনের মানসিকতা। প্রথমটি হচ্ছে ক্ষোভের। যাপিত-জীবনের নানান দিকে বহু নানান বঞ্চনা, সমাজে ন্যায্যতার অভাব, অসাম্য ও বৈষম্য মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। বিশেষত যখন এই জাতীয় বঞ্চনা, অন্যায়, অসাম্য ও বৈষম্য শুধু বঞ্চিত মানুষের অর্থনৈতিক জীবনেই দেখা যায় না, তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনেও ব্যাপ্ত। এই জাতীয় ক্ষোভ একটু একটু করে পুঞ্জীভূত হয়ে বঞ্চিত মানুষকে একদম খাদের কিনারে নিয়ে যায়। সুতরাং বঞ্চিত মানুষের বহুদিনের জমানো ক্ষোভ ফেটে পড়ে মব সহিংসতার মধ্যে। যৌথভাবে এটা করে বলে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের মধ্যে এক ধরনের সংহতি অনুভব করে।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে ক্ষমতায়ণের। বঞ্চিত মানুষ কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা ভোগ করে না, তাঁদের মতপ্রকাশের কোনো ক্ষেত্র নেই। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা প্রান্তিক অবস্থানে থাকে। একটা ক্ষমতাহীনতার অসহায়ত্ব তাদের কুরে কুরে খায়। মবের অংশ হিসেবে তারা যখন তাদের যা ইচ্ছে তা করতে পারে, সেটার মাধ্যমে সারা জীবনের বঞ্চিত মানুষেরা এক ধরনের ক্ষমতা অনুভব করে। মব সহিংসতার মাধ্যমে বঞ্চিত মানুষেরা ক্ষমতায়নের একটি স্বাদ পায়।
তৃতীয়টি হচ্ছে শ্রেণি-চেতনার। আমাদের সমাজে শ্রেণি-বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট—আয় ও সম্পদের বৈষম্য, সামাজিক অবস্থানের অসমতা, জীবন ধারার অসাম্য, সুযোগের ফারাক এত বেশি যে, সমাজে একটি তীব্র মেরুকরণ বিদ্যমান। যখন বঞ্চিত মানুষ দেখে যে ধনিক শ্রেণির এত কিছু আছে এবং তাঁদের কিছুই নেই। যেখানে ধনিক শ্রেণি বিলাসবহুল এক জীবনযাপন করছে, অথচ তাঁদের যাপিত-জীবন মানবেতর। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের কারণে অসমতার বিস্তার আর গভীরতা বঞ্চিত শ্রেণির কাছে আরও পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান। এর পরিপ্রেক্ষিতে, ধনিক শ্রেণির বিরুদ্ধে এক ধরনের বিদ্বেষ-বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মনে জন্ম নেয়। মব সহিংসতা ক্ষেত্র বিশেষে সে শ্রেণি-বৈষম্যের প্রতিফলনও হতে পারে। শ্রেণি-চেতনাও সেখানে একটি ভূমিকা পালন করতে পারে।
শেষের কথা বলি। মব ভায়োলেন্সকে ‘মব জাস্টিস’ বলে যৌক্তিকতা দানের প্রচেষ্টা পরিপূর্ণভাবে অন্যায়। ন্যায্যতা অনেক উঁচু মার্গের বিষয়। সহিংসতার মত বিকৃত একটি পন্থা দিয়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সমাজে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্যে যৌক্তিক, অর্থবহ, এবং প্রাসঙ্গিক অনেক পন্থা আছে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজের সেগুলোর ব্যবহার ও বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে ‘মব ভায়োলেন্সকে’ কিছুতেই ‘মবোক্রেসির’ সমার্থক বলা যায় না। একটি হিংসাত্মক প্রক্রিয়াকে ‘ডেমোক্রেসির’ সঙ্গে তুলনা করা অন্যায়। চূড়ান্ত বিচারে, ‘মব ভায়োলেন্স’ হিংস্র সহিংসতা ভিন্ন কিছুই নয়।
লেখক: জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগের ভূতপূর্ব পরিচালক

রাজধানীর বেইলি রোড, মিন্টো রোড ও হেয়ার রোড মন্ত্রিপাড়া হিসেবে পরিচিত। এসব এলাকার আবাসিক ভবনগুলোয় মন্ত্রীরা বসবাস করেন। বর্তমানে সেখানে আছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাসহ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। বাড়িগুলো বনেদি। বিশাল জায়গাজুড়ে। খোলামেলা। কিন্তু তারপরও ভবিষ্যৎ সরকারের মন্ত
১৫ ঘণ্টা আগে
লাশের কি কোনো রাজনীতি আছে? ৯ মাসের শিশুর লাশের গায়ে কি দলীয় লেবেল সাঁটা সম্ভব? বাগেরহাটের মর্মান্তিক ঘটনা ও কারাবন্দীর প্যারোল অধিকার প্রসঙ্গে লিখেছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মারুফ ইসলাম।
২ দিন আগে
একসময় যা ছিল উগ্রবাদী প্রচারপুস্তকের স্লোগান, আজ তা আমেরিকার রাষ্ট্রীয় ভাষ্য। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে নাৎসি মতাদর্শ লালন ও প্রচারের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
২ দিন আগে
আজকের সমাজে আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে ক্ষণিকের আনন্দ আমাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। মোবাইল স্ক্রলের তৃপ্তি, ফেসবুক বা রিলসের অন্তহীন প্রবাহ, কিংবা ভার্চুয়াল বিনোদনের সাময়িক স্বস্তি—এসবই আমাদের ক্লান্ত মনকে মুহূর্তের জন্য আরাম দেয়।
২ দিন আগে