leadT1ad

সংকটের পাহাড়ে উচ্চাশার বাজেট, পরীক্ষা বাস্তবায়নে

প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৬, ২৩: ৩১
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রথম বাজেট দিয়ে উচ্চাশার বাণী শোনালেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। স্ট্রিম গ্রাফিক

পিছু ছাড়ছে না সংকট। চার বছরের বেশি দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতির জালে আটকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধি স্মরণকালের নিম্নতম, ৪ শতাংশের ঘরে। কর-জিডিপির অনুপাতও মাত্র ৮। সামষ্টিক অর্থনীতির সব সূচকই দুর্বল। তরুণদের জন্য শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে বাড়ছে দারিদ্র্য। পাহাড়সম ঋণের বোঝা নিয়ত বাড়িয়ে চলেছে দেনা শোধের চাপ।

অন্তর্বর্তী সরকার মাঝে অপেক্ষাকৃত ছোট বাজেট দিয়েও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। আগের অর্থবছরগুলোতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বড় বাজেটও বাস্তবায়নের নজির নেই। তারপরও দুই দশক পর ক্ষমায় ফিরে ঝুঁকি নিল বিএনপি সরকার। জাতীয় সংসদে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রথম বাজেট দিয়ে উচ্চাশার বাণী শোনালেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বাজেট বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল বাজেটের যে অর্থায়ন কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে, তা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন বিরোধী রাজনৈতিক শিবির ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের।

এরই মধ্যে বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগও (সিপিডি) তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়ন ‘দুরূহ’ বলেছে।

বর্তমানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি চার শতাংশের কিছুটা বেশি। সেই প্রেক্ষাপটে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার বর্তমানে ৯ শতাংশের ওপরে। আগামী অর্থবছরে এটি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসবে বলে প্রত্যাশা করছে সরকার। এছাড়া বাজেটে অর্থায়নের প্রধান কৌশল হিসেবে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি মেটানো হবে দেশীয় ও বিদেশি ঋণ নিয়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ এই অঙ্কের ধারেকাছেও নেই। এমন বাস্তবতায় ঘোষিত বাজেট কতটুকু বাস্তবায়ন হবে, সেটি জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন পর্যন্ত।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর আদায় করেছে ৩ লাখ ২৯ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। বাকি দুই মাসে সর্বোচ্চ আরও ৮০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ হতে পারে। সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ কীভাবে সম্ভব, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা বাজেট প্রস্তাবনায় নেই। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের যে লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, সেটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে কিংবা কোন খাতে কত কর্মসংস্থান হবে, তারও সুনির্দিষ্ট বিবরণ মেলেনি।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন পরিস্থিতিও নাজুক। চলতি অর্থবছর শেষে এই এডিপি বাস্তবায়ন ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে না। সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার প্রস্তাবিত এডিপি বাস্তবায়ন কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মনে নানা প্রশ্ন। অবশ্য সরকারের দাবি, এই নতুন এডিপি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত, অবকাঠামো শক্তিশালী এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নিয়ে ডিজাইন করা হয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির এই সংকট মুহূর্তে পাহাড়সম সমস্যা সমাধানে অর্থমন্ত্রী যে উচ্চাভিলাষী বাজেট দিলেন, তার অর্থায়ন নিশ্চিত এবং খাতভিত্তিক লক্ষ্য সঠিকভাবে অর্জন করার ওপরই নির্ভর করবে সাফল্য।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন

গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি যে ইশতেহার দিয়েছিল, সেখানে অবকাঠামোর পরিবর্তে সামাজিক খাতে জোর ছিল। বাজেটেও সেটির প্রতিফলন দেখা গেছে। দীর্ঘদিন পর শিক্ষাখাতে এককভাবে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও বেড়েছে বরাদ্দ। তবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যেসব কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত, সেগুলো কোনো একক মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করে না। সেই বিবেচনায় শিক্ষাখাতেই সর্বোচ্চ বাজেট দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যখাতেও রয়েছে অনেক ইতিবাচক প্রস্তাব।

সংসদে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ছবি: পিআইডি
সংসদে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ছবি: পিআইডি

চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এই দুই খাতের সম্মিলিত বরাদ্দ প্রায় ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজেট নথি অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই দুই খাত সম্মিলিতভাবে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা পেতে যাচ্ছে, যা চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২১ কোটি। শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ থাকছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এই বরাদ্দের মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০২ কোটি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪৬ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।

একইভাবে স্বাস্থ্য খাতেও সরকার বিশেষ মনোযোগের প্রমাণ রেখেছে। স্বাস্থ্যখাতের মোট বরাদ্দ চলতি বছরের ২৮ হাজার ৫৪ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বরাদ্দ গত বছরের সংশোধিত বাজেটের (২১ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা) তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বাড়িয়ে ৪৯ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারের এই বড় লাফ নিঃসন্দেহে প্রশংসার।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ আহামরি বাড়ানো হয়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই খাতে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছিল ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। প্রতিরক্ষা খাতের জন্য মোট ৪২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা বেশি। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এসব ক্ষেত্রে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এখন এগুলোর বাস্তব রূপায়ন হয় কিনা, সেটিই দেখার।

বাস্তবে বিগত কয়েক বছর ধরে বাজেটের ব্যয়ের যে গতিধারা, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো সহজ উপায় আপাতত নেই। অবকাঠামো খাতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা এবারো বজায় রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় এখনো উচ্চ পর্যায়ে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ফলে সেখানেও বড় অঙ্কের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে একক সর্ববৃহৎ বরাদ্দ পেয়েছে অর্থ বিভাগ– ৩ লাখ ১৯ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এটি মূলত সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি ও সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হবে। জনপ্রশাসনে বাজেটে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং সুদের পেছনেই ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ থাকছে। এই বিশাল পরিচালন ব্যয় মিটিয়ে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।

সার্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে ইতোমধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এই বাজেটের বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সংস্থার সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ‘অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে চিন্তাশীল’ অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এই বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও মানবিক অর্থনীতি গড়ার যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, তা বেশ বিচক্ষণ। তবে, দেশের বর্তমান ‘অত্যন্ত দুর্বল’ আর্থিক কাঠামোর কারণে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে রাজস্ব আয়ের প্রাক্কলন ও বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ড. দেবপ্রিয়। তাঁর মতে, বাজেটের সুন্দর পরিকল্পনা কতটুকু সফল হবে, তা এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে সরকারের বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও সংস্কারের দৃঢ়তার ওপর।

টানা দুই দশক পর জাতীয় বাজেট দিল বিএনপি। আগে দেশের সবচেয়ে সফল অর্থমন্ত্রী হিসেবে যাঁকে বিবেচনা করা হয়, প্রয়াত সাইফুর রহমান ১৯৯১ সালে বাজেটে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারে আসা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উত্তরাধিকারী হিসেবে সাইফুর রহমানের দায়িত্ব পালন করছেন। কাকতালীয়ভাবে এম সাইফুর রহমান পেশাদার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন, আমির খসরুও তা-ই। এখন জাতি অপেক্ষায়, সাইফুর রহমানের সংস্কারমুখী ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানোর পদক্ষেপ নতুন অর্থমন্ত্রী কতটা অনুসরণ করেন।

নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাজেটটি একাধারে আশা ও শঙ্কার এক অদ্ভুত দোলাচল। একদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো জনকল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করে সরকার ইতিবাচক আশাবাদ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, আয়ের বিশ্বাসযোগ্য উৎস ছাড়া বিশাল ঘাটতি ও ঋণের ওপর নির্ভরতা তৈরি করেছে নতুন উদ্বেগ। দেশের চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থানের খরা দূর এবং খেলাপি ঋণের পাহাড় কমানোর ক্ষেত্রে এই বাজেট কতটা কার্যকর দাওয়াই, তা এখনই বলা মুশকিল।

খাতভিত্তিক যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলোর সঠিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন কীভাবে নিশ্চিত হবে– তার ওপরই নির্ভর করবে এই বাজেটের চূড়ান্ত সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা। সাধারণ মানুষ বড় অঙ্কের খেলা দেখতে চায় না, তারা চায় স্বস্তি। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর পেশাদার দক্ষতা দিয়ে এই সংকট উত্তরণ করতে পারেন কিনা, সেটাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Ad 300x250

সম্পর্কিত