জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের অবৈধ অভ্যুত্থানের পর দুটি বিপদ

রাজান মেনন
রাজান মেনন

প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮: ৫৫
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অভিনব উপায়ে বলপ্রয়োগে আটক করে যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারে বলেছিলেন, তিনি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ শেষ করে বিশ্বজুড়ে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে সরে আসবেন। এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পুনর্গঠনে মনোযোগ দেবেন। কারণ তার মতে, অতিরিক্ত আমদানির কারণে যুক্তরাষ্ট্র শিল্পশূন্য হয়ে পড়েছে। ট্রাম্পের বিজয়ের পেছনে একক কোনো কারণ ছিল না। তবে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বক্তব্য অনেকের মনে দাগ কেটেছিল।

কিন্তু বাস্তবে ট্রাম্প ভিন্ন পথ নিলেন। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বলপ্রয়োগে আটক করেন। তার আগে গাজা ধ্বংসে ইসরায়েলকে পূর্ণ সমর্থন দেন। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালান। এতে বোঝা যায়, তিনিও আগের প্রেসিডেন্টদের মতোই সামরিক হস্তক্ষেপে আগ্রহী।

ট্রাম্প আগে থেকেই মাদুরোকে লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন। মাদুরোকে ধরিয়ে দিতে তিনি ৫ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেন। ভেনেজুয়েলার বন্দর অবরোধ করেন। মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ তোলেন। তবু খুব কম মানুষই ভেবেছিল, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি একটি দেশে ঢুকে সেখানকার প্রেসিডেন্টকে ধরে নিয়ে যাবে।

মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে মাদক পাচার ও মাদক-সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ। এই অভিযোগ অস্পষ্ট হলেও ভয়ংকরভাবে উপস্থাপিত। এর মাধ্যমে একটি সন্দেহজনক ও অবৈধ পদক্ষেপের ন্যায্যতা প্রতিপাদনের চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। মাদুরো যে সরাসরি মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত, তা প্রমাণিত নয়। ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি ছিল এমন দাবিও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

ভেনেজুয়েলায় অনেক সমস্যা আছে। সেখানে মাদকচক্র ও কর্তৃত্ববাদী শাসন রয়েছে। কিন্তু এসব কারণে একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করা যায় না। যদি খারাপ শাসনই অপহরণের কারণ হয়, তাহলে ট্রাম্পের সামনে দীর্ঘ তালিকা রয়েছে। সেই তালিকায় এমন শাসকরাও আছেন, যুক্তরাষ্ট্র যাদের অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে সমর্থন দেয়।

আন্তর্জাতিক আইনের আত্মরক্ষার ধারা দিয়ে এই অভিযানের ন্যায্যতা প্রতিপাদন করা যায় না। ভেনেজুয়েলা কখনো যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণের হুমকি দেয়নি। আক্রমণের সামর্থ্যও তাদের নেই। বরং উল্টো ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর হামলা চালিয়েছে। নৌ-অবরোধের মতো যুদ্ধকালীন পদক্ষেপ নিয়েছে।

ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান তাকে এই হস্তক্ষেপের ক্ষমতা দেয়। তিনি বলেন, মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া তার দায়িত্ব। কিন্তু ভেনেজুয়েলা কোনো মার্কিন নাগরিককে হুমকি দেয়নি। কারো ক্ষতিও করেনি। বরং ট্রাম্প আগেই মাদুরোর বিরুদ্ধে চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছিলেন। মাদুরো এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে হামলার অজুহাত দিতেন না।

ট্রাম্পের প্রধান অভিযোগ হলো, মাদুরোর সহযোগিতায় ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল পাঠিয়েছে। ফেন্টানিল একটি কৃত্রিম আফিম জাতীয় মাদক। এটি মরফিনের চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ গুণ শক্তিশালী। মাত্র ২ মিলিগ্রামই মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

বাস্তবে ট্রাম্প ভিন্ন পথ নিলেন। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বলপ্রয়োগে আটক করেন। তার আগে গাজা ধ্বংসে ইসরায়েলকে পূর্ণ সমর্থন দেন। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালান। এতে বোঝা যায়, তিনিও আগের প্রেসিডেন্টদের মতোই সামরিক হস্তক্ষেপে আগ্রহী।

যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ ফেন্টানিল ব্যবহারে বহু মানুষ মারা গেছে। এটি একটি বাস্তব সংকট। মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে সিনথেটিক মাদকজনিত মৃত্যু ছিল ৭৮২ জন। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ হাজার ৭৭৬ জনে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা কমে আনুমানিক ৪৭ হাজার ৭৩৫-এ নেমেছে। তবুও ক্ষয়ক্ষতি বিপুল।

হোয়াইট হাউসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে অবৈধ আফিম জাতীয় মাদকের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে মৃত্যু, চিকিৎসা ব্যয়, অপরাধ এবং শ্রমশক্তি হারানোর খরচ।

প্রশ্ন হলো, এই সব কিছুর সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক কী। যুক্তরাষ্ট্রে যে ফেন্টানিল পাচার হয়, তার প্রায় সবটাই আসে মেক্সিকো হয়ে। এই মাদকের উপাদান আসে চীন থেকে। এ কথা ট্রাম্প প্রশাসন নিজেই স্বীকার করেছে। তবু ট্রাম্প সেপ্টেম্বরে দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার উপকূলে নৌকায় হামলা চালানো হয়েছে। কারণ নৌকাগুলোতে সাদা পাউডারের বস্তা ভর্তি ছিল। ট্রাম্পের দাবি যে এগুলোর বেশিরভাগই ফেন্টানিলের মতো মাদক।

ট্রাম্প আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার অপরাধী চক্র ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’র সঙ্গে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরাসরি যোগ আছে। তিনি দাবি করেন, এই গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণের হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি। এই অপরাধী চক্রের কোনো সেনাবাহিনীও নেই। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদুরো সরকার এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ভেনেজুয়েলা আগে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও জমি ‘চুরি’ করেছে। তিনি বলেন, এই সম্পদ তিনি ফেরত নেবেন। এই অভিযোগেরও কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

ভেনেজুয়েলা ১৯৭৬ সাল থেকে নিজেদের তেল শিল্প জাতীয়করণ শুরু করে। ১৯৯৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ এই নীতিকে আরও সম্প্রসারিত করেন। ২০০৭ সালে তিনি নির্দেশ দেন, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ ওরিনোকো অঞ্চলের তেল প্রকল্পে সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা নেবে।

এই প্রকল্পে যুক্ত ছিল এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপসের মতো মার্কিন তেল কোম্পানি। তারা শর্ত মানতে রাজি না হয়ে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। তবে শেভরন, বিপি, নরওয়ের স্ট্যাটঅয়েল ও ফ্রান্সের টোটাল সেখানে কাজ চালিয়ে যায়। তবু কখনোই এমন ছিল না যে, ভেনেজুয়েলার তেল বা জমির মালিক যুক্তরাষ্ট্র সরকার বা কোনো মার্কিন কোম্পানি ছিল। সুতরাং চুরির অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

ট্রাম্পের এই হস্তক্ষেপ অন্তত দুটি কারণে উদ্বেগজনক।

মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে মাদক পাচার ও মাদক-সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ। এই অভিযোগ অস্পষ্ট হলেও ভয়ংকরভাবে উপস্থাপিত। এর মাধ্যমে একটি সন্দেহজনক ও অবৈধ পদক্ষেপের ন্যায্যতা প্রতিপাদনের চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি।

প্রথমত, মাদুরোকে আটক করার পর কী হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও কার্যকর রয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীও অক্ষত আছে। বর্তমানে একজন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আছেন। তিনি ডেলসি রোদ্রিগেজ। তিনি ২০১৮ সাল থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তবে রাস্তায় প্রতিবাদ যদি রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নেয়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে। ট্রাম্প যদি আরও হস্তক্ষেপমূলক পদক্ষেপ নেন, এবং তা প্রতিরোধের মুখে পড়ে, তাহলেও অস্থিরতা বাড়বে।

ভেনেজুয়েলার প্রধান বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো আগেই স্বাগত জানিয়েছিলেন মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে। তিনি ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। মাদুরো আটক হওয়ার পর তিনি একে ‘স্বাধীনতার সময়’ বলে অভিহিত করেন। এতে ট্রাম্প আরও এগোনোর সুযোগ পেতে পারেন।

তবে ট্রাম্প নিজেই বলেন, ভেনেজুয়েলায় মাচাদোর সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা নেই। ইতিমধ্যে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে। এতে স্পষ্ট হয়, তিনি শুধু মাদুরোকে বিচারের মুখে তুলতেই চান না। তিনি ভেনেজুয়েলার তেল খাত মার্কিন কোম্পানির জন্য খুলে দেওয়ার অধিকারও নিজের হাতে নিচ্ছেন।

দ্বিতীয়ত, ইরান বর্তমানে দেশজুড়ে বিদ্রোহের মুখে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রতিবাদকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত থাকবে। ইতিমধ্যে কিছু মানুষ ইরানে নিহত হয়েছেন। ভেনেজুয়েলায় নেওয়া পদক্ষেপ ট্রাম্পকে ইরানেও সরকার পরিবর্তনের পথে উৎসাহিত করবে কিনা তা নিশ্চিত নয়।

তবে যদি তিনি ইরানের সংকটে জড়িয়ে পড়েন, তার পরিণতি হবে আরও ভয়াবহ। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য এই ঝুঁকি ভেনেজুয়েলার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। আর ট্রাম্পের আচরণ কখনোই আগে থেকে অনুমান করা যায় না।


লেখক: রাজান মেনন নিউইয়র্ক সিটি কলেজে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এমেরিটাস। তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাল্টজম্যান ইনস্টিটিউট অব ওয়ার অ্যান্ড পিস স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

সম্পর্কিত