গত সপ্তাহে জেনেভায় মার্কিন ও ইরানি কূটনীতিকরা ওমানের মধ্যস্থতায় আরও এক দফা আলোচনায় বসেছিলেন। কিন্তু এর ফলাফল ঠিক পরিষ্কার ছিল না। ইরান যখন আলোচনায় ‘ভালো অগ্রগতি’র দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্র তখন বলছে অগ্রগতি হয়েছে ‘সামান্যই’। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তরফ থেকে ইরানে হামলার হুমকি আসতে থাকে। এই উত্তেজনার চরম পরিণতি দেখা গেল আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন স্থানে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাল।
এই হামলা একদিকে ভয়াবহ এক যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা তৈরি করেছে। আবার কেউ কেই বলছেন ইরানকে চুক্তিতে রাজি করাতে চার প্রয়োগের কৌশল হিসেবে এটি একটি সতর্কতামূলক হামলা।
আজ শনিবার ইরানে হামলা চালয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বাহিনী। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, এই আলোচনাগুলো কি কেবল যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সময়ক্ষেপণের একটি কৌশল ছিল?
যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক শক্তির মুখে কেউ কেউ বলছেন, ইরানের জন্য একমাত্র পথ হলো আমেরিকার সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো, তা যতই অন্যায্য হোক না কেন। যদিও বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজেটের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কিছুই নয়, কিন্তু ওয়াশিংটনের দ্বারা আবারও একটি অনিশ্চিত দুর্বল চুক্তির মাধ্যমে আত্মসমর্পণই তেহরানের একমাত্র বিকল্প নাও হতে পারে।
মার্কিন এই আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এবং জেতার জন্য ইরানের সামনে আরও একটি পথ খোলা আছে।
অতীত আলোচনার অভিজ্ঞতা
আমেরিকার সঙ্গে ইরানের বর্তমান আলোচনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে চলবে না। ইরানের জন্য আমেরিকার সাথে যেকোনো কূটনৈতিক আলোচনার পেছনেই রয়েছে ‘জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন’ বা জেসিপিওএ চুক্তির পূর্বের অভিজ্ঞতা।
২০১৫ সালে আমেরিকা, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইরানের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার বিনিময়ে দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা ছিল। চুক্তিতে কিছু অন্যায্য শর্ত থাকা সত্ত্বেও তেহরান তা মেনে নিয়েছিল। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও (আইএইএ) বারবার যাচাই করে নিশ্চিত করেছে যে ইরান তার সমস্ত বাধ্যবাধকতা পূরণ করেছে।
কিন্তু বিনিময়ে, চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে আমেরিকা তার কথা রাখেনি। ২০১৮ সালে, ট্রাম্প একতরফাভাবে চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন এবং ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার লক্ষ্যে আবারও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
এটি ছিল একটি কঠিন বাস্তবতা যা ইরানকে মনে করিয়ে দেয় যে আমেরিকার প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্য নয়। যে নেতা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির জন্য মিত্রদের স্বার্থেরও তোয়াক্কা করেননি, তিনি যে প্রতিপক্ষের স্বার্থকে সম্মান করবেন না, তা বলাই বাহুল্য। এমনকি যদি হোয়াইট হাউসে একজন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টও থাকতেন, তাহলেও চুক্তি টিকে থাকবে তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। আমেরিকার বিভক্ত রাজনৈতিক আবহে, একজন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্তই কার্যকর থাকে।
সৌদি আরব, ওমান, তুরস্ক ও কাতার এখন ট্রাম্পকে সংযম প্রদর্শনের জন্য অনুরোধ করছে। এই প্রতিবেশীসুলভ কূটনীতির উপর ভিত্তি করে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও একটি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার জন্য বিনিয়োগের মাধ্যমে এই অঞ্চলে আমেরিকার আরেকটি বড় যুদ্ধ ঠেকানো সম্ভব।
আমেরিকার জন্য আলোচনা কখনো কখনো একটি লোকদেখানো কৌশলও হতে পারে, যার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে একটি মিথ্যা নিরাপত্তাবোধ দিয়ে শান্ত রাখা। গত বছর, যখন মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা ওমানে আলোচনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আমেরিকার অন্যতম প্রধান মিত্র ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরু করে। যদিও আমেরিকা সরাসরি জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে, তবে তারা আগে থেকে জানার কথা স্বীকার করেছে। দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিবেচনা করলে, এটা স্পষ্ট যে এই বিমান হামলার জন্য আমেরিকার নীরব সমর্থন ছিল।
ইসরায়েলের সঙ্গে আমেরিকার বিশেষ সম্পর্কের অর্থ হলো, ওয়াশিংটন এমন একটি ইরান সরকারের প্রতি মৌলিকভাবে বিদ্বেষী যারা ইসরায়েলকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে দেখে। আর তাই, ট্রাম্পের লক্ষ্য কোনো টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানো নয়, বরং এটা নিশ্চিত করা যে ইরান যেন কখনই তার দাবি পুরোপুরি পূরণ করতে না পারে, যাতে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে স্থায়ীভাবে সর্বোচ্চ চাপ এবং শত্রুতা বজায় রাখার ন্যায্যতা খুঁজে পান। এই প্রেক্ষাপটে এবং সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার আলোকে, ইরানের জন্য মার্কিন প্রতিশ্রুতি এবং আলোচনার উপর নির্ভর করা বোকামি হবে।
ইরানের জয়ের পথ খোলা আছে
বর্তমান মার্কিন-ইরান সংকট একটি উচ্চ ঝুঁকির খেলা, যার সম্ভাব্য পরিণতি একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ। আমেরিকা তার অপ্রতিরোধ্য সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে প্রাথমিক বিজয় অর্জন করতে পারলেও, ইরানের পার্বত্য অঞ্চলে একটি দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের ফাঁদে আটকা পড়তে পারে। অন্যদিকে, ইরান হয়তো শেষ পর্যন্ত একটি মার্কিন আগ্রাসন প্রতিহত করতে সক্ষম হবে—যেমনটা তার প্রতিবেশী আফগানিস্তান করেছে—কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় দেশটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।
তার মানে এই নয় যে ইরানকে পিছু হটতে হবে। গ্রিনল্যান্ড সংকট এবং চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ দেখিয়েছে যে, ট্রাম্পের যুদ্ধের হুমকি দেওয়ার প্রবণতা থাকলেও তিনি নিজে লোকসান এড়িয়ে চলতে চান। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং চীন ইরানের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, তবুও দৃঢ় সংকল্প দেখাতে পারলে ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করা যেতে পারে।
আর এই প্রতিরোধের রাস্তায় তেহরানকে একা থাকতে হবে না। তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে এমন অনেক বড় শক্তি রয়েছে যারা বুঝতে পারছে যে আমেরিকার নেতৃত্বে আরেকটি বিপর্যয়কর যুদ্ধ তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্যও ভালো হবে না। ইরান এই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগাতে পারে এবং তাকে তা-ই করা উচিত।
বহু বছর ধরে ইরান এই অঞ্চলে সংঘাতের নীতি অনুসরণ করেছিল, যতক্ষণ না তারা বুঝতে পারে যে একটি ‘প্রভাব বলয়’ তৈরি করতে গিয়ে আসলে তাদের নিরাপত্তা সংকট আরও বাড়ছে। এই উপলব্ধিই শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে নিয়ে যায়—একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ যা চীন, ওমান এবং ইরাকের মধ্যস্থতায় সম্ভব হয়েছিল। এর ফলে অন্যান্য আরব দেশগুলোর সঙ্গেও ইরানের সম্পর্কের উন্নতি ঘটে।
তিন বছর পর, সেই সিদ্ধান্তের সুফল পাওয়া যাচ্ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, সৌদি আরব, ওমান, তুরস্ক ও কাতার এখন ট্রাম্পকে সংযম প্রদর্শনের জন্য অনুরোধ করছে। এই প্রতিবেশীসুলভ কূটনীতির উপর ভিত্তি করে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও একটি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার জন্য বিনিয়োগের মাধ্যমে এই অঞ্চলে আমেরিকার আরেকটি বড় যুদ্ধ ঠেকানো সম্ভব।
শান্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ—এবং আমেরিকার ‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’ বা শক্তির জোরে দাবি আদায়ের কূটনীতি মোকাবিলার একমাত্র উপায়—মার্কিন সামরিক শক্তির সমান হওয়ার চেষ্টা করা নয়, যে প্রতিযোগিতায় ইরান নিশ্চিতভাবে হেরে যাবে। বরং প্রকৃত উপায় হলো প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে নিজের জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা।
- ইয়াং জিয়াওটং: হরাইজন ইনসাইটস সেন্টারের একজন গবেষক
আলজাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম