মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে এক নজিরবিহীন ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং আবুধাবিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইরান আমিরাতকে সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে। এই উত্তেজনার আগুনে নতুন ঘি ঢেলেছে ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’, যার মাধ্যমে আমিরাত ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে তেহরানের চিরশত্রুকে দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছে। ইরান আমিরাতের এই কৌশলগত পরিবর্তনকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছে এবং সেজন্য বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীর মাধ্যমে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তীব্রতর করছে। ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ছত্রছায়া এবং তেল আবিবের সাথে গোয়েন্দা সহযোগিতা আমিরাতকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করলেও, একই সাথে দেশটিকে ইরানের সরাসরি আগ্রাসনের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ২০২৪-২৫ সালের উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে আমিরাত এখন কেবল একটি অর্থনৈতিক হাব নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান এই ত্রিমুখী ক্ষমতার লড়াইয়ের এক জটিল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
গত পহেলা মার্চ, রবিবার মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের ‘ট্রুথফুল প্রমিজ ৪’ অপারেশন এই উত্তেজনার পারদকে নজিরবিহীন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যেখানে দুবাইয়ের মতো ব্যস্ততম বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোও সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং পাম জুমেইরাহ এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা আমিরাতের দীর্ঘদিনের নিরাপদ ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একই সাথে বাহরাইন ও কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার বিস্তৃতি ইঙ্গিত দেয় যে, পুরো অঞ্চলটি এখন এক মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। আরব আমিরাত এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বললেও, ইরানের এই বৈরী নীতি মূলত মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি সহিংস প্রতিক্রিয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির কেন্দ্রবিন্দু
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা বিমান ঘাঁটিতে হাজার হাজার মার্কিন সেনার উপস্থিতি এবং অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মোতায়েনকে ইরান তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে গণ্য করে। তেহরানের মতে, ওয়াশিংটন আমিরাতকে একটি ‘লঞ্চপ্যাড’ হিসেবে ব্যবহার করে পারস্য উপসাগরে তাদের ওপর নজরদারি ও সামরিক চাপ বজায় রাখছে। এরফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের যেকোনো বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ে আমিরাতের ওপর, যা দেশটিকে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
আল ধাফরা বিমান ঘাঁটি: কৌশলগত উত্তেজনার কেন্দ্র
আবুধাবিতে অবস্থিত আল ধাফরা বিমান ঘাঁটিটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক কেন্দ্র, যেখানে বর্তমানে প্রায় ৩,৫০০ মার্কিন সেনা এবং অত্যাধুনিক এফ-৩৫ ও প্রেডেটর ড্রোনের স্থায়ী উপস্থিতি রয়েছে। ২০২৪-২৫ সালের সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই ঘাঁটিটি ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল রেঞ্জের মধ্যে থাকায় তেহরান এটিকে তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রধান ‘থ্রেট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ইরান স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো সরাসরি সংঘাত শুরু হলে আমিরাতের এই ঘাঁটিটিই হবে তাদের প্রথম পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু। ফলে ওয়াশিংটনের সাথে আমিরাতের এই গভীর সামরিক অংশীদারিত্ব দেশটিকে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ড্রোন ও সাইবার হামলার প্রধান লক্ষ্যবিন্দুতে পরিণত করেছে।
প্রতিরক্ষা সহায়তা: সামরিক সক্ষমতা ও ইরানের প্রতিক্রিয়া
সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের অন্যতম আধুনিক সমরাস্ত্রের ভাণ্ডার গড়ে তুলছে, যার মূল যোগানদাতা যুক্তরাষ্ট্র; বিশেষ করে এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটার জেট এবং এমকিউ-৯বি ড্রোন ক্রয়ের চুক্তি ইরানকে চরম ক্ষুব্ধ করেছে। ২০২৪-২৫ সালের সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী, আমিরাত তার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অত্যাধুনিক ‘থাড’ এবং ‘প্যাট্রিয়ট’ মিসাইল সিস্টেমের আধুনিকায়ন নিশ্চিত করেছে। ইরান মনে করে, এই উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্রশস্ত্র পারস্য উপসাগরে ক্ষমতার ভারসাম্য আমিরাতের দিকে ঝুঁকিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যূহকে অকার্যকর করার ষড়যন্ত্র। এই সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রচেষ্টা তেহরানের কাছে কেবল আত্মরক্ষা নয়, বরং মার্কিন সহায়তায় একটি আঞ্চলিক সামরিক জোট গঠনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক
২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক দশকের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়ে ইরানকে কৌশলগতভাবে কোণঠাসা করে ফেলেছে, যা তেহরান তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম ‘লাল রেখা’ অতিক্রম হিসেবে গণ্য করে। ইসরায়েলের সাথে আমিরাতের এই প্রকাশ্য কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক মেলবন্ধন ইরানের দোরগোড়ায় তার প্রধান শত্রুর উপস্থিতিকে বৈধতা দিয়েছে, যা তেহরানের আঞ্চলিক আধিপত্যের পথে বড় বাধা। ইরান এই সম্পর্ককে কেবল দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নয়, বরং তাদের ঘিরে ফেলার একটি পশ্চিমা ও জায়োনিস্ট ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখে আমিরাতের ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়িয়ে চলেছে।
‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে গণ্য: ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
ইরান এবং তার মিত্র শক্তিগুলো আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে, যা ২০২৪-২৫ সালের ফিলিস্তিন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আরও তীব্র হয়েছে। তেহরান স্পষ্টভাবে মনে করে, এই কূটনৈতিক সম্পর্ক কেবল বাণিজ্য নয়, বরং ইরানের ওপর নজরদারি এবং আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করার জন্য একটি যৌথ সামরিক ও গোয়েন্দা ফ্রন্ট তৈরির প্রচেষ্টা। ইরান তার প্রক্সি নেটওয়ার্ককে এই চুক্তির বিরুদ্ধে সক্রিয় করে তুলেছে এবং আমিরাতকে বারবার সতর্ক করেছে যে, ইসরায়েলের সাথে যে কোনো ধরনের সামরিক সহযোগিতাকে তারা নিজেদের ওপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করবে। এই ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র আখ্যানটি ইরান তার অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক সমর্থকদের মধ্যে আমিরাত বিরোধী মনোভাব তৈরিতে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা: কৌশলগত ভারসাম্য পরিবর্তন
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস স্বাক্ষরের পর থেকে ইসরায়েল এবং আরব আমিরাতের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও নিরাপত্তা সহযোগিতা অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ইরানের জন্য একটি বড় কৌশলগত মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪-২৫ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উভয় দেশ তাদের অত্যাধুনিক সাইবার নিরাপত্তা প্রযুক্তি এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন-‘স্পাইডার’ সিস্টেম) একে অপরের সাথে শেয়ার করছে, যা ইরানের ড্রোন ও মিসাইল সক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে। এই নিরাপত্তা জোটের মাধ্যমে ইসরায়েল ইরানের সীমান্তবর্তী এলাকায় তাদের নজরদারি ক্ষমতা বাড়িয়েছে, যা তেহরানকে তার নিজস্ব আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ইরান স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে যে, আমিরাতের মাটি ব্যবহার করে ইসরায়েলের কোনো ধরনের গোয়েন্দা কার্যক্রম বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় করলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
প্রক্সি যুদ্ধ এবং প্রতীকী হামলা
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সাথে আমিরাতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার প্রতিক্রিয়ায়, ইরান নিজেদের পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মতো প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে আমিরাতে হামলা চালানোর কৌশল গ্রহণ করেছে। এই হামলাগুলো কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বরং আমিরাতের বাণিজ্যিক ভাবমূর্তিকে বিনষ্ট করার একটি প্রতীকী ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ হিসেবে কাজ করে। এর মাধ্যমে তেহরান ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে বার্তা দিতে চায় যে, তাদের মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন এবং আমিরাতকে ব্যবহার করে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে।
হুথি বিদ্রোহীরা: প্রক্সি যুদ্ধের সরাসরি হুমকি
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সরাসরি সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্রবিন্দুগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তেহরানের আগ্রাসী নীতির বাস্তবায়ন ঘটাচ্ছে। ২০২২ সালে আবুধাবির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং তেল স্থাপনায় ভয়াবহ হামলার পর, ২০২৪-২৫ সালেও হুথিরা নিয়মিত বিরতিতে আমিরাতের আকাশসীমায় ড্রোন পাঠানোর হুমকি বজায় রেখেছে, যার নেপথ্যে ইরানের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই হামলাগুলোর মূল লক্ষ্য হলো আমিরাতের স্থিতিশীল অর্থনীতি এবং বিনিয়োগকারী রাষ্ট্র হিসেবে এর বিশ্বব্যাপী ভাবমূর্তিকে চরম হুমকির মুখে ফেলা। ইরান হুথিদের আধুনিক প্রযুক্তিগত ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে যাতে আমিরাতকে সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকির মধ্যে রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতার মাশুল দিতে বাধ্য করা যায়।
অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি: বাণিজ্যিক কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত
ইরান বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ড দুবাইকে লক্ষ্যবস্তু করে এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য কেবল অবকাঠামো ধ্বংস নয়, বরং বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া। ইরান নিজে এবং তার সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে দুবাইয়ের জ্বালানি ডিপো, বন্দর ও জনবহুল এলাকায় সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয়াবহতা আমিরাতের জিডিপির ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই হামলার ভীতি সৃষ্টি করে ইরান আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের বার্তা দিতে চাইছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে আমিরাত আর নিরাপদ কোনো বাণিজ্যিক হাব নয়। একইসাথে এই কৌশলটি মার্কিন ও ইসরায়েলি মিত্রদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা যে, ইরানের ওপর যেকোনো চাপ প্রয়োগের বিপরীতে তারা মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো অচল করে দিতে সক্ষম। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরান সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে দুবাইয়ের আর্থিক খাতকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা করছে, যাতে আমিরাতের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া যায়। এই সম্মিলিত অর্থনৈতিক আগ্রাসন আমিরাতকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আঞ্চলিক কনফ্লিক্ট ও প্রক্সি লড়াইয়ের প্রভাব: সুদান ও ইয়েমেন
ইরান-আমিরাত দ্বন্দ্ব কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সমীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আফ্রিকান ও আরব ভূ-রাজনীতির প্রক্সি লড়াইও এতে বড় ভূমিকা রাখছে। ইয়েমেন কনফ্লিক্টে আরব আমিরাত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে সরাসরি অংশ নিয়ে ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, যার ফলে হুথিরা আমিরাতের জ্বালানি অবকাঠামো ও জনবহুল শহরগুলোকে তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করে নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধে আমিরাত জেনারেল হামদান দাগালোর নেতৃত্বাধীন আরএসএফ-কে সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা সুদানের বৈধ সেনাবাহিনীর মিত্র হিসেবে ইরানকে ক্ষুব্ধ করেছে। ইরান বর্তমানে সুদানের সেনাবাহিনীর সাথে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে এবং তাদের উন্নত ড্রোন ও প্রযুক্তি সহায়তা প্রদান করছে, যা সরাসরি আমিরাতের আঞ্চলিক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে। এই বিপরীতমুখী অবস্থান আফ্রিকার লোহিত সাগর তীরবর্তী অঞ্চলে ইরান ও আমিরাতের দ্বন্দ্বকে আরও গভীর ও বিপজ্জনক করেছে। মূলত, লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে আমিরাত এখন ইরানের প্রচ্ছন্ন ও সরাসরি আগ্রাসনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে, ইরান ও ইসরায়েল-আমেরিকার মধ্যকার তীব্র সংঘাত সংযুক্ত আরব আমিরাতকে এক নজিরবিহীন নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং আবুধাবির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা আমিরাতের দীর্ঘদিনের নিরাপদ বাণিজ্যিক হাবের ভাবমূর্তিকে চূর্ণ করেছে। ওয়াশিংটনের সাথে ঐতিহাসিক সামরিক মিত্রতা এবং ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত গোয়েন্দা সহযোগিতা আমিরাতকে রক্ষার চেষ্টা করলেও, তেহরানের আগ্রাসী নীতিতে তা কেবল ইরানের লক্ষ্যবস্তুকে আরও স্পষ্ট করেছে। হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে চালানো হামলা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হওয়ায়, আমিরাতকে চরম কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হচ্ছে। তবে ইরানের বৈরী নীতির মুখে টিকে থাকতে হলে আমিরাতকে তার পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
- সুমন সুবহান: কবি ও কথাশিল্পী