জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

সুন্দরবন দিবস: শুধু একদিনের উদযাপন নয়, চাই আমৃত্যু অঙ্গীকার

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬: ৪৩
কমে যাচ্ছে সুন্দরবনের কম লবণসহিষ্ণু সুন্দরীসহ অন্যান্য গাছ, কমছে বন্যপ্রাণীর বিচরণ ক্ষেত্রও। স্ট্রিম ছবি

আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, একই সঙ্গে সুন্দরবন দিবস। দিনটি কাকতালীয়ভাবে এক হলেও এর প্রতীকী গুরুত্ব অপরিসীম। ভালোবাসার লগ্ন যখন উদযাপিত হয়, তখন সেই ভালোবাসার দৃষ্টি দিয়ে যদি আমরা সুন্দরবনের দিকে তাকাই, তবে প্রকৃতিকে ভালোবাসার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সুন্দরবনের মতো মহাপ্রাণকে কোনো একটি নির্দিষ্ট দিবসের ফ্রেমে আটকে রাখা যৌক্তিক নয়। কারণ, সুন্দরবন রক্ষা করতে হলে আমাদের প্রতিনিয়ত, প্রতিটি মুহূর্তেই কাজ করতে হবে। তবু বিশেষ এই দিবসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানবিক প্রেমের মতোই প্রকৃতির প্রতি প্রেমও আমাদের অস্তিত্বের জন্য জরুরি।

আমরা প্রায়ই বলি, প্রকৃতি বাঁচলে আমরা বাঁচব। আমাদের মন, চারপাশের পরিবেশ এবং পারস্পরিক সম্পর্কগুলো সুন্দর রাখতে হলে প্রকৃতিকে সুস্থ রাখা আবশ্যক। প্রচলিত আপ্তবাক্য, ‘জীবে দয়া করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’। এখানে জীব বলতে উদ্ভিদ ও প্রাণী—সব মিলিয়েই প্রকৃতিকে বোঝানো হয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সুন্দরবন আমাদের প্রকৃতির এক বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে। তাই এই বনকে ভালোবাসা, আগলে রাখা এবং সংরক্ষণের দায় প্রতিটি মানুষের।

সুন্দরবনের কাছে আমাদের ঋণ অপরিশোধ্য। এই বন কেবল বাংলাদেশের নয়, পুরো অঞ্চলের অক্সিজেনের ভান্ডার। আমরা প্রতি মুহূর্তে নিঃশ্বাসের সঙ্গে যে মহামূল্যবান অক্সিজেন গ্রহণ করি, তার বড় জোগানদাতা গাছপালা ও সামুদ্রিক শৈবাল। সুন্দরবনকে অনায়াসেই আমরা এই অঞ্চলের ‘ফুসফুস’ বলতে পারি। শুধু অক্সিজেনই নয়; আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনে সুন্দরবনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। উপকূলীয় অঞ্চলের ঢাল হিসেবে সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস আর সমুদ্রের ভয়াল ঢেউ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে মায়ের মতো আগলে রাখে এই বন। আমাজন যেমন বিশ্ববাসীর কাছে এক রহস্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, সুন্দরবনও তেমনি বিশ্বের কাছে এক বিস্ময়কর ঐতিহ্য। এই বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষার দায় তাই আমাদের সবার।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সুন্দরবন আমাদের অন্নদাতা। গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবন আমাদের প্রায় ২৪ ধরনের ‘ইকোসিস্টেম সার্ভিস’ বা প্রাকৃতিক সেবা দিয়ে থাকে। এর মধ্যে মাছ, মধু, কাঠ ও পর্যটন অন্যতম। সুন্দরবনের ওপর ভিত্তি করে প্রত্যক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ এবং পরোক্ষভাবে উপকৃত হন ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ। এই সম্পর্ক একদিনে গড়ে ওঠেনি, এটি ঐতিহাসিক ও প্রাচীন। কিন্তু যখনই আমরা প্রকৃতি থেকে দূরে সরে গেছি বা প্রকৃতিকে ধ্বংস করেছি, তখনই আমাদের জীবিকা ও ঐতিহ্য হুমকির মুখে পড়েছে। ঢাকার বুড়িগঙ্গার দিকে তাকালে আমরা দেখি, নদী মরে যাওয়ায় সেখানকার জেলে সম্প্রদায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সুন্দরবনকে যদি আমরা রক্ষা করতে না পারি, তবে উপকূলীয় বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকাও একইভাবে বিপন্ন হবে, যা আমাদের কাম্য নয়।

সুন্দরবনের প্রতি আমাদের ভালোবাসা কেবল মুখে বা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, এর প্রকাশ ঘটতে হবে কাজে ও দায়িত্বে। প্রথমত, মানবসৃষ্ট হুমকিগুলো আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের বাঘের প্রধান খাবার চিত্রা হরিণ চোরাশিকারিদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে এবং মানুষ তা খাচ্ছে।

সুন্দরবনের প্রতি আমাদের ভালোবাসা কেবল মুখে বা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, এর প্রকাশ ঘটতে হবে কাজে ও দায়িত্বে। প্রথমত, মানবসৃষ্ট হুমকিগুলো আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের বাঘের প্রধান খাবার চিত্রা হরিণ চোরাশিকারিদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে এবং মানুষ তা খাচ্ছে। বাঘের খাবারের ৮০ ভাগই আসে এই হরিণ থেকে। আমাদের গরু, খাসি বা হাঁস-মুরগির মতো বিকল্প আমিষের উৎস আছে, কিন্তু বাঘের নেই। তাই আজকের দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত—আমরা কখনোই হরিণের মাংস খাব না। আমরা যদি হরিণ খাওয়া বন্ধ করি, তবে বাঘের খাদ্যশৃঙ্খল অটুট থাকবে এবং বাঘ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।

দ্বিতীয়ত, নাগরিক হিসেবে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। সুন্দরবন রক্ষায় যখনই কোনো হুমকি আসবে, আমাদের কথা বলতে হবে। সরকারের ওপর ইতিবাচক চাপ বজায় রাখতে হবে যাতে বন সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় লোকবল, অর্থায়ন এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়। সুন্দরবন নিয়ে কথা বলার জন্য গবেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু দেশপ্রেম ও সচেতনতা।

পরিশেষে বলব, সুন্দরবন কোনো একদিনের ভালোবাসার বস্তু নয়। একে ভালোবাসতে হবে সারা বছর, সারা জীবন। আমাদের অস্তিত্ব, ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের নৈতিক ও নাগরিক দায়িত্ব। আসুন, ভালোবাসার এই দিনে আমরা সুন্দরবনকে আগলে রাখার শপথ নিই।

  • এম এ আজিজ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক
Ad 300x250

সম্পর্কিত