জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

রাষ্ট্র সংস্কারের ম্যান্ডেট ও জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন: বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ে পরিবর্তনের বার্তা কতটুকু

প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১: ৪৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচন কেবল একটি ভোটাভুটি নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের গণতান্ত্রিক প্রতিফলন। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নিরঙ্কুশ ও ভূমিধস বিজয় কেবল একটি নিয়মিত ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং এটি দীর্ঘ দেড় দশকের রুদ্ধশ্বাস রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে জনগণের মুক্তি এবং রাষ্ট্রকাঠামো আমূল পরিবর্তনের এক শক্তিশালী ম্যান্ডেট।

ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষ যে রায় দিয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনগণ কেবল সরকার পরিবর্তন চায়নি, তারা রাষ্ট্রব্যবস্থার গুণগত রূপান্তর বা 'স্টেট রিফর্ম'-এর পক্ষে তাদের সুচিন্তিত রায় প্রদান করেছে। এই জয় যেমন বিএনপির জন্য এক বিশাল স্বীকৃতি, তেমনি এটি জনগণের পক্ষ থেকে দেওয়া এক কঠিন দায়বদ্ধতার সনদ।

এবারের নির্বাচনে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতি ছিল গতানুগতিক নির্বাচনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘প্যারাডাইম শিফট’, বাংলাদেশে ঠিক তাই ঘটেছে। দীর্ঘ সময় ধরে দেশে যে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীতন্ত্র এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, ভোটাররা তার মূলে আঘাত করেছে।

বিএনপির এই বিজয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের ‘পরিবর্তনের স্পৃহা’। মানুষ দেখেছে কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এবারের ভোটে জন-আকাঙ্ক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা এবং বাক-স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার। এই রায় প্রমাণ করে যে, জনগণ এখন এমন এক বাংলাদেশ চায় যেখানে রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং সাধারণ নাগরিকের সেবকে পরিণত হবে।

নির্বাচনের আগে বিএনপি যে ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা ঘোষণা করেছিল, নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায় যে তা জনমতের সাথে দারুণভাবে মিশে গেছে। এই ৩১ দফা ছিল একটি ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক চুক্তির প্রস্তাব। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনা এবং টানা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকার যে প্রস্তাব, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ও আস্থার জন্ম দিয়েছে। উচ্চকক্ষ গঠনের মাধ্যমে দেশের মেধা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে নীতিনির্ধারণে যুক্ত করার প্রস্তাবটি বুদ্ধিজীবী ও তরুণ প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিই মূলত এই বিশাল ম্যান্ডেট আদায়ে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি ছিল তরুণ ভোটাররা, বিশেষ করে যারা গত ১৫ বছরে প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এই তরুণ প্রজন্ম বা 'জেন-জি' কোনো গৎবাঁধা রাজনৈতিক বৃত্তে বন্দি নয়। তারা চেয়েছে কর্মসংস্থান, মেধাভিত্তিক নিয়োগ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইন থেকে মুক্তি। বিএনপি তাদের প্রচারণায় তরুণদের এই মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার যে স্বপ্ন দেখিয়েছে, তা তরুণ ভোটারদের বড় অংশকে টেনেছে।

তরুণদের এই সমর্থন ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি হবে পারফরম্যান্স-ভিত্তিক। যারা কাজ করবে এবং আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারবে, তরুণরা তাদেরই পাশে থাকবে। বিএনপির বিজয় মূলত এই আধুনিক ও প্রগতিশীল চিন্তার একটি সম্মিলিত প্রতিফলন।

দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে ‘উইনার টেকস অল’ সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল, এবারের ম্যান্ডেট তার বিপরীতে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বার্তা দেয়। বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় হলেও দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বারবার 'অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার’ এবং সর্বজনীন ঐক্যের কথা বলা হয়েছে। এটি রাজনৈতিক তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক তত্ত্বের ভাষায় একে 'Consociational Democracy' বা অংশীদারত্বমূলক গণতন্ত্রের একটি উন্নত রূপ হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে। যেখানে বিজয়ী দল একচ্ছত্র আধিপত্য বা সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপট না দেখিয়ে, রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে অন্যদের সাথে ক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশের চিরাচরিত 'বিজয়ী সব পাবে' রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিপরীতে এই অবস্থানটি একটি আধুনিক ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থার পথ নির্দেশ করে। জনগণ এই বিপুল জয়ের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সংসদ চেয়েছে, যেখানে বিরোধী দলের মতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ম্যান্ডেটটি এমন এক ব্যবস্থার পক্ষে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপট থাকবে না, বরং যুক্তিনির্ভর বিতর্কের মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক মানসিকতাই হবে আগামীর বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি।

বিশাল জয়ের আনন্দ যেমন আছে, তেমনি বিএনপির সামনে পাহাড়সমান চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। দীর্ঘদিনের লুটপাট ও অর্থ পাচারের কারণে দেশের অর্থনীতি বর্তমানে ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করা হবে নতুন সরকারের প্রথম ও প্রধান অগ্নিপরীক্ষা। জনগণের এই ম্যান্ডেট কেবল ভোটের জয় নয়; এটি মূলত একটি ‘পারফরম্যান্স প্রেসার’-এর বহিঃপ্রকাশ।

ভোটাররা প্রত্যাশা করে যে নতুন সরকার দ্রুত বাজারব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনবে, পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট-নির্ভর বাণিজ্যিক কাঠামো ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। আমলাতন্ত্রের কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস, প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং জবাবদিহিতাভিত্তিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। দুর্নীতি দমনকে কেবল আইনগত প্রতিশ্রুতি হিসেবে নয়, বরং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ও স্বাধীন নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন জরুরি।

জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একাডেমিক মূল্যায়ন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। উচ্চশিক্ষা খাতে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ম দূর করে উদ্ভাবন, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং নীতিনির্ধারণে গবেষণার কার্যকর সংযোগ স্থাপন করতে না পারলে সামগ্রিক রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়া পূর্ণতা পাবে না। আর তাই, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত রূপান্তর—এই চারটি অগ্রাধিকার একে অপরের পরিপূরক। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করতে না পারলে বর্তমানের বিপুল জনসমর্থন দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন হবে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। বিএনপির এই ভূমিধস বিজয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও গভীর দৃষ্টি রয়েছে। জনগণ এমন এক নেতৃত্বের পক্ষে রায় দিয়েছে, যারা জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রেখে সবার সাথে বন্ধুত্বের পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে দেশের মানুষ।

এই বিজয় বিএনপির দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল। বছরের পর বছর রাজনৈতিক নিপীড়ন ও প্রতিকূলতা সহ্য করে দলটি যেভাবে জনগণের কাতারে দাঁড়িয়েছে, তা রাজনৈতিক গবেষণার বিষয় হতে পারে। তবে ক্ষমতার দম্ভ যাতে দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত কাউকে স্পর্শ না করে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। জনগণের এই নিরঙ্কুশ বিজয় কোনো ‘ব্ল্যাংক চেক’ নয় যে যা খুশি করা যাবে, বরং এটি একটি ‘আমানত’। দলটির ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা হবে নেতৃত্বের বড় চ্যালেঞ্জ।

২০২৬ সালের এই নির্বাচনী ফলাফল বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন ভোরের সূচনা করেছে। এটি প্রমাণ করেছে যে, বন্দুকের নল বা ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, জনগণের ভালোবাসা ও আস্থাই রাজনীতির আসল শক্তি। রাষ্ট্র সংস্কারের যে ম্যান্ডেট বিএনপি পেয়েছে, তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। জনগণ তাদের দায়িত্ব পালন করেছে ব্যালটের মাধ্যমে; এখন দায়িত্ব বিজয়ী দলের।

এই পরিবর্তনের ধারাকে বাস্তবে রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ধৈর্য এবং অদম্য দেশপ্রেম। যদি রাষ্ট্র সংস্কারের এই সুযোগটি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে একটি আধুনিক ও স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। জনগণের এই আকাঙ্ক্ষাই হোক আগামীর পাথেয়।


লেখক: শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যায়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত