জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

প্রায় ৬০ শতাংশ ভোট পড়েছে, এটাই ইসির বড় সাফল্য

প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩: ৪৪
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে গ্রাফিতি। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। সংখ্যাটি আপাতদৃষ্টিতে ২০০৮ সালের মাইলফলক ৮৭ শতাংশের তুলনায় ছোট। ভোটের এই হার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছেন অনেকেই। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতি এবং গত দেড় দশকের নির্বাচনবিমুখতার সংস্কৃতি বিবেচনায় এই উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত যৌক্তিকতা দাঁড় করিয়েছে।

পরিসংখ্যানগত ফ্রেমিং ও বৈধতার মানদণ্ড

বিগত নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের বেসলাইন বা ভিত্তি ধরা হয় ৬০ শতাংশের ওপরে। অন্যদিকে, প্রধান দলগুলোর বর্জনের মুখে অনুষ্ঠিত একতরফা নির্বাচনের ভিত্তি বা বেসলাইন সাধারণত ৪০ শতাংশের নিচে অবস্থান করে।

এই সমীকরণে ২০২৬ সালের ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ উপস্থিতি নতুন বৈধতার নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে যেখানে প্রকৃত উপস্থিতি ছিল তলানিতে এবং ২০২৪ সালে ডামি প্রার্থীর নির্বাচনেও যা ৪২ শতাংশের ঘরে আটকে ছিল, সেখানে আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় দলের অনুপস্থিতিতে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি প্রমাণ করে—এটি কোনো স্ফীত পরিসংখ্যান নয়। বরং এটি একটি স্বাভাবিক জনমতের প্রতিফলন, যেখানে ভোটাররা কোনো চাপ ছাড়াই কেন্দ্রে এসেছেন। এবারের নির্বাচনের এই হারটি প্রমাণ করে যে নির্বাচনটি বয়কট বেসলাইন অতিক্রম করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মানদণ্ড স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছে।

ঐতিহাসিক উপাত্তের তুলনা

১৯৯১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নির্বাচনী উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্দলীয় সরকারের অধীনে ভোটারের উপস্থিতি সব সময়ই ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের নির্বাচনে উপস্থিতি ছিল ৫৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের জুনে তা এক লাফে প্রায় ৭৫ দশমিক ৫৯ শতাংশে পৌঁছায়। ২০০১ সালে এই হার ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকার স্বচ্ছতায় তা রেকর্ড ৮৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকে।

বিপরীত চিত্র দেখা যায় দলীয় সরকারের অধীনে। ২০১৪ সালে উপস্থিতি নেমে আসে ৪০ শতাংশে, যা ছিল ১৯৯১-পরবর্তী সর্বনিম্ন। ২০১৮ সালে ৮০ শতাংশের ওপরে উপস্থিতির সরকারি দাবি থাকলেও, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের কাছে তা পরিসংখ্যানগত বিচ্যুতি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

২০২৪ সালের ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ উপস্থিতিও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-এর ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ উপস্থিতি নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনআস্থা পুনর্বহালের একটি গাণিতিক প্রমাণ।

৩০০ আসনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও রাজনৈতিক সমীকরণ

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে নির্বাচন হয়েছে। এক প্রার্থী মারা যাওয়ায় সেটি স্থগিত ছিল। নির্বাচনে আরও দুই আসনের (শেরপুর-৩, চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪) ফল স্থগিত থাকায় ২৯৭টি আসনের চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়া গেছে। ঘোষিত ২৯৭ আসনের ফলাফলে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০৯টি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রেখেছে।

সংসদের বিরোধী বেঞ্চে এক নতুন বিন্যাস তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ ছাড়া জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৬টি আসনে জয়লাভ করেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি, এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বিজেপি, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ ও খেলাফত মজলিস প্রত্যেকে ১টি করে আসনে জয়ী হয়েছে। এছাড়া স্বতন্ত্র ও অন্যান্য আসন ৭টি এবং জাতীয় পার্টি এবার কোনো আসনই নিশ্চিত করতে পারেনি।

জোটের হিসেবে এখন পর্যন্ত বিএনপি ও মিত্রদল ২১২ আসন নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদে যাচ্ছে। আর জমায়াত ও মিত্র দলের জুটেছে ৭৭টি আসন।

ইসির স্ট্র্যাটেজিক হস্তক্ষেপ

এ দিকে ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করতে ইসি এবার প্রথাগত প্রচারণার বাইরে গিয়ে কিছু কাঠামোগত সংস্কার বা স্ট্র্যাটেজিক ইন্টারভেনশন গ্রহণ করেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকরী ছিল পোস্টাল ব্যালটের আধুনিকায়ন। এটি কেবল ভোটারের সংখ্যাই বাড়ায়নি, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তির একটি সফল মডেল দাঁড় করিয়েছে।

পাশাপাশি, সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই সনদের ওপর গণভোট আয়োজন ভোটারদের জন্য একটি বড় পুল ফ্যাক্টর বা আকর্ষণ হিসেবে কাজ করেছে। রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের এই সুযোগ কাজে লাগাতে অনেক নির্দলীয় ভোটারও কেন্দ্রে এসেছেন।

এ ছাড়া প্রায় ৫০ লাখ নতুন ভোটারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সামাজিক মাধ্যমকেন্দ্রিক প্রচারণাও কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

দিন শেষে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশের এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও আস্থার প্রত্যাবর্তনের একটি দালিলিক প্রমাণ।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত