জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ও ভোট গণনায় কারচুপির অভিযোগ এনসিপির

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১: ০৩
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যরা

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, ফলাফল প্রভাবিত করা এবং ভোট গণনায় কারচুপির অভিযোগ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টায় এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করে দলটি। সংবাদ সম্মেলনে দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ও সেক্রেটারি মুনিরা শারমিন বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে মুনিরা শারমিন বলেন, ‘ভোটাররা নিরাপদ পরিবেশেই ভোট দিতে পেরেছেন। তবে ফলাফল ঘোষণার পর থেকে পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে।’

তাঁর অভিযোগ, যেসব আসনে এনসিপির ‘শাপলা কলি’ প্রতীকের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন বা জয়লাভের কাছাকাছি ছিলেন, সেসব এলাকায় ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও প্রশাসনিক সহযোগিতায় এসব ঘটনা ঘটেছে এবং নির্বাচন কমিশন এই বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়নি।

তিনি আরও বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া সহিংসতায় পোলিং এজেন্টদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর এবং দলীয় নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘গত ১৭ বছর বিএনপিকে একটি মজলুম দল হিসেবে দেখেছি, কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তাদের মধ্যে জালিম হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।’

সংবাদ সম্মেলনে জেলা ও আসনভিত্তিক একাধিক হামলার বিবরণ তুলে ধরা হয়। রংপুর-৪ আসনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের এলাকায় গত রাত থেকে সাতটি হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন মুনিরা শারমিন। এতে ১১ জন আহত হয়েছেন। রংপুরের হারাগাছ পৌরসভাসহ বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয় ও নেতাদের বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

একইভাবে দিনাজপুর-৫, পঞ্চগড়-১, পিরোজপুর-৩, নোয়াখালী-২ ‍ও কুড়িগ্রাম-২ আসনেও একাধিক হামলা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এনেছে এনসিপি। এসব আসনে একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে দলটি।

এসব ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে বলেও অভিযোগ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। বিরোধী দলে থাকলে মামলা নেওয়া হয় না, উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই মামলা দেওয়া হয়—এই সংস্কৃতির অবসান চান তারা। এসব ঘটনার দায় বিএনপিকে নিতে হবে উল্লেখ করে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং সহিংসতা অব্যাহত থাকলে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।

ভোট কারচুপি ও ফলাফল পরিবর্তনের অভিযোগ

এরপর বক্তব্য দেন দলের মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তিনি বলেন, সারা দেশে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেন যুদ্ধাবস্থা চলছে। ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই সহিংসতা শুরু হয়েছে এবং এমনকি এক বিজয়ী প্রার্থীর একজন কর্মীও নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

আসিফ মাহমুদ জানান, এনসিপি ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে এবং ছয়জন প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। তবে তিনি দাবি করেন, অন্তত আরও তিনটি আসনে তাদের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে বারবার ভোট গণনা করে তাদের হারানো হয়েছে। তিনি তিনটি আসনের নাম উল্লেখ করেন—ঢাকা-৮ (নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী), পঞ্চগড়-১ (সাজিস) এবং দিনাজপুর-৫ (ড. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ)। এসব আসনে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তারা মোটামুটি সন্তুষ্ট ছিলেন, কিন্তু মূল ‘নাটকীয়তা’ শুরু হয় ভোট গণনার পর। প্রথম দুই-তিন ঘণ্টায় ১১ দলীয় জোট এগিয়ে থাকলেও পরে ‘ট্রানজিশন’ শুরু হয়। কেন্দ্র ঘেরাও করে ফলাফল আটকে রাখা হয় এবং দুই ঘণ্টায় গণনা শেষ হলেও ফলাফল মধ্যরাতে প্রকাশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, দলের আহ্বায়কের আসনে প্রথমে ছয় হাজার ভোটে এগিয়ে থাকার পর বারবার কাটাকাটি করে চার হাজার ভোট কমিয়ে শেষ পর্যন্ত দুই হাজার ভোটে বিজয়ী ঘোষণা করতে বাধ্য করা হয়েছে।

ঢাকা-১৩ আসনে মাওলানা মামুনুল হককে অসচ্ছ প্রক্রিয়ায় হারানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ঢাকা-১৭ আসনে সন্ধ্যা ৮টায় বিজয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়, অথচ তখনো ৫০টি কেন্দ্রের ভোট গণনা বাকি ছিল বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, বিএনপিকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাইয়ে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে ভোট গণনায় কারচুপি ও ফলাফল বিকৃত করা হয়েছে। তার দাবি, ২০০৮ সালের নির্বাচনের মতো এবারও মিডিয়া ও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে একটি ‘পারসেপশন’ তৈরি করা হয়েছে। গণমাধ্যমে বিএনপির আসন সংখ্যা বেশি দেখিয়ে একটি ইকো-সিস্টেম তৈরি করে তাদের ২০০-এর বেশি আসনে জয়ী করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তনের চেষ্টা হতে পারে। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে গণভোটের পক্ষে থাকলেও তাদের এজেন্টরা মাঠে ‘না’ ভোটের প্রচারণা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার দাবি, সব ষড়যন্ত্রের পরও ‘হ্যাঁ’ ভোট ৬৮ শতাংশ পেয়ে বিজয়ী হয়েছে। যারা সংসদে যাচ্ছেন, তাদের জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি বলেন, গণভোটের বৈধতা জাতীয় নির্বাচনের চেয়েও বেশি।

সজীব ভূঁইয়া আরও অভিযোগ করেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম আবার শুরু হচ্ছে। দেড় বছর ধরে বন্ধ থাকা দলটির অফিসগুলো খুলে দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের মধ্যে গোপন বোঝাপড়ার ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আইনগতভাবে নিষিদ্ধ, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হামলা, মামলা ও দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকলে ১১ দলীয় জোট রাজপথে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে। তারা গণতান্ত্রিক রূপান্তর চান, তবে জনগণকে দমন করা হলে চুপ থাকবেন না।

ড. ইউনূসের সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি কি ব্যর্থ হলো, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সরকার ও নির্বাচন কমিশন ভোট গ্রহণ মোটামুটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছে। তবে ভোট গণনার সময় ভিন্নভাবে ‘টেম্পারিং’ হয়েছে এবং ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে সরকার ও নির্বাচন কমিশন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

‘টু-থার্ড মেজরিটি’ পরিকল্পনায় কারা জড়িত—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি একটি পুরো ইকো-সিস্টেমের মাধ্যমে হয়েছে, যেখানে মিডিয়া, সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বোঝাপড়া ছিল। এতে ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আগামী কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি বলেন, ১১ দলীয় জোটের ফোরামে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

গণভোট ও সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংস্কার ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন যেন কোনো নির্দিষ্ট দলের নিয়ন্ত্রণে না পড়ে, সেজন্যই গণভোট হয়েছে। সংসদে যাওয়া প্রত্যেক সদস্যের ওপর জনগণের রায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব রয়েছে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত