আজ ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হকের জন্মদিন। ২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতার সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন গাজীউল হক। এই তথ্যটিই কেবল গাজীউল হকের ইতিহাসের নায়ক হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনি ইতিহাসের এই গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন, কী ধরনের দ্বিধার বৃত্ত ভেঙ্গে সময়ের সঠিক সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করতে পেরেছিলেন, শ্রেণিঅবস্থানের চেয়েও বৃহত্তর জনমানুষের স্পন্দনকে কীভাবে ধারণ করতে পেরেছিলেন, এর সঙ্গেই গাজীউল হকের সময়ের নায়ক হয়ে ওঠার ইতিহাস সম্পর্কযুক্ত।
রাফাত আলম

১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন একক কোনো ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের জনমানুষের সামূহিক আন্দোলন-সংগ্রামের পরম্পরাগত বহুমাত্রিক ঘটনাপুঞ্জের একটি দৃশ্যমান রূপ। একটি গণআন্দোলনকে সফল করার পেছনে ব্যক্তির ভূমিকা গৌণ নয়। ব্যক্তি-মানুষকে কখনো কখনো নায়কে পরিণত করে সময় ও ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত। বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যাঁরা ব্যক্তি থেকে সময়ের ইতিহাসের হয়ে উঠেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ভাষাসৈনিক গাজীউল হক।
গাজীউল হকের পূর্ণনাম আবু নছর মোহাম্মদ গাজীউল হক (আ ন ম গাজীউল হক); ডাকনাম বাচ্চু। জন্ম ১৯২৯ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি (বঙ্গাব্দের হিসেবে পহেলা ফাল্গুন ১৩৩৫) ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার নিচিন্তা গ্রামে। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই জুন ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আশি বছরের বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি ছিলেন একাধারে মেধাবী ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী, লেখক, গীতিকার, সংগীতের সমঝদার, সুবক্তা, পেশাগত জীবনে সফল আইনজীবী, পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে সুফিবাদী ধর্মবোধে অনুপ্রাণিত। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর বড় পরিচয় তিনি ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা—ইতিহাসের সাহসী সন্তান, সময়ের নায়ক।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল রাষ্ট্র বনাম জনতার সম্পর্ক ও সংঘর্ষের সূত্র ধরে। সদ্য ‘স্বাধীন’ এবং ‘কাঙ্ক্ষিত’ পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মুহূর্তে এই দুই পক্ষকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা সহজ ছিল না। ১৯৪৭ সাল থেকেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে যে বিতর্ক দেখা দেয়, ১৯৪৮ সালে এসে তা একটি শক্তিশালী আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চে সংঘটিত রাষ্ট্রভাষাকেন্দ্রিক সর্বাত্মক ধর্মঘট বৃহত্তর জনমানুষকে এ বিষয়ে আরও সজাগ করে তোলে। এরপর ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নতুন প্রাণশক্তি নিয়ে ফিরে আসে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ও অনিবার্যতায় আসে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। এই তারিখে আহূত ধর্মঘটে সরকার কর্তৃক ১৪৪ ধারা জারি, ওই দিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্রদের জনসভা ও মিছিল এবং সেই মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত ভাষাশহিদদের আত্মদানের কথা বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতার সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন গাজীউল হক। এই তথ্যটিই কেবল গাজীউল হকের ইতিহাসের নায়ক হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনি ইতিহাসের এই গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন, কী ধরনের দ্বিধার বৃত্ত ভেঙ্গে সময়ের সঠিক সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করতে পেরেছিলেন, শ্রেণিঅবস্থানের চেয়েও বৃহত্তর জনমানুষের স্পন্দনকে কীভাবে ধারণ করতে পেরেছিলেন, এর সঙ্গেই গাজীউল হকের সময়ের নায়ক হয়ে ওঠার ইতিহাস সম্পর্কযুক্ত। এই নায়ক হয়ে ওঠা যে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় গাজীউল হকের জন্য, বরং ভাষা আন্দোলনের পূর্ববর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এবং পরবর্তীকালে রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি একনিষ্ঠতা তাঁকে সর্বতোভাবে পরিণত করে ব্যক্তি থেকে নায়কে।
গাজীউল হক পারিবারিক উত্তরাধিকারসূত্রেই ছিলেন রাজনীতিসচেতন। তাঁর দাদা মওলানা আবদুল বারী (রা.), তাঁর বাবা মওলানা ছেরাজুল হক চিশতী (রা.) দুজনেই তিনি ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। সংগীতশিল্পী মা নূরজাহান বেগমও ছিলেন রাজনীতিসচেতন। এমনই সচেতন পারিবারিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা গাজীউল হক শৈশবেই অবস্থান গ্রহণ করেন অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে; যার প্রথম দৃষ্টান্ত ছাগলনাইয়া সদরে ১৯৪২ সালের ২৩শে মার্চ তারিখে ব্রিটিশ-বিরোধী মিছিলে যোগদান এবং মিছিল শেষে ছাগলনাইয়া থানা কার্যালয়ের ওপরে থাকা ব্রিটিশ পতাকা ইউনিয়নজেক নামিয়ে পাকিস্তানি তিনকোণা সবুজ পতাকা উত্তোলনে অংশগ্রহণ। তখন তিনি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র; বয়স তের। এ ঘটনায় তাঁকে গ্রেফতারবরণ করতে হয়। সেটিই তাঁর প্রথম হাজতবাস এবং রাজনৈতিকভাবে বন্দি হওয়ার সূচনা। এরপর পাকিস্তান-পর্বের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ করতে হয় তাঁকে।
চল্লিশের দশকে পূর্ববঙ্গের অপরাপর রাজনীতিসচেতন তরুণদের মতো গাজীউল হকও ছিলেন ‘পাকিস্তান-আন্দোলনে’র সমর্থক। জনগণের শোষণমুক্তি ও অসাম্প্রদায়িক নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাঁর আগ্রহের কথা জানা যায়। এই চিন্তনরেখা ধরে অগ্রসর হলে গাজীউল হকের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্তি, বামপন্থি রাজনৈতিক সংগঠন পূর্ব-পাকিস্তান যুবলীগের সদস্য হওয়া, কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয় সংযোগ, মওলানা ভাসানীর ন্যাশানাল আওয়ামী পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্তি এবং অন্যদিকে পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সদস্য হওয়া, বাংলাদেশ-পর্বে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার মধ্যে কোনো দ্বৈরথ উপলব্ধি করা যায় না। কারণ জনমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এক নির্ভীক যোদ্ধা গাজীউল হক। সময়, পরিপার্শ্ব ও জনস্পন্দনকে অনুভব করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি সময়ের নায়ক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন।
ভাষা আন্দোলনের প্রথম সর্বজনীন পদক্ষেপ ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চের ধর্মঘট। ঢাকা যখন এ নিয়ে উত্তাল, তখন তার উত্তাপ ছড়িয়েছিল জেলাশহর বগুড়াতেও। ১৯৪৮ সালে গাজীউল হক বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের ছাত্র। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সেই ধর্মঘটের মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন গাজীউল হক, যে মিছিলের সূচনাভাগে ছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। ভাষা আন্দোলনের প্রারম্ভ পর্ব থেকেই সক্রিয় ছিলেন গাজীউল হক। ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে তাঁর অংশগ্রহণ ও সক্রিয়তা ইতিহাস-সমর্থিত।
১৯৫২ সালে ঢাকায় পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণায় ভাষা আন্দোলন আবারও অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে। গাজীউল হক তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এমএ শ্রেণির ছাত্র। ২৭শে জানুয়ারি নাজিমুদ্দিনের ঘোষণার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির ২৯ তারিখের প্রতিবাদ সভা থেকে ৩০ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতীকী ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। ৩০ তারিখ সফলভাবে ধর্মঘট পালিত হয় এবং মিছিল শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে ৪ঠা ফেব্রুয়ারি সমগ্র ঢাকা শহরে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রধর্মঘটের আহ্বান করা হয়। ৩১শে জানুয়ারি গঠন করা হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ছাত্রধর্মঘটের পর মিছিল করা নিয়ে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্রলীগের কিছুসংখ্যক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বিরোধিতা করে। ওই দিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে সমবেত দশ সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে ছাত্রলীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের মতামতকে গ্রহণ না করে মিছিলের পক্ষে সমর্থন জানায়। ওই সভার সভাপতিত্ব করেছিলেন গাজীউল হক। তখন তিনি ছিলেন যুবলীগের সদস্য। গাজীউল হক এখানে প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। এমন পরিচয় পাওয়া যায় ২০ এবং ২১শে ফেব্রুয়ারির ঘটনাক্রমেও। গাজীউল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা থেকেই ২১শে ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ধর্মঘটের আহ্বান করা হয়। ফেব্রুয়ারির ১২ ও ১৩ তারিখে পালিত হয় পতাকা দিবস। ২০শে ফেব্রুয়ারি বিকেলের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে গাজীউল হক সহ আরও অনেকে যখন বসে পরের দিনের আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেলেন, তখন মাইকে ১৪৪ ধারা জারির ঘোষণা শুনতে পান। ছাত্রদের আন্দোলনকে দমন করতে, ছাত্রদের মনোবল ভাঙতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন গুজবও ছড়ানো হয়। তবে ছাত্ররা কোনোভাবেই বিভ্রান্ত হয়নি। কিন্তু বিভ্রান্ত হয়েছিল ক্ষমতার রাজনীতি-আকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব। সেই দোদুল্যমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভেতর থেকে কীভাবে জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সফল হলেন, তার সঙ্গেই গাজীউল হকের অনন্য হয়ে ওঠার আলেখ্য জড়িত।
১৪৪ ধারার জারির খবরের পরিপ্রেক্ষিতে ওইদিন সন্ধ্যার পরে আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ১১ জনই ২১শে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি প্রত্যাহারের পক্ষে মত দেয়। এতে নেতৃবৃন্দের আপসকামী মনোভাব স্পষ্ট হয়ে যায়। এবং তারা জনস্পন্দন থেকে সরে যায় অনেক দূরে। গাজীউল হক সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন না। কিন্তু তিনি সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তকে ভুল মনে করেছিলেন। তিনি ও তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সতীর্থ-সহযোদ্ধারা ওইদিন রাতে মিলিত হন ফজলুল হক হলের পুকুরঘাটে। ওই বৈঠকে তাঁরা ১৪৪ ধারা ভাঙার সংকল্প করেন।
২১শে ফেব্রুয়ারির সকালে পুরাতন কলাভবনের আমতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্র সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গাজীউল হক। সমাবেশে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে বক্তৃতা শুরু করেন; এবং সাধারণ ছাত্র-জনতা কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হন। শেষ পর্যন্ত সাধারণ ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষেই স্বতঃস্ফূর্ত রায় দেয়; এবং সভাপতি হিসেবে গাজীউল হকের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তা কার্যকর হয়। ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন তিনি। গাজীউল হক ওইদিন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, টিয়ার শেলের আঘাতে আহতও হয়েছিলেন।
গাজীউল হক এখানেই থেমে থাকেন না। তাঁর সংগ্রামী অভিযাত্রাকে অব্যাহত রাখেন প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও শোষণবিরোধী আন্দোলনে। এর সঙ্গে তাঁর সাংস্কৃতিক বৈদগ্ধ্যও যুক্ত হয়। একুশের প্রথম গানও লিখেছিলেন গাজীউল হক। গানটি হুবহু তুলে ধরা হলো:
ভুলবনা ভুলবনা এই একুশে ফেব্রুয়ারী
ভুলবো না।
লাঠিগুলি, টিয়ার গ্যাস, মিলিটারী আর মিলিটারী
ভুলবনা ॥
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই এই দাবীতে ধর্মঘট,
বরকত সালামের খুনে লাল ঢাকার রাজপথ,
ভুলবনা ॥
স্মৃতি সৌধ ভাঙ্গিয়াছ জেগেছে পাষাণে প্রাণ,
মোরা কি ভুলিতে পারি খুন রাঙা জয় নিশান?
১৯৫২ সালের পরের কয়েক বছর প্রভাতফেরিতে তাঁর লেখা এই গান গাওয়া হতো। এতে সুর দিয়েছিলেন করেছিলেন তাঁর ছোটভাই নিজাম উল হক। ভাষা আন্দোলনে শহিদদের উদ্দেশে গাজীউল হক আরও একটি গান লিখেছিলেন। বদরুদ্দীন উমরের কাছে পাঠানো চিঠিতে তার উল্লেখ পাওয়া যায়:
শহীদ তোমায় মনে পড়ে, তোমায় মনে পড়ে।
তোমার কান্না তোমার হাসি আমার চোখে ঝরে ॥
তোমার খুনে রাঙলো যেদিন মাটির এই ধরা
তোমার মায়ের কান্নায় ভরলো এই বসুন্ধরা,
সেই কান্না আজি গুমরে ফিরে প্রতি ঘরে ঘরে ॥
ভেঙ্গে[ছে] তারা স্মৃতিসৌধ তব,
কিন্তু আমাদের বুকের সৌধ ভাঙ্গতে কি পেরেছে পেরেছে?
কণ্ঠ তোমার করেছে নীরব,
কিন্তু আমাদের কণ্ঠকে রুদ্ধ করতে কি পেরেছে পেরেছে?
ঈশাণ কোণের ঝঞ্ঝা বায়ে জাগে তোমার শপথ,
ঊষার আলোর রাঙা আভায় জাগে তোমার শপথ,
কোটি মায়ের সিক্ত চোখে জাগে তোমার শপথ,
কোটি চোখের রক্ত তারায় জাগে তোমার শপথ,
সেই শপথ মোদের যাত্রাপথে দীপশিখা ধরে,
তোমায় মনে পড়ে ॥
গাজীউল হকের রাজনৈতিক জীবন বৈচিত্র্যময়। তবে এই বৈচিত্র্যের সঙ্গে সবসময় সংরক্ত ছিল জনমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। আদর্শিক কারণে তাঁর ব্যক্তিগত ত্যাগও কম নয়। ১৯৫৩ সালে যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন, সে-বছরই ১৪ই এপ্রিল রাজনৈতিক কারণে তাঁকে জেলে যেতে হয়। চার বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়; তাঁর এমএ ডিগ্রিও কেড়ে নেওয়া হয়। যদিও তুমুল ছাত্র-আন্দোলনের কারণে এমএ ডিগ্রি ফেরত দিতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরে জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে আইন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ১৯৫৬ সালে তিনি আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এছাড়াও ১৯৫৪, ১৯৫৫, ১৯৫৬, ১৯৫৮ সালে বিভিন্ন মেয়াদে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল।
ভাষা আন্দোলনের মূল্যবোধকে তিনি আজীবন ধারণ ও লালন করেছেন। উচ্চ-আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলনের পক্ষে সংগ্রামকে গাজীউল হকের আরও একটি ভাষা আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করা যায়। উচ্চ-আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি। গাজীউল হক নিজে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী হিসেবে বাংলা প্রচলনে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তার অন্যতম দৃষ্টান্ত তাঁর ‘উচ্চতর আদালতে বাংলা প্রচলন’ বই (প্রথম প্রকাশ: ২০০৪)। জেলে থাকা অবস্থায় পরিকল্পিত তাঁর নিজের লেখা ছয়টি কবিতাসহ দেশি-বিদেশি কবিদের জেলজীবনে লেখা কবিতার সংকলন ‘জেলের কবিতা’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে।
একজন ব্যক্তি গাজীউল হক কীভাবে ইতিহাসের গাজীউল হক হয়ে ওঠেন, তা তাঁর রাজনৈতিক পরম্পরা থেকে উপলব্ধি করা যায়। জনমানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই ছিল তার রাজনৈতিক চেতনার প্রধান কেন্দ্র। বাংলাদেশের সংগ্রামী ইতিহাসে গাজীউল হকের কর্ম ও কৃতি আরও প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠুক, তাঁর আত্মত্যাগ ও সাহসী ভূমিকা বাংলাদেশের আত্মপরিচয় নির্মাণের অভিযাত্রাকে আরও সমৃদ্ধতর করুক—এই প্রত্যাশা করি।
তথ্যসূত্র
আমিনুর রহমান সুলতান, ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক (২০১০), বাংলা একাডেমী, ঢাকা
গাজীউল হক, আমার দেখা আমার লেখা (২০০০), মেরী প্রকাশন, ঢাকা
গাজীউল হক, উচ্চতর আদালতে বাংলা প্রচলন (২০১৪), জোনাকী প্রকাশনী, ঢাকা
বদরুদ্দীন উমর, ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ : কতিপয় দলিলপত্র, দ্বিতীয় খণ্ড (১৯৯৫), বাংলা একাডেমী, ঢাকা
সুজাতা হক ও নাসিম আনোয়ার (সম্পাদিত), ভাষাসৈনিক গাজীউল হক স্মারকগ্রন্থ (২০২২), তৃণলতা প্রকাশ, ঢাকা
লেখক: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন একক কোনো ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের জনমানুষের সামূহিক আন্দোলন-সংগ্রামের পরম্পরাগত বহুমাত্রিক ঘটনাপুঞ্জের একটি দৃশ্যমান রূপ। একটি গণআন্দোলনকে সফল করার পেছনে ব্যক্তির ভূমিকা গৌণ নয়। ব্যক্তি-মানুষকে কখনো কখনো নায়কে পরিণত করে সময় ও ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত। বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যাঁরা ব্যক্তি থেকে সময়ের ইতিহাসের হয়ে উঠেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ভাষাসৈনিক গাজীউল হক।
গাজীউল হকের পূর্ণনাম আবু নছর মোহাম্মদ গাজীউল হক (আ ন ম গাজীউল হক); ডাকনাম বাচ্চু। জন্ম ১৯২৯ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি (বঙ্গাব্দের হিসেবে পহেলা ফাল্গুন ১৩৩৫) ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার নিচিন্তা গ্রামে। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই জুন ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আশি বছরের বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি ছিলেন একাধারে মেধাবী ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী, লেখক, গীতিকার, সংগীতের সমঝদার, সুবক্তা, পেশাগত জীবনে সফল আইনজীবী, পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে সুফিবাদী ধর্মবোধে অনুপ্রাণিত। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর বড় পরিচয় তিনি ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা—ইতিহাসের সাহসী সন্তান, সময়ের নায়ক।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল রাষ্ট্র বনাম জনতার সম্পর্ক ও সংঘর্ষের সূত্র ধরে। সদ্য ‘স্বাধীন’ এবং ‘কাঙ্ক্ষিত’ পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মুহূর্তে এই দুই পক্ষকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা সহজ ছিল না। ১৯৪৭ সাল থেকেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে যে বিতর্ক দেখা দেয়, ১৯৪৮ সালে এসে তা একটি শক্তিশালী আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চে সংঘটিত রাষ্ট্রভাষাকেন্দ্রিক সর্বাত্মক ধর্মঘট বৃহত্তর জনমানুষকে এ বিষয়ে আরও সজাগ করে তোলে। এরপর ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নতুন প্রাণশক্তি নিয়ে ফিরে আসে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ও অনিবার্যতায় আসে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। এই তারিখে আহূত ধর্মঘটে সরকার কর্তৃক ১৪৪ ধারা জারি, ওই দিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্রদের জনসভা ও মিছিল এবং সেই মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত ভাষাশহিদদের আত্মদানের কথা বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতার সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন গাজীউল হক। এই তথ্যটিই কেবল গাজীউল হকের ইতিহাসের নায়ক হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনি ইতিহাসের এই গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন, কী ধরনের দ্বিধার বৃত্ত ভেঙ্গে সময়ের সঠিক সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করতে পেরেছিলেন, শ্রেণিঅবস্থানের চেয়েও বৃহত্তর জনমানুষের স্পন্দনকে কীভাবে ধারণ করতে পেরেছিলেন, এর সঙ্গেই গাজীউল হকের সময়ের নায়ক হয়ে ওঠার ইতিহাস সম্পর্কযুক্ত। এই নায়ক হয়ে ওঠা যে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় গাজীউল হকের জন্য, বরং ভাষা আন্দোলনের পূর্ববর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এবং পরবর্তীকালে রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি একনিষ্ঠতা তাঁকে সর্বতোভাবে পরিণত করে ব্যক্তি থেকে নায়কে।
গাজীউল হক পারিবারিক উত্তরাধিকারসূত্রেই ছিলেন রাজনীতিসচেতন। তাঁর দাদা মওলানা আবদুল বারী (রা.), তাঁর বাবা মওলানা ছেরাজুল হক চিশতী (রা.) দুজনেই তিনি ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। সংগীতশিল্পী মা নূরজাহান বেগমও ছিলেন রাজনীতিসচেতন। এমনই সচেতন পারিবারিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা গাজীউল হক শৈশবেই অবস্থান গ্রহণ করেন অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে; যার প্রথম দৃষ্টান্ত ছাগলনাইয়া সদরে ১৯৪২ সালের ২৩শে মার্চ তারিখে ব্রিটিশ-বিরোধী মিছিলে যোগদান এবং মিছিল শেষে ছাগলনাইয়া থানা কার্যালয়ের ওপরে থাকা ব্রিটিশ পতাকা ইউনিয়নজেক নামিয়ে পাকিস্তানি তিনকোণা সবুজ পতাকা উত্তোলনে অংশগ্রহণ। তখন তিনি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র; বয়স তের। এ ঘটনায় তাঁকে গ্রেফতারবরণ করতে হয়। সেটিই তাঁর প্রথম হাজতবাস এবং রাজনৈতিকভাবে বন্দি হওয়ার সূচনা। এরপর পাকিস্তান-পর্বের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ করতে হয় তাঁকে।
চল্লিশের দশকে পূর্ববঙ্গের অপরাপর রাজনীতিসচেতন তরুণদের মতো গাজীউল হকও ছিলেন ‘পাকিস্তান-আন্দোলনে’র সমর্থক। জনগণের শোষণমুক্তি ও অসাম্প্রদায়িক নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাঁর আগ্রহের কথা জানা যায়। এই চিন্তনরেখা ধরে অগ্রসর হলে গাজীউল হকের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্তি, বামপন্থি রাজনৈতিক সংগঠন পূর্ব-পাকিস্তান যুবলীগের সদস্য হওয়া, কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয় সংযোগ, মওলানা ভাসানীর ন্যাশানাল আওয়ামী পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্তি এবং অন্যদিকে পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সদস্য হওয়া, বাংলাদেশ-পর্বে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার মধ্যে কোনো দ্বৈরথ উপলব্ধি করা যায় না। কারণ জনমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এক নির্ভীক যোদ্ধা গাজীউল হক। সময়, পরিপার্শ্ব ও জনস্পন্দনকে অনুভব করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি সময়ের নায়ক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন।
ভাষা আন্দোলনের প্রথম সর্বজনীন পদক্ষেপ ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চের ধর্মঘট। ঢাকা যখন এ নিয়ে উত্তাল, তখন তার উত্তাপ ছড়িয়েছিল জেলাশহর বগুড়াতেও। ১৯৪৮ সালে গাজীউল হক বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের ছাত্র। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সেই ধর্মঘটের মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন গাজীউল হক, যে মিছিলের সূচনাভাগে ছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। ভাষা আন্দোলনের প্রারম্ভ পর্ব থেকেই সক্রিয় ছিলেন গাজীউল হক। ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে তাঁর অংশগ্রহণ ও সক্রিয়তা ইতিহাস-সমর্থিত।
১৯৫২ সালে ঢাকায় পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণায় ভাষা আন্দোলন আবারও অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে। গাজীউল হক তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এমএ শ্রেণির ছাত্র। ২৭শে জানুয়ারি নাজিমুদ্দিনের ঘোষণার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির ২৯ তারিখের প্রতিবাদ সভা থেকে ৩০ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতীকী ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। ৩০ তারিখ সফলভাবে ধর্মঘট পালিত হয় এবং মিছিল শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে ৪ঠা ফেব্রুয়ারি সমগ্র ঢাকা শহরে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রধর্মঘটের আহ্বান করা হয়। ৩১শে জানুয়ারি গঠন করা হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ছাত্রধর্মঘটের পর মিছিল করা নিয়ে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্রলীগের কিছুসংখ্যক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বিরোধিতা করে। ওই দিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে সমবেত দশ সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে ছাত্রলীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের মতামতকে গ্রহণ না করে মিছিলের পক্ষে সমর্থন জানায়। ওই সভার সভাপতিত্ব করেছিলেন গাজীউল হক। তখন তিনি ছিলেন যুবলীগের সদস্য। গাজীউল হক এখানে প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। এমন পরিচয় পাওয়া যায় ২০ এবং ২১শে ফেব্রুয়ারির ঘটনাক্রমেও। গাজীউল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা থেকেই ২১শে ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ধর্মঘটের আহ্বান করা হয়। ফেব্রুয়ারির ১২ ও ১৩ তারিখে পালিত হয় পতাকা দিবস। ২০শে ফেব্রুয়ারি বিকেলের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে গাজীউল হক সহ আরও অনেকে যখন বসে পরের দিনের আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেলেন, তখন মাইকে ১৪৪ ধারা জারির ঘোষণা শুনতে পান। ছাত্রদের আন্দোলনকে দমন করতে, ছাত্রদের মনোবল ভাঙতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন গুজবও ছড়ানো হয়। তবে ছাত্ররা কোনোভাবেই বিভ্রান্ত হয়নি। কিন্তু বিভ্রান্ত হয়েছিল ক্ষমতার রাজনীতি-আকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব। সেই দোদুল্যমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভেতর থেকে কীভাবে জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সফল হলেন, তার সঙ্গেই গাজীউল হকের অনন্য হয়ে ওঠার আলেখ্য জড়িত।
১৪৪ ধারার জারির খবরের পরিপ্রেক্ষিতে ওইদিন সন্ধ্যার পরে আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ১১ জনই ২১শে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি প্রত্যাহারের পক্ষে মত দেয়। এতে নেতৃবৃন্দের আপসকামী মনোভাব স্পষ্ট হয়ে যায়। এবং তারা জনস্পন্দন থেকে সরে যায় অনেক দূরে। গাজীউল হক সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন না। কিন্তু তিনি সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তকে ভুল মনে করেছিলেন। তিনি ও তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সতীর্থ-সহযোদ্ধারা ওইদিন রাতে মিলিত হন ফজলুল হক হলের পুকুরঘাটে। ওই বৈঠকে তাঁরা ১৪৪ ধারা ভাঙার সংকল্প করেন।
২১শে ফেব্রুয়ারির সকালে পুরাতন কলাভবনের আমতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্র সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গাজীউল হক। সমাবেশে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে বক্তৃতা শুরু করেন; এবং সাধারণ ছাত্র-জনতা কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হন। শেষ পর্যন্ত সাধারণ ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষেই স্বতঃস্ফূর্ত রায় দেয়; এবং সভাপতি হিসেবে গাজীউল হকের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তা কার্যকর হয়। ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন তিনি। গাজীউল হক ওইদিন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, টিয়ার শেলের আঘাতে আহতও হয়েছিলেন।
গাজীউল হক এখানেই থেমে থাকেন না। তাঁর সংগ্রামী অভিযাত্রাকে অব্যাহত রাখেন প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও শোষণবিরোধী আন্দোলনে। এর সঙ্গে তাঁর সাংস্কৃতিক বৈদগ্ধ্যও যুক্ত হয়। একুশের প্রথম গানও লিখেছিলেন গাজীউল হক। গানটি হুবহু তুলে ধরা হলো:
ভুলবনা ভুলবনা এই একুশে ফেব্রুয়ারী
ভুলবো না।
লাঠিগুলি, টিয়ার গ্যাস, মিলিটারী আর মিলিটারী
ভুলবনা ॥
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই এই দাবীতে ধর্মঘট,
বরকত সালামের খুনে লাল ঢাকার রাজপথ,
ভুলবনা ॥
স্মৃতি সৌধ ভাঙ্গিয়াছ জেগেছে পাষাণে প্রাণ,
মোরা কি ভুলিতে পারি খুন রাঙা জয় নিশান?
১৯৫২ সালের পরের কয়েক বছর প্রভাতফেরিতে তাঁর লেখা এই গান গাওয়া হতো। এতে সুর দিয়েছিলেন করেছিলেন তাঁর ছোটভাই নিজাম উল হক। ভাষা আন্দোলনে শহিদদের উদ্দেশে গাজীউল হক আরও একটি গান লিখেছিলেন। বদরুদ্দীন উমরের কাছে পাঠানো চিঠিতে তার উল্লেখ পাওয়া যায়:
শহীদ তোমায় মনে পড়ে, তোমায় মনে পড়ে।
তোমার কান্না তোমার হাসি আমার চোখে ঝরে ॥
তোমার খুনে রাঙলো যেদিন মাটির এই ধরা
তোমার মায়ের কান্নায় ভরলো এই বসুন্ধরা,
সেই কান্না আজি গুমরে ফিরে প্রতি ঘরে ঘরে ॥
ভেঙ্গে[ছে] তারা স্মৃতিসৌধ তব,
কিন্তু আমাদের বুকের সৌধ ভাঙ্গতে কি পেরেছে পেরেছে?
কণ্ঠ তোমার করেছে নীরব,
কিন্তু আমাদের কণ্ঠকে রুদ্ধ করতে কি পেরেছে পেরেছে?
ঈশাণ কোণের ঝঞ্ঝা বায়ে জাগে তোমার শপথ,
ঊষার আলোর রাঙা আভায় জাগে তোমার শপথ,
কোটি মায়ের সিক্ত চোখে জাগে তোমার শপথ,
কোটি চোখের রক্ত তারায় জাগে তোমার শপথ,
সেই শপথ মোদের যাত্রাপথে দীপশিখা ধরে,
তোমায় মনে পড়ে ॥
গাজীউল হকের রাজনৈতিক জীবন বৈচিত্র্যময়। তবে এই বৈচিত্র্যের সঙ্গে সবসময় সংরক্ত ছিল জনমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। আদর্শিক কারণে তাঁর ব্যক্তিগত ত্যাগও কম নয়। ১৯৫৩ সালে যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন, সে-বছরই ১৪ই এপ্রিল রাজনৈতিক কারণে তাঁকে জেলে যেতে হয়। চার বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়; তাঁর এমএ ডিগ্রিও কেড়ে নেওয়া হয়। যদিও তুমুল ছাত্র-আন্দোলনের কারণে এমএ ডিগ্রি ফেরত দিতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরে জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে আইন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ১৯৫৬ সালে তিনি আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এছাড়াও ১৯৫৪, ১৯৫৫, ১৯৫৬, ১৯৫৮ সালে বিভিন্ন মেয়াদে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল।
ভাষা আন্দোলনের মূল্যবোধকে তিনি আজীবন ধারণ ও লালন করেছেন। উচ্চ-আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলনের পক্ষে সংগ্রামকে গাজীউল হকের আরও একটি ভাষা আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করা যায়। উচ্চ-আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি। গাজীউল হক নিজে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী হিসেবে বাংলা প্রচলনে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তার অন্যতম দৃষ্টান্ত তাঁর ‘উচ্চতর আদালতে বাংলা প্রচলন’ বই (প্রথম প্রকাশ: ২০০৪)। জেলে থাকা অবস্থায় পরিকল্পিত তাঁর নিজের লেখা ছয়টি কবিতাসহ দেশি-বিদেশি কবিদের জেলজীবনে লেখা কবিতার সংকলন ‘জেলের কবিতা’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে।
একজন ব্যক্তি গাজীউল হক কীভাবে ইতিহাসের গাজীউল হক হয়ে ওঠেন, তা তাঁর রাজনৈতিক পরম্পরা থেকে উপলব্ধি করা যায়। জনমানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই ছিল তার রাজনৈতিক চেতনার প্রধান কেন্দ্র। বাংলাদেশের সংগ্রামী ইতিহাসে গাজীউল হকের কর্ম ও কৃতি আরও প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠুক, তাঁর আত্মত্যাগ ও সাহসী ভূমিকা বাংলাদেশের আত্মপরিচয় নির্মাণের অভিযাত্রাকে আরও সমৃদ্ধতর করুক—এই প্রত্যাশা করি।
তথ্যসূত্র
আমিনুর রহমান সুলতান, ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক (২০১০), বাংলা একাডেমী, ঢাকা
গাজীউল হক, আমার দেখা আমার লেখা (২০০০), মেরী প্রকাশন, ঢাকা
গাজীউল হক, উচ্চতর আদালতে বাংলা প্রচলন (২০১৪), জোনাকী প্রকাশনী, ঢাকা
বদরুদ্দীন উমর, ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ : কতিপয় দলিলপত্র, দ্বিতীয় খণ্ড (১৯৯৫), বাংলা একাডেমী, ঢাকা
সুজাতা হক ও নাসিম আনোয়ার (সম্পাদিত), ভাষাসৈনিক গাজীউল হক স্মারকগ্রন্থ (২০২২), তৃণলতা প্রকাশ, ঢাকা
লেখক: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭ আসনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ফলাফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। এখন প্রধান আগ্রহের জায়গা, নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা কখন এবং কীভাবে শুরু হবে।
৪ ঘণ্টা আগে
আপনি জানেন কী, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি আন্তর্জাতিক দিবস আছে? আজ সেই দিন। প্রতিবছর ১১ ফেব্রুয়ারি ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে অফ উইমেন অ্যান্ড গার্লস ইন সায়েন্স’ বা বিজ্ঞানে নারী ও মেয়েদের আন্তর্জাতিক দিবস।
২ দিন আগে
স্বাধীন বাংলাদেশে গড়ে ওঠা প্রথম ব্যান্ড ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারস’-এর ভোকালিস্ট ও গিটারিস্ট দস্তগীর হক আর নেই। আজ (১১ ফেব্রুয়ারি) বুধবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
২ দিন আগে
ব্যালট পেপারে মানুষের নামের পাশে নয়, মানুষ সিল মেরেছে কুকুর, বিড়াল, গন্ডার, শিম্পাঞ্জির নামের পাশে। কোথাও এসব হয়েছে মজা করে, কোথাও আবার হয়েছে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে। চলুন, তেমনই কিছু অদ্ভুত প্রার্থীর গল্পে চোখ রাখা যাক যারা নির্বাচনের মাঠে নেমেছিল, আর কখনো কখনো মানুষের সঙ্গেই হাড্ড
৩ দিন আগে