ড. আব্দুর রাজ্জাকের কলাম

ঋণ খেলাপিদের তালিকা প্রকাশই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কঠোর ব্যবস্থা

ড. আব্দুর রাজ্জাক
ড. আব্দুর রাজ্জাক

স্ট্রিম গ্রাফিক

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী। এই ঘটনার নিঃসন্দেহে একটি প্রতীকী ও নীতিগত গুরুত্ব রয়েছে। তবে এই তালিকা প্রকাশের প্রকৃত তাৎপর্য তখনই অনুধাবন করা যাবে, যখন তালিকাভুক্ত এসব খেলাপির বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন, খেলাপিরা যদি ইতোমধ্যে দেশ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার করে থাকেন এবং রাষ্ট্র যদি সেই অর্থ ফেরত আনতে ব্যর্থ হয়, তবে কেবল সংসদে নাম প্রকাশ করে অর্থনীতির কোনো দৃশ্যমান লাভ হবে না। তালিকা প্রকাশের পর সরকার কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আমাদের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সমস্যা চরম আকার ধারণ করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই মুহূর্তে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ব্যাংক খাতের মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই এখন নন-পারফর্মিং লোন বা অকার্যকর ঋণ। বছরের পর বছর এসব ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলেই আজ পুরো ব্যাংক খাত একটি পঙ্গু ও ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে ক্যাপিটাল মার্কেট বা পুঁজিবাজার অত্যন্ত দুর্বল। ফলে দেশের আর্থিক খাতের মূল চালিকাশক্তিই হলো ব্যাংক খাত। এই খাতে যখন এমন ভঙ্গুরতা তৈরি হয়, তখন তার প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতির ওপর। এই সংকট যদি আমরা সফলভাবে মোকাবিলা করতে না পারি, তবে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার যে চেষ্টা চলছে, তা চরমভাবে ব্যাহত হবে এবং নতুন করে আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশ।

এই বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়ার পর তা আর ফেরত আসছে না। এর ফলে বহু ব্যাংক আজ রুগ্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট এতটাই তীব্র যে, তারা সাধারণ গ্রাহকদের জমানো টাকা পর্যন্ত ফেরত দিতে পারছে না। আমানতকারীরা যখন তাদের জমানো টাকা তুলতে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসছেন, তখন পুরো ব্যাংক ব্যবস্থার ওপরই মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।

আর্থিক খাতে কোনো ব্যাংক বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে না। প্রতিটি ব্যাংক একে অপরের সঙ্গে এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। রুগ্ন ব্যাংকগুলো টিকে থাকতে না পারলে তার প্রভাব অন্যান্য সুস্থ ব্যাংক ও আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পড়বে। এটি পুরো আর্থিক খাতের জন্য একটি ভয়াবহ পদ্ধতিগত বা সিস্টেমিক ঝুঁকি।

বিপুল পরিমাণ ঋণ যখন খেলাপি হয়ে যায়, তখন নিজেদের প্রফিটেবিলিটি বা লাভজনকতা ধরে রাখতে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয় দেশের এসএমই (ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প) খাত। চড়া সুদের কারণে এই খাতের উদ্যোক্তারা তখন আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হন, যা দেশের কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে।

ব্যাংকগুলোর অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট বা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক হতে হবে। প্রতি বছর সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন এবং ঝুঁকি চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ব্যাংক খাতের স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বাংলাদেশের আর্থিক খাতের এই দুর্বলতা আন্তর্জাতিক মহলে ভুল বার্তা দিচ্ছে। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাচ্ছেন, যা আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনছে।

আমাদের দেশে ঋণখেলাপি হওয়াটা যেন এক ধরনের 'সংস্কৃতি'তে পরিণত হয়েছে। এই সংস্কৃতি গড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে রাজনীতিক ও ঋণখেলাপিদের মধ্যকার অশুভ আঁতাত। অতীত ঘাঁটলে দেখা যায়, যারা ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন সরকার তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা তো নিতে পারেইনি; উল্টো তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছেন। অনেকেই সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন।

অনেক সময় নির্বাচনের আগে ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ডাউন পেমেন্টের নামে সামান্য কিছু টাকা জমা দিয়ে তারা খেলাপি ঋণকে 'নিয়মিত' করে নিয়েছেন। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যা কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমালেও অর্থনীতির অন্তর্নিহিত ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে কোনো কাজেই আসেনি। এর পাশাপাশি ঋণখেলাপিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির না থাকায় মানুষের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তা বোধহয় আর ফেরত দিতে হয় না।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ অত্যন্ত কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। কাজটিকে কঠিন বলার প্রধান কারণ হলো, বছরের পর বছর এসব ঋণ আদায় করা হয়নি। যারা বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন, তাদের অনেকেই হয়তো বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন বা অর্থ-সম্পদ পাচার করেছেন। তাদের নামে থাকা যেসব রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা জমিজমা ব্যাংকের কাছে বন্ধক হিসেবে আছে, সেগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য হয়তো নেওয়া ঋণের তুলনায় খুবই সামান্য। ফলে এসব বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করে পুরো টাকা আদায় করা সম্ভব নাও হতে পারে।

এ অবস্থায় ব্যাংক খাতে কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। প্রথমত, রুগ্ন ব্যাংকগুলোর বিষয়ে সরকারকে একটি কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকার যদি এই ব্যাংকগুলোকে নতুন করে তহবিল না দেয়, তবে আমানতকারীদের কী হবে? আবার সরকার যদি আমানতকারীদের সব টাকা পরিশোধ করে দেয়, তবে কি ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হবে? এখানে এমন একটি মেকানিজম দরকার, যাতে আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত থাকে এবং ব্যাংকগুলোও নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

ব্যাংকগুলোর অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট বা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক হতে হবে। প্রতি বছর সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন এবং ঝুঁকি চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সরকারকে দুটি কাজ সমান্তরালভাবে করতে হবে। একদিকে, আগের খেলাপিদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। অন্যদিকে, এখন থেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে নতুন করে কাউকে ঋণখেলাপি হওয়ার কিংবা ঋণ পুনঃতফসিল করার কোনো অন্যায্য সুযোগ দেওয়া যাবে না—এই কঠোর বার্তাটি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

অতীতের খেলাপিদের যদি ছাড় দেওয়া হয়, তবে নতুন কোনো আইন বা সংস্কারকে কেউ গুরুত্বের সঙ্গে নেবে না। ব্যবসা যারা করবেন, তারা কেবল ব্যবসায়িক নিয়ম-নীতির মধ্যেই থাকবেন; এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো স্থান থাকা চলবে না। খেলাপি ঋণের এই পাহাড় যদি এখনই ধসিয়ে দেওয়া না যায়, তবে আমাদের ব্যাংক খাতে কখনোই মানুষের আস্থা ফিরবে না। আর আস্থাহীন আর্থিক খাত নিয়ে কোনো দেশের অর্থনীতিই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। তাই এখনই সময় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার। তালিকা প্রকাশ করে যে প্রক্রিয়ার শুরু হলো, তার সমাপ্তি হোক খেলাপিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ব্যাংক খাত সুশাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

  • ড. আব্দুর রাজ্জাক : রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‌্যাপিড) এর চেয়ারম্যান; গবেষণা পরিচালক পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)

সম্পর্কিত