ইনবক্সের বাইরে–৮

আমাদের বাবারা এত ‘গম্ভীর’ কেন

স্ট্রিম গ্রাফিক

ট্রেনটা তখন ধীরে ধীরে ছাড়ছে।

স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম পেছনে সরে যাচ্ছে। আমি জানালার পাশে বসে আছি। পায়ের কাছে চালের বস্তা, পাশে ছোট্ট একটা ব্যাগ। কলেজে পড়ি তখন। গ্রামের বাড়ি থেকে দূরের শহরে যাচ্ছি পড়তে।

ট্রেনটা একটু গতি নেওয়ার পর জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, আব্বা হেঁটে যাচ্ছেন স্টেশন থেকে। ধীর পায়ে, ভারী ভঙ্গিতে। তারপর হঠাৎই দেখলাম, তিনি চোখ মুছছেন।

অবাক হয়েছিলাম। কারণ আমার চেনা আব্বা তো কাঁদার মানুষ নন। আমাদের কাছে বাবা ছিলেন অনেকটা হুমায়ূন আজাদের কবিতার সেই মানুষটির মতো—

‘বাবা ছিলেন অনেকটা সিংহের মতো, তার গর্জনে আমরা কাঁপতে থাকতাম

বাবা ছিলেন অনেকটা আড়িয়াল বিলের প্রচণ্ড চিলের মতো, তার ছায়া দেখলেই

মুরগির বাচ্চার মতো আমরা মায়ের ডানার নিচে লুকিয়ে পড়তাম।’

আমাদের বাড়িতেও বাবার সামনে জোরে কথা বলার সাহস ছিল না। চোখে চোখ রেখে কথা বলা তো দূরের কথা। আব্বা খুব কম কথা বলতেন। হাসতেন আরও কম। প্রয়োজন ছাড়া গল্পে অংশ নিতেন না। তাঁর মুখে সবসময় যেন এক ধরনের গাম্ভীর্যের মুখোশ লেগে থাকত।

তাই ট্রেনের জানালা থেকে দেখা চোখ মুছতে থাকা মানুষটির সঙ্গে ঘরের ভেতরের সেই কঠিন মানুষটিকে কখনো মেলাতে পারিনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি, এই বৈপরীত্য শুধু আমার বাবার নয়। আমাদের সমাজের প্রায় সব বাবার গল্পই এমন।

ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে দেখছি, বাবা দিবস উপলক্ষে অনেকে ছবি দিচ্ছেন। কোথাও ফুল, কোথাও কেক, কোথাও দামি উপহার। ছবিগুলোর ভিড়ে হঠাৎ মনে হলো, আমরা কি সত্যিই আমাদের বাবাদের চিনি? নাকি আমরা শুধু তাদের দায়িত্বগুলো চিনি?

বাবাদের নিয়ে আমাদের সমাজে একটা অদ্ভুত ধারণা আছে। বাবা মানেই শক্ত হতে হবে। বাবা মানেই গম্ভীর হতে হবে। বাবা মানেই পরিবারের বটগাছ। তিনি কাঁদবেন না, দুর্বল হবেন না, ভেঙে পড়বেন না।

মজার ব্যাপার হলো, এই ধারণা শুধু পুরুষেরা নয়, নারীরাও অনেক সময় বিশ্বাস করেন। ২০১৯ সালে বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইপসসের এক জরিপে দেখা যায়, বিপুলসংখ্যক বাবা মনে করেন, সমাজ তাদের ওপর ‘কঠিন মানুষ’ হয়ে থাকার চাপ সৃষ্টি করে। অনেক বাবাই বলেছেন, তাঁরা নিজেদের আবেগ চেপে রাখতে বাধ্য হন।

হয়তো সেই কারণেই ট্রেন ছাড়ার আগে আব্বা কাঁদেননি। ট্রেন ছাড়ার পর কেঁদেছিলেন। সন্তানের চোখের আড়ালে। কারণ এই সমাজ বাবাদের শিখিয়েছে, পুরুষ কাঁদে না। বাবা দুর্বল হয় না। বাবা ভেঙে পড়ে না।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণাগুলো দেখায়, দীর্ঘদিন ধরে আবেগ দমন করতে করতে অনেক পুরুষ মানসিক সমস্যায় ভোগেন। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, একাকিত্ব—এসব সমস্যা পুরুষদের মধ্যে প্রায়ই অদৃশ্য থেকে যায়, কারণ তারা সাহায্য চাইতে শেখেননি।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণায় দেখা গেছে, আজও বহু মানুষ মনে করেন, পরিবারের যত্ন নেওয়া, সংসার চালানো বা ত্যাগ স্বীকার করা বাবার স্বাভাবিক দায়িত্ব। ফলে তাদের অবদান অনেক সময় দৃশ্যমান স্বীকৃতি পায় না।

আমার নিজের বাবার কথাই ধরা যাক। বয়স বাড়ার পর লক্ষ্য করেছি, বাবার চশমার ডাঁটি হয়তো ভেঙে গেছে সাত দিন আগে। স্যান্ডেলটা ছিঁড়ে গেছে। ডায়াবেটিসের ওষুধ ফুরিয়ে গেছে কয়েক দিন আগে। কিন্তু তিনি কাউকে বলছেন না।

কেন বলছেন না? কারণ সারা জীবন তিনি দিয়েছেন। চাওয়া শেখেননি। বাবাদের ট্র্যাজেডি সম্ভবত এখানেই। তারা পরিবারকে কেন্দ্র করে জীবন কাটান, কিন্তু পরিবারের ভেতরেও অনেক সময় নিঃসঙ্গ থাকেন।

মায়েদের তুলনায় বাবাদের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব অনেক বেশি। মায়ের মাথাব্যথার খবর সন্তান জানে। মায়ের ওষুধের খবর রাখে। কিন্তু বাবার কষ্টগুলো অনেক সময় অগোচরেই থেকে যায়।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণায় দেখা গেছে, আজও বহু মানুষ মনে করেন, পরিবারের যত্ন নেওয়া, সংসার চালানো বা ত্যাগ স্বীকার করা বাবার স্বাভাবিক দায়িত্ব। ফলে তাদের অবদান অনেক সময় দৃশ্যমান স্বীকৃতি পায় না।

আমরা বাবাদের দেখি উপার্জনকারী হিসেবে। রক্ষাকারী হিসেবে। দায়িত্ব পালনকারী হিসেবে। কিন্তু মানুষ হিসেবে দেখি কতটা? সম্ভবত খুব কম। তাই বাবা দিবস এলেই আমার ফুল, কেক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলোর কথা মনে হয় না। আমার মনে পড়ে সেই স্টেশন। মনে পড়ে ট্রেনের জানালা। মনে পড়ে দূরে সরে যাওয়া প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষকে; যিনি সারা জীবন আমাদের সামনে শক্ত থাকার অভিনয় করেছেন। আর দুর্বল হয়েছেন আড়ালে।

আমাদের সমাজ বাবাদের একটা চরিত্র লিখে দিয়েছে। সেই চরিত্রে কান্না নেই, ভয় নেই, ক্লান্তি নেই। আছে শুধু দায়িত্ব।

কিন্তু মানুষ কি শুধু দায়িত্ব দিয়ে তৈরি?

আজ বাবা দিবসে তাই মনে হয়, বাবাদের সবচেয়ে বড় উপহার হয়তো ফুল নয়, টাই নয়, দামি কোনো মগও নয়। সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে একটা প্রশ্ন— ‘আব্বা, আপনি কেমন আছেন?’

হয়তো প্রশ্নটা শুনে তিনি প্রথমে হেসে উড়িয়ে দেবেন। হয়তো বলবেন, ‘ভালো আছি।’

কিন্তু সেই ‘ভালো আছি’-র ভেতরে যে কত না-বলা গল্প জমে থাকে, তা বোঝার চেষ্টা করাও কি সন্তানের দায়িত্ব নয়?

কবি রণজিৎ দাশ বাবাকে নিয়ে লিখেছিলেন—

‘আপনি আমার লেখার জগৎ থেকে একটু দূরে রয়েছেন,

যেমন শহর থেকে একটু দূরে থাকে পাওয়ার স্টেশন।’

বাবারা বোধহয় সত্যিই পাওয়ার স্টেশনের মতো। দূরে থাকেন। শব্দ করেন না। আলো নিয়ে বড়াই করেন না। কিন্তু তাদের নীরব শক্তি বন্ধ হয়ে গেলে তবেই আমরা বুঝতে পারি, কত আলো আসছিল সেখান থেকে।

  • মারুফ ইসলাম: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
Ad 300x250

সম্পর্কিত