হাসান মামুনের মতামত
হাসান মামুন

শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা যে খারাপ এবং তাদের চেয়ে নিকৃষ্ট শাসক যে কমই হয়, সেটা নতুন করে বর্ণনার কিছু নেই। নিকৃষ্ট ছিলেন বলেই তাদেরকে ক্ষমতা থেকে নামাতে অকাতরে জীবন দিতে হয়েছে ছাত্র-জনতাকে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এ দেশের মানুষ যেন আত্মাহুতির উৎসবে মেতেছিল। শেষদিকে তাদের প্রত্যাঘাতেও হাসিনার দলের অনেকের জীবন গেছে। এরা সবাই কিন্তু এ দেশের নাগরিক।
পুলিশের যেসব সদস্য আন্দোলনকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন, তারা ছিলেন রাষ্ট্রের পোশাকধারী। তবে পোশাকের আড়ালে তাদের সিংহভাগই রূপান্তরিত হয়েছিল আওয়ামী লীগে। পুলিশ আর আওয়ামী লীগকে হাসিনা শাসনামলের শেষ দিকে আলাদা করা যাচ্ছিল না। এটা যে কত বড় ক্ষতি, তা বুঝতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হতে হয় না।
সেনাবাহিনীকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে স্বভাবতই। গণঅভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি সামলাতে সামলাতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। সমালোচিতও কম হননি। কারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল বিরাট। কিন্তু সেনাদের পক্ষে তো পুলিশি দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। তাদের থাকার কথা ব্যারাকে; রাখতে হয় দেশরক্ষার প্রস্তুতিও।
নির্বিচারে গুলি করে শত শত মানুষ হত্যার পরও পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে যে রাতে সেনাবাহিনী নামিয়েছিলেন হাসিনা, সেই মুহূর্তে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের প্রধানকে তার কক্ষে বসে বলেছিলাম– এই সেনাবাহিনী সহসা ব্যারাকে ফিরবে না। এত মানুষকে খুন করে হাসিনাও ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না।
আরও আগ থেকেই দুম করে ভবিষ্যদ্বাণী করতাম। অনেকেই এটা করতেন নিশ্চয়ই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যেদিন বাদ দিয়ে দেওয়া হয়, সেদিন অল্পবয়সী সহকর্মীদের কাছে মাফ চেয়ে এমন উক্তি করেছিলাম, যা এখানে উল্লেখ করা যাবে না। তবে এর চাইতেও বাজে পরিণতি হয়েছে শেখ হাসিনার।
মুশকিল ওখানে যে, তিনি ও তারা পরিণতির কথা ভাবেননি। ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার নেশায় বরং একটা আগ্রাসী সম্প্রদায়ে পরিণত করেছিলেন নিজেদের। যেন দখলদার বাহিনী। জুলাই-আগস্টে তাদেরকে এর বাইরে কিছু ভাবা যায়নি। মানুষ তাদের বিষয়ে সব রকম গুজবেই বিশ্বাস স্থাপন করছিল। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে লোকজন এসে পুলিশের পোশাকে খুন করে যাচ্ছে বলে ‘খবর’ দাবানলের মতো ছড়িয়ে গিয়েছিল তখন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘নতুন উচ্চতা’য় তোলার নামে যা যা করা হয়েছিল আর মুখে যা বলা হতো, তাতে সেটাও অবিশ্বাস করেনি মানুষ। সেই ভারতেই পালাতে হয়েছে হাসিনাকে দুপুরের খাবার ফেলে রেখে, বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে। এর আগে অন্য স্বজনদের দেশ ছাড়ার সুযোগ অবশ্য করে দিয়েছিলেন।
এখন ভারতে আশ্রিত হয়ে নিত্যনতুন হুমকি দিয়ে চলেছেন হাসিনা। এমনকি ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় সেখানকার একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি হাজির হয়ে অডিও বক্তব্যও দিয়েছেন। এসব করে আসলে উজ্জীবিত রাখতে চাইছেন দেশে অবস্থানরত অন্ধ সমর্থকদের। তবে বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার আসার পর ভারতীয় প্রশাসন হুঁশে ফেরার কথা। দেরিতে হলেও তারা হয়তো এখন আত্মোপলব্ধিহীন এই নারীকে সামলাবেন।
ভারতের রীতিবিরুদ্ধ আর বিপুল সহায়তা ছাড়া শেখ হাসিনার স্বৈরতন্ত্র যেহেতু এতটা বলদর্পী হতে পারত না, তাই তাদের দায়িত্ব রয়েছে এ ক্ষেত্রে ভিন্ন কিছু করার। নইলে ভারত আরও সংকটে জড়াবে, যা গড়াবে আরও অনাকাঙ্ক্ষিত দিকে।
হাসিনা গং রাজনৈতিক অপরাধের বাইরে অর্থনীতিতে যা যা করে গেছে, সেগুলো সামলে চলাও এখন কঠিন।
সরকারটির আর্থিক অপরাধ নিয়ে কিন্তু কথা হয় কম। বিশেষ করে সাধারণ লোকে এটা কমই বোঝে; কিন্তু তারা এর দুর্ভোগ কম পোহাচ্ছে না। হাসিনা গংয়ের সহায়তায় ব্যাংক খাত থেকে যে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার হয়েছে, সেগুলো তো দেশের আমানতকারীদের অর্থ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সুরক্ষা দেয়নি, যেটা ছিল তার প্রধান কাজ। একাধিক গভর্নরকেও তাই পালাতে হয়েছে হাসিনার দেখাদেখি। এ অঞ্চলে কোনো রাজনৈতিক পালাবদলের পর কী ঘটেছে এমন কিছু?
উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদার, এমনকি প্রকল্প পরিচালকও গা ঢাকা দিয়েছেন। কারণ সেই সব প্রকল্পে করা হচ্ছিল রাষ্ট্রীয় অর্থের দুর্নীতিমূলক ব্যয়। এমন বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতাও ছিল না। এদিকে বিদ্যুৎ খাতে অব্যাহত অপচয় আর গ্যাস খাতে আমদানিনির্ভরতা আমাদের এমন নাজুক অবস্থায় ফেলে রেখেছিল যে, এ মুহূর্তে একটা বাজে গ্যাস পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে অর্থনীতি।
অন্তর্বর্তী সরকারও এসব ক্ষেত্র সংস্কারে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়নি। তারা হাসিনা সরকারের এলএনজি টার্মিনাল চুক্তিগুলো বাতিল করলেও নিজেরা নতুন কোনো উদ্যোগ না নিয়ে পার করেছেন মূল্যবান দেড়টি বছর। তারা অনেক বেশি আগ্রহ দেখান রাজনৈতিক সংস্কারে, যেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আবার ছিল না মাঠে থাকা দলগুলোর ঐকমত্য। অর্থনৈতিক সংস্কারে ঐকমত্য বেশি থাকলেও এতে আগ্রহ কম পরিলক্ষিত হয়েছে। তাদের বড় সাফল্য অবশ্য ছিল বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো আর মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনায়। তবে কাজের সুযোগ আরও কমেছে দেড় বছরে; কেননা অর্থনীতি গতি হারিয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট অরাজকতায় অর্থনীতি গতি হারায় বটে। ক্ষমতাচ্যুতদের রেখে যাওয়া প্রশাসন ঠিকমতো কাজ করে না। সহায়তা জোগায় না অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে। রাজনৈতিক দলগুলোও ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে মেতে থেকে জাতির প্রয়োজন উপলব্ধিতে ব্যর্থ হয়। আমাদের দেশে তো এ প্রবণতা জোরালো। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল কোনো দিকে হেলে না পড়ে দৃঢ়ভাবে দলনিরপেক্ষতা বজায় রাখা।
সেটি করতে ব্যর্থ হওয়াতেই সংকট বেড়ে উঠেছে হাসিনা সরকার দৃশ্যপট থেকে বিদায় নেওয়ার পর। মাসের পর মাস চলেছে ‘মব’ আর সেটা মোকাবিলায় সেনাবাহিনীও সক্রিয় হতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সক্রিয় করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। মবের হাতে মিডিয়া প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে দিনেদুপুরে।
এ অবস্থায় ক্ষমতাচ্যুতদের পক্ষ থেকে অনেকেই বলতে চেয়েছেন, ‘আগেই ভালো ছিলাম’। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সৃষ্ট অরাজক পরিস্থিতিতেও অনেকে বলতেন, পাকিস্তান আমলই ভালো ছিল। এটা তাদের দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যা। সংকট থেকে বেরোনোর ইতিহাস সম্পর্কে যারা অজ্ঞ, তাদের পক্ষেই অতীতের সঙ্গে এমন তুলনা করা সম্ভব। অতীত ‘ভালো’ হলে তো অকাতরে জীবন দিয়ে মানুষ তা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইতো না।
কখনো কখনো হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েও স্বৈরশাসকদের ক্ষমতা থেকে হটানো হয়ে থাকে। পদ্ধতি হিসেবে সেটা অগ্রহণযোগ্য হলেও এর ভেতর দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে পথ তৈরি হয় এগিয়ে যাওয়ার। আর পথটা বন্ধুরই হয়ে থাকে। দেশে দেশে এর উদাহরণ কম নেই।
গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের চাইতে খারাপ ও ভালো দু’রকম অভিজ্ঞতাই রয়েছে। খারাপ অভিজ্ঞতা হিসেবে মিসর আর ভালো অভিজ্ঞতা হিসেবে শ্রীলঙ্কার কথা বলা যেতে পারে। মিসরের রাজনীতিতে যা ঘটেছে, এখানে তা ঘটেনি। আবার শ্রীলঙ্কায় অপেক্ষাকৃত কম সময়ে রাজনীতি ও অর্থনীতি উভয় ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি এসেছে, বাংলাদেশে সেটাও ঘটেনি।
শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি প্রায় দেউলিয়া অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে সেখানে অর্থনৈতিক অপরাধের বদলে নীতিগত ভ্রান্তি ছিল বলে। যেমন, রাজস্ব আহরণ ও কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার মতো অপরিণামদর্শী নীতি নিয়েছিল দেশটির ক্ষমতাচ্যুত সরকার। তবে তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিনষ্ট করেনি। দুর্নীতিগ্রস্ত হলেও সরকারটি নির্বাচিত ছিল বটে। আর বেশি শক্তি প্রয়োগ না করে রণে ভঙ্গও দেয় সরকার।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের অপশাসনের সঙ্গে এর তুলনা হয় না। হাসিনা গং ধরে ধরে এক-একটা খাত নষ্ট করে দিচ্ছিল। সেরা মেধাগুলোও কিনে নিচ্ছিল হাট বসিয়ে। পচনের প্রবাহ গিয়ে পৌঁছে বিচার বিভাগ পর্যন্ত। অতীতে ক্ষমতার অস্বাভাবিক পালাবদলে পরিস্থিতি সামলানোর জন্য খোঁজ করা হতো সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেখা গেল তাদের অনেককে ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে আশ্রয় নিতে। তবে শেখ হাসিনার জন্য দেশের কোনো জায়গাই নাকি নিরাপদ ছিল না। একমাত্র ভারত ছিল তার নিরাপদ গন্তব্য।
একজন শাসকের এর চাইতে খারাপ পরিণতি আর কী হতে পারে! এখন কথা হলো, ভারত যাদের গন্তব্য নয়; তাদের তো দেশটাকেই করে তোলার কথা নিঃশঙ্কচিত্তে বিচরণের স্থান। শাসক নির্বাচিত হয়ে আসবেন এবং সেটি হবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তারা দেশ চালাবেন সংবিধান ও আইন অনুযায়ী– সংসদকে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু করে। স্বচ্ছভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং নিজেদের কাজের জন্য করবেন জবাবদিহি। কথা বলার সুযোগ অবারিত রাখবেন। আর বিচার বিভাগকে বহাল রাখবেন বিরোধ নিষ্পত্তির সর্বশেষ গন্তব্য হিসেবে। তারপরও দায়িত্ব পালন করতে না পারলে বলেকয়ে ছেড়ে দেবেন।
এগুলোকে অভ্যাসে পরিণত করতে পারা অবশ্য সহজ নয়। গণঅভ্যুত্থানের পর মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোকে এসবের মধ্যে যাওয়ার প্রবণতা দেখাতে দেখা গেছে খুব কম। নির্বাচনের পর ছয় মাসও যায়নি; এরই মধ্যে তারা যে যার চেহারা উন্মোচনেও ব্যস্ত মনে হচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালনের মধ্যেই শিক্ষাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত এর একটা প্রমাণ।
রাজনৈতিক মতভেদ আর সেটা নিয়ে সংঘাত তো এক নয়। এ অবস্থায় আগে সরকারকে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সংযত করতে হবে দ্রুত। আইনগত পন্থায় বিচারিক নিষ্পত্তির সুযোগও রাখতে হবে।
গণভবনকে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তর করে তা উদ্বোধনের সময় অনেক কথাই বলা হয়েছে। সেগুলোর ৫০ শতাংশের বেশি রাখতে পারলেও সামনের দিনগুলোয় তেমন সমস্যা হবে না। প্রত্যাশা তো খুব বেশি নয়। এটা আমাদের সুবিধাও বটে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট

শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা যে খারাপ এবং তাদের চেয়ে নিকৃষ্ট শাসক যে কমই হয়, সেটা নতুন করে বর্ণনার কিছু নেই। নিকৃষ্ট ছিলেন বলেই তাদেরকে ক্ষমতা থেকে নামাতে অকাতরে জীবন দিতে হয়েছে ছাত্র-জনতাকে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এ দেশের মানুষ যেন আত্মাহুতির উৎসবে মেতেছিল। শেষদিকে তাদের প্রত্যাঘাতেও হাসিনার দলের অনেকের জীবন গেছে। এরা সবাই কিন্তু এ দেশের নাগরিক।
পুলিশের যেসব সদস্য আন্দোলনকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন, তারা ছিলেন রাষ্ট্রের পোশাকধারী। তবে পোশাকের আড়ালে তাদের সিংহভাগই রূপান্তরিত হয়েছিল আওয়ামী লীগে। পুলিশ আর আওয়ামী লীগকে হাসিনা শাসনামলের শেষ দিকে আলাদা করা যাচ্ছিল না। এটা যে কত বড় ক্ষতি, তা বুঝতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হতে হয় না।
সেনাবাহিনীকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে স্বভাবতই। গণঅভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি সামলাতে সামলাতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। সমালোচিতও কম হননি। কারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল বিরাট। কিন্তু সেনাদের পক্ষে তো পুলিশি দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। তাদের থাকার কথা ব্যারাকে; রাখতে হয় দেশরক্ষার প্রস্তুতিও।
নির্বিচারে গুলি করে শত শত মানুষ হত্যার পরও পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে যে রাতে সেনাবাহিনী নামিয়েছিলেন হাসিনা, সেই মুহূর্তে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের প্রধানকে তার কক্ষে বসে বলেছিলাম– এই সেনাবাহিনী সহসা ব্যারাকে ফিরবে না। এত মানুষকে খুন করে হাসিনাও ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না।
আরও আগ থেকেই দুম করে ভবিষ্যদ্বাণী করতাম। অনেকেই এটা করতেন নিশ্চয়ই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যেদিন বাদ দিয়ে দেওয়া হয়, সেদিন অল্পবয়সী সহকর্মীদের কাছে মাফ চেয়ে এমন উক্তি করেছিলাম, যা এখানে উল্লেখ করা যাবে না। তবে এর চাইতেও বাজে পরিণতি হয়েছে শেখ হাসিনার।
মুশকিল ওখানে যে, তিনি ও তারা পরিণতির কথা ভাবেননি। ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার নেশায় বরং একটা আগ্রাসী সম্প্রদায়ে পরিণত করেছিলেন নিজেদের। যেন দখলদার বাহিনী। জুলাই-আগস্টে তাদেরকে এর বাইরে কিছু ভাবা যায়নি। মানুষ তাদের বিষয়ে সব রকম গুজবেই বিশ্বাস স্থাপন করছিল। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে লোকজন এসে পুলিশের পোশাকে খুন করে যাচ্ছে বলে ‘খবর’ দাবানলের মতো ছড়িয়ে গিয়েছিল তখন। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘নতুন উচ্চতা’য় তোলার নামে যা যা করা হয়েছিল আর মুখে যা বলা হতো, তাতে সেটাও অবিশ্বাস করেনি মানুষ। সেই ভারতেই পালাতে হয়েছে হাসিনাকে দুপুরের খাবার ফেলে রেখে, বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে। এর আগে অন্য স্বজনদের দেশ ছাড়ার সুযোগ অবশ্য করে দিয়েছিলেন।
এখন ভারতে আশ্রিত হয়ে নিত্যনতুন হুমকি দিয়ে চলেছেন হাসিনা। এমনকি ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় সেখানকার একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি হাজির হয়ে অডিও বক্তব্যও দিয়েছেন। এসব করে আসলে উজ্জীবিত রাখতে চাইছেন দেশে অবস্থানরত অন্ধ সমর্থকদের। তবে বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার আসার পর ভারতীয় প্রশাসন হুঁশে ফেরার কথা। দেরিতে হলেও তারা হয়তো এখন আত্মোপলব্ধিহীন এই নারীকে সামলাবেন।
ভারতের রীতিবিরুদ্ধ আর বিপুল সহায়তা ছাড়া শেখ হাসিনার স্বৈরতন্ত্র যেহেতু এতটা বলদর্পী হতে পারত না, তাই তাদের দায়িত্ব রয়েছে এ ক্ষেত্রে ভিন্ন কিছু করার। নইলে ভারত আরও সংকটে জড়াবে, যা গড়াবে আরও অনাকাঙ্ক্ষিত দিকে।
হাসিনা গং রাজনৈতিক অপরাধের বাইরে অর্থনীতিতে যা যা করে গেছে, সেগুলো সামলে চলাও এখন কঠিন।
সরকারটির আর্থিক অপরাধ নিয়ে কিন্তু কথা হয় কম। বিশেষ করে সাধারণ লোকে এটা কমই বোঝে; কিন্তু তারা এর দুর্ভোগ কম পোহাচ্ছে না। হাসিনা গংয়ের সহায়তায় ব্যাংক খাত থেকে যে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার হয়েছে, সেগুলো তো দেশের আমানতকারীদের অর্থ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সুরক্ষা দেয়নি, যেটা ছিল তার প্রধান কাজ। একাধিক গভর্নরকেও তাই পালাতে হয়েছে হাসিনার দেখাদেখি। এ অঞ্চলে কোনো রাজনৈতিক পালাবদলের পর কী ঘটেছে এমন কিছু?
উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদার, এমনকি প্রকল্প পরিচালকও গা ঢাকা দিয়েছেন। কারণ সেই সব প্রকল্পে করা হচ্ছিল রাষ্ট্রীয় অর্থের দুর্নীতিমূলক ব্যয়। এমন বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতাও ছিল না। এদিকে বিদ্যুৎ খাতে অব্যাহত অপচয় আর গ্যাস খাতে আমদানিনির্ভরতা আমাদের এমন নাজুক অবস্থায় ফেলে রেখেছিল যে, এ মুহূর্তে একটা বাজে গ্যাস পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে অর্থনীতি।
অন্তর্বর্তী সরকারও এসব ক্ষেত্র সংস্কারে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়নি। তারা হাসিনা সরকারের এলএনজি টার্মিনাল চুক্তিগুলো বাতিল করলেও নিজেরা নতুন কোনো উদ্যোগ না নিয়ে পার করেছেন মূল্যবান দেড়টি বছর। তারা অনেক বেশি আগ্রহ দেখান রাজনৈতিক সংস্কারে, যেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আবার ছিল না মাঠে থাকা দলগুলোর ঐকমত্য। অর্থনৈতিক সংস্কারে ঐকমত্য বেশি থাকলেও এতে আগ্রহ কম পরিলক্ষিত হয়েছে। তাদের বড় সাফল্য অবশ্য ছিল বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো আর মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনায়। তবে কাজের সুযোগ আরও কমেছে দেড় বছরে; কেননা অর্থনীতি গতি হারিয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট অরাজকতায় অর্থনীতি গতি হারায় বটে। ক্ষমতাচ্যুতদের রেখে যাওয়া প্রশাসন ঠিকমতো কাজ করে না। সহায়তা জোগায় না অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে। রাজনৈতিক দলগুলোও ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে মেতে থেকে জাতির প্রয়োজন উপলব্ধিতে ব্যর্থ হয়। আমাদের দেশে তো এ প্রবণতা জোরালো। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল কোনো দিকে হেলে না পড়ে দৃঢ়ভাবে দলনিরপেক্ষতা বজায় রাখা।
সেটি করতে ব্যর্থ হওয়াতেই সংকট বেড়ে উঠেছে হাসিনা সরকার দৃশ্যপট থেকে বিদায় নেওয়ার পর। মাসের পর মাস চলেছে ‘মব’ আর সেটা মোকাবিলায় সেনাবাহিনীও সক্রিয় হতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সক্রিয় করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। মবের হাতে মিডিয়া প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে দিনেদুপুরে।
এ অবস্থায় ক্ষমতাচ্যুতদের পক্ষ থেকে অনেকেই বলতে চেয়েছেন, ‘আগেই ভালো ছিলাম’। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সৃষ্ট অরাজক পরিস্থিতিতেও অনেকে বলতেন, পাকিস্তান আমলই ভালো ছিল। এটা তাদের দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যা। সংকট থেকে বেরোনোর ইতিহাস সম্পর্কে যারা অজ্ঞ, তাদের পক্ষেই অতীতের সঙ্গে এমন তুলনা করা সম্ভব। অতীত ‘ভালো’ হলে তো অকাতরে জীবন দিয়ে মানুষ তা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইতো না।
কখনো কখনো হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েও স্বৈরশাসকদের ক্ষমতা থেকে হটানো হয়ে থাকে। পদ্ধতি হিসেবে সেটা অগ্রহণযোগ্য হলেও এর ভেতর দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে পথ তৈরি হয় এগিয়ে যাওয়ার। আর পথটা বন্ধুরই হয়ে থাকে। দেশে দেশে এর উদাহরণ কম নেই।
গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের চাইতে খারাপ ও ভালো দু’রকম অভিজ্ঞতাই রয়েছে। খারাপ অভিজ্ঞতা হিসেবে মিসর আর ভালো অভিজ্ঞতা হিসেবে শ্রীলঙ্কার কথা বলা যেতে পারে। মিসরের রাজনীতিতে যা ঘটেছে, এখানে তা ঘটেনি। আবার শ্রীলঙ্কায় অপেক্ষাকৃত কম সময়ে রাজনীতি ও অর্থনীতি উভয় ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি এসেছে, বাংলাদেশে সেটাও ঘটেনি।
শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি প্রায় দেউলিয়া অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে সেখানে অর্থনৈতিক অপরাধের বদলে নীতিগত ভ্রান্তি ছিল বলে। যেমন, রাজস্ব আহরণ ও কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার মতো অপরিণামদর্শী নীতি নিয়েছিল দেশটির ক্ষমতাচ্যুত সরকার। তবে তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিনষ্ট করেনি। দুর্নীতিগ্রস্ত হলেও সরকারটি নির্বাচিত ছিল বটে। আর বেশি শক্তি প্রয়োগ না করে রণে ভঙ্গও দেয় সরকার।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের অপশাসনের সঙ্গে এর তুলনা হয় না। হাসিনা গং ধরে ধরে এক-একটা খাত নষ্ট করে দিচ্ছিল। সেরা মেধাগুলোও কিনে নিচ্ছিল হাট বসিয়ে। পচনের প্রবাহ গিয়ে পৌঁছে বিচার বিভাগ পর্যন্ত। অতীতে ক্ষমতার অস্বাভাবিক পালাবদলে পরিস্থিতি সামলানোর জন্য খোঁজ করা হতো সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেখা গেল তাদের অনেককে ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে আশ্রয় নিতে। তবে শেখ হাসিনার জন্য দেশের কোনো জায়গাই নাকি নিরাপদ ছিল না। একমাত্র ভারত ছিল তার নিরাপদ গন্তব্য।
একজন শাসকের এর চাইতে খারাপ পরিণতি আর কী হতে পারে! এখন কথা হলো, ভারত যাদের গন্তব্য নয়; তাদের তো দেশটাকেই করে তোলার কথা নিঃশঙ্কচিত্তে বিচরণের স্থান। শাসক নির্বাচিত হয়ে আসবেন এবং সেটি হবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তারা দেশ চালাবেন সংবিধান ও আইন অনুযায়ী– সংসদকে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু করে। স্বচ্ছভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং নিজেদের কাজের জন্য করবেন জবাবদিহি। কথা বলার সুযোগ অবারিত রাখবেন। আর বিচার বিভাগকে বহাল রাখবেন বিরোধ নিষ্পত্তির সর্বশেষ গন্তব্য হিসেবে। তারপরও দায়িত্ব পালন করতে না পারলে বলেকয়ে ছেড়ে দেবেন।
এগুলোকে অভ্যাসে পরিণত করতে পারা অবশ্য সহজ নয়। গণঅভ্যুত্থানের পর মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোকে এসবের মধ্যে যাওয়ার প্রবণতা দেখাতে দেখা গেছে খুব কম। নির্বাচনের পর ছয় মাসও যায়নি; এরই মধ্যে তারা যে যার চেহারা উন্মোচনেও ব্যস্ত মনে হচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালনের মধ্যেই শিক্ষাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত এর একটা প্রমাণ।
রাজনৈতিক মতভেদ আর সেটা নিয়ে সংঘাত তো এক নয়। এ অবস্থায় আগে সরকারকে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সংযত করতে হবে দ্রুত। আইনগত পন্থায় বিচারিক নিষ্পত্তির সুযোগও রাখতে হবে।
গণভবনকে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তর করে তা উদ্বোধনের সময় অনেক কথাই বলা হয়েছে। সেগুলোর ৫০ শতাংশের বেশি রাখতে পারলেও সামনের দিনগুলোয় তেমন সমস্যা হবে না। প্রত্যাশা তো খুব বেশি নয়। এটা আমাদের সুবিধাও বটে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট
.png)

১২ আগস্ট ২০১৯, সোমবার। এদেশের মানুষ তথা ইছাপুর-কুসুমপুরবাসীর জন্য শোকাবহ দিন। এদিন আমরা হারিয়েছি এক মহান ব্যক্তিত্বকে। প্রখ্যাত লেখক, শিক্ষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও সাবেক মন্ত্রী আমাদের প্রিয় শেলী দাদা এই দিনে আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
২ ঘণ্টা আগে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতা এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। শুধু সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ নয়, বাংলাদেশ সরকারের প্রধান হিসেবে আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণও পেয়েছেন তিনি।
৫ ঘণ্টা আগে
ব্রিকস তার পরবর্তী অগ্রযাত্রা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। তবে এবার আরও বেশি অর্থায়ন জোগাড়ে নয়; বিশ্ব কীভাবে সম্পদ, স্থিতিস্থাপকতা ও অগ্রগতিকে মূল্যায়ন করবে, তার মধ্য দিয়ে ব্রিকস সামনে এগিয়ে যেতে চায়।
৬ ঘণ্টা আগে
মানবসভ্যতা সম্ভবত এখন বাস্তবতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের তৃতীয় যুগে প্রবেশ করেছে। একসময় মানুষ কেবল বাস্তবকে প্রত্যক্ষ করত, যাপন করত। পরে শিখল সেই বাস্তবকে ক্যামেরায় ধারণ করতে। আর এখন জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ভৌত অস্তিত্বহীন ব্যাপারকে বাস্তবের মতো নতুন মানুষ, দৃশ্য ও ঘট
৭ ঘণ্টা আগে