ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যখন দোহা, দুবাই এবং মানামার আকাশসীমা ভেদ করে শহরগুলোতে আছড়ে পড়ল, তখন কেবল কাচ আর কংক্রিটের ভবনই চূর্ণ হয়নি, ভেঙে গেছে উপসাগরীয় দেশগুলোর বহু যত্নে গড়া স্থিতিশীলতার দুর্গ। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলের সংকট ও সংঘাত থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখার যে ভাবমূর্তি তারা তৈরি করেছিল, তাতেও লেগেছে বড় ধাক্কা।
এখন এই অঞ্চলের দেশগুলো এক অসম্ভব সংকটের মুখোমুখি। বিশ্লেষকরা বলছেন, তাদের সামনে দুটি পথ খোলা: হয় পাল্টা হামলা চালিয়ে ইসরায়েলের সহযোগী হিসেবে পরিচিত হওয়া, অথবা নিজেদের শহরগুলোকে জ্বলতে দেখেও নিষ্ক্রিয় থাকা। দুটো পথই তাদের জন্য বিপজ্জনক।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবুধাবির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক মনিকা মার্কসের ভাষায়, ‘এই অঞ্চলের মানুষ এবং নেতাদের জন্য মানামা, দোহা বা দুবাইতে বোমা হামলা দেখাটা ততটাই অবিশ্বাস্য, যতটা আমেরিকানদের জন্য শার্লট বা মায়ামিতে বোমা হামলা দেখা।’
যে যুদ্ধ তারা থামাতে চেয়েছিল
ঘটনার সূত্রপাত হয় মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার পর, যেখানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং শীর্ষ সামরিক নেতারা নিহত হন। এর প্রতিশোধ হিসেবেই ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। কিন্তু সেই হামলা সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানের মতো দেশগুলোর আকাশেও আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দেয়। হামলায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে এবং শহরগুলোর বিখ্যাত সব ভবন ও বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উপসাগরীয় দেশগুলো এই সংঘাত কোনোভাবেই চায়নি। হামলার কয়েক সপ্তাহ আগেও ওমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চালাচ্ছিল। এমনকি ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সীমিত করার একটি চুক্তির সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছিল। কিন্তু সেই শান্তি আলোচনাকে উপেক্ষা করেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়, যা পরিস্থিতিকে পুরোপুরি বদলে দেয়।
অধ্যাপক মার্কসের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো বুঝতে পারছিল যে যুদ্ধ আসন্ন। তারা এটি থামানোর জন্য প্রচুর কূটনৈতিক চেষ্টাও করেছিল। তারা জানত, কোণঠাসা হয়ে পড়লে ইরান আত্মসমর্পণ করার আগে তার উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের যুদ্ধের মধ্যে টেনে আনবে।
দেশগুলোর সামনে উভয় সংকট
কিংস কলেজ লন্ডনের প্রভাষক রব জিস্ট পিনফোল্ডের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এখন উভয় সংকট। একদিকে, ইরানের হামলা সহ্য করে চুপ করে বসে থাকলে তাদের সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের কাছে তাদের নিজেদের রক্ষা করার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। অন্যদিকে, যুদ্ধে জড়ালে তাদের ইসরায়েলের সহযোগী হিসেবে দেখা হবে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ, দিন শেষে এই সরকারগুলোকেও জনমতের কথা ভাবতে হয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো হয়তো শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থা নেবে, তবে নিজেদের শর্তে। তারা সরাসরি মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযানে যোগ না দিয়ে, উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা (জিসিসি)-এর যৌথ সামরিক বাহিনী “পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্স (পিএসএফ)”-এর মাধ্যমে নিজস্ব অভিযান চালাতে পারে।
এর মাধ্যমে তারা কয়েকটি জিনিস অর্জন করতে পারবে: প্রথমত, তারা বিশ্বকে দেখাতে পারবে যে তারা নিষ্ক্রিয় নয়, বরং নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম। দ্বিতীয়ত, তারা ইসরায়েল বা আমেরিকার সহযোগী হিসেবে পরিচিত হওয়া থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারবে। আর তৃতীয়ত, তারা নিজেদের আঞ্চলিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।
দুই ধরনের ভয়—অবকাঠামো ও ভাবমূর্তি
উপসাগরীয় নেতাদের জন্য দুটি বড় দুঃশ্চিন্তা রয়েছে। প্রথমটি হলো, তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলা। বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি পরিশোধন কেন্দ্র এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা হলে এই দেশগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়বে। কারণ প্রচণ্ড গরমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বিশুদ্ধ পানি ছাড়া এসব দেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে।
দ্বিতীয় এবং আরও গভীর ভয়টি হলো তাদের ভাবমূর্তির সংকট। উপসাগরীয় দেশগুলো এতদিন ধরে নিজেদেরকে ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং পর্যটনের জন্য একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ইরানের এই হামলা সেই ‘ব্র্যান্ড ইমেজ’-এ বড় ধরনের আঘাত হেনেছে।
রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রের যুদ্ধের নতুন যুগ?
এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার পুরোনো ধারণাকেও বদলে দিয়েছে। এতদিন উপসাগরীয় দেশগুলোর মূল চিন্তা ছিল ইয়েমেনের হুতি বা লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে। কিন্তু এখন তারা সরাসরি রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রের যুদ্ধের মুখোমুখি।
আগে একসময় উপসাগরীয় দেশগুলো ইরান নয়, বরং ইসরায়েলকেই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি মনে করত। কিন্তু ইরানের এই সর্বাত্মক হামলা সেই চিন্তাভাবনাকে বদলে দিতে বাধ্য করছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো এখন দ্রুত তাদের রণকৌশল পুনর্মূল্যায়ন করছে। তারা এখনও হয়তো একটি সুযোগ খুঁজছে, যার মাধ্যমে তারা এই যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারবে। কিন্তু তাদের ঝলমলে আকাশ আজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত, এবং নিষ্ক্রিয় থাকার পথও হয়তো দ্রুত বন্ধ হয়ে আসছে। তাদের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ গতিপথ।
- উরোবা জামাল: আলজাজিরার সংবাদিক
(আল জাজিরা থেকে অনূদিত)