দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তান আজ যেন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়ে ইসলামাবাদ এখন দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদে বন্দি।
সম্ভবত আমেরিকা ও ইসরায়েলের দাবার ছকে পাকিস্তানকে এমন এক আত্মঘাতী অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই তাদের জন্য ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠতে পারে। মুসলিম বিশ্বের সামরিক শক্তিগুলোকে পঙ্গু করার যে পরিকল্পনা তুরস্ক ও ইরানের ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে, তার পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ইসলামাবাদের পারমাণবিক সক্ষমতা ও সামরিক সার্বভৌমত্ব।
এই জটিল সমীকরণে পাকিস্তান কি কেবলই বহিঃশক্তির হাতের খেলনা বা দাবার ঘুঁটি, নাকি এক ‘ট্র্যাজিক হিরো’ হিসেবে নিজের অস্তিত্ব বিলীন হতে দেখবে? বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদের প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ শুধু সরকার রক্ষার জন্য নয়, বরং নিজেদের মানচিত্র রক্ষার এক অন্তিম পরীক্ষা। এই ত্রিমুখী সংকটময় অবস্থায় পাকিস্তানের সামান্যতম ভুলও দেশটিকে চিরস্থায়ী অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
মধ্যস্থতার আড়ালে কৌশলী মরণফাঁদ
পাকিস্তানকে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ‘দূত’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়াকে অনেক বিশ্লেষক ‘বিষাক্ত উপহার’ হিসেবে দেখছেন, যার মূল লক্ষ্য মূলত ইসলামাবাদকে কূটনৈতিক ব্যর্থতার দায়ভারে পিষ্ট করা। পাকিস্তান একটি শান্তিচুক্তির জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করলেও ইসরায়েলের লেবানন আক্রমণ এবং হরমুজ প্রণালীতে আমেরিকার নৌ-অবরোধের বিপরীতে ইরানের পাল্টা গোলাবর্ষণ এমন এক সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে শান্তিচুক্তির ব্যর্থতার দায়ভার সুকৌশলে পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে।
২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’-এর মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েল আজ মিত্র। অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সামরিক ও গোয়েন্দা কৌশলগত অংশীদারত্ব এই সংকটকে পাকিস্তানের জন্য আরও ঘনীভূত করেছে। ২০০৬ সালে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি এবং সাম্প্রতিক দীর্ঘপাল্লার সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ও ড্রোন প্রযুক্তির যৌথ উৎপাদন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা করছে। ভারত মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করার চেষ্টা চালাতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও যুদ্ধের আবর্তে পাকিস্তান একবার জড়িয়ে পড়লে তাদের পক্ষে একই সঙ্গে ভারত ও আফগানিস্তান সীমান্তে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। আর তাই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মনোযোগকে মূল সীমান্ত থেকে বিচ্যুত করা ইসরায়েল ও ভারতের সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য শান্তিচুক্তি কার্যক্রমে পরিকল্পিত বিচ্যুতি পাকিস্তানের সামরিক সার্বভৌমত্বের জন্য এক প্রকার ‘কৌশলগত আত্মহত্যা’র সমান হতে পারে। এই তথাকথিত মধ্যস্থতার আড়ালে সম্ভবত লুকিয়ে আছে পাকিস্তানকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে পঙ্গু করার এক নিপুণ মরণফাঁদ।
সৌদি-ইরান দ্বন্দ্ব ও অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল
পাকিস্তানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড মূলত সৌদি আরব (৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার), সংযুক্ত আরব আমিরাত (১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার) এবং কাতারের ঋণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা তাদের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি আঘাত করছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো থেকে পাকিস্তান কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পাচ্ছে না, যার পেছনে আইএমএফ-এর ফার্স্ট ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর গীতা গোপীনাথের মতো উচ্চপদস্থ ভারতীয় কর্মকর্তাদের নীতিগত প্রভাব এবং ভারতের কূটনৈতিক প্ররোচনা রয়েছে বলে মনে করা হয়।
এই অর্থনৈতিক অসহায়ত্বকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে রিয়াদ ১৯৮২ সালের প্রটোকল এবং গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’-এর দোহাই দিয়ে পাকিস্তানকে যুদ্ধের জাঁতাকলে পিষ্ট করছে। ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর আদলে তৈরি এই চুক্তির ফলে ইরান যদি সৌদি আরবের মার্কিন স্থাপনা বা তেলক্ষেত্রে হামলা চালায়, তবে প্রতিরক্ষা চুক্তির জেরে রিয়াদ ইসলামাবাদকে সরাসরি যুদ্ধে নামতে বাধ্য করতে পারে, যা হবে পাকিস্তানের জন্য এক ভয়াবহ ফাঁদ।
এই মহাবিপদ থেকে বাঁচতে পাকিস্তানের সামনে এখন ‘বিচক্ষণ কূটনীতি’ এবং একমুখী আমেরিকা-নির্ভরতা কাটিয়ে চীন-রাশিয়া-তুরস্ক বলয়ে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে তুরস্কের সঙ্গে প্রস্তাবিত ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠন এবং নিজস্ব ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করাই হবে তাদের টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।
গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান ও একটি সামরিক বহর সৌদি আরবের কিং আব্দুল আজিজ বিমান ঘাঁটিতে পৌঁছানো এই বাধ্যবাধকতারই বহিঃপ্রকাশ। বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ২৬ লাখ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৫ লাখ পাকিস্তানি শ্রমিক কর্মরত, যারা বছরে প্রায় ২৭-৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের রিজার্ভ সচল রাখে।
যদি পাকিস্তান রিয়াদের সামরিক নির্দেশ অমান্য করে, তবে এই শ্রমিকদের ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি রয়েছে যা পাকিস্তানের রেমিট্যান্স প্রবাহ স্তব্ধ করে দেবে। এই অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল কেবল পাকিস্তানকে দেউলিয়া করবে না, বরং দেশের ভেতর চরম বেকারত্ব, দাঙ্গা এবং গৃহযুদ্ধের এক নারকীয় পরিবেশ তৈরি করবে। পশ্চিমা মিত্রদের মদতে তৈরি এই ‘রেমিট্যান্সের মরণফাঁদ’ পাকিস্তানকে আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে যেখানে ভ্রাতৃত্ব ও অস্তিত্ব—উভয়ই চরম হুমকির মুখে।
অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার ঝুঁকি
পাকিস্তানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিয়া জনগোষ্ঠী এবং সাধারণ জনগণের বড় অংশই ঐতিহাসিকভাবে ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল, যার প্রমাণ আমরা ইরানে মার্কিন হামলার প্রতিবাদে পাকিস্তানের রাজপথে সাধারণ মানুষের উত্তাল মিছিলে দেখেছি। বর্তমানে শিয়া সম্প্রদায়ের এই সংখ্যাটা আনুমানিক ৪ কোটি ২০ লাখ থেকে ৪ কোটি ৫০ লাখ। এটি ইরান-পরবর্তী বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া জনগোষ্ঠী, যা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। ফলে জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে এই যুদ্ধে জড়ালে খোদ সেনাবাহিনীর নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিদ্রোহ বা বিভাজন দেখা দেওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। কারণ সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিয়া সম্প্রদায়ের।
অন্যদিকে যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান যদি পাকিস্তানের প্রধান শহর, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কিংবা পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তবে তার সুফল ভোগ করবে পাকিস্তানের চিরশত্রু প্রতিবেশী ভারত ও আফগানিস্তান। এই যুদ্ধের ডামাডোলে ইরান-পাকিস্তান সীমান্তবর্তী অশান্ত বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এক নতুন মাত্রা পাবে, যা পাকিস্তানের বিপুল খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণহীন করার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দেবে।
এছাড়াও অস্থিতিশীলতার কারণে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং সিপেক প্রকল্প কেন্দ্রিক চীনের বিশাল আর্থিক ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ চিরতরে হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। এছাড়াও ইরান-পাকিস্তান সংঘর্ষ শুরু হলে পশ্চিম সীমান্তে আফগানিস্তানের সঙ্গে চলমান সীমান্ত সংঘাত এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
তুরস্কের ‘নব্য ইরান’ তত্ত্ব ও জিসিসির কৌশলগত দাসত্ব
বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে আমেরিকা ও ইসরায়েলের লক্ষ্য কেবল ইরান নয়, বরং তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো মুসলিম শক্তিগুলোকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া। তুরস্ককে ‘নব্য ইরান’ তকমা দিয়ে ন্যাটো থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া চলছে, তা মূলত আঙ্কারার কৌশলগত স্বকীয়তা ও রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিকে নস্যাৎ করার একটি নীলনকশা। একইভাবে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং তুরস্কের ওপর অবরোধের খড়গ ঝোলানো মূলত একই সূত্রে গাঁথা, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য স্বাধীন দেশগুলোকে অনুগত দাসে পরিণত করা।
জিসিসিভুক্ত দেশগুলো—বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন—নিজেদের রাজতন্ত্রের স্থায়িত্ব রক্ষায় ইতিমধ্যেই পশ্চিমা শক্তির কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব কার্যত বিকিয়ে দিয়েছে। ২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’ এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য মিত্রতা এবং পশ্চিমা বিনিয়োগের ওপর চরম নির্ভরশীলতা প্রমাণ করে, এই দেশগুলো পশ্চিমা এজেন্ডা বাস্তবায়নের অগ্রবর্তী ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। জিসিসি দেশগুলো এখন আর মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ নয়, বরং পশ্চিমা শক্তির ‘পার্থিব পাহারাদার’ হিসেবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও ইরানের স্বাধীনচেতা অবস্থানকে দমনে লিপ্ত। ফলে আঙ্কারা বা ইসলামাবাদ যদি কোনো বিকল্প ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠন করতে চায়, তবে ডলারের রাজনীতি ও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে তাদের শ্বাসরোধ করার পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই টেবিলে রাখা হয়েছে। তুরস্ককে আর্টিকেল ৫-এর সুরক্ষা কবচ থেকে বের করে দেওয়া এবং পাকিস্তানকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ঠেলে দেওয়া মূলত এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য চিরতরে নষ্ট করার ছক।
পাকিস্তান বর্তমানে দাবার এমন এক বোর্ডে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে চাল দেওয়ার নিয়ন্ত্রণ মূলত বহিঃশক্তির হাতে। ইসরায়েল ও আমেরিকার মূল লক্ষ্য পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে অকার্যকর করে দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া; যাতে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসরায়েলের মিত্র দেশ ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য নিশ্চিত হয়।
এই মহাবিপদ থেকে বাঁচতে পাকিস্তানের সামনে এখন ‘বিচক্ষণ কূটনীতি’ এবং একমুখী আমেরিকা-নির্ভরতা কাটিয়ে চীন-রাশিয়া-তুরস্ক বলয়ে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে তুরস্কের সঙ্গে প্রস্তাবিত ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠন এবং নিজস্ব ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করাই হবে তাদের টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি। পাকিস্তান কি পারবে আরবের ঋণের বোঝা আর পশ্চিমা ব্ল্যাকমেইল উপেক্ষা করে তার সার্বভৌমত্বের মানচিত্র রক্ষা করতে?
মধ্যপ্রাচ্যে একটি কার্যকর শান্তিচুক্তির মাধ্যমে ইরান বনাম ইসরায়েল-আমেরিকার চলমান যুদ্ধ বন্ধ করা আজ পাকিস্তানের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব এবং অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য শর্ত। ইসলামাবাদের হাতে এই প্রাণান্তকর কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আসলে ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই; কারণ এই ব্যর্থতার অর্থ হলো নিজেদের ধ্বংসের দলিলে নিজেরাই স্বাক্ষর করা।
- সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক