জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

উৎসব, জবাবদিহি ও তারুণ্যের উপস্থিতি কীভাবে হয়ে উঠতে পারে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রত্যয়

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬: ৫৭
ছবি: লেখক

বাংলাদেশ তার ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রবেশ করেছে এক বিস্ময়কর মিশ্র অনুভূতি নিয়ে—উত্তেজনা, আশা, সংশয় এবং উৎসবমুখরতা নিয়ে। বাংলাদেশে নির্বাচন খুব কমই শান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে সীমাবদ্ধ থেকেছে; বরং এটি নাগরিক আচার হিসেবে ইতিহাস, পরিচয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভরপুর। তবে এবার একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ছে: প্রথমবারের ভোটারদের, বিশেষ করে জেনারেশন ‘জি’–এর তরুণদের, স্পষ্ট আবেগী সম্পৃক্ততা। তারা শুধু অংশগ্রহণকারী হিসেবেই নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের অংশীদার হিসেবে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করছে।

এই নির্বাচনের দিনে চারপাশে যে উৎসবের আবহ দেখা যাচ্ছে, তার একটি প্রতীকী চিত্র ধরা পড়ে ফুল, বেলুন ও রঙিন উপকরণ ঘিরে তরুণদের উচ্ছ্বাসে। অনেক নতুন ভোটার ভোট দিতে এসে ফুল হাতে ছবি তুলছে, বন্ধুদের সঙ্গে স্মৃতি ধরে রাখছে—যেন এটি কেবল নাগরিক দায়িত্ব নয়, একটি ব্যক্তিগত মাইলফলক।

ফুল এখানে শুধু সৌন্দর্যের উপকরণ নয়; এটি নতুন সূচনার প্রতীক, গণতন্ত্রের প্রতি ভালোবাসার দৃশ্যমান প্রকাশ। বেলুনের রঙিন ভেসে ওঠা যেন তরুণদের প্রত্যাশা—রাজনীতি আরও উন্মুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক হোক।

শহর, মফস্বল ও গ্রামীণ মেঠোপথ জুড়ে ভোটের দিনটি উৎসবের আবহ নিয়ে এসেছে। অনেক তরুণ ভোটারের জন্য ভোটকেন্দ্র একটি সামাজিক মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে, যাদের অনেকেই প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছে। তারা সেলফি তুলছে, প্রবীণ ভোটারদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়াচ্ছে, বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করছে এবং প্রকাশ্যে তাদের নাগরিক অংশগ্রহণের কথা জানাচ্ছে।

ডিজিটাল সংযোগ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও বৈশ্বিক সচেতনতার প্রভাবে গড়ে ওঠা একটি প্রজন্মের জন্য ভোট প্রদান একই সঙ্গে প্রতীকী ও বাস্তব অর্থ বহন করে। এটি যেন একধরনের ঘোষণা—আমরা উপস্থিত, এবং আমাদের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাও এই নির্বাচনের দিনটিকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। এক তরুণ ভোটারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বর্ণনায় দেখা যায়—ভোটের দিনটি তার কাছে প্রায় গ্রামীণ মেলার মতো মনে হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের আশপাশে চা, জিলাপি ও পান–সিগারেটের দোকানে ভিড়, দল বেঁধে মানুষের আগমন, নারীদের দৃশ্যমান উপস্থিতি, কারও হাতে ভোটার স্লিপ, কারও সঙ্গে ছোট শিশু—সব মিলিয়ে নাগরিক অংশগ্রহণ যেন এক সামাজিক দৃশ্যে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও মানুষের মুখে ছিল আগ্রহ, অস্থিরতা নয়।

প্রথমবারের ভোট দিতে যাওয়ার অনুভূতিটিও সেখানে স্পষ্ট—দুপুরে বিশ্রাম থেকে উঠে কেন্দ্রে যাওয়া, মনে এক ধরনের অদ্ভুত উত্তেজনা, “জীবনের প্রথম ভোট”—এই ব্যক্তিগত উপলব্ধি গণতন্ত্রের সামষ্টিক অভিজ্ঞতাকে আরও গভীর করে। ভোট দিতে গিয়ে বহুদিন পর পুরনো বন্ধু বা সহপাঠীর সঙ্গে দেখা হওয়ার ঘটনাও ঘটছে—যা ভোটের দিনকে শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক পুনর্মিলনের দিনেও পরিণত করছে। কোথাও কোথাও শান্ত পরিবেশ, ধৈর্য নিয়ে লাইনে দাঁড়ানো ভোটার, প্রতীক দেখেও অস্থিরতা নয়, বরং নিয়ম মেনে অপেক্ষা করার প্রবণতা—এসব দৃশ্য নাগরিক সংস্কৃতির ইতিবাচক দিকটিও তুলে ধরে।

তরুণদের এই অংশগ্রহণ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের জনসংখ্যার গঠন ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে তরুণ প্রজন্মই দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কিন্তু কেবল জনসংখ্যা নয়, গণতন্ত্রের সুস্থতার জন্য প্রয়োজন সক্রিয় অংশগ্রহণ। সাধারণত প্রথমবারের ভোটাররা যখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ভোট দেয়, তখন তারা প্রক্রিয়াটিকে বৈধতা দেয় এবং রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ওপর নতুন অগ্রাধিকার—কর্মসংস্থান, সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায্যতা, জলবায়ু ঝুঁকি, ডিজিটাল অধিকার ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ—নিয়ে কাজ করার চাপ সৃষ্টি করে।

তবে কেবল উৎসাহ দিয়ে একটি নির্বাচনের মান নির্ধারণ করা যায় না।

শহর, মফস্বল ও গ্রামীণ মেঠোপথ জুড়ে ভোটের দিনটি উৎসবের আবহ নিয়ে এসেছে। অনেক তরুণ ভোটারের জন্য ভোটকেন্দ্র একটি সামাজিক মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে, যাদের অনেকেই প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছে। তারা সেলফি তুলছে, প্রবীণ ভোটারদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়াচ্ছে, বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করছে এবং প্রকাশ্যে তাদের নাগরিক অংশগ্রহণের কথা জানাচ্ছে।

বিভিন্ন স্থানে অনিয়ম, বিচ্ছিন্ন গোলযোগ ও প্রক্রিয়াগত অসামঞ্জস্যতার খবর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিকভাবে পরিচালিত হয় না। এর জন্য সতর্কতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রয়োজন। পরিপক্ব গণতন্ত্র সেইগুলোই, যেখানে সমস্যা নেই—এমন নয়; বরং যেখানে সমস্যা প্রকাশ্যে স্বীকার করা হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংশোধন করা হয়। অনিয়ম স্বীকার করা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে না; বরং তা গোপন করা বা অস্বীকার করাই গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।

একই সঙ্গে, আঞ্চলিক বা বিচ্ছিন্ন সমস্যাগুলো যেন সেইসব এলাকার স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণকে আড়াল না করে, যেখানে কোনো জটিলতা ছাড়াই ভোট হয়েছে—সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। যখন ভোটার উপস্থিতি বেশি থাকে এবং মানুষ উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে দৃঢ় থাকে, তখন তা নাগরিক সংস্কৃতির স্থিতিস্থাপকতার ইঙ্গিত দেয়। সচেতন ভোটাররা জানে, গণতন্ত্র একদিনের ঘটনা নয়; এটি ক্ষমতা ও জবাবদিহিতার মধ্যকার চলমান টানাপোড়েন। নির্বাচন এখনও এমন কয়েকটি উপলক্ষের একটি, যখন সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ অনুভব করে।

অনেকের কাছে ভোট শুধু একটি প্রক্রিয়াগত অধিকার নয়; এটি এক বিরল সমতা প্রতিষ্ঠাকারী মাধ্যম। আয়, মর্যাদা বা প্রভাব যাই হোক না কেন, প্রতিটি ভোটের মূল্য সমান। বাস্তবে তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হোক বা না হোক, এই ধারণাই গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখে।

জেন-জি ভোটাররা এক ভিন্ন ধরনের প্রত্যাশা নিয়ে আসে। তারা অস্বচ্ছ সিদ্ধান্তের প্রতি কম সহনশীল, সুশাসনের ফলাফলের দিকে বেশি মনোযোগী, এবং বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড সম্পর্কে বেশি অবগত। তারা স্লোগানের চেয়ে ফলাফলের ভিত্তিতে রাজনীতিকে বিচার করতে আগ্রহী। নির্বাচনের দিনের ক্ষণস্থায়ী উৎসবমুখর অংশগ্রহণ—ফুল, ছবি, রঙিন মুহূর্ত—যদি দীর্ঘমেয়াদি নাগরিক চাপ ও সম্পৃক্ততায় রূপ নেয়, তবেই এর প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পাবে।

এটা স্বাভাবিক যে রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বুঝতে পারছে—শুধু প্রতীকী জনসমর্থন আর যথেষ্ট নয়। তরুণ ভোটাররা সুশাসন সংস্কার, সেবার মান, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং জনজীবনে সততার বিষয়ে উচ্চ প্রত্যাশা রাখে। এই প্রজন্মের কাছে বিশ্বাসযোগ্য প্রশাসনিক সক্ষমতা ছাড়া নির্বাচনী সাফল্য ধরে রাখা কঠিন হবে।

সবশেষে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রকৃত মূল্যায়ন কেবল ভোটের হার বা বিজয়ের ব্যবধান দিয়ে নির্ধারিত হবে না। এটি নির্ধারিত হবে এ দিয়ে—নাগরিকরা, বিশেষ করে নতুন ভোটাররা, মনে করেছে কি না যে তাদের অংশগ্রহণ অর্থবহ ছিল, তাদের ভোট ন্যায্যভাবে গণনা হয়েছে, এবং তাদের উদ্বেগগুলো নির্বাচনের পর গুরুত্ব পাবে। গণতন্ত্র কেবল প্রদত্ত ভোটে নয়, সংরক্ষিত বিশ্বাসে শক্তিশালী হয়।

আজ ভোটকেন্দ্রে যে হাসিমুখের লাইন, ফুল হাতে ছবি তোলা তরুণদের উচ্ছ্বাস, এবং অংশগ্রহণের গর্ব দেখছি—তা আশাবাদী করে। প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে আগামীকাল—ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহৃত হয়, মূল্যায়িত হয় এবং নবায়িত হয়, তার মধ্য দিয়ে।

লেখক: অধ্যাপক ও সভাপতি, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Ad 300x250

সম্পর্কিত