জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

অমোচনীয় কালি আবিষ্কারের আগে কীভাবে ঠেকানো হতো জাল ভোট

আজ ফেসবুকজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে নীল কালির আচড় দেওয়া আঙুলের ছবি। এই কালিটিকে বলা হয় ‘অমোচনীয় কালি’ বা ‘ইন্ডেলিবল ইনক’। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এটি কি শুধু বাংলাদেশেই ব্যবহার হয়? নাকি বিশ্বের অন্য দেশেও এর প্রচলন আছে?

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬: ৫৭
নির্বাচনে অমোচনীয় কালি ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য হলো একজন ভোটার যেন একবারের বেশি ভোট দিতে না পারেন। ছবি: আশরাফুল আলম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আজ রোববার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টায় শেষ হয়েছে। তবে এই সময়ের মধ্যে যারা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেছেন তারা প্রত্যেকেই ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।

আজ ফেসবুকজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে নীল কালির আচড় দেওয়া আঙুলের ছবি। এই কালিটিকে বলা হয় ‘অমোচনীয় কালি’ বা ‘ইন্ডেলিবল ইনক’। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এটি কি শুধু বাংলাদেশেই ব্যবহার হয়? নাকি বিশ্বের অন্য দেশেও এর প্রচলন আছে?

নির্বাচনে অমোচনীয় কালি ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য হলো একজন ভোটার যেন একবারের বেশি ভোট দিতে না পারেন। সাধারণত ভোটারের বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বা তর্জনীর নখে এই কালি লাগানো হয়। এটি সাধারণ কালি নয়। সাবান-পানি দিয়ে ধুলে উঠে যায় না। এই কালির প্রধান উপাদান হলো সিলভার নাইট্রেট। এটি যখন নখ বা চামড়ার সংস্পর্শে আসে, তখন চামড়ার প্রোটিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে। সূর্যের আলো, বিশেষ করে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে দাগটি গাঢ় বেগুনি বা কালচে রং ধারণ করে।

সাধারণত ভোটারের বৃদ্ধাঙ্গুলি বা তর্জনীর নখে এই কালি লাগানো হয়। ছবি: আশরাফুল আলম
সাধারণত ভোটারের বৃদ্ধাঙ্গুলি বা তর্জনীর নখে এই কালি লাগানো হয়। ছবি: আশরাফুল আলম

এই দাগ সহজে মুছে না। সাধারণত ৭২ ঘণ্টা থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থেকে যেতে পারে। নখ বড় হয়ে কেটে ফেলা বা চামড়া বদলানো ছাড়া এটি পুরোপুরি যায় না।

বাংলাদেশে শুরু হলো কীভাবে

বাংলাদেশে অমোচনীয় কালির ব্যবহার দক্ষিণ এশিয়ার নির্বাচনী চর্চার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে চালু হয়। এই অঞ্চলে বহু বছর ধরেই ভোটে ‘ইন্ডেলিবল ইনক’ ব্যবহারের নজির আছে। ভারতে ১৯৬২ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রথম এই কালি ব্যবহার করা হয়। কর্ণাটক রাজ্যের ‘মহীশূর পেইন্টস অ্যান্ড ভার্নিশ লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই বিশেষ কালি তৈরি করে। তারা বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২৫টিরও বেশি দেশে এই কালি রপ্তানি করে।

বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন এই কালি ব্যবহার করে নিশ্চিত করে যে, কেউ বুথ থেকে বের হয়ে পুনরায় ভোট দিতে ঢুকলে তাকে যেন সহজেই শনাক্ত করা যায়।

অমোচনীয় কালি আবিষ্কারের আগে কী ব্যবহার করা হতো

অমোচনীয় কালি বা আধুনিক প্রযুক্তির আবিষ্কারের আগে মানুষ কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করত। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ও যুক্তরাজ্যে গোপন ব্যালটের প্রচলন ছিল না। তখন ভোট হতো মৌখিকভাবে, যাকে বলা হতো ‘ভাইভা ভোস’। ভোটাররা জনসমক্ষে বা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা করতেন তাঁরা কাকে ভোট দিচ্ছেন। যেহেতু সবার সামনে ভোট দেওয়া হতো এবং প্রতিবেশীরা একে অপরকে চিনত, তাই একজন ব্যক্তির পক্ষে ছদ্মবেশ ধরে দুবার ভোট দেওয়া বেশ কঠিন ছিল। ১৮০০ দশকের শেষদিকে এই প্রথা বাতিল হয়।

পৃথিবীর সব দেশে নির্বাচনের সময় অমোচনীয় কালি ব্যবহার করা হয় না। মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলো বা যেসব দেশে জনসংখ্যা অনেক বেশি এবং কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ বা পরিচয়পত্র ব্যবস্থা শতভাগ সুসংহত নয়, সেসব দেশেই এই কালির ব্যবহার বেশি দেখা যায়।

প্রাচীন গ্রিস বা রোমে এবং পরবর্তী সময়ে ছোট ছোট গ্রামভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করতেন স্থানীয় মুরুব্বি বা সম্মানিত ব্যক্তিরা। তাঁরা এলাকার প্রায় সবাইকেই ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। কোনো অপরিচিত ব্যক্তি ভোট দিতে এলে বা কেউ দ্বিতীয়বার লাইনে দাঁড়ালে তাকে সহজেই শনাক্ত করে বের করে দেওয়া হতো। তখন জনসংখ্যা কম থাকায় এই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল।

এছাড়া কিছু অঞ্চলে কার্ড পাঞ্চিং বা ক্লিপিং পদ্ধতি বেশ প্রচলিত ছিল। ভোটারদের হাতে একটি করে কার্ড থাকত, ভোট দেওয়ার পর সেই কার্ডের একটি কোণা ছিদ্র করে বা কেটে দেওয়া হতো।

প্রাচীন এথেন্সে মানুষ ভোট দিত ভাঙা মাটির পাত্রের টুকরো বা ‘অস্ট্রাকা’ ব্যবহার করে। সেখানে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সবার উপস্থিতিতে এই টুকরোগুলো জমা নেওয়া হতো। এটি ছিল এক ধরনের সামাজিক উৎসবের মতো, যেখানে লুকিয়ে একাধিক ভোট দেওয়া কঠিন ছিল।

রোমান প্রজাতন্ত্রে ভোট দেওয়ার জন্য মোমের তৈরি ট্যাবলেট বা ধাতব টোকেন ব্যবহার করা হতো। একটি নির্দিষ্ট পাত্রে সেই টোকেন ফেলতে হতো এবং পাহারাদাররা লক্ষ্য রাখত যেন কেউ একাধিক টোকেন না ফেলে।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে পশ্চিমা বিশ্বে ভোটার তালিকা বা ‘রেজিস্ট্রেশন’ ব্যবস্থা কঠোর হতে থাকে। ভোটকেন্দ্রে কাগজের বিশাল বই থাকত, যেখানে ভোটারদের নাম ও ঠিকানা লেখা থাকত। ভোট দেওয়ার পর নামের পাশে লাল কালি দিয়ে দাগ কেটে দেওয়া হতো। কালির দাগ আঙুলে না দিয়ে খাতায় দেওয়ার এই পদ্ধতিই ছিল আধুনিক ডাটাবেজের আদি রূপ।

পৃথিবীর সবখানেই কি এই কালির ব্যবহার আছে

পৃথিবীর সব দেশে নির্বাচনের সময় অমোচনীয় কালি ব্যবহার করা হয় না। মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলো বা যেসব দেশে জনসংখ্যা অনেক বেশি এবং কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ বা পরিচয়পত্র ব্যবস্থা শতভাগ সুসংহত নয়, সেসব দেশেই এই কালির ব্যবহার বেশি দেখা যায়। এই কালির ব্যবহার এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি। ইরাক ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোতেও আঙুলে কালি লাগানোর প্রথা চালু আছে।

আজ ফেসবুকজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে নীল কালির আচড় দেওয়া আঙুলের ছবি। ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি
আজ ফেসবুকজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে নীল কালির আচড় দেওয়া আঙুলের ছবি। ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি

অন্যদিকে, উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের দেশগুলো কিংবা জাপানে নির্বাচনের সময় এই কালির ব্যবহার নেই বললেই চলে। সেসব দেশে ভোটের সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ভিন্ন হওয়ায় তাদের আঙুলে দাগ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

যেসব দেশে অমোচনীয় কালি ব্যবহার করা হয় না, তারা জাল ভোট ঠেকাতে বা ‘ডাবল ভোটিং’ প্রতিরোধ করতে মূলত প্রযুক্তি এবং আইনি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। উন্নত দেশগুলোতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে একটি ডিজিটাল তালিকা থাকে, যাকে বলা হয় ‘ইলেকট্রনিক পোল বুক’। যখন একজন ভোটার ভোট দিতে আসেন, তখন কম্পিউটারে তাঁর নাম এন্ট্রি করা হয়। একবার নাম এন্ট্রি হয়ে গেলে, তিনি যদি অন্য কোনো কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে কেন্দ্রীয় সার্ভার তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দেবে যে, এই ব্যক্তি আগেই ভোট দিয়েছেন।

ব্রাজিল এবং আফ্রিকার কিছু দেশে এখন আঙুলের কালির বদলে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। ভোটকেন্দ্রে ঢোকার সময় ভোটারের আঙুলের ছাপ বা চোখের আইরিস স্ক্যান করা হয়। মেশিন যদি নিশ্চিত করে যে এই ব্যক্তি আজ আর ভোট দেননি, তবেই তাঁকে ভোট দিতে দেওয়া হয়। এটি কালির চেয়েও নির্ভুল পদ্ধতি হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

ইউরোপের অনেক দেশে আবার ভোট দেওয়ার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট দেখানো বাধ্যতামূলক। পোলিং অফিসাররা ম্যানুয়ালি বা ডিজিটালি ওই আইডি নম্বরের বিপরীতে ‘ভোট দেওয়া হয়েছে’ মার্ক করে রাখেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত