জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

২০২৪-এর জনশূন্য ভোটকেন্দ্র থেকে ২০২৬-এর দীর্ঘ লাইন: গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম কি শুরু

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০: ০৬
রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের সামনে দীর্ঘ লাইন। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সকালে তোলা। ছবি: আশরাফুল আলম

আজ থেকে ঠিক ২ বছর ১ মাস ৫ দিন আগে ঢাকা শহরের ভোটকেন্দ্রগুলো ছিল প্রায় জনশূন্য। রাজধানীর গুলশানের মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কেন্দ্র কিংবা ধানমন্ডির ভোটকেন্দ্রগুলোতে দেখা গেছে নরোম রোদে মাঠের মধ্যে রোদ পোহাচ্ছেন পোলিং এজেন্টরা। দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের অনলাইনগুলোতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ভেসে উঠছিল খবরের শিরোনাম—‘ভোটার উপস্থিতি কম’, ‘দুপুর পর্যন্ত ভোট পড়েনি একটিও’ ইত্যাদি। আজ দেখা যাচ্ছে সেই দৃশ্যের ঠিক বিপরীত চিত্র।

আজ বৃহস্পতিবারের (১২ ফেব্রুয়ারি) এই সকাল যেন অন্য এক বাংলাদেশের গল্প বলছে। শীত যাই যাই করা মাঘের শেষের সকালেই ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে মানুষের লাইন। ভোটের অধিকার পুনরুদ্ধার করতে এসেছেন প্রবীণ থেকে প্রথমবারের ভোটার। আঙুলে অমোচনীয় কালির ছাপ নিয়ে হাসিমুখে বের হচ্ছেন ব্যালট বাক্সের গোপন কক্ষ থেকে। এই কালির ছাপ আর মুখের হাসি নিছক কোনো অর্জন নয়, এ যেন অধিকার ফিরে পাওয়ার আনন্দ।

মগবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে ভোট দিয়ে বের হলেন মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি। কাছে গিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে বললেন, তাঁর নাম আজিজার রহমান।

‘ভোট দিলেন?’

‘জি। ম্যালা দিন পর ভোট দিলাম।’

‘কেমন লাগছে ভোট দিয়ে?’

আঙুলে কালির দাগের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বললেন, ‘১৬ বছর পর ভোট দিলাম। আনন্দ তো লাগবেই।’

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির সেই ‘একতরফা’ ও ‘ডামি প্রার্থীর’ নির্বাচনের বিপরীতে ২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের এই ‘আংশগ্রহণমূলক’ দৃশ্য কি তবে গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের ইঙ্গিত?

স্মৃতির আয়নায় ২০২৪: যখন ‘ডামি’ই ছিল ভরসা

২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রধান বিরোধী দলগুলো বর্জন করেছিল। নির্বাচন কমিশনকে মোকাবিলা করতে হয়েছিল ‘ভোটার খরা’। দেশের শীর্ষ গণমাধ্যম প্রথম আলোডেইলি স্টার অনলাইন খবরের শিরোনাম করেছিল—‘ভোটারদের অনাগ্রহের এক নির্বাচন’।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তখন নিজেদের প্রার্থীদেরই নিজেদের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। গণমাধ্যম যার নাম দিয়েছিল ‘ডামি প্রার্থী’। তাই সাধারণ মানুষের এসব ডামি প্রার্থীদের লড়াই নিয়ে খুব একটা আগ্রহ ছিল না। সবাই জানত, কে জিতবে। ফলাফল জানার জন্য ছিল না দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা।

ডেইলি স্টার এমন একটি ভোটকেন্দ্রের ছবি ছেপেছিল, যেখানে ভোটারশূন্য ভোটকেন্দ্রের মাঠে একাকী দাঁড়িয়ে আছেন এক নিরাপত্তারক্ষী। একজন ভোটারও নেই। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ভারতচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের দুপুরের ওই একটি ছবিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল, ওই সময়ে নাগরিকদের কতটা উনমানুষ ভাবা হতো। জনমতের গুরুত্ব কতটা গৌণ হয়ে পড়েছিল তখন।

২০২৬: যা দেখা যাচ্ছে

২০২৪ সালের আগস্টের সেই রক্তঝরা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত (সকাল ৮টা ১১ মিনিট) কোথাও কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। মানুষ আনন্দ নিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসছেন। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন।

মোহাম্মদপুর সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন আদনান হক রাফি। এবারই প্রথম ভোট দিয়েছেন তিনি। ২৩ বছর বয়সী এই তরুণ বলেন, জীবনে প্রথম ভোট দিলাম। তাও আবার একসঙ্গে দুটি ভোট। একটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের, আরেকটি গণভোটের। বিরল সৌভাগ্য বলতে পারেন।

এই তরুণের মতো প্রায় ৪ কোটি তরুণ ভোটার এবারের নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই জেনজি ভোটাররাই এবারের নির্বাচনের মূল চালিকাশক্তি। এরাই গড়ে দেবে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান। নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি স্ট্রিমকে বলেন, ‘তরুণদের ভোট অনেক। তবে এই ভোট একক কোন বাক্সে যাবে বলে মনে হচ্ছে না।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘১৯৯১ সালের ভোটেও তরুণরা পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল। এখন তরুণরা ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতিতে যে আস্থা রাখতে তা কিন্তু নয়। কারণ তারা বুঝতে পারে যে এটি শুধু দেওয়ার জন্যই। প্রতিশ্রুতির চেয়ে তাই তারা দলগুলোর আচরণের দিকটি বেশি বিবেচনা করবে।’

আজকের নির্বাচনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এবার ৫০টির বেশি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ভোটের লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে। যদিও দেশের অন্যতম প্রধান ও পুরোনো দল আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। কারণ দেশে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। তারপরও অর্ধ শতাধিকের বেশি দল যেহেতু নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, ফলে ভোটারদের সামনে রয়েছে ‘বিকল্প’ বেছে নেওয়ার সুযোগ।

আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, মানুষের ভাবনায় ‍ও মনস্তত্ত্বে এসেছে পরিবর্তন। ২০২৪-এ মানুষ ভাবত, ‘ভোট দিয়ে কী হবে? ফলাফল তো নির্ধারিত। কে জিতবে সবাই জানে।’ আর ২০২৬-এ মানুষ ভাবছে, ‘আমার ভোটই ঠিক করবে দেশের ভবিষ্যৎ।’

পরিসংখ্যান বনাম বাস্তবতা

২০২৪-এ নির্বাচন কমিশন ভোটের হার ৪০ শতাংশ বলে দাবি করে সারা দেশে হাস্যরসের খোরাক হয়েছিল। কারণ নির্বাচন কমিশনের দাবির সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার কোনো মিল ছিল না। কিন্তু আজ সকাল থেকেই মাঠের চিত্র বলছে, উপস্থিতির হার অতীতের তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। ভোটারদের দীর্ঘ লাইন আর উৎসবমুখর পরিবেশ প্রমাণ করছে, গণতন্ত্র কেবল ব্যালট পেপারের সংখ্যায় নয়, বরং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বাঁচে।

সরেজমিন ঢাকা-১১ আসনের বেরাইদের একেএম রহমত উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ভোর থেকেই কেন্দ্রের সামনে ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। এই কেন্দ্রে পরে ভোট দিয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

কেরাণীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে সকাল থেকেই জড়ো হয়েছেন ভোটাররা। স্ট্রিম ছবি
কেরাণীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে সকাল থেকেই জড়ো হয়েছেন ভোটাররা। স্ট্রিম ছবি

রাজধানীর খিলগাঁও মডেল কলেজ কেন্দ্রের সামনেও গেছে একই চিত্র। ভোটারদের ভিড়। মহাখালির বিটিসিএল আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনেও দেখা গেছে ভোটারদের ভিড়। মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ কেন্দ্রে গিয়েও দেখা গেছে, সময়ের আগেই ভোটারেরা লাইন ধরে অপেক্ষায় আছেন। সেখানে ভোট দিয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। এছাড়া ঢাকা-১৫ আসনের দক্ষিণ কাফরুল মডেল হাই স্কুল কেন্দ্রে গিয়েও দেখা গেছে, ভোটারদের দীর্ঘ সারি।

স্ট্রিমের কেরাণীগঞ্জ সংবাদদাতা জানিয়েছে, কেরাণীগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে সকাল থেকেই জড়ো হয়েছেন ভোটাররা। রাজশাহী সংবাদদাতা জানিয়েছেন, ভোট শুরুর আগে সকাল ৭টা থেকেই রাজশাহী নগরের স্যাটেলাইট টাউন মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের কেন্দ্রে ভোটারদের লাইন দেখা গেছে। একইভাবে ৭টা থেকে রাজশাহীর শহীদ নজমুল হক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনেও ভোটারদের লাইন দেখা গেছে। চট্টগ্রাম সংবাদদাতা জানিয়েছেন, নগরীর ইয়াকুব আলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র দেখা যায়, নারী ও পুরুষ—উভয় সারিতেই দাঁড়িয়ে আছেন শতাধিক ভোটার। সেখানে কথা হয় নতুন ভোটার আজাদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সকালে ঝামেলা কম থাকে। ভোট দিয়ে অন্য কাজে নেমে পড়ব। তাই ভোট দিতে চলে এসেছি।’

আজ বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। দিন শেষে জানা যাবে, ভোটার উপস্থিতি কত ছিল। তখন নিশ্চয় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ভোটার উপস্থিতির পরিসংখ্যান জানানো হবে।

গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম?

২০২৪ ছিল একটি ব্যবস্থার ‘মৃতপ্রায়’ রূপ, আর ২০২৬ হলো সেই ব্যবস্থার ‘মেরামত’। তবে ভোটারদের দীর্ঘ লাইনেই কাজ শেষ নয়। ব্যালট বাক্সে জমা পড়া এই কোটি কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় কি না, তা দেখার বিষয়।

রাজনীতি বিশ্লেষক ও গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মো. আবু সালেহ বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। এটি মূলত রাষ্ট্র সংস্কার ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি সামাজিক চুক্তি। নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার ওপরই নির্ভর করছে একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ। রাজনৈতিক দলগুলো যদি গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।’

সুতরাং ২০২৪-এর সেই জনশূন্য ভোটকেন্দ্রের দৃশ্য আর আজকের এই প্রাণবন্ত রঙিন উপস্থিতি—এই দুই ছবির মাঝখানে আজ দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। দুঃখীনি এই মাতৃভূমি যেন বলছে, গণতন্ত্র হারায় না, বরং মানুষের রক্ত ও ঘামের বিনিময়ে বারবার পুনর্জন্ম নেয়।

  • মারুফ ইসলাম: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
Ad 300x250

সম্পর্কিত