ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। একটি নির্বাচনের মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হলো মাঠপর্যায়ের পরিবেশ। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত সংবাদ ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যা মনে হচ্ছে, তাতে খুব বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কারণ নেই। ভোটের মাঠের পরিবেশ এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণই রয়েছে। আমার ধারণা, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দল ও জোট একটি বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন—যেকোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা বা হঠকারিতা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেই ব্যাহত করতে পারে। প্রধান রাজনৈতিক পক্ষগুলো যেহেতু জয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী, তাই এই আশার পরিবেশ বিনষ্ট হয় এমন কোনো আত্মঘাতী আচরণ তারা করবে না বলেই বিশ্বাস।
অতীতের কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনটি চরিত্রগতভাবেই ভিন্ন। এই ভিন্নতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ। দেশের জনগণ পরপর তিনটি নির্বাচনে কার্যত ভোট দিতে পারেনি বা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সী বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, যারা বিগত বছরগুলোতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত ছিল, তারা এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবে। এটি তাদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা ও শিহরণ জাগানিয়া মুহূর্ত। এছাড়াও, এবারের নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দলের সরব উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। তারা তাদের নির্বাচনী প্রচারণার মাধ্যমে জানান দিয়েছে যে, জাতীয় রাজনীতিতে তারা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। অতীতে তাদের এই রূপ দেখা যায়নি, যা এবারের নির্বাচনের অন্যতম একটি নতুন দিক।
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি চিরস্থায়ী সমস্যা হলো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব। বর্তমান প্রেক্ষাপটেও সেই আস্থার সংকট দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন পক্ষ থেকেই নির্বাচনে কারচুপি বা ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মী ও ভোটারদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিচ্ছে। এই আস্থার সংকট কেবল রাজনৈতিক দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি নির্বাচন কমিশনকে ঘিরেও দানা বেঁধেছে। কমিশনের কিছু কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি বা ‘ল্যাপসেস’ এই সন্দেহের মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয়।
নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো মাঠ প্রশাসন। এখন পর্যন্ত মাঠ প্রশাসন বাধার মুখে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো—প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত করার প্রবণতা। সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে, কতজন ডিসি জামায়াতপন্থী বা কতজন বিএনপি-পন্থী—এভাবে কর্মকর্তাদের ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে।
তাত্ত্বিকভাবে আমরা জানি, সমাজে ‘বিশ্বাস’ বা ‘ট্রাস্ট’ একটি সামাজিক পুঁজি হিসেবে কাজ করে। একসময় আমাদের সমাজে মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করত, সমাজের মুরুব্বি বা নেতৃস্থানীয়দের কথার ওপর ভরসা রাখত। কিন্তু ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে আজ পর্যন্ত নানাবিধ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে সেই পুরনো সামাজিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধগুলো ভেঙে গেছে। সমাজটা একটা ওলটপালট অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ‘বিশ্বাস’ তার কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না। সমাজ যখন আবার স্থিতিশীল হবে এবং উন্নয়ন ও উৎপাদনের পথে হাঁটবে, তখনই হয়তো নতুন করে আস্থার ভিত্তি তৈরি হবে।
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও কিছু প্রশ্ন আছে। মাঝেমধ্যে তারা এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেয়, যার ফলাফল বা ‘কনসিকোয়েন্স’ তারা আগেই চিন্তা করে না। যেমন—ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটি সমালোচনার মুখে পরে তাদের প্রত্যাহার করতে হয়েছে। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো কমিশনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং উদ্বেগের কথা জানাচ্ছে। আশা করা যায়, নির্বাচন কমিশন একটি ‘সেলফ কারেক্টিং মেকানিজম’ বা নিজেদের শুধরে নেয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ত্রুটিগুলো কাটিয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো মাঠ প্রশাসন। এখন পর্যন্ত মাঠ প্রশাসন বাধার মুখে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো—প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত করার প্রবণতা। সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে, কতজন ডিসি জামায়াতপন্থী বা কতজন বিএনপি-পন্থী—এভাবে কর্মকর্তাদের ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করা সুস্থতার লক্ষণ নয়। এতে করে আস্থার সংকট আরও তীব্র হয়।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এখনো মনে হচ্ছে, আমরা একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর নির্বাচনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। আশা করি, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সবাই একে অপরের সহযোগিতা করবে এবং কোনো প্রকার উগ্রতা বা হঠকারিতা পরিহার করে সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখবে। জনগণ তাদের কাছে যে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করে, তা তারা পূরণ করবেন।
পরিশেষে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমার পরামর্শ—আপনারা সহনশীল হোন। জয়ের নেশায় কেউ কোনো অনৈতিক পন্থার আশ্রয় নেবেন না। সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি করার আগে নিজের বিবেকের কাছে জবাবদিহি করুন। মনে রাখবেন, জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে কেউ নয়। আজ হোক বা কাল, মানুষ আপনার ত্রুটি-বিচ্যুতির হিসাব চাইবে এবং আপনাকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। আওয়ামী লীগ একসময় মনে করেছিল তাদের কোনো জবাবদিহি করতে হবে না, কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, সেই ভুলের জন্য আজ তাদের চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। আশা করি বংলাদেশের মানুষ এমন উদাহরণ আর দেখবে না।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; সাবেক অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়