২৬ জুলাই বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস

কতটা সুস্থ আছে আমাদের ম্যানগ্রোভ বন?

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই। ইকুয়েডরের মুইস্নেতে চলছে আন্দোলন। স্লোগান চলছে—ম্যানগ্রোভ জলাভূমি ধ্বংস করে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ চলবে না। মূলত এটি একটি প্রতিবাদী সমাবেশ। পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস এর এক কর্মী ড্যানিয়েল ন্যানোতো এই প্রতিবাদে অংশ নিতে গিয়ে মারা যান। তার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়েই জাতিসংঘ ২৬ জুলাইকে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ দিবস।

প্রতি বছরের মতো এ বছরও ২৬ জুলাই পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য হলো- টেকসই নীল অর্থনীতি ও জলবায়ু স্থিতিশীলতার জন্য সুস্থ ম্যানগ্রোভ।

ইকুয়েডরের ম্যানগ্রোভ বন শুধু বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের জন্য ব্যবহার হত। এর ফলে সেখানে ১৯৮০ দশকে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ম্যানগ্রোভ বন হারিয়ে যায়। জলাভূমি ও বন কেটে হাজার হাজার হেক্টর বাণিজ্যিক চিংড়ি খামার গড়ে উঠে সেখানে। এর ফলে সেখানে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যা স্পষ্টতই বলে দিচ্ছিল এভাবে চলতে থাকলে বনের সাথে হারিয়ে যাবে জনপদ ও মানুষ। সেখানে চিংড়ি ঘের করার কারণে জোয়ার-ভাটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। এর ফলে অনেক জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছিল। বন ধ্বংসের কারণে হুমকির মুখে পড়ছিল কাঁকড়া শিকারি ও ছোট ছোট জেলেদের জীবন। যার সঙ্গে বাংলাদেশের দৃশ্যপটও কিছুটা মেলে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা যেমন খুলনা, পটুয়াখালী, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম জেলায় উপকূলীয় বন অবস্থিত। এর আয়তন প্রায় ৫২০০০০ হেক্টর। প্রধানত সুন্দরী, গেওয়া, গরান, ধুন্দুল, আমুর, ডাকুর প্রভৃতি পাওয়া যায়। এখানে ঝাউ, কেরু, পনিয়াল, কাঠবাদাম, পিপুল, নিশিন্দার দেখা মিলে।

সুন্দরবন বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বন। ম্যানগ্রোভ বন নামেও এটি পরিচিত। বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪.০৭ ভাগ ম্যানগ্রোভ বন। এসব বনের অধিকাংশ এলাকায় জোয়ার ভাটা হয়। ফলে এ বনের গাছপালা বেশ লবণাক্ত সহনশীল হয়ে থাকে। সুন্দরী, গেওয়া , গরান, বাইন, ধুন্দুল, কেওড়া, গোলপাতা এসব বনের প্রধান বৃক্ষ। এছাড়া এখানকার উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণী হলো রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বানর ইত্যাদি। সুন্দরবনে প্রায় ২৮৯ প্রজাতি স্থলজ প্রাণীর বসবাস। এর মধ্যে ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর ও মাছ সহ ২১৯ প্রজাতির জলজ প্রাণী আছে। এখানে প্রায় ৫০ প্রজাতির পাখির বাস। একটি তথ্য মতে সুন্দরবনে হুমকির মুখে আছে ২ প্রজাতির উভচর, ১৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৫ প্রজাতির পাখি ও ৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। এই বনটি উপকূলবর্তী হওয়ায় সমুদ্র দ্বারা প্রভাবিত। সৈকত, মোহনা, জলাভূমি, মাটির প্রকৃতির কারণে এটি একটি স্বতন্ত্র বাস্তুতন্ত্র গঠন করেছে।

এই সুন্দরবন নানা ভাবে আমাদের রক্ষা করে। সুন্দরবনের কারণে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের গতি ৭০ কিলোমিটার কমেছে। এটি জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা কমিয়েছে তিন থেকে ৪ ফুট। ২০০৭ সালে সিডর আর ২০০৯ সালে যে আইলার তাণ্ডব দেখা গেছে বাংলাদেশে তারও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়েছে সুন্দরবন।

সুন্দরবনে ১৯৯৬ সালে তিনটি অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১২ সালে এখানে ৩টি ডলফিন অভয়ারণ্য করা হয়। সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডকে মেরিন প্রটেকটেড এরিয়া ঘোষণা করা হয় ২০১৪ সালে। ১৯৯২ সালে এটি ৫৬০তম রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো ৭৯৮তম বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। প্রায় ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এর আয়তন।

এই সুন্দরবন নানা ভাবে আমাদের রক্ষা করে। সুন্দরবনের কারণে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের গতি ৭০ কিলোমিটার কমেছে। এটি জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা কমিয়েছে তিন থেকে ৪ ফুট। অথচ ১৯৬০ সালের পর থেকে আমাদের দেশে যতগুলো ঘূর্ণিঝড় হয়েছে তার মধ্যে আম্ফান ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ। এত দীর্ঘ হওয়ার পরও সিডর বা আইলার চেয়ে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম করতে পেরেছে। কেননা সুন্দরবনে এসেই এই ঝড়ের গতি কমতে শুরু করে। জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা পনেরো থেকে আঠার ফুট হওয়ার শঙ্কা থাকলেও সুন্দরবনের কারণে এটি কমে দশ থেকে বারো ফুট হয়। ২০০৭ সালে সিডর আর ২০০৯ সালে যে আইলার তাণ্ডব দেখা গেছে বাংলাদেশে তারও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়েছে সুন্দরবন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা প্রতিবেদন মতে ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় সুন্দরবন ৪৮৫.২৯ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ রক্ষা করেছিল। অথচ এই সুন্দরবনের ওপর চলছে নানা অন্যায়-অত্যাচার। প্রায়ই হরিণের মাংস উদ্ধারের সংবাদ প্রকাশিত হয়। শুধু হরিণ নয়, বাঘ, শূকরসহ অন্যান্য প্রাণীও হত্যা করা হচ্ছে।

বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসার মূল কারণ বন্যপ্রাণীর মাংস বিক্রি। এরকম হরিণের মাংস বিক্রির খবর প্রায়ই পত্রিকায় পাওয়া যায়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ক একটি সংস্থার প্রতিবেদনের তথ্য মতে ২০০০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৫১টি বাঘ হত্যা করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয় ২০১৪ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে ২টি করে বাঘ হত্যা করা হয়েছে। ২০২০ সালের শেষ ছয় মাসে সুন্দরবনের দুইটি রেঞ্জ অভিযান চালিয়ে শতাধিক হরিণের চামড়া ও মাংস উদ্ধার করেছিল। সুন্দরবেন বিষ দিয়েও মাছ মারা হয়, ধরা হয় কাঁকড়া। বিষ দিয়ে মাছ মারার কারণে জলজ প্রাণীরা মারা যাচ্ছে। সুন্দরবনে ৩১.১৫ ভাগ জলাভূমি। বিষ প্রয়োগের কারণে জলাভূমির জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।

বাংলাদেশের সুন্দরবন এবং এর সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজারেরও বেশি চিংড়ি ঘের রয়েছে। এর মধ্যে শুধু সাতক্ষীরা জেলাতেই রয়েছে ৫৫ থেকে ৫৯ হাজার চিংড়ি ঘের আর খুলনায় রয়েছে ৫০ হাজারেরও বেশি ঘের।

সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ নিষিদ্ধ হলেও এর আশেপাশে চিংড়ি ঘের করা হচ্ছে। এর ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। লবণাক্ততার কারণে মাছ ও জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে। বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। চিংড়ি ঘের বানানোর জন্য নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। অনেক জায়গায় কাগজে কলমে বনভূমি থাকলেও বাস্তবে চিংড়ি ঘের করে চাষাবাদ চলছে বলে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। এই অবস্থায় আমাদের সুন্দরবন সে কতটুকু সুস্থ আছে, সেই প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক।

  • ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র: পরিবেশ বিষয়ক লেখক
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত