সাকলাইন রিজভি

ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর কিন্তু বেইজিং বা নয়াদিল্লিতে হয়নি। সফরটি শুরু হয় কুয়ালালামপুর থেকে। সেখানে আলোচনা হয় শ্রম অভিবাসন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে।
এরপর সফরের দ্বিতীয় ধাপে তিনি যান চীনে। সেখানে তিনি সামার দাভোস ফোরামে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি দ্বিপক্ষীয় সফরও করেন।
সফরের এই ক্রম বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার ও অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। তারপরও তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য বেইজিং ছিল না। অন্যদিকে, সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী ভারতেও তিনি শুরুতে যাননি। ব্যাপারটি বেশ লক্ষণীয়।
এটি কি নিছকই কূটনৈতিক সময়সূচি, নাকি অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার? নাকি নতুন সরকারের পাওয়া রাজনৈতিক পরিবেশের ফল? তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে এই ক্রম বুঝিয়ে দেয়, ঢাকার নতুন প্রশাসনকে কতটা ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হচ্ছে।
তবে তারেক রহমানের সূচিতে কোন রাজধানী আগে এল, তার চেয়েও গভীর একটি প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্নটি হলো—পর্যায়ক্রমিক সরকারগুলোর অধীনে বাংলাদেশের চীন নীতিতে কি মৌলিক কোনো পরিবর্তন এসেছে? নাকি বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাটা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ধারাবাহিক একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে?
বিষয়টি বুঝতে আমরা তিনটি সফরের যৌথ বিবৃতি মিলিয়ে দেখতে পারি। এগুলো হলো—জুলাই ২০২৪-এ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেইজিং সফর, মার্চ ২০২৫-এ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সফর এবং জুন ২০২৬-এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর। এগুলো তুলনা করলে দেখা যায়, সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু কিছুটা বদলালেও সামগ্রিক পথচলা অনেকটাই একই রকম রয়ে গেছে।
আপাতদৃষ্টিতে এই তিন সফর তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরে। শেখ হাসিনার চীন সফরটি হয়েছিল চরম বিতর্কিত এক নির্বাচনের মাধ্যমে টানা ৪র্থ ধাপে ক্ষমতায় আসার কয়েক মাস পর।
ড. ইউনূস বেইজিং যান ২০২৪ সালের আগস্টের নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও শেখ হাসিনার পতনের পর। তিনি এমন এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন, যার পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা ছিল অনিশ্চিত। ভারতের সঙ্গে তখন চরম উত্তেজনা।
অন্যদিকে, তারেক রহমানের সফরটি হলো ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির বিপুল বিজয়ের কয়েক মাস পর। হাসিনা বা ইউনূস প্রশাসনের চেয়ে তারেক রহমানের সরকারের গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি।
তবে এই ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরও সরকারি নথিপত্রগুলোতে বেশ ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়।
শেখ হাসিনার ২০২৪ সালের সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বড় কোনো বাঁকবদল হয়নি। তবে কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বজায় ছিল। দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে 'স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ' থেকে 'কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কোঅপারেটিভ পার্টনারশিপ'-এ উন্নীত করে। বেল্ট অ্যান্ড রোড (বিআরআই), অবকাঠামো, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জলবায়ুসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশাল এক রূপরেখা তৈরি হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অবকাঠামো-নির্ভর উন্নয়নের প্রতি চীনের সমর্থন ফুটে ওঠে। তবে ঢাকায় এই সফর নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। বাংলাদেশ যতটা আর্থিক সহায়তা চেয়েছিল, চীন ততটা দেয়নি।
কয়েক সপ্তাহ পরই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। চীনের প্রতি বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের মার্চে ড. ইউনূসের সফর প্রমাণ করে, দ্বিপক্ষীয় এই সম্পর্ক কতটা মজবুত। নতুন কোনো রূপরেখা না এনে, মূলত আগের চুক্তিগুলোকেই পুনরায় নিশ্চিত করা হয়। বিআরআই, মোংলা বন্দর, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই আলোচ্যসূচিতে টিকে থাকে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও চীনের প্রতি ঢাকার নীতি খুব একটা বদলায়নি।
অন্যদিকে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফরটি সম্পর্কের একটি নতুন পর্যায়কে নির্দেশ করে। এর কারণ এই নয় যে তিনি পুরোনো অগ্রাধিকারগুলো বাদ দিয়েছেন, বরং তিনি সেগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও গভীর করতে চেয়েছেন।
সবচেয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে 'চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডোর'-এর চীনা প্রস্তাব। আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য বাড়াতে শি জিনপিং ও তারেক রহমানের বৈঠকে এটি নিয়ে আলোচনা হয়। যদিও সরকারি যৌথ বিবৃতিতে এর উল্লেখ নেই। এর আগে চীন 'বিসিআইএম' (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) করিডোরের প্রস্তাব করেছিল, যা থমকে যায়। নতুন এই প্রস্তাবে ভারতকে বাদ দিয়ে করিডোর গড়ার ধারণাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
পাশাপাশি, চীন ও বাংলাদেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে কৌশলগত সংলাপ এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের নিয়ে 'টু প্লাস টু (২+২)' সংলাপ চালুর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এছাড়া সরকারের বাইরে গিয়ে বিএনপি এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে প্রথম সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক কেবল প্রকল্প-ভিত্তিক সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে।
গত তিন বছরে সম্পর্ক কীভাবে এগিয়েছে, তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো তিস্তা প্রকল্প। হাসিনার আমলে এটি কেবল পানি ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ইউনূসের সময়ে চীনা কোম্পানিগুলোকে এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। আর তারেক রহমানের সময়ে এসে বিষয়টি আরও সুনির্দিষ্ট হয়েছে; চীন এতে সমর্থন জানিয়েছে এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ব্রিকস এবং এসসিও-তে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও চীনের জোরালো সমর্থন এবারের বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
তবে এই তিন সফরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ভূ-রাজনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক। ২০২৪ সালের বিবৃতিতে জোর দেওয়া হয়েছিল অবকাঠামোর ওপর। ২০২৫-এ গুরুত্ব পায় শিল্পায়ন ও উৎপাদন। আর ২০২৬-এ এসে সাপ্লাই চেইন, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি এবং রপ্তানি আধুনিকায়নের বিষয়গুলো যুক্ত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার এখন কেবল অবকাঠামো নয়; বরং শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ।
বাংলাদেশের জন্য তারেক রহমানের সফরের তাৎপর্য কয়টি চুক্তি সই হলো তার ওপর নির্ভর করছে না। বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কীভাবে বিকশিত হচ্ছে, সেটাই আসল বিষয়। সহজ কথায় বললে—শেখ হাসিনা অংশীদারত্বের মান উন্নয়ন করেছিলেন, ড. ইউনূস রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তা টিকিয়ে রেখেছিলেন, আর তারেক রহমান এখন সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছেন।
অবশ্য এই সফরকে এখনই বিশাল কোনো 'কূটনৈতিক যুগান্তকারী ঘটনা' বলা ঠিক হবে না। এটি মূলত বিদ্যমান অংশীদারত্বকে আরও সুদৃঢ় ও আনুষ্ঠানিক করেছে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা শেষ পর্যন্ত আরও বেশি বিনিয়োগ বা শক্তিশালী রপ্তানির সুযোগ তৈরি করবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই তিন সফরকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার—গত দুই বছরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অভাবনীয় পরিবর্তন এলেও, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভাঙনের চেয়ে ধারাবাহিকতাই বেশি বজায় থেকেছে।
(লেখাটি দ্য ডিওপ্লাম্যাট থেকে ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)

ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর কিন্তু বেইজিং বা নয়াদিল্লিতে হয়নি। সফরটি শুরু হয় কুয়ালালামপুর থেকে। সেখানে আলোচনা হয় শ্রম অভিবাসন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে।
এরপর সফরের দ্বিতীয় ধাপে তিনি যান চীনে। সেখানে তিনি সামার দাভোস ফোরামে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি দ্বিপক্ষীয় সফরও করেন।
সফরের এই ক্রম বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার ও অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। তারপরও তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য বেইজিং ছিল না। অন্যদিকে, সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী ভারতেও তিনি শুরুতে যাননি। ব্যাপারটি বেশ লক্ষণীয়।
এটি কি নিছকই কূটনৈতিক সময়সূচি, নাকি অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার? নাকি নতুন সরকারের পাওয়া রাজনৈতিক পরিবেশের ফল? তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে এই ক্রম বুঝিয়ে দেয়, ঢাকার নতুন প্রশাসনকে কতটা ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হচ্ছে।
তবে তারেক রহমানের সূচিতে কোন রাজধানী আগে এল, তার চেয়েও গভীর একটি প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্নটি হলো—পর্যায়ক্রমিক সরকারগুলোর অধীনে বাংলাদেশের চীন নীতিতে কি মৌলিক কোনো পরিবর্তন এসেছে? নাকি বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাটা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ধারাবাহিক একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে?
বিষয়টি বুঝতে আমরা তিনটি সফরের যৌথ বিবৃতি মিলিয়ে দেখতে পারি। এগুলো হলো—জুলাই ২০২৪-এ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেইজিং সফর, মার্চ ২০২৫-এ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সফর এবং জুন ২০২৬-এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর। এগুলো তুলনা করলে দেখা যায়, সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু কিছুটা বদলালেও সামগ্রিক পথচলা অনেকটাই একই রকম রয়ে গেছে।
আপাতদৃষ্টিতে এই তিন সফর তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরে। শেখ হাসিনার চীন সফরটি হয়েছিল চরম বিতর্কিত এক নির্বাচনের মাধ্যমে টানা ৪র্থ ধাপে ক্ষমতায় আসার কয়েক মাস পর।
ড. ইউনূস বেইজিং যান ২০২৪ সালের আগস্টের নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও শেখ হাসিনার পতনের পর। তিনি এমন এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন, যার পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা ছিল অনিশ্চিত। ভারতের সঙ্গে তখন চরম উত্তেজনা।
অন্যদিকে, তারেক রহমানের সফরটি হলো ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির বিপুল বিজয়ের কয়েক মাস পর। হাসিনা বা ইউনূস প্রশাসনের চেয়ে তারেক রহমানের সরকারের গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি।
তবে এই ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরও সরকারি নথিপত্রগুলোতে বেশ ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়।
শেখ হাসিনার ২০২৪ সালের সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বড় কোনো বাঁকবদল হয়নি। তবে কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বজায় ছিল। দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে 'স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ' থেকে 'কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কোঅপারেটিভ পার্টনারশিপ'-এ উন্নীত করে। বেল্ট অ্যান্ড রোড (বিআরআই), অবকাঠামো, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জলবায়ুসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশাল এক রূপরেখা তৈরি হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অবকাঠামো-নির্ভর উন্নয়নের প্রতি চীনের সমর্থন ফুটে ওঠে। তবে ঢাকায় এই সফর নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। বাংলাদেশ যতটা আর্থিক সহায়তা চেয়েছিল, চীন ততটা দেয়নি।
কয়েক সপ্তাহ পরই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। চীনের প্রতি বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের মার্চে ড. ইউনূসের সফর প্রমাণ করে, দ্বিপক্ষীয় এই সম্পর্ক কতটা মজবুত। নতুন কোনো রূপরেখা না এনে, মূলত আগের চুক্তিগুলোকেই পুনরায় নিশ্চিত করা হয়। বিআরআই, মোংলা বন্দর, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই আলোচ্যসূচিতে টিকে থাকে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও চীনের প্রতি ঢাকার নীতি খুব একটা বদলায়নি।
অন্যদিকে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফরটি সম্পর্কের একটি নতুন পর্যায়কে নির্দেশ করে। এর কারণ এই নয় যে তিনি পুরোনো অগ্রাধিকারগুলো বাদ দিয়েছেন, বরং তিনি সেগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও গভীর করতে চেয়েছেন।
সবচেয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে 'চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডোর'-এর চীনা প্রস্তাব। আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য বাড়াতে শি জিনপিং ও তারেক রহমানের বৈঠকে এটি নিয়ে আলোচনা হয়। যদিও সরকারি যৌথ বিবৃতিতে এর উল্লেখ নেই। এর আগে চীন 'বিসিআইএম' (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) করিডোরের প্রস্তাব করেছিল, যা থমকে যায়। নতুন এই প্রস্তাবে ভারতকে বাদ দিয়ে করিডোর গড়ার ধারণাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
পাশাপাশি, চীন ও বাংলাদেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে কৌশলগত সংলাপ এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের নিয়ে 'টু প্লাস টু (২+২)' সংলাপ চালুর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এছাড়া সরকারের বাইরে গিয়ে বিএনপি এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে প্রথম সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক কেবল প্রকল্প-ভিত্তিক সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে।
গত তিন বছরে সম্পর্ক কীভাবে এগিয়েছে, তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো তিস্তা প্রকল্প। হাসিনার আমলে এটি কেবল পানি ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ইউনূসের সময়ে চীনা কোম্পানিগুলোকে এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। আর তারেক রহমানের সময়ে এসে বিষয়টি আরও সুনির্দিষ্ট হয়েছে; চীন এতে সমর্থন জানিয়েছে এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ব্রিকস এবং এসসিও-তে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও চীনের জোরালো সমর্থন এবারের বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
তবে এই তিন সফরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ভূ-রাজনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক। ২০২৪ সালের বিবৃতিতে জোর দেওয়া হয়েছিল অবকাঠামোর ওপর। ২০২৫-এ গুরুত্ব পায় শিল্পায়ন ও উৎপাদন। আর ২০২৬-এ এসে সাপ্লাই চেইন, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি এবং রপ্তানি আধুনিকায়নের বিষয়গুলো যুক্ত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার এখন কেবল অবকাঠামো নয়; বরং শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ।
বাংলাদেশের জন্য তারেক রহমানের সফরের তাৎপর্য কয়টি চুক্তি সই হলো তার ওপর নির্ভর করছে না। বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কীভাবে বিকশিত হচ্ছে, সেটাই আসল বিষয়। সহজ কথায় বললে—শেখ হাসিনা অংশীদারত্বের মান উন্নয়ন করেছিলেন, ড. ইউনূস রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তা টিকিয়ে রেখেছিলেন, আর তারেক রহমান এখন সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছেন।
অবশ্য এই সফরকে এখনই বিশাল কোনো 'কূটনৈতিক যুগান্তকারী ঘটনা' বলা ঠিক হবে না। এটি মূলত বিদ্যমান অংশীদারত্বকে আরও সুদৃঢ় ও আনুষ্ঠানিক করেছে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা শেষ পর্যন্ত আরও বেশি বিনিয়োগ বা শক্তিশালী রপ্তানির সুযোগ তৈরি করবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই তিন সফরকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার—গত দুই বছরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অভাবনীয় পরিবর্তন এলেও, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভাঙনের চেয়ে ধারাবাহিকতাই বেশি বজায় থেকেছে।
(লেখাটি দ্য ডিওপ্লাম্যাট থেকে ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)
.png)

বাংলাদেশের একটা গ্রামের ছেলে ব্রাজিলের জার্সি পরে উল্লাস করে, পতাকা ওড়ায় ছাদে, দেয়ালে আঁকে মেসি বা নেইমারের ছবি। এই ভালোবাসার পেছনে যুক্তি খুঁজতে যাওয়াই বৃথা—এটা নিছক আবেগ, আর সেই আবেগই ফুটবলকে বানিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ঘটনা।
২ ঘণ্টা আগে
গাজায় ইসরায়েলের হামলা তিন বছর গড়াতে চলেছে। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে পূর্ব জেরুজালেম, সিরিয়া ও লেবাননেও। অথচ আরব দেশগুলো শুধু উদ্বেগ প্রকাশ, প্রতীকী ত্রাণ সহায়তা পাঠানো এবং জাতিসংঘে বৈঠকের আহ্বান জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এসব উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত তাদের সম্মিলিত নিষ্ক্রিয়তাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।
৫ ঘণ্টা আগে
মন্দ বা খেলাপি ঋণের পাহাড় কমাতে বিশেষ ‘এক্সিট’ বা প্রস্থান সুবিধা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, খেলাপি গ্রাহকেরা তাদের আসল পুরো টাকা এককালীন পরিশোধ করে দায়মুক্ত হতে পারবেন। এককালীন পরিশোধ করলে আরোপিত ও অনারোপিত উভয় ধরনের সুদ মওকুফের সুবিধা পাবেন।
৫ ঘণ্টা আগে
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আন্দোলনের শুরু, সরকার পতনের দিকে মোড় নেওয়া, ডিবি হেফাজতের অভিজ্ঞতা, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে ঢাকা স্ট্রিম।
১৭ ঘণ্টা আগে