আব্বাস আরাগচির কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ: তেহরান-বেইজিং-মস্কো বলয়ে বদলাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ১৮: ৫৯
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি এক অভূতপূর্ব ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, যেখানে ইসরায়েল-আমেরিকা বনাম ইরান ও তার প্রক্সি শক্তিগুলোর মধ্যকার সরাসরি সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, যার সাম্প্রতিক পাকিস্তান (২৪ এপ্রিল ২০২৬), ওমান (২৫ এপ্রিল ২০২৬), রাশিয়া (২৭ এপ্রিল ২০২৬) ও চীন (৬ মে ২০২৬) সফর কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচার নয়, বরং মার্কিন নেভাল ব্লকেড বা নৌ-অবরোধের বিপরীতে এক বিশাল প্রতিরোধের ইঙ্গিত।

একদিকে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে জ্বালানি সরবরাহে ইরানের ছাড় না দেওয়ার অনমনীয় মনোভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলছে, অন্যদিকে আমেরিকার কঠোর সামরিক চাপের মুখেও আরাগচি বেইজিং ও মস্কোর সাথে কৌশলগত বলয় মজবুত করছেন। চীন থেকে সৌদি আরবের সাথে আঞ্চলিক সহযোগিতার সংলাপ এবং চীন ও রাশিয়ার সাথে সামরিক যন্ত্রাংশের গোপন আদান-প্রদান প্রমাণ করে যে, ইরান কেবল যুদ্ধবিরতির আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। পশ্চিমের চাপিয়ে দেওয়া একক আধিপত্যকে রুখতে তেহরান-বেইজিং-মস্কো অক্ষ এখন একটি শক্তিশালী ‘মাল্টিপোলার’ বিশ্ব ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছে। মার্কিন রণতরীর টহল এবং ইসরায়েলি আক্রমণের মুখেও ইরানের এই কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ স্পষ্ট করে দেয় যে, তারা দীর্ঘমেয়াদী সামরিক ও রাজনৈতিক যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। হরমুজ প্রণালীর উত্তাপ এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর নতুন মেরুকরণ মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে এমন এক পথে নিয়ে যাচ্ছে যেখানে ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আর কার্যকর থাকছে না। এটি কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং পশ্চিমী শক্তির জন্য এক চরম ভূ-রাজনৈতিক সতর্কবার্তা, যা নতুন এক বিশ্ব ব্যবস্থার জানান দিচ্ছে।

তেহরান-বেইজিং-মস্কো অক্ষ: নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার কারিগর

গত ৬ মে আব্বাস আরাগচির চীন সফর মূলত পুতিন ও শি জিনপিংয়ের ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বা পশ্চিমা-বিরোধী বহুমুখী বিশ্ব ব্যবস্থা বাস্তবায়নের একটি কৌশলগত মহড়া, যেখানে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে রুশ-চীন বলয়ের প্রধান পাহারাদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বেইজিংয়ে বসে সৌদি আরবের সাথে কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে ইরান এই বার্তাই দিয়েছে যে, অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণে এখন ওয়াশিংটনের পরিবর্তে বেইজিংই প্রধান প্রভাবক।

কৌশলগত অংশীদারিত্ব: ক্ষমতার নতুন ভরকেন্দ্র

চীন ও রাশিয়ার প্রস্তাবিত ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বা বহুমুখী বিশ্ব ব্যবস্থায় ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান কৌশলগত স্তম্ভ ও পাহারাদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) এবং ব্রিকস-এ ইরানের অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে, মস্কো ও বেইজিং তেহরানকে কেবল মিত্র নয়, বরং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ভাঙার প্রধান অংশীদার মনে করে। এর মাধ্যমে রাশিয়ার সামরিক প্রযুক্তি এবং চীনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগের বিপরীতে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব বলয়কে চ্যালেঞ্জ করার রসদ পাচ্ছে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ত্রিপক্ষীয় অক্ষটি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র থেকে মার্কিন একাধিপত্য সরিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নতুন ভূ-রাজনৈতিক কাঠামো তৈরির লক্ষ্যেই কাজ করছে।

ডিপ্লোম্যাটিক সিগন্যাল: বেইজিং যখন মধ্যস্থতার মূল মঞ্চ

আরাগচির বেইজিং সফরকালে চীন থেকে সৌদি আরবের সাথে কূটনৈতিক সংলাপ মূলত এই বার্তা দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের একাধিপত্য এখন অস্তমিত। অতীতে রিয়াদ-তেহরান বিরোধ নিষ্পত্তিতে আমেরিকার ভূমিকা অনিবার্য থাকলেও, বর্তমানে চীনের সক্রিয় মধ্যস্থতায় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ আঞ্চলিক কূটনীতিতে বেইজিংকে ‘চিফ আর্কিটেক্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান ও সৌদি আরবের এই ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ কেবল দ্বিপাক্ষিক নয়, বরং এটি মার্কিন প্রভাবমুক্ত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ার প্রচেষ্টা। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পশ্চিমের নাক গলানোর সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে, যা বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক নেতৃত্বের স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।

আঞ্চলিক কো-অপারেশন ও সৌদি আরব ফ্যাক্টর

আব্বাস আরাগচির পাকিস্তান, ওমান এবং সৌদি আরবের সাথে যোগাযোগ মূলত ইরানের চারপাশের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে একটি নিরপেক্ষমূলক নিরাপত্তা বলয়ে আবদ্ধ করার কৌশলগত প্রচেষ্টা। চীনকে সাক্ষী রেখে সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ককে ‘আঞ্চলিক সহযোগিতার’ স্তরে উন্নীত করার মাধ্যমে ইরান আব্রাহাম অ্যাকর্ডের আদলে গড়া ইসরায়েলি জোটের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। এই কূটনীতির মূল লক্ষ্য হলো আমেরিকার সম্ভাব্য সামরিক অভিযানে প্রতিবেশীদের ভূমি ও আকাশসীমা ব্যবহার নিষিদ্ধ নিশ্চিত করে ইসরায়েলকে আঞ্চলিকভাবে একা করে ফেলা।

নিরপেক্ষতার কৌশল: প্রতিবেশীদের কবজায় রাখার নীতি

আমেরিকা বা ইসরায়েলের সাথে সম্ভাব্য সরাসরি যুদ্ধে জয়ী হতে ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর কৌশলগত অবস্থানকে সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। পাকিস্তান ও ওমান সফর করে আব্বাস আরাগচি স্পষ্টভাবে বার্তা দিয়েছেন যে, কোনো অবস্থাতেই যেন তাদের ভূমি বা আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা না চালানো হয়। ইরান জানে যে ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে এই দেশগুলো যুদ্ধের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল; তাই তাদের ‘নিরপেক্ষ’ রাখার নিশ্চয়তা মানেই ইসরায়েলি ও মার্কিন বিমান হামলার গতিপথ সীমিত করে দেওয়া। এর ফলে একদিকে যেমন ইরানের ওপর আকস্মিক হামলার ঝুঁকি কমছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক দেশগুলোও ইরানের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে আমেরিকার সামরিক আবদার থেকে দূরে থাকছে।

সৌদি-ইরান সমঝোতা: ইসরায়েলি জোট গঠনের পথে অন্তরায়

চীনের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া ইরান-সৌদি সম্পর্ককে আরাগচি এখন সাধারণ স্তরের বাইরে নিয়ে গিয়ে একটি স্থায়ী ‘আঞ্চলিক কো-অপারেশন’ বা সহযোগিতার কাঠামো দিতে চাইছেন। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সংলাপে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রিয়াদ ও তেহরানের অভিন্ন অবস্থান এবং যৌথ সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’-এর লক্ষ্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। সৌদি আরবকে ইরানের সাথে এই সমীকরণে যুক্ত করার মাধ্যমে তেহরান মূলত ইসরায়েলের কাঙ্ক্ষিত ‘আরব-ইসরায়েল সামরিক জোট’ গড়ার স্বপ্নকে অঙ্কুরেই ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। এরফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে একঘরে করার যে মার্কিন নীতি ছিল, তা এখন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

সামরিক প্রস্তুতি ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের চাঞ্চল্যকর তথ্য

আব্বাস আরাগচির কূটনৈতিক তৎপরতার সমান্তরালে ইরান যে যুদ্ধের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর একটি বিশেষ রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে চীনের বিভিন্ন অস্ত্র প্রস্তুতকারী কারখানা থেকে রেল, সমুদ্র এবং আকাশপথে ড্রোন, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইলের অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্রাংশ (যেমন: ইঞ্জিন, মাইক্রোচিপ এবং ফাইবার-অপ্টিক কেবল) নিয়মিত ইরান ও রাশিয়ায় পাঠানো হচ্ছে।

সরঞ্জাম সরবরাহ: সামরিক সক্ষমতার নেপথ্য কারিগর

চীনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে রেল, সমুদ্র এবং আকাশপথে ড্রোন, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইলের ‘ক্রিটিকাল পার্টস’ বা অতি-প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ইরান ও রাশিয়ায় রপ্তানি করা হচ্ছে। গত ৬ মে ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, জাইমেন ভিক্টরি টেকনোলজির মতো চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ড্রোন ইঞ্জিনের (যেমন: লিমব্যাচ এল ৫৫০) পাশাপাশি লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ও ফাইবার-অপ্টিক কেবল ব্যাপকভাবে সরবরাহ করছে। এই সরবরাহ চেইনটি মূলত ‘ডুয়াল-ইউজ’ বা দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্যের আড়ালে পরিচালিত হয়, যা পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষে শনাক্ত করা বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থামানো কঠিন করে তুলেছে। এরফলে ইরান ও রাশিয়ার ওপর চাপানো মার্কিন অবরোধগুলো কার্যত অকেজো হয়ে পড়ছে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার আরও আধুনিক হচ্ছে। বেইজিংয়ের এই নিরবচ্ছিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহ তেহরান ও মস্কোর সামরিক সক্ষমতাকে পশ্চিমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।

ক্লোজড লুপ সাপ্লাই চেইন: নিষেধাজ্ঞার ঊর্ধ্বে এক অভেদ্য সামরিক বলয়

তেহরান-বেইজিং-মস্কোর মধ্যে গড়ে ওঠা এই ‘ক্লোজড লুপ’ বা আবদ্ধ সরবরাহ শৃঙ্খল পশ্চিমা অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞাকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দিয়েছে। ইরান তার উদ্ভাবিত ‘শাহেদ’ ড্রোন ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়ার কাছে সরবরাহ করছে, আর বিনিময়ে রাশিয়ার কাছ থেকে উন্নত সাইবার ইলেকট্রনিক্স এবং চীনের কাছ থেকে উচ্চ-প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর ও মিসাইল গাইডেন্স সিস্টেম লাভ করছে। এই পারস্পরিক বিনিময় প্রথাটি কোনো ব্যাংকিং চ্যানেল বা ডলারের ওপর নির্ভরশীল নয়, ফলে ওয়াশিংটন চাইলেও এটি বন্ধ করতে পারছে না। এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক চক্র তৈরি করেছে, যেখানে এক দেশের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অন্য দেশের প্রযুক্তির সাথে মিশে সমরাস্ত্রকে আরও নিখুঁত ও বিধ্বংসী করে তুলছে। এই ত্রিপক্ষীয় বলয়টি কেবল একটি সাপ্লাই চেইন নয়, বরং পশ্চিমাদের বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে একটি সফল ভূ-রাজনৈতিক বিদ্রোহ।

হরমুজ প্রণালী: জ্বালানি রাজনীতির নতুন অস্ত্র

আব্বাস আরাগচির সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বার্তার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রচ্ছন্ন দিক হলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী। ইরান সম্ভবত বিশ্বকে এই চরম বার্তা দিচ্ছে যে, যদি তাদের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তবে তারা এই আন্তর্জাতিক জলপথে আর কোনো ছাড় দেবে না। প্রতিদিন বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত মোট খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ বা এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ধমনী। ইরান যদি এখানে তার সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো করে বা নৌ-অবরোধের মতো পদক্ষেপ নেয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছাবে। এটি মূলত আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলোর জন্য এক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াবে, কারণ তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া মানেই তাদের শিল্পোৎপাদন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়া। ইরান এই প্রণালীকে আসলে একটি ‘জিও-পলিটিক্যাল লিভারেজ’ বা কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে যাতে পশ্চিমারা তাদের ওপর সামরিক চাপ প্রয়োগের আগে অন্তত দশবার ভাবে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি কঠোর বার্তা

বর্তমান উত্তাল পরিস্থিতিতে ইরানের গতিবিধি ও ভাষা বিশ্লেষণ করলে বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি একটি কঠোর সতর্কবার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইরান সরাসরি এই দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করছে। তেহরান থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, যদি এই দেশগুলোর মাটি বা আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানের ওপর কোনো ধরনের হামলা চালানো হয়, তবে পাল্টা আঘাত থেকে তারাও রেহাই পাবে না। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে ‘প্রো-ইরান’ এবং ‘প্রো-ইউএস’—এই দুই স্পষ্ট শিবিরে বিভক্ত করে দিচ্ছে। এরফলে আরব দেশগুলো এখন এক চরম উভয়সংকটের মুখোমুখি; একদিকে আমেরিকার নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে ইরানের সরাসরি আক্রমণের ঝুঁকি। ইরানের এই কঠোর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তির প্রভাবকে সংকুচিত করে আঞ্চলিক মেরুকরণের জন্ম দিচ্ছে।

ব্রিকস ও এসসিও: প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি

ইরান এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো রাষ্ট্র নয়, বরং ব্রিকস এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) পূর্ণ সদস্য হিসেবে এক শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ঢালের আড়ালে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। এই জোটগুলোর মাধ্যমে ইরান ডলার-বিহীন বা বিকল্প মুদ্রায় লেনদেন করার সুযোগ পাচ্ছে, যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলোকে কার্যত অকেজো করে দিচ্ছে। চীন ও রাশিয়ার সাথে এই অর্থনৈতিক ও কৌশলগত একীভূতকরণ ইরানকে কেবল কূটনৈতিক শক্তিই দিচ্ছে না, বরং যুদ্ধের সময় নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন বজায় রাখার সক্ষমতাও প্রদান করছে। এরফলে পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও তেহরান দীর্ঘমেয়াদী সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে পারছে, যা তাদের আঞ্চলিক আধিপত্যকে আরও সুসংহত করেছে। এই জোটবদ্ধতা ইরানকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক অধরা শক্তিতে পরিণত করেছে।

আব্বাস আরাগচির কূটনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা প্রমাণ করে যে, ইরান এখন কেবল আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং তেহরান-বেইজিং-মস্কো অক্ষের এক অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিরপেক্ষ রাখা এবং অন্যদিকে চীন-রাশিয়ার থেকে উন্নত প্রযুক্তির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে ইরান আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ এবং ব্রিকস ও এসসিও-র মতো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ইরানকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে যেখানে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এখন অকেজো প্রায়। মধ্যপ্রাচ্য সম্ভবত একটি দীর্ঘমেয়াদী দ্বিমেরু ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে যাচ্ছে, যেখানে ওয়াশিংটনের পেন্সিলের বদলে বেইজিং ও মস্কোর প্রভাব হবে আরও প্রকট। যদি আমেরিকা ও ইসরায়েল তাদের সামরিক নীতিতে পরিবর্তন না আনে, তবে লোহিত সাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত এক বিশাল অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রতিরোধ গড়ে উঠবে যা বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

সৌদি-ইরান ক্রমবর্ধমান সমঝোতা এবং চীনের সক্রিয় মধ্যস্থতা ইঙ্গিত দেয় যে, আগামীর মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত আর এককভাবে পশ্চিমের হাতে থাকছে না। আরাগচির এই সফরগুলো আসলে একটি নতুন ‘মাল্টিপোলার’ বিশ্বব্যবস্থার সলতে পাকানোর কাজ সম্পন্ন করেছে, যা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। এই নতুন সমীকরণে ইরান সম্ভবত আর কোনো মার্কিন চাপকে পরোয়া না করে নিজস্ব শর্তে আঞ্চলিক মানচিত্র পুনর্গঠন করবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিবর্তনশীল মানচিত্র কেবল একটি অঞ্চলের গল্প নয়, বরং এটি ভেঙে যাওয়া পুরনো বিশ্বব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষের ওপর নতুন এক শক্তির উত্থানের পদধ্বনি।

  • সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

সম্পর্কিত