লুণ্ঠনচক্রেই ঘুরপাক

শুভ কিবরিয়া
শুভ কিবরিয়া

স্ট্রিম গ্রাফিক

সরকার জ্বালানি তেলের পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে ১.২০–১.৫০ টাকা (প্রায় ১৭–২১%) দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যার সঙ্গে খুচরা দামে আনুপাতিক সমন্বয় হতে পারে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রস্তাবটি নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করেছে এবং সব সংস্থার মতামত ও গণশুনানির পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। এ মাসের মধ্যে গণশুনানির ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে খুচরা বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি প্রায় ৮.৯৫ টাকা এবং পাইকারি ৭.০৪ টাকা। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল।

বলা ভালো, বাংলাদেশ এক গভীর জ্বালানি সংকটে আছে। তার জ্বালানি নিরাপত্তা অরক্ষিত, জ্বালানি সুবিচার অনিশ্চিত এবং ভোক্তার জ্বালানি অধিকার ভূলুন্ঠিত। আমেরিকার ইরান আক্রমণে উদ্ভূত পরিস্থিতি জ্বালানি খাতে একটা নতুন বৈশ্বিক সংকটের জন্ম দিয়েছে বটে; কিন্তু এই সংকট না হলেও বাংলাদেশের জ্বালানি খাত অবকাঠামোগত লুন্ঠন ও অবিচারের মধ্যেই হাবুডুবু খাচ্ছিল। এই খাতে গভীর সংস্কার তাই অপরিহার্য।

জ্বালানি সংকটের কারণসমূহ

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে গত দেড় দশক ধরে একটি বিশেষ আইনের (বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি বিশেষ বিধান আইন, ২০১০) আওতায় পরিচালনা করা হয়। ২০২৩ সালে আইন সংশোধন করে জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণের ক্ষমতা সরকার নিজের হাতে নেয়। এর ফলে প্রতিযোগিতাহীন বিনিয়োগ, একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতির ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়। এতে যেসব পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তা হলো–

ক) আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধি: বছরের পর বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এমন নীতিকাঠামো তৈরি হয়েছে, যার ফলে এখানে এলএনজি, তরল জ্বালানি, কয়লা ও বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। সরকার বদল হয়েছে; কিন্তু নীতি বদলায়নি। এই কাজে ফ্যাসিবাদী, অনির্বাচিত, গণতান্ত্রিক সরকারের মধ্যে ঐক্যভাব সুস্পষ্ট। ফলে এখানকার জ্বালানি নিরাপত্তা সুরক্ষার বদলে অরক্ষিত হয়েছে।

(খ) তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে স্থবিরতা: সমুদ্রসীমার বিরোধ মীমাংসার পরও কার্যকর তেল-গ্যাস অনুসন্ধান হয়নি। ৯০ দশকের পর থেকে স্থলভাগেও গ্যাস অনুসন্ধান স্থবির। এ কাজেও সব ধরনের সরকারের মধ্যে সমভাবে স্থবিরতা বিরাজ করেছে।

(গ) নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে ব্যর্থতা: কথা অনেক হলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে কোনো শক্ত কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। এনজিও লেভেলে হৈচৈ চললেও বাস্তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সাশ্রয়ী মূল্যে, ব্যবহার উপযোগীভাবে ভোক্তাদের মধ্যে আদরণীয় করে তোলা যায়নি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের নামে দেশ-বিদেশের টাকা এসেছে, কিন্তু তা জনগণকে প্রকৃত সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। দামে, সেবায়, কারিগরী বিবেচনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে মানুষ স্বস্তি পায়নি। আবার জীবাশ্ম জ্বালানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টেকার মতো নীতি ও আর্থিক সুবিধা পায়নি বলে বিনিয়োগকারীদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ফলে জনপরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকৃত বিকাশ ঘটেনি।

(ঘ) মূল্য নির্ধারণে অস্বচ্ছতা ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সমন্বয়: এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইন পরিবর্তন করে গণশুনানি ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে ফ্যাসিবাদি সরকার বিভিন্ন সময়ে নিজেই জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণ করেছে। ফলে স্বেচ্ছাচারিতার কবলে পড়ে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ নিজেই বেপরোয়া থেকেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি নখদন্তহীন; সরকারের আজ্ঞাবহ আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ কারণে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে ভোক্তারা বরাবরই স্বেচ্ছাচারের শিকার হয়েছে। জ্বালানির মূল্যহার ভোক্তা শ্রেণীভেদে অনায্যভাবে বেড়েই চলেছে।

(ঙ) দুর্নীতি ও অপচয় বৃদ্ধি: জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ক্রিয়াশীল সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি খাত, কোম্পানি এবং লাইসেন্সিরা লুণ্ঠনমূলক ব্যয় বৃদ্ধি করে। যেসব ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়, সেসব খাতে অস্বচ্ছতা, অদক্ষতা, লুটপাট, বৈষম্য, স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণের অভাব, আইনি প্রটেকশন ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় যে লুন্ঠনমূলক ব্যয় ও লুন্ঠনমূলক মুনাফা নিশ্চিত করা হয়, তাতে এই খাত দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বৃহত্তম খাত হিসেবে পরিগণিত হয়েছে– যার দায়ভার বহন করতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

(চ) বিইআরসি আইনের সীমাবদ্ধতায় নিয়ন্ত্রকের অকার্যকারিতা: জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গঠিত হলেও সাপ্লাই চেইনের বড় অংশ– অনুসন্ধান, উৎপাদন ও আমদানিকে এর আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে জ্বালানি ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই ও ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণে এটি অকার্যকর থেকে গেছে।

ফলে একদিকে জ্বালানি ঘাটতি তীব্র হয়েছে, অন্যদিকে ভোক্তারা উচ্চ জ্বালানি মূল্যের বোঝা বহন করছে। এর ফলে জ্বালানি দারিদ্র্য ও জ্বালানি অবিচার এক বড় বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে লুন্ঠনের পুরনো কাঠামো চালু রেখে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি কোনো সমাধান তো নয়ই, বরং তা সংকট বাড়াবে। অনেক বছর ধরেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ বাড়তি খরচ আছে। এটা কমানোর কাজে হাত দেওয়া উচিত সবার আগে। খরচ কমিয়ে ভর্তুকি কমানো যেতে পারে। এসব না করে পুরনো চক্রে গা ভাসিয়ে জনভোগান্তির আয়োজন করলে জনগণ আগের সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের কাজে পার্থক্য খুঁজে পাবে বলে মনে হয় না।

দায়মুক্তির আইন, ইতিকথা ও বর্তমান

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়নের নামে তৈরি হওয়া দায়মুক্তির আইন, যার নাম ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’, যেটা ২০১০ সালের ৫৪ নং আইন হিসেবে চিহ্নিত। এর মেয়াদ ১৬ বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত করা হয়েছিল। ফ্যাসিবাদি সরকার নিজ ক্ষমতাবলে এই আইনের মেয়াদ বারংবার বাড়িয়েছে।

সেই আমলে বলা হয়েছিল, সরকার দ্রুত মানুষকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ করতে চায়। তাই যারপরনাই দ্রুত ব্যবস্থার মাধ্যমে পথের বাধাগুলো সরাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন সরকারকে বানাতে হয়েছে। আইনে বলা ছিল, প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার বা দরপ্রস্তাবের বাইরে গিয়ে সীমিত সংখ্যক অথবা একক কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ ও দর কষাকষির মাধ্যমে কাজ প্রদান করা যাবে। আইনে বলা ছিল, ওই আইনের অধীন কৃত বা কৃত বলে বিবেচিত কোনো কার্য, গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, প্রদত্ত কোনো আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।

ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ, ২০২৪ (২০২৪ সালের ১৫ নং অধ্যাদেশ) নামের অধ্যাদেশ জারি করে ওই কালো আইন রহিত করে। জারিকৃত অধ্যাদেশবলে দায়মুক্তির আইন বাতিল গণ্য হলেও অন্তর্বর্তী সরকার বাতিলকৃত অধ্যাদেশে দুটি আপত্তিকর অনুচ্ছেদ যুক্ত করে ওই আইনের আওতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংঘটিত অতীতের সব অপকর্মকে বৈধতা দেয়। যেখানে বলা হয়,

(২) উক্ত আইন রহিতকরণ সত্ত্বেও

(ক) উক্তরূপ রহিতকরণের অব্যবহিত পূর্বে উক্ত আইনের আওতায় সম্পাদিত চুক্তি বা সম্পাদিত চুক্তির অধীন গৃহীত কোনো ব্যবস্থা বৈধভাবে সম্পাদিত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে;

(খ) উক্ত আইনের আওতায় সম্পাদিত চুক্তির অধীন চলমান কোনো কার্যক্রম এমনভাবে অব্যাহত থাকিবে অথবা নিষ্পন্ন করিতে হইবে, যেন উক্ত আইন রহিত হয় নাই;

সম্প্রতি বিএনপির নতুন সরকার সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই অধ্যাদেশের কোনো সংশোধন ছাড়াই ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) (রহিতকরণ) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ১৮ নং আইন)’ নামে এটিকে অধ্যাদেশ থেকে আইনে পরিণত করে।

মজার ব্যাপার, ফ্যাসিবাদী সরকার যে আইন বানিয়ে অস্বচ্ছ চুক্তি করেছে, জ্বালানি খাতে অনায্যভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে, হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের ব্যবস্থা করেছে; গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার তার সব প্রক্রিয়াকে জায়েজ বলে আইনি মর্যাদা দিয়েছে। নতুন আইনে জ্বালানি খাতে সংঘটিত সব অপরাধকে এক ধরনের বৈধতাই দেওয়া হয়েছে। বিএনপি তার ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অগ্রাহ্য করে জ্বালানি খাতের দায়মুক্তির আইনে আপত্তিকর, জনস্বার্থ বিঘ্নকারী অনুচ্ছেদ অনুমোদন করে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এবং ওই আইন জারি রেখেই নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

লুটপাটের ফল ও চলমান গন্তব্য

পিডিবির তথ্য ও পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উপাদন করতে খরচ হতো ৬.০১ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা হয়েছে ১১.৩৩ টাকা। পাঁচ বছরেই প্রতি ইউনিট উৎপাদনের খরচ বেড়েছে ৮৮.৫%। ওই সময়ে বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণও বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে আমাদের খরচ হয়েছে ১১.৩৩ টাকা। অথচ এই সময়ে ভারত থেকে আমদানিকৃত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ পড়েছে ৮.৭৭ টাকা। অর্থাৎ দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাইতে আমদানি করা বিদ্যুৎ সস্তা পড়েছে। ফলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত আমদানির বাজারে পরিণত হওয়ার দিকে যৌক্তিকভাবেই এগিয়ে চলেছে।

দায়মুক্তি আইনের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশে জ্বালানি ও বিদ্যুৎকে ক্রমে ব্যয়বহুল করে তোলা হয়েছে। এ খাতে স্বেচ্ছাচারিতা-অদক্ষতা-দুর্নীতি-জবাবদিহিহীনতার মধ্য দিয়ে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও লুণ্ঠনমূলক মুনাফা বাড়িয়ে ভোক্তার সর্বনাশ করা হচ্ছে। দেশের বাজারকে আমদানি নির্ভরতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে অধিকতর ব্যয়ের মুখে ঠেলে দুর্বল করে প্রতিযোগিতায় অযোগ্য করে তোলা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যা বহুলাংশে অর্থনীতি ও জীবনমান নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আর এই ধারা ব্যাহত না করেই সরকার নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

নতুন সরকারের উদ্যোগ ও প্রতিফল

বিএনপির সরকার ক্ষমতায় এসেই ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েল, কেরোসিন, পেট্রোল, ডিজেল, অকটেনসহ সব রকম জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। বোতলজাত এলপিজির দাম বাড়িয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামে এই এলপিজি যাতে ভোক্তারা ক্রয় করতে পারে, সেই ব্যবস্থা অতীতের মতো বর্তমান সরকারও নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে সড়ক ও নৌপথে গণপরিবহণের ভাড়াও সরকার বাড়িয়েছে।

সরকার দায়মুক্তির আইন রহিত করলেও জনস্বার্থ পরিপন্থী দুটি অনুচ্ছেদ বহাল রেখে এই খাতে বলা যায় লুন্ঠনকেই স্বীকৃতি দিয়েছে।

বিএনপি তার দেওয়া ৩১ দফার ১৭ নম্বরে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে দায়মুক্তি আইনসহ সব কালাকানুন বাতিল করা হবে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ রোধ করার লক্ষ্যে জনস্বার্থবিরোধী কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনায় চলমান সীমাহীন দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। সরকার সেই প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে পদক্ষেপ না নিয়ে পূর্ববর্তী প্রক্রিয়াতেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে।

বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন সম্পর্কে বলেছিল– গত দেড় দশকে সীমাহীন দুর্নীতি, অস্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া, ব্যয়বহুল স্বল্পমেয়াদী চুক্তি, আত্মঘাতী ক্যাপাসিটি চার্জ ও অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতার ফলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত ব্যয়বহুল, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের নজিরবিহীন দুর্নীতির কারণে জাতির ওপর জ্বালানি খাতে বিশাল অঙ্কের দায় এসে পড়েছে। বলা হয়েছিল, ক্যাপাসিটি চার্জসহ রেন্টাল ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তিসমূহ পর্যালোচনা করে অযৌক্তিক ব্যয় হ্রাস এবং স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু নির্বাচনী ইশতেহারে বিবৃত সেসব বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নিয়েই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

গত দেড় দশকে পাইকারিতে ১২বার ও গ্রাহক পর্যায়ে ১৪বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছিল ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার এসে দাম না বাড়িয়ে খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বিএনপি সরকার এসে ফ্যাসিবাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে।

পুনশ্চ: নানা অসিলায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ফ্যাসিবাদী আমলের চল। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে লুন্ঠনের পুরনো কাঠামো চালু রেখে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি কোনো সমাধান তো নয়ই, বরং তা সংকট বাড়াবে। অনেক বছর ধরেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ বাড়তি খরচ আছে। এটা কমানোর কাজে হাত দেওয়া উচিত সবার আগে। খরচ কমিয়ে ভর্তুকি কমানো যেতে পারে। এসব না করে পুরনো চক্রে গা ভাসিয়ে জনভোগান্তির আয়োজন করলে জনগণ আগের সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের কাজে পার্থক্য খুঁজে পাবে বলে মনে হয় না।

  • শুভ কিবরিয়া: সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

*মতামত লেখকের নিজস্ব

সম্পর্কিত