সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যে সহিংসতাগুলো দেখছি, তার বেশিরভাগই ঘটছে মূলত কৃষ্ণাঙ্গ, বাদামী বর্ণের বা অশ্বেতাঙ্গ মানুষদের ওপর। তাহলে কি আমাদের মানসিকভাবে এমনভাবে অভ্যস্ত করে তোলা হয়েছে যে, এই মানুষদের ওপর হওয়া অত্যাচার আমাদের আর ভাবায় না? যখন বাদামী বর্ণের কোনো মানুষকে মাটিতে আছড়ে ফেলে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়, হত্যা করা হয় বা তাদের ওপর বোমা ফেলা হয়, তখন আমরা কি আর আগের মতো শিউরে উঠি?
লেখা:

আজকের বিশ্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সহিংস হয়ে উঠেছে। আমরা চরম এক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করছি। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর তাদের চলমান যুদ্ধকে আরও দীর্ঘ করার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
যুদ্ধের পক্ষে যেসব রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো শুনলে গা শিউরে ওঠে। এগুলো অত্যন্ত উসকানিমূলক এবং চরম সহিংস। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো হুমকি দিচ্ছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। তিনি এমন পারমাণবিক হুমকিও দিয়েছিলেন যে, তার দাবি না মানলে ‘আজ রাতেই একটি আস্ত সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।’
অন্যদিকে, আমরা লেবাননে বেসামরিক মানুষের বাড়িঘরের ওপর ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ দেখছি। মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে বৈরুতে ১০০টি বোমা ফেলা হয়েছে। মনে হচ্ছিল হামলাকারীরা কোনোভাবেই নিজেদের ধ্বংস করার এই উন্মাদনাকে থামাতে পারছে না। গাজাতেও যুদ্ধবিরতির কথা বলা হলেও বোমা হামলা পুরোপুরি থামেনি। হয়তো হামলার গতি এখন কিছুটা কমেছে। কিন্তু অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং ধীরে ধীরে তারা একটানা হামলা চালিয়েই যাচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের পরিস্থিতির দিকে তাকালেও আমরা চরম সহিংসতা দেখতে পাই। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই অভিবাসীদের ওপর যে অমানবিক আচরণ করে, তা এর বড় প্রমাণ। অ্যালেক্স প্রেত্তি নামের এক ব্যক্তিকে তারা ১০টি গুলি করেছিল। অ্যামি লুসিয়া লোপেজ বেলোজা নামের এক নারীকে হাতকড়া পরিয়ে হন্ডুরাসে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। অথচ সাত বছর বয়সের পর থেকে অ্যামি কখনোই ওই দেশে থাকেননি। আমরা আমাদের নিজেদের দেশের মানুষের ওপর এভাবেই প্রতিদিন সহিংসতা চালাই। সেই কানায় কানায় পূর্ণ হওয়া সহিংসতাই যেন শেষ পর্যন্ত বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে উপচে পড়ছে।
বিশ্ব ক্রমশই সহিংস হয়ে উঠছে। আর এই সহিংসতা উসকে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা দিন দিন আরও পরিষ্কার হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দেখে আমি নিজেকেই একটি প্রশ্ন করেছি: আমরা কীভাবে এমন একটি অবস্থায় এসে পৌঁছালাম?
এই প্রশ্নের উত্তরে নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়াটা খুব সহজ। আমরা বলতেই পারি, যারা ক্ষমতায় আছেন এবং যারা তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন, তারাই এই সব সহিংসতার জন্য দায়ী। এই কথা বলে আমরা হয়তো ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিতে পারি। এটা সত্য যে, আমরা সাধারণ মানুষ সরাসরি এই বড় বড় সহিংসতার সঙ্গে জড়িত নই। কিন্তু আমরা কি পরোক্ষভাবে সহিংসতায় অংশ নিচ্ছি না? আমাদের চারপাশে প্রতিদিন এমন অসংখ্য ছোট ছোট সহিংস আচরণ ঘটছে যা ধীরে ধীরে আমাদের বড় সহিংস ঘটনাগুলোর প্রতি অনুভূতিহীন করে তুলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যে সহিংসতাগুলো দেখছি, তার বেশিরভাগই ঘটছে মূলত কৃষ্ণাঙ্গ, বাদামী বর্ণের বা অশ্বেতাঙ্গ মানুষদের ওপর। তাহলে কি আমাদের মানসিকভাবে এমনভাবে অভ্যস্ত করে তোলা হয়েছে যে, এই মানুষদের ওপর হওয়া অত্যাচার আমাদের আর ভাবায় না? যখন বাদামী বর্ণের কোনো মানুষকে মাটিতে আছড়ে ফেলে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়, হত্যা করা হয় বা তাদের ওপর বোমা ফেলা হয়, তখন আমরা কি আর আগের মতো শিউরে উঠি?
দৈনন্দিন সহিংসতা বা ‘মাইক্রোঅ্যাগ্রেশন’
গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে অশ্বেতাঙ্গদের ওপর হওয়া একধরনের সূক্ষ্ম সহিংসতা নিয়ে কাজ করছেন। তারা এই বিষয়টিকে বলেন ‘মাইক্রোঅ্যাগ্রেশন’। বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় সূক্ষ্ম বা ছোটখাটো মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আফ্রিকান-আমেরিকান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চেস্টার পিয়ার্স ১৯৭০ সালে প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন। অশ্বেতাঙ্গদের প্রতি করা ছোটখাটো এবং স্বয়ংক্রিয় অপমান বোঝাতে তিনি এই শব্দটি বেছে নেন।
গবেষকদের মতে, এগুলো হলো খুব ছোট কিন্তু প্রতিদিনের মৌখিক বা আচরণগত অপমান। এগুলো ইচ্ছাকৃত হতে পারে, আবার অনিচ্ছাকৃতও হতে পারে। তবে এর মাধ্যমে অশ্বেতাঙ্গদের প্রতি একধরনের অবমাননাকর ও নেতিবাচক বর্ণবাদী মনোভাব প্রকাশ পায়।
গবেষকরা এই মাইক্রোঅ্যাগ্রেশনকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন:
প্রথমত, মৌখিক আক্রমণ। যেমন, একজন অশ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিকে বারবার জিজ্ঞেস করা, ‘আপনি আসলে কোথা থেকে এসেছেন?’
দ্বিতীয়ত, আচরণগত আক্রমণ। যেমন, একজন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে একজন শ্বেতাঙ্গ নারীর নিজের পার্সটি শক্ত করে বুকে চেপে ধরা।
তৃতীয়ত, প্রতিবেশগত আক্রমণ। যেমন, কোনো একটি ক্লাসরুমের দেয়ালে শুধু শ্বেতাঙ্গ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের ছবি দিয়ে সাজিয়ে রাখা। এগুলো সবই আমাদের প্রতিদিনের জীবনের ছোটখাটো সহিংসতা।
এই মাইক্রোঅ্যাগ্রেশনের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো এটি খুব সহজে চোখে পড়ে না। একটি বড় ধরনের আক্রমণ খুব সহজেই সবার নজর কাড়ে। মেট্রো রেলে দাঁড়িয়ে কেউ যদি প্রকাশ্যে কাউকে বর্ণবাদী গালি দেয়, তবে তাকে অন্যদের সরাসরি প্রতিবাদের মুখে পড়তে হতে পারে। কিন্তু এর চেয়ে ছোট এবং তীক্ষ্ণ আক্রমণ করাটা অনেক বেশি সহজ।
যেমন ধরুন—আড়চোখে তাকানো। লিফটে একজন অশ্বেতাঙ্গ মানুষ প্রবেশ করলে নিজের ফোনে মনোযোগ দেওয়ার ভান করা। অথচ ঠিক এক মিনিট পর অন্য কোনো শ্বেতাঙ্গ মানুষ ঢুকলেই তার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা। আমরা প্রায়ই এই ছোট আক্রমণগুলোকে এড়িয়ে যাই। কারণ এগুলো খুব ছোট এবং আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বহীন মনে হয়।
কিন্তু এটি আসলে হাজারো ছোট ছোট ক্ষতের মাধ্যমে তিলে তিলে মারা যাওয়ার মতো ব্যাপার। এই সূক্ষ্ম নড়াচড়া, দ্রুত উচ্চারিত বাঁকা কথা, সামান্য ঘৃণামিশ্রিত দৃষ্টি—এগুলো মানুষের মনের ভেতর জমতে থাকে। একজন ভুক্তভোগী মানুষের পৃথিবী এই ছোট ছোট অপমান দিয়ে ভরে যায়। আর ছোট ছোট সহিংসতায় ভরা একটি পৃথিবীও মূলত একটি সহিংস পৃথিবীই।
চেস্টার পিয়ার্স যেমনটা লিখেছিলেন, “অধিকাংশ আক্রমণাত্মক আচরণই খুব বড় বা পঙ্গু করে দেওয়ার মতো হয় না। এগুলো হয় অত্যন্ত সূক্ষ্ম। এই সূক্ষ্ম আঘাতগুলো যখন প্রতিদিন একটানা দেওয়া হয়, কেবল তখনই এর আসল ভয়াবহতা বোঝা যায়।” অর্থাৎ, এই ছোট আক্রমণগুলো রাডারের নিচ দিয়ে পার হয়ে যায় বলে এর বিরুদ্ধে কোনো শক্ত অবস্থান নেওয়া সম্ভব হয় না।
অস্পষ্টতা এবং মনের ভেতরের সংশয়
মাইক্রোঅ্যাগ্রেশন আরও একটি কারণে মারাত্মক। আর তা হলো এর অস্পষ্টতা। এটি আসলেই ঘটেছে কি না, তা নিয়ে ভুক্তভোগীর মনেই সংশয় তৈরি হয়। আমরা ভাবতে বাধ্য হই: রেস্তোরাঁয় ঢোকার পর মানুষগুলো কি আসলেই আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিল? নাকি তারা অন্য কিছু দেখছিল? মেয়েটি কি আমাকে দেখেই পার্স শক্ত করে ধরল, নাকি সে এমনিতেই নড়েচড়ে বসছিল?
এমনকি যখন কোনো ঘটনা স্পষ্টভাবে ঘটে, তখনও আমরা নিশ্চিত হতে পারি না। আমরা বুঝতে পারি না যে এর সঙ্গে আমার গায়ের রঙ বা পরিচয়ের কোনো সম্পর্ক আছে কি না। এটা কি নিছকই লোকটার সাধারণ অভদ্রতা ছিল? অ্যাকাডেমিক আলোচনায় ওই ব্যক্তি কি আমার যুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন কারণ আমি অশ্বেতাঙ্গ? নাকি আমি হিজাব পরা একজন মুসলিম বলে তিনি এমন করলেন? তিনি কি একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষের সঙ্গেও এমন আচরণ করতেন? নাকি লোকটার দিনটাই খারাপ যাচ্ছিল?
এই যে প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রশ্ন করা—সে কি ইচ্ছা করে করেছে, নাকি করেনি—এটাই নিজের মনের ভেতর চরম যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। বড় আক্রমণের বেলায় অন্তত বিষয়টি স্পষ্ট থাকে এবং তার প্রতিবাদ করা যায়। কিন্তু এই ছোট আক্রমণগুলো হলো ছায়ার মতো। এর ফলে অন্যদের বিশ্বাস করানো কঠিন হয়ে পড়ে যে আসলেই কিছু ঘটেছে। আর নিজের মনের ভেতরেও চলতে থাকে অবিরাম দহন।
দার্শনিক ক্রিস্টিনা ফ্রিডল্যান্ডার লিখেছেন: “শ্বেতাঙ্গদের হয়তো কখনোই এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। কারও খারাপ আচরণ বর্ণবাদী কি না, তা নিয়ে তাদের ভাবতে হয় না। অন্যদিকে অশ্বেতাঙ্গরা সবসময় এই দ্বিধা বা মানসিক যাতনায় ভোগেন।” অনেকেই হয়তো বলবেন, যারা এসব আশা করে, এগুলো কেবল তাদের মনেই থাকে। কিন্তু মানুষ মানুষের আচরণের ধরন বুঝতে পারে। একজন কৃষ্ণাঙ্গ হয়তো একবার কল্পনা করতে পারেন যে, নারীটি তাকে দেখে পার্স শক্ত করে ধরেছে। কিন্তু সব নারীই যখন একই কাজ করে, তখন কি পুরোটাই কল্পনা হতে পারে?
সূক্ষ্ম অপমান থেকে চরম নৃশংসতায় উত্তরণ
যখন আমরা প্রতিনিয়ত এমন ছোটখাটো সহিংসতার আবহে থাকি, তখন এর পরিণতি কী হয়? গবেষণায় দেখা গেছে, এটি ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে স্ট্রেস হরমোন বাড়ে। প্রতিদিন এই অপমানগুলোকে ঠেকানো, উপেক্ষা করা বা তা নিয়ে সংশয়ে ভোগা একজন মানুষের জীবনকে কতটা দুর্বিষহ করে তোলে, তা সহজেই বোঝা যায়।
তবে এই সহিংসতার প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়েই আটকে থাকে না। এর বড় রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। আমাদের প্রতিদিনের জীবনে অশ্বেতাঙ্গদের প্রতি হওয়া এই নীরব সহিংসতা যদি আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তবে এর ফল হয় মারাত্মক। তখন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া কোনো নিরীহ মানুষের চিৎকার আমাদের কাছে খুব একটা গায়ে লাগে না। ইরান ও গাজার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ওপর বোমাবর্ষণের মতো ঘটনাগুলো তখন আমাদের কাছে দৈনন্দিন সাধারণ ঘটনার মতোই মনে হতে শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিল, অনেকেই একটি বিষয় লক্ষ্য করেছেন। এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে কোনো বড় যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। অথচ জরিপগুলোতে দেখা গেছে, বেশিরভাগ সাধারণ আমেরিকান এই যুদ্ধের বিরোধী। এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন: সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতাহীনতার অনুভূতি, গাজায় দীর্ঘদিন ধরে চলা গণহত্যার পর প্রতিবাদের ক্লান্তি, এবং মিডিয়ার পক্ষপাতিত্ব।
তবে এসবের বাইরে আরও একটি নীরব ও অবচেতন কারণ হয়তো কাজ করেছে। আর তা হলো, অশ্বেতাঙ্গ বা অন্য বর্ণের মানুষদের আঘাত করা বা হত্যা করাটাই বোধহয় দুনিয়ার স্বাভাবিক নিয়ম—এমন একটি ভুল বিশ্বাস তৈরি হওয়া। যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের শক্তি শেষ হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, অশ্বেতাঙ্গ এবং মূলত মুসলিম মানুষের মৃত্যুর প্রতি আমাদের অনুভূতিহীনতা। আমরা আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত এই সূক্ষ্ম সহিংসতায় এত বেশি ডুবে আছি যে, সমুদ্রের ওপারে ঘটে চলা বৃহত্তর সহিংসতা আমাদের আর ততটা ক্ষুব্ধ করে না। আমরা একধরনের হতাশায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
সহিংসতার দুষ্টচক্র
এটিও মনে রাখা জরুরি যে, বড় রাজনৈতিক সহিংসতা আবার এই ছোটখাটো সহিংসতাকে আরও উসকে দেয়। বর্ণবাদী সহিংসতা একটি চক্রের মতো কাজ করে। এটি ছোট পর্যায় থেকে শুরু হয়ে বৃহত্তর পর্যায়ে পৌঁছায়, আবার বৃহত্তর পর্যায় থেকে তা পুনরায় মানুষের প্রতিদিনের জীবনে ছড়িয়ে পড়ে।
নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো দেখিয়েছে, ইরানের ওপর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অনলাইনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অমানবিক ভাষার ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের সাধারণ মানুষের ওপর বোমা ফেলছে, তখন সেই অমানবিকতার প্রভাব যে নিজ দেশের সমাজেও পড়বে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমেরিকান রাজনীতি ও গণমাধ্যমে ইসলামভীতির একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই মনোভাব যে আরও সূক্ষ্ম ও ছোটখাটো আক্রমণ হিসেবে প্রকাশ পাবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।
অবশ্যই, নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বা আমরা এর প্রতি অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছি—এমন কথা ভাবতেও আমাদের খারাপ লাগে। কিন্তু আমাদের প্রত্যেকের নিজেদের জিজ্ঞাসা করা উচিত। বড় বড় সহিংসতার প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া কীভাবে ছোট ছোট সহিংসতার অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে? কীভাবে আমরা এর বিরুদ্ধে কাজ করতে পারি?
অনেক গবেষকই মনে করেন, যখনই এই ধরনের ছোটখাটো বর্ণবাদী বা অপমানজনক ঘটনা ঘটে, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের উচিত প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ করা। এর ফলে অন্তত এই ভ্রান্ত ধারণা দূর হবে যে, এসব অপমান কেবল অশ্বেতাঙ্গদের মনের কল্পনা।
যুক্তরাষ্ট্র কেন এত সহিংস হয়ে উঠেছে, তার পেছনে আরও অনেক কারণ রয়েছে। শুধু মাইক্রোঅ্যাগ্রেশন দিয়ে তা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাবে না। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ওপর ইসরায়েলপন্থি লবিং গ্রুপগুলোর প্রভাব, ট্রাম্পের উসকে দেওয়া স্পষ্ট বর্ণবাদ এবং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক উদাসীনতা—এগুলো সবই বড় কারণ। সরকার যখন বিদেশে গণহত্যা চালায়, তখন এই রাজনৈতিক উদাসীনতার কারণেই বহু আমেরিকান নিশ্চিন্তে সাধারণ জীবনযাপন করতে পারে।
তবে আমাদের সব ধরনের সহিংসতাকেই চিনতে শিখতে হবে। তা সে স্পষ্ট বা সূক্ষ্ম, কাছের বা দূরের—যাই হোক না কেন। রাস্তায় সাধারণ ট্রাফিক সিগন্যালে বন্দুক হাতে পুলিশের সহিংসতা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম বা লিফটে নীরবে ঘটে যাওয়া ছোট অপমান—কোনোটিকেই এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। যে সহিংসতা আমেরিকার যুদ্ধকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে এবং যে সহিংসতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মিশে থাকে—তা হয়তো আমাদের অজান্তেই আমাদের মন ও আত্মাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই ছোট ছোট সহিংসতাগুলোকে চিহ্নিত করতে পারাই হলো এসব চিরতরে বন্ধ করার প্রথম পদক্ষেপ।
(লেখাটি মিডলইস্টআই থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম ও মুজাহিদুল ইসলাম)

আজকের বিশ্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সহিংস হয়ে উঠেছে। আমরা চরম এক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করছি। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর তাদের চলমান যুদ্ধকে আরও দীর্ঘ করার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
যুদ্ধের পক্ষে যেসব রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো শুনলে গা শিউরে ওঠে। এগুলো অত্যন্ত উসকানিমূলক এবং চরম সহিংস। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো হুমকি দিচ্ছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। তিনি এমন পারমাণবিক হুমকিও দিয়েছিলেন যে, তার দাবি না মানলে ‘আজ রাতেই একটি আস্ত সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।’
অন্যদিকে, আমরা লেবাননে বেসামরিক মানুষের বাড়িঘরের ওপর ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ দেখছি। মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে বৈরুতে ১০০টি বোমা ফেলা হয়েছে। মনে হচ্ছিল হামলাকারীরা কোনোভাবেই নিজেদের ধ্বংস করার এই উন্মাদনাকে থামাতে পারছে না। গাজাতেও যুদ্ধবিরতির কথা বলা হলেও বোমা হামলা পুরোপুরি থামেনি। হয়তো হামলার গতি এখন কিছুটা কমেছে। কিন্তু অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং ধীরে ধীরে তারা একটানা হামলা চালিয়েই যাচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের পরিস্থিতির দিকে তাকালেও আমরা চরম সহিংসতা দেখতে পাই। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই অভিবাসীদের ওপর যে অমানবিক আচরণ করে, তা এর বড় প্রমাণ। অ্যালেক্স প্রেত্তি নামের এক ব্যক্তিকে তারা ১০টি গুলি করেছিল। অ্যামি লুসিয়া লোপেজ বেলোজা নামের এক নারীকে হাতকড়া পরিয়ে হন্ডুরাসে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। অথচ সাত বছর বয়সের পর থেকে অ্যামি কখনোই ওই দেশে থাকেননি। আমরা আমাদের নিজেদের দেশের মানুষের ওপর এভাবেই প্রতিদিন সহিংসতা চালাই। সেই কানায় কানায় পূর্ণ হওয়া সহিংসতাই যেন শেষ পর্যন্ত বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে উপচে পড়ছে।
বিশ্ব ক্রমশই সহিংস হয়ে উঠছে। আর এই সহিংসতা উসকে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা দিন দিন আরও পরিষ্কার হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দেখে আমি নিজেকেই একটি প্রশ্ন করেছি: আমরা কীভাবে এমন একটি অবস্থায় এসে পৌঁছালাম?
এই প্রশ্নের উত্তরে নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়াটা খুব সহজ। আমরা বলতেই পারি, যারা ক্ষমতায় আছেন এবং যারা তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন, তারাই এই সব সহিংসতার জন্য দায়ী। এই কথা বলে আমরা হয়তো ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিতে পারি। এটা সত্য যে, আমরা সাধারণ মানুষ সরাসরি এই বড় বড় সহিংসতার সঙ্গে জড়িত নই। কিন্তু আমরা কি পরোক্ষভাবে সহিংসতায় অংশ নিচ্ছি না? আমাদের চারপাশে প্রতিদিন এমন অসংখ্য ছোট ছোট সহিংস আচরণ ঘটছে যা ধীরে ধীরে আমাদের বড় সহিংস ঘটনাগুলোর প্রতি অনুভূতিহীন করে তুলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যে সহিংসতাগুলো দেখছি, তার বেশিরভাগই ঘটছে মূলত কৃষ্ণাঙ্গ, বাদামী বর্ণের বা অশ্বেতাঙ্গ মানুষদের ওপর। তাহলে কি আমাদের মানসিকভাবে এমনভাবে অভ্যস্ত করে তোলা হয়েছে যে, এই মানুষদের ওপর হওয়া অত্যাচার আমাদের আর ভাবায় না? যখন বাদামী বর্ণের কোনো মানুষকে মাটিতে আছড়ে ফেলে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়, হত্যা করা হয় বা তাদের ওপর বোমা ফেলা হয়, তখন আমরা কি আর আগের মতো শিউরে উঠি?
দৈনন্দিন সহিংসতা বা ‘মাইক্রোঅ্যাগ্রেশন’
গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে অশ্বেতাঙ্গদের ওপর হওয়া একধরনের সূক্ষ্ম সহিংসতা নিয়ে কাজ করছেন। তারা এই বিষয়টিকে বলেন ‘মাইক্রোঅ্যাগ্রেশন’। বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় সূক্ষ্ম বা ছোটখাটো মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আফ্রিকান-আমেরিকান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চেস্টার পিয়ার্স ১৯৭০ সালে প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন। অশ্বেতাঙ্গদের প্রতি করা ছোটখাটো এবং স্বয়ংক্রিয় অপমান বোঝাতে তিনি এই শব্দটি বেছে নেন।
গবেষকদের মতে, এগুলো হলো খুব ছোট কিন্তু প্রতিদিনের মৌখিক বা আচরণগত অপমান। এগুলো ইচ্ছাকৃত হতে পারে, আবার অনিচ্ছাকৃতও হতে পারে। তবে এর মাধ্যমে অশ্বেতাঙ্গদের প্রতি একধরনের অবমাননাকর ও নেতিবাচক বর্ণবাদী মনোভাব প্রকাশ পায়।
গবেষকরা এই মাইক্রোঅ্যাগ্রেশনকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন:
প্রথমত, মৌখিক আক্রমণ। যেমন, একজন অশ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিকে বারবার জিজ্ঞেস করা, ‘আপনি আসলে কোথা থেকে এসেছেন?’
দ্বিতীয়ত, আচরণগত আক্রমণ। যেমন, একজন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে একজন শ্বেতাঙ্গ নারীর নিজের পার্সটি শক্ত করে বুকে চেপে ধরা।
তৃতীয়ত, প্রতিবেশগত আক্রমণ। যেমন, কোনো একটি ক্লাসরুমের দেয়ালে শুধু শ্বেতাঙ্গ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের ছবি দিয়ে সাজিয়ে রাখা। এগুলো সবই আমাদের প্রতিদিনের জীবনের ছোটখাটো সহিংসতা।
এই মাইক্রোঅ্যাগ্রেশনের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো এটি খুব সহজে চোখে পড়ে না। একটি বড় ধরনের আক্রমণ খুব সহজেই সবার নজর কাড়ে। মেট্রো রেলে দাঁড়িয়ে কেউ যদি প্রকাশ্যে কাউকে বর্ণবাদী গালি দেয়, তবে তাকে অন্যদের সরাসরি প্রতিবাদের মুখে পড়তে হতে পারে। কিন্তু এর চেয়ে ছোট এবং তীক্ষ্ণ আক্রমণ করাটা অনেক বেশি সহজ।
যেমন ধরুন—আড়চোখে তাকানো। লিফটে একজন অশ্বেতাঙ্গ মানুষ প্রবেশ করলে নিজের ফোনে মনোযোগ দেওয়ার ভান করা। অথচ ঠিক এক মিনিট পর অন্য কোনো শ্বেতাঙ্গ মানুষ ঢুকলেই তার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা। আমরা প্রায়ই এই ছোট আক্রমণগুলোকে এড়িয়ে যাই। কারণ এগুলো খুব ছোট এবং আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বহীন মনে হয়।
কিন্তু এটি আসলে হাজারো ছোট ছোট ক্ষতের মাধ্যমে তিলে তিলে মারা যাওয়ার মতো ব্যাপার। এই সূক্ষ্ম নড়াচড়া, দ্রুত উচ্চারিত বাঁকা কথা, সামান্য ঘৃণামিশ্রিত দৃষ্টি—এগুলো মানুষের মনের ভেতর জমতে থাকে। একজন ভুক্তভোগী মানুষের পৃথিবী এই ছোট ছোট অপমান দিয়ে ভরে যায়। আর ছোট ছোট সহিংসতায় ভরা একটি পৃথিবীও মূলত একটি সহিংস পৃথিবীই।
চেস্টার পিয়ার্স যেমনটা লিখেছিলেন, “অধিকাংশ আক্রমণাত্মক আচরণই খুব বড় বা পঙ্গু করে দেওয়ার মতো হয় না। এগুলো হয় অত্যন্ত সূক্ষ্ম। এই সূক্ষ্ম আঘাতগুলো যখন প্রতিদিন একটানা দেওয়া হয়, কেবল তখনই এর আসল ভয়াবহতা বোঝা যায়।” অর্থাৎ, এই ছোট আক্রমণগুলো রাডারের নিচ দিয়ে পার হয়ে যায় বলে এর বিরুদ্ধে কোনো শক্ত অবস্থান নেওয়া সম্ভব হয় না।
অস্পষ্টতা এবং মনের ভেতরের সংশয়
মাইক্রোঅ্যাগ্রেশন আরও একটি কারণে মারাত্মক। আর তা হলো এর অস্পষ্টতা। এটি আসলেই ঘটেছে কি না, তা নিয়ে ভুক্তভোগীর মনেই সংশয় তৈরি হয়। আমরা ভাবতে বাধ্য হই: রেস্তোরাঁয় ঢোকার পর মানুষগুলো কি আসলেই আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিল? নাকি তারা অন্য কিছু দেখছিল? মেয়েটি কি আমাকে দেখেই পার্স শক্ত করে ধরল, নাকি সে এমনিতেই নড়েচড়ে বসছিল?
এমনকি যখন কোনো ঘটনা স্পষ্টভাবে ঘটে, তখনও আমরা নিশ্চিত হতে পারি না। আমরা বুঝতে পারি না যে এর সঙ্গে আমার গায়ের রঙ বা পরিচয়ের কোনো সম্পর্ক আছে কি না। এটা কি নিছকই লোকটার সাধারণ অভদ্রতা ছিল? অ্যাকাডেমিক আলোচনায় ওই ব্যক্তি কি আমার যুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন কারণ আমি অশ্বেতাঙ্গ? নাকি আমি হিজাব পরা একজন মুসলিম বলে তিনি এমন করলেন? তিনি কি একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষের সঙ্গেও এমন আচরণ করতেন? নাকি লোকটার দিনটাই খারাপ যাচ্ছিল?
এই যে প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রশ্ন করা—সে কি ইচ্ছা করে করেছে, নাকি করেনি—এটাই নিজের মনের ভেতর চরম যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। বড় আক্রমণের বেলায় অন্তত বিষয়টি স্পষ্ট থাকে এবং তার প্রতিবাদ করা যায়। কিন্তু এই ছোট আক্রমণগুলো হলো ছায়ার মতো। এর ফলে অন্যদের বিশ্বাস করানো কঠিন হয়ে পড়ে যে আসলেই কিছু ঘটেছে। আর নিজের মনের ভেতরেও চলতে থাকে অবিরাম দহন।
দার্শনিক ক্রিস্টিনা ফ্রিডল্যান্ডার লিখেছেন: “শ্বেতাঙ্গদের হয়তো কখনোই এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। কারও খারাপ আচরণ বর্ণবাদী কি না, তা নিয়ে তাদের ভাবতে হয় না। অন্যদিকে অশ্বেতাঙ্গরা সবসময় এই দ্বিধা বা মানসিক যাতনায় ভোগেন।” অনেকেই হয়তো বলবেন, যারা এসব আশা করে, এগুলো কেবল তাদের মনেই থাকে। কিন্তু মানুষ মানুষের আচরণের ধরন বুঝতে পারে। একজন কৃষ্ণাঙ্গ হয়তো একবার কল্পনা করতে পারেন যে, নারীটি তাকে দেখে পার্স শক্ত করে ধরেছে। কিন্তু সব নারীই যখন একই কাজ করে, তখন কি পুরোটাই কল্পনা হতে পারে?
সূক্ষ্ম অপমান থেকে চরম নৃশংসতায় উত্তরণ
যখন আমরা প্রতিনিয়ত এমন ছোটখাটো সহিংসতার আবহে থাকি, তখন এর পরিণতি কী হয়? গবেষণায় দেখা গেছে, এটি ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে স্ট্রেস হরমোন বাড়ে। প্রতিদিন এই অপমানগুলোকে ঠেকানো, উপেক্ষা করা বা তা নিয়ে সংশয়ে ভোগা একজন মানুষের জীবনকে কতটা দুর্বিষহ করে তোলে, তা সহজেই বোঝা যায়।
তবে এই সহিংসতার প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়েই আটকে থাকে না। এর বড় রাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। আমাদের প্রতিদিনের জীবনে অশ্বেতাঙ্গদের প্রতি হওয়া এই নীরব সহিংসতা যদি আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তবে এর ফল হয় মারাত্মক। তখন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া কোনো নিরীহ মানুষের চিৎকার আমাদের কাছে খুব একটা গায়ে লাগে না। ইরান ও গাজার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ওপর বোমাবর্ষণের মতো ঘটনাগুলো তখন আমাদের কাছে দৈনন্দিন সাধারণ ঘটনার মতোই মনে হতে শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিল, অনেকেই একটি বিষয় লক্ষ্য করেছেন। এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে কোনো বড় যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। অথচ জরিপগুলোতে দেখা গেছে, বেশিরভাগ সাধারণ আমেরিকান এই যুদ্ধের বিরোধী। এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন: সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতাহীনতার অনুভূতি, গাজায় দীর্ঘদিন ধরে চলা গণহত্যার পর প্রতিবাদের ক্লান্তি, এবং মিডিয়ার পক্ষপাতিত্ব।
তবে এসবের বাইরে আরও একটি নীরব ও অবচেতন কারণ হয়তো কাজ করেছে। আর তা হলো, অশ্বেতাঙ্গ বা অন্য বর্ণের মানুষদের আঘাত করা বা হত্যা করাটাই বোধহয় দুনিয়ার স্বাভাবিক নিয়ম—এমন একটি ভুল বিশ্বাস তৈরি হওয়া। যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের শক্তি শেষ হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, অশ্বেতাঙ্গ এবং মূলত মুসলিম মানুষের মৃত্যুর প্রতি আমাদের অনুভূতিহীনতা। আমরা আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত এই সূক্ষ্ম সহিংসতায় এত বেশি ডুবে আছি যে, সমুদ্রের ওপারে ঘটে চলা বৃহত্তর সহিংসতা আমাদের আর ততটা ক্ষুব্ধ করে না। আমরা একধরনের হতাশায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
সহিংসতার দুষ্টচক্র
এটিও মনে রাখা জরুরি যে, বড় রাজনৈতিক সহিংসতা আবার এই ছোটখাটো সহিংসতাকে আরও উসকে দেয়। বর্ণবাদী সহিংসতা একটি চক্রের মতো কাজ করে। এটি ছোট পর্যায় থেকে শুরু হয়ে বৃহত্তর পর্যায়ে পৌঁছায়, আবার বৃহত্তর পর্যায় থেকে তা পুনরায় মানুষের প্রতিদিনের জীবনে ছড়িয়ে পড়ে।
নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো দেখিয়েছে, ইরানের ওপর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অনলাইনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অমানবিক ভাষার ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের সাধারণ মানুষের ওপর বোমা ফেলছে, তখন সেই অমানবিকতার প্রভাব যে নিজ দেশের সমাজেও পড়বে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমেরিকান রাজনীতি ও গণমাধ্যমে ইসলামভীতির একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই মনোভাব যে আরও সূক্ষ্ম ও ছোটখাটো আক্রমণ হিসেবে প্রকাশ পাবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।
অবশ্যই, নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বা আমরা এর প্রতি অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছি—এমন কথা ভাবতেও আমাদের খারাপ লাগে। কিন্তু আমাদের প্রত্যেকের নিজেদের জিজ্ঞাসা করা উচিত। বড় বড় সহিংসতার প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া কীভাবে ছোট ছোট সহিংসতার অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে? কীভাবে আমরা এর বিরুদ্ধে কাজ করতে পারি?
অনেক গবেষকই মনে করেন, যখনই এই ধরনের ছোটখাটো বর্ণবাদী বা অপমানজনক ঘটনা ঘটে, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের উচিত প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ করা। এর ফলে অন্তত এই ভ্রান্ত ধারণা দূর হবে যে, এসব অপমান কেবল অশ্বেতাঙ্গদের মনের কল্পনা।
যুক্তরাষ্ট্র কেন এত সহিংস হয়ে উঠেছে, তার পেছনে আরও অনেক কারণ রয়েছে। শুধু মাইক্রোঅ্যাগ্রেশন দিয়ে তা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাবে না। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ওপর ইসরায়েলপন্থি লবিং গ্রুপগুলোর প্রভাব, ট্রাম্পের উসকে দেওয়া স্পষ্ট বর্ণবাদ এবং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক উদাসীনতা—এগুলো সবই বড় কারণ। সরকার যখন বিদেশে গণহত্যা চালায়, তখন এই রাজনৈতিক উদাসীনতার কারণেই বহু আমেরিকান নিশ্চিন্তে সাধারণ জীবনযাপন করতে পারে।
তবে আমাদের সব ধরনের সহিংসতাকেই চিনতে শিখতে হবে। তা সে স্পষ্ট বা সূক্ষ্ম, কাছের বা দূরের—যাই হোক না কেন। রাস্তায় সাধারণ ট্রাফিক সিগন্যালে বন্দুক হাতে পুলিশের সহিংসতা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম বা লিফটে নীরবে ঘটে যাওয়া ছোট অপমান—কোনোটিকেই এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। যে সহিংসতা আমেরিকার যুদ্ধকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে এবং যে সহিংসতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মিশে থাকে—তা হয়তো আমাদের অজান্তেই আমাদের মন ও আত্মাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই ছোট ছোট সহিংসতাগুলোকে চিহ্নিত করতে পারাই হলো এসব চিরতরে বন্ধ করার প্রথম পদক্ষেপ।
(লেখাটি মিডলইস্টআই থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম ও মুজাহিদুল ইসলাম)

প্রতিবছর ১২ মে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ স্বাস্থ্য দিবস’ পালিত হয়। এ বছরের মূল প্রতিপাদ্য ‘খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির জন্য উদ্ভিদ জীবনিরাপত্তা’।
১৬ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি রেমিট্যান্স বাড়াতে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে চলে আসে—শুধু রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্যই কি এই উদ্যোগ, নাকি যেসব মানুষ নিজেদের জীবন, শ্রম ও স্বপ্ন উৎসর্গ করে দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখছেন, তাদের সুরক্ষা ও মর্যাদা...
২১ ঘণ্টা আগে
পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে মুসলমানরাই এখন বিজেপির প্রধান রাজনৈতিক বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, এই বিরোধী শক্তির নেতৃত্ব দিচ্ছেন হিন্দু নেতারাই। আর বিজেপির সঙ্গে এই রাজনৈতিক লড়াইয়ে দিনশেষে মুসলমানরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
১ দিন আগে
ড. আইনুন নিশাত জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ ও পানিসম্পদ বিষয়ে বাংলাদেশের পথিকৃৎ বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় জলবায়ু ও পানিবিষয়ক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। নদী ব্যবস্থাপনা, মৌসুমি বন্যা, হাওরের ফসলহানি ও নীতিনির্ধারণী সমস্যাসহ নানা বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন।
২ দিন আগে