এক্সপ্লেইনার

ক্রুড অয়েল কেন এত আলোচিত

স্ট্রিম গ্রাফিক

প্রায় এক মাস বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড ৮ মে সকাল থেকে পুনরায় চালু হয়েছে। অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েলের সংকটে কারখানাটি উৎপাদন স্থগিত রেখেছিল। ক্রুডের মজুত একেবারে তলানিতে নেমে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এই সরবরাহ সংকটের প্রধান কারণ। হরমুজ প্রণালিতে টানা অবরোধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলবাহী জাহাজ আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এতে আমদানিনির্ভর দেশগুলো সংকটে পড়ে। হরমুজ বন্ধের কারণে বাংলাদেশ মূলত পড়ে ক্রুড সংকটে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় ক্রুড আসত হরমুজ দিয়ে।

ক্রুড অয়েল কী

মাটির নিচ থেকে সরাসরি তোলা তরল জ্বালানিকে অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড বলা হয়। এই তেল মূলত বিভিন্ন হাইড্রোকার্বনের জটিল মিশ্রণ। তেল শিল্পে ক্রুড অয়েলের মান নির্ধারণের প্রধান একক হলো এপিআই গ্র্যাভিটি। গেট গ্লোবাল গ্রুপের এক গবেষণা অনুযায়ী, এই এককের ভিত্তিতে ক্রুডকে মূলত হালকা ও ভারি দু’ভাগে ভাগ করা হয়।

যে তেলের এপিআই গ্র্যাভিটি ৩১.১ ডিগ্রির ওপরে, তাকে হালকা ক্রুড বলা হয়। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঞ্চলে এ ধরনের তেল বেশি পাওয়া যায়। হালকা ক্রুডে সালফার কম থাকে। ২২ দশমিক ৩ ডিগ্রির নিচে এপিআই গ্র্যাভিটি থাকলে তাকে ভারি ক্রুড বলে। ভেনেজুয়েলা, কানাডা ও ইরাকের বাসরা অঞ্চলে এই ক্রুডের বিশাল মজুত রয়েছে। ভারি ক্রুড ঘন, আঠালো প্রকৃতির হয়। কিমরে নামের শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, ভারি ক্রুড শোধন করা জটিল ও ব্যয়বহুল। সালফার বেশি থাকায় রিফাইনারির যন্ত্রপাতির ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ক্রুড অয়েল থেকে উৎপাদিত জ্বালানি

ক্রুড সরাসরি কোনো ইঞ্জিন বা কারখানায় ব্যবহার করা যায় না। রিফাইনারিতে পাতন প্রক্রিয়ায় একে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করা হয়। বিশ্বজুড়ে রিফাইনারিগুলো ক্রুড পুড়িয়ে নানান অত্যাবশ্যকীয় পণ্য তৈরি করে। ম্যাগ ভেঞ্চারস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হালকা ক্রুড থেকে সবচেয়ে বেশি পেট্রল, জেট ফুয়েল ও ডিজেল পাওয়া যায়। ভারি ক্রুড থেকে মূলত ফার্নেস অয়েল, অ্যাসফাল্ট ও লুব্রিকেন্টের মতো ভারি উপাদান উৎপাদিত হয়। আধুনিক বিশ্বের পরিবহন ও শিল্প ব্যবস্থা এই পরিশোধিত জ্বালানিগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশে ক্রুড আমদানি ও ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন

বাংলাদেশ ক্রুডের জন্য মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। স্ক্রিবড-এ প্রকাশিত ইস্টার্ন রিফাইনারির এক সিমুলেশন রিপোর্ট অনুযায়ী, এটি প্রধানত দুটি দেশের ক্রুডের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ সৌদি আরব থেকে ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ‘মুবান ক্রুড’ আমদানি করে। ক্রুডের ৮০ শতাংশ আসে সৌদি আরব থেকে। বাকিটুকু সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে।

ইস্টার্ন রিফাইনারি ভারি ক্রুড পরিশোধনে সক্ষম নয়। এখানে পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রধানত ডিজেল, ন্যাপথা, কেরোসিন ও ফার্নেস অয়েল উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত ন্যাপথা প্রক্রিয়াজাত করে দেশে ব্যবহৃত অকটেনের প্রায় অর্ধেক তৈরি করা হয়।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, আমদানিকৃত ক্রুড থেকে ডিজেল পাওয়া যায় কমই। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৬৫ শতাংশ ডিজেল হলেও ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে আসে ২০-৩০ শতাংশ।

পরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরতা

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো পরিশোধন সক্ষমতার অভাব। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যবহৃত মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই পরিশোধিত। এশিয়ার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকেই মূলত এটা আমদানি করা হয়। বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিভিন্ন কোম্পানি থেকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি কেনে।

ভারত হয়ে তেল আমদানি: সুবিধা ও ঝুঁকি

হরমুজ সংকটে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরাসরি ক্রুড আনা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিবেশি দেশ ভারত থেকে পরিশোধিত ডিজেল কেনা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনে ভারত থেকে ডিজেল আসছে। দেশটি থেকে সমুদ্রপথেও আনা হচ্ছে।

খবরে প্রকাশ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের কাছে একটি ফাইল পাঠিয়েছে। এতে ভারতের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার ভিত্তিতে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল শোধন করে বাংলাদেশে আনার বিষয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানি করে নিজ রিফাইনারিতে শোধন করবে ভারত। পরিশোধিত পণ্য আবার বাংলাদেশে পাঠাবে। এ ক্ষেত্রে ক্রুড আমদানি ব্যয়, পরিশোধনের চার্জ ও পরিবহন খরচ বাংলাদেশ বহন করবে। তবে ভারতের ওপর এ ধরনের নির্ভরশীলতা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

জ্বালানি তেল সংরক্ষণে সীমাবদ্ধতা

বিশ্ববাজারের এমন অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব মজুত সক্ষমতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত ব্যবস্থা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকলেও বাংলাদেশ একসঙ্গে বেশি তেল কিনে মজুত করে রাখতে পারে না। চাহিদামাফিক এখানে জ্বালানি তেল আমদানি করে ব্যবহার করা হয়। মজুত বলতে আছে ‘চলতি মজুত’। কৌশলগত মজুতের অভাবেই ক্রুড সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। এ অবস্থায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশে পর্যাপ্ত মজুত ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি বলে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে ক্রুড অয়েলের রাজনীতি

জ্বালানি তেল বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। প্রভাবশালী দেশগুলো তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে একে অপরের ওপর ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের সময় তার হাতে থাকা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও এক পর্যায়ে হরমুজসহ ওই এলাকায় নৌ-অবরোধ দিয়েছে। উদ্দেশ্য ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে আরও কাবু করে চুক্তিতে আসতে বাধ্য করা। এর কিছুদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় আগ্রাসী নীতি নেন। তিনি খোলাখুলি ঘোষণা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় গিয়ে ব্যবসা করতে উদগ্রীব। সেই প্রক্রিয়া এর মধ্যে শুরুও হয়েছে।

এ অবস্থায় চীনের মতো বিপুল জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ তার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন আগে থেকেই প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ব্যারেল ক্রুডের কৌশলগত মজুত গড়ে তুলেছে। তারা স্থল পাইপলাইন দিয়ে নিরাপদে ক্রুড আনছে রাশিয়া থেকে। এদিকে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার তেলের ওপর ‘প্রাইস ক্যাপ’ দিলেও এশিয়ায় নতুন বাজার খুঁজে নিয়েছে তারা। রাশিয়ার অর্থনীতি এতে অনেকটাই চাপমুক্ত।

জ্বালানি তেলকেন্দ্রিক এ জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বুদ্ধিদীপ্ত জ্বালানি কূটনীতি অনুসরণ ও মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া এখান থেকে বেরুনোর কোনো সুযোগ আছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন না।

সম্পর্কিত