সালাহউদ্দিন আহমেদ রায়হান

স্বাধীন বাংলাদেশে বহু রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থান–পতন আমরা দেখেছি। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণে পরিমিতিবোধ বজায় রাখার ধারাবাহিকতা যদি বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে বেগম খালেদা জিয়ার নাম আলাদাভাবে আলোচনায় আসে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে বিপথগামী সেনা সদস্যদের হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তিনি দুটি শিশু সন্তান নিয়ে কঠিন সংকটে পড়েন। এই শোক ও নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও মানসিক দৃঢ়তা তৈরিতে প্রভাব ফেলেছিল।
খালেদা জিয়া স্বামীর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সফরে অংশগ্রহণ ছাড়া সরাসরি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না। জিয়াউর রহমানের সততা ও ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ছিল। তাই তাঁর মৃত্যুর পর খালেদা জিয়ার মানসিক বিপর্যস্ত হওয়া ছিল স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া, কোনো রাজনৈতিক কৌশল নয়। একই সময়ে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করে বিএনপিকে বিভক্ত ও দুর্বল করার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আনার উদ্যোগ নেন। প্রথমদিকে তিনি স্পষ্টভাবেই অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে তাঁর পারিবারিক পরিসরে, এমনকি মায়ের দিক থেকেও এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রবল আপত্তি ছিল। তবে বিএনপি যখন একাধিক অংশে বিভক্ত হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তখন তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার ফল হিসেবে দেখাই যুক্তিসঙ্গত।
ব্যক্তিগত রুচি ও আচরণে খালেদা জিয়া ছিলেন সংযত। রাজনীতির উত্তপ্ত বাস্তবতায়ও তিনি শালীন ভাষা বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। জাতীয় নেতাদের অবদান তিনি নিয়মিত স্মরণ করতেন। তার বক্তৃতায় সহনশীলতা ও সহাবস্থানের আহ্বান বারবার এসেছে। তিনি ন্যায্যতার প্রশ্নে দৃঢ় থাকলেও, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা জনদাবিকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করেছেন—এমন অভিযোগ সচরাচর শোনা যায় না।
এরশাদ শাসনামলে তিনি একাধিকবার গৃহবন্দী হন এবং রাজনৈতিকভাবে নিপীড়নের শিকার হন। ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি ১৯৮৬ সালের সামরিক নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে অংশ নেননি। এই সিদ্ধান্ত তাকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে জনপরিসরে দৃশ্যমান করে তোলে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বে দ্বিতীয়। এই অর্জন প্রতীকী হলেও, বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এর তাৎপর্য ছিল বাস্তব ও গভীর। নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ যেখানে সীমিত, সেখানে তার নেতৃত্ব একটি মানসিক বাধা ভাঙতে ভূমিকা রাখে। নারীশিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে উপবৃত্তি, ফুড ফর এডুকেশনসহ একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি একদল দক্ষ সহকর্মী ও বিশেষজ্ঞের ওপর নির্ভর করেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে সাইফুর রহমানকে পুনরায় দায়িত্ব দিয়ে তাকে উল্লেখযোগ্য নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা দেন। ভ্যাট ব্যবস্থার প্রবর্তন ও রাজস্ব কাঠামোর সংস্কার তার সরকারের সময় অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করে। কৃষির পাশাপাশি শিল্পখাতের গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা তার অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়।
প্রায়ই বলা হয় যে তিনি গৃহবধূ ছিলেন, তাহলে এত প্রাজ্ঞ হলেন কীভাবে? এই প্রশ্ন আসলে সমাজের এক ধরনের শ্রেণি ও লিঙ্গভিত্তিক ধারণার প্রতিফলন। খালেদা জিয়া নিজেকে গড়ে তুলেছেন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই। দীর্ঘ ৯ বছর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা বুঝতে সহায়তা করে।
দলীয় রাজনীতিতে ভিন্নমতের জায়গা দেওয়ার প্রবণতাও তার ক্ষেত্রে দেখা যায়। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তিনি তাদের রাজনৈতিক পরিসরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একইভাবে মহিউদ্দিন আহমদের মতো সমালোচনামুখর লেখকের ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট—ইতিহাস বা জীবনী লেখার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সন্তুষ্টির চেয়ে সত্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি তাঁর আস্থা ছিল। ১৯ দফা কর্মসূচি তাঁর নীতিগত রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি বড় শক্তির প্রতি অতিনির্ভরশীলতা এড়িয়ে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন—চীন, ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র, সব ক্ষেত্রেই।
খালেদা জিয়ার সরকারের সময় দারিদ্র্য বিমোচন, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। অর্থনীতিবিদ রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের গবেষণা অনুযায়ী, তাঁর দুই মেয়াদে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের জীবনে মৌলিক পরিবর্তন আসে। ২০০৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬ শতাংশ। শেয়ারবাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, যা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা জুগিয়েছিল।
ব্যক্তিগত আচরণে বেগম জিয়া ছিলেন সংযত ও মিতভাষী। অহেতুক আত্মপ্রচার বা প্রতিপক্ষকে আক্রমণের প্রবণতা তার মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম ছিল। অলীক স্বপ্ন না দেখিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। ভিশন ২০৩০ ঘোষণার সময়ও তিনি বাস্তব সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। রাজনীতিতে ‘আমি’ নয়, ‘আমরা’—এই দৃষ্টিভঙ্গি তার বক্তব্যে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে।
নারীজাগরণে তার কর্মসূচিগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০০৫ সালে তিনি বিশ্বে প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় স্থান পান। নির্মম রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েও তিনি প্রতিহিংসার পরিবর্তে সহনশীলতার আহ্বান জানিয়েছেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে এই সংযত অবস্থান তাকে সমসাময়িক রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
খালেদা জিয়া গৃহবধূ ছিলেন, এটি সত্য। জিয়াউর রহমানের দপ্তরে নিয়মিত যেতেন না এটিও সত্য। কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাস কেবল পটভূমি দিয়ে নয়, সিদ্ধান্ত ও আচরণ দিয়ে মানুষকে মূল্যায়ন করে। সেই বিবেচনায় বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘকাল আলোচিত ও স্মরণীয় থাকবেন। এমন সংযত, পরিমিতিবোধসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আবার কবে পাবে—সে প্রশ্ন উন্মুক্তই থেকে যায়।
প্রকৌশলী, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

স্বাধীন বাংলাদেশে বহু রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থান–পতন আমরা দেখেছি। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণে পরিমিতিবোধ বজায় রাখার ধারাবাহিকতা যদি বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে বেগম খালেদা জিয়ার নাম আলাদাভাবে আলোচনায় আসে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে বিপথগামী সেনা সদস্যদের হাতে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তিনি দুটি শিশু সন্তান নিয়ে কঠিন সংকটে পড়েন। এই শোক ও নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও মানসিক দৃঢ়তা তৈরিতে প্রভাব ফেলেছিল।
খালেদা জিয়া স্বামীর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সফরে অংশগ্রহণ ছাড়া সরাসরি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না। জিয়াউর রহমানের সততা ও ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ছিল। তাই তাঁর মৃত্যুর পর খালেদা জিয়ার মানসিক বিপর্যস্ত হওয়া ছিল স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া, কোনো রাজনৈতিক কৌশল নয়। একই সময়ে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করে বিএনপিকে বিভক্ত ও দুর্বল করার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আনার উদ্যোগ নেন। প্রথমদিকে তিনি স্পষ্টভাবেই অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে তাঁর পারিবারিক পরিসরে, এমনকি মায়ের দিক থেকেও এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রবল আপত্তি ছিল। তবে বিএনপি যখন একাধিক অংশে বিভক্ত হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তখন তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার ফল হিসেবে দেখাই যুক্তিসঙ্গত।
ব্যক্তিগত রুচি ও আচরণে খালেদা জিয়া ছিলেন সংযত। রাজনীতির উত্তপ্ত বাস্তবতায়ও তিনি শালীন ভাষা বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। জাতীয় নেতাদের অবদান তিনি নিয়মিত স্মরণ করতেন। তার বক্তৃতায় সহনশীলতা ও সহাবস্থানের আহ্বান বারবার এসেছে। তিনি ন্যায্যতার প্রশ্নে দৃঢ় থাকলেও, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা জনদাবিকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করেছেন—এমন অভিযোগ সচরাচর শোনা যায় না।
এরশাদ শাসনামলে তিনি একাধিকবার গৃহবন্দী হন এবং রাজনৈতিকভাবে নিপীড়নের শিকার হন। ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি ১৯৮৬ সালের সামরিক নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে অংশ নেননি। এই সিদ্ধান্ত তাকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে জনপরিসরে দৃশ্যমান করে তোলে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বে দ্বিতীয়। এই অর্জন প্রতীকী হলেও, বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এর তাৎপর্য ছিল বাস্তব ও গভীর। নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ যেখানে সীমিত, সেখানে তার নেতৃত্ব একটি মানসিক বাধা ভাঙতে ভূমিকা রাখে। নারীশিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে উপবৃত্তি, ফুড ফর এডুকেশনসহ একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি একদল দক্ষ সহকর্মী ও বিশেষজ্ঞের ওপর নির্ভর করেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে সাইফুর রহমানকে পুনরায় দায়িত্ব দিয়ে তাকে উল্লেখযোগ্য নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা দেন। ভ্যাট ব্যবস্থার প্রবর্তন ও রাজস্ব কাঠামোর সংস্কার তার সরকারের সময় অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করে। কৃষির পাশাপাশি শিল্পখাতের গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা তার অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়।
প্রায়ই বলা হয় যে তিনি গৃহবধূ ছিলেন, তাহলে এত প্রাজ্ঞ হলেন কীভাবে? এই প্রশ্ন আসলে সমাজের এক ধরনের শ্রেণি ও লিঙ্গভিত্তিক ধারণার প্রতিফলন। খালেদা জিয়া নিজেকে গড়ে তুলেছেন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই। দীর্ঘ ৯ বছর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা বুঝতে সহায়তা করে।
দলীয় রাজনীতিতে ভিন্নমতের জায়গা দেওয়ার প্রবণতাও তার ক্ষেত্রে দেখা যায়। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তিনি তাদের রাজনৈতিক পরিসরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একইভাবে মহিউদ্দিন আহমদের মতো সমালোচনামুখর লেখকের ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট—ইতিহাস বা জীবনী লেখার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সন্তুষ্টির চেয়ে সত্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি তাঁর আস্থা ছিল। ১৯ দফা কর্মসূচি তাঁর নীতিগত রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি বড় শক্তির প্রতি অতিনির্ভরশীলতা এড়িয়ে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন—চীন, ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র, সব ক্ষেত্রেই।
খালেদা জিয়ার সরকারের সময় দারিদ্র্য বিমোচন, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। অর্থনীতিবিদ রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের গবেষণা অনুযায়ী, তাঁর দুই মেয়াদে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের জীবনে মৌলিক পরিবর্তন আসে। ২০০৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬ শতাংশ। শেয়ারবাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, যা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা জুগিয়েছিল।
ব্যক্তিগত আচরণে বেগম জিয়া ছিলেন সংযত ও মিতভাষী। অহেতুক আত্মপ্রচার বা প্রতিপক্ষকে আক্রমণের প্রবণতা তার মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম ছিল। অলীক স্বপ্ন না দেখিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। ভিশন ২০৩০ ঘোষণার সময়ও তিনি বাস্তব সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। রাজনীতিতে ‘আমি’ নয়, ‘আমরা’—এই দৃষ্টিভঙ্গি তার বক্তব্যে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে।
নারীজাগরণে তার কর্মসূচিগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০০৫ সালে তিনি বিশ্বে প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় স্থান পান। নির্মম রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েও তিনি প্রতিহিংসার পরিবর্তে সহনশীলতার আহ্বান জানিয়েছেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে এই সংযত অবস্থান তাকে সমসাময়িক রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
খালেদা জিয়া গৃহবধূ ছিলেন, এটি সত্য। জিয়াউর রহমানের দপ্তরে নিয়মিত যেতেন না এটিও সত্য। কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাস কেবল পটভূমি দিয়ে নয়, সিদ্ধান্ত ও আচরণ দিয়ে মানুষকে মূল্যায়ন করে। সেই বিবেচনায় বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘকাল আলোচিত ও স্মরণীয় থাকবেন। এমন সংযত, পরিমিতিবোধসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আবার কবে পাবে—সে প্রশ্ন উন্মুক্তই থেকে যায়।
প্রকৌশলী, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
.png)

একজন নেতার মৃত্যু একটি দলের জন্য শোকের ঘটনা। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক পরীক্ষাও। নেতা চলে যাওয়ার পর দলটি কী করে, সেটিই প্রমাণ করে সেই নেতার উত্তরাধিকার কতটা গভীর ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপিও এমন এক পরীক্ষার সামনে। জন্মদিনে দলটি তাঁকে স্মরণ করবে। শ্রদ্ধা জানাবে।
১০ ঘণ্টা আগে
দেশে গত দুই মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব বলছে, এ সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে। বাজার বাস্তবতা ও সরকারি পরিসংখ্যানের এই ব্যবধান বিবিএসের তথ্যের মান, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে পুরনো বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
১৪ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কৃষি। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কৃষির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকে আমাদের কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। উন্নত জাতের ফসল, সেচ, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন ও প্রযুক্তির ব্যবহার এই সাফল্যের পেছনের মূল কারণ।
১৩ আগস্ট ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতা এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। শুধু সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ নয়, বাংলাদেশ সরকারের প্রধান হিসেবে আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণও পেয়েছেন তিনি।
১২ আগস্ট ২০২৬