আনুশেহ আনাদিল

মানবসভ্যতার প্রতিটি প্রজন্মের সামনে একসময় একটি প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়—আমরা কি শুধু উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পৃথিবীকে গ্রহণ করব, নাকি সাহস করে এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখব, যা আমরা সত্যিই তৈরি করতে চাই?
আমরা হয়তো এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীরা লড়াই করেছেন শুধু দৃশ্যমান হওয়ার জন্য—শিক্ষার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবং নিজের কণ্ঠ প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য। আজ বিশ্বের অসংখ্য নারী বিজ্ঞানী, শিল্পী, উদ্যোক্তা, কৃষক, চিকিৎসক, শিক্ষক, লেখক, চিন্তকও নেতৃত্বের ভূমিকায় কাজ করছেন।
তারা পৃথিবীতে নতুন করে প্রবেশ করছেন না। তারা সবসময়ই পৃথিবীর অংশ ছিলেন। শুধু এখন তাদের কণ্ঠ আরও বেশি শোনা যাচ্ছে।
তবুও পথ এখনো অসম্পূর্ণ। নারীর সমতা শুধু একটি ঘরে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার বিষয় নয়; সেই ঘরে প্রবেশ করার পর তার কথা সত্যিই শোনা হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আজও বিশ্বের বহু নারী শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখোমুখি হন। অনেক নারী পরিবারের যত্ন নেওয়ার বিশাল দায়িত্ব পালন করেন, অথচ সেই শ্রমের মূল্য যথাযথভাবে স্বীকৃতি পায় না।
এগুলো শুধু নারীর সমস্যা নয়। এগুলো মানবতার সমস্যা। কারণ মানবজাতির অর্ধেক যখন তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা প্রকাশ করতে পারে না, তখন পুরো মানবসভ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের একজন নারী হিসেবে আমি আমাদের সমাজের নানা বৈপরীত্য দেখি। আমাদের দেশে দীর্ঘদিন নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করেছেন—এটি প্রমাণ করেছে যে নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারেন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও শিখিয়েছে যে শুধু একজন নারী ক্ষমতার জায়গায় এলেই সমাজের গভীর কাঠামো বদলে যায় না।
প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নেতৃত্বের ধারণাকেই নতুনভাবে ভাবা।
আমরা দীর্ঘদিন নেতৃত্বকে শক্তি, নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছি। কিন্তু আজকের পৃথিবীর প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যা শুনতে পারে, যত্ন নিতে পারে এবং বুঝতে পারে যে ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে আমাদের প্রকৃতি, সম্পর্ক ও মানবিকতার ওপরও।
প্রত্যেক মানুষের প্রথম ঘর হলো একজন নারীর শরীর। প্রতিটি মানুষ—সে নবী হোক, দার্শনিক হোক, রাজা হোক, বিজ্ঞানী হোক বা সাধারণ মানুষ—পৃথিবীতে এসেছে একজন নারীর শরীরের মাধ্যমে।
মাতৃত্ব আমাকে শরীর ও জীবনের অর্থ নতুনভাবে বুঝিয়েছে। নিজের শরীরের ভেতরে আরেকটি জীবন বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা এমন এক বিস্ময়, যার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো সৃষ্টির তুলনা হয় না। একজন মা নয় মাস ধরে শুধু একটি সন্তানকে বহন করেন না; তিনি একটি নতুন পৃথিবীর আশ্রয় হয়ে ওঠেন।
তবুও ইতিহাসজুড়ে নারীর শরীরকে ভালোবাসা যেমন হয়েছে, তেমনি তাকে ভয় করা ও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাও হয়েছে। নারীর শরীরকে অনেক সময় লজ্জা, নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে।
কিন্তু যে শরীরের ঋতুচক্র নতুন জীবনের সম্ভাবনা তৈরি করে, যে শরীর পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের প্রথম আশ্রয়—তার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই। সেখানে আছে সৃষ্টির বিস্ময়।
বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে নারীর শরীর ও ঋতুস্রাবকে বিভিন্নভাবে দেখা হয়েছে। কোথাও তা নিষেধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, কোথাও তা সৃষ্টিশীলতার প্রতীক হিসেবে সম্মান পেয়েছে। আমার কাছে এটি প্রকৃতির এক গভীর রহস্য—একটি চক্র, যা জীবনকে অব্যাহত রাখে।
হিন্দু দর্শনের ‘শক্তি’ ধারণা আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। শক্তি শুধু ক্ষমতা নয়; এটি সৃষ্টি, পরিবর্তন ও জীবনের প্রবাহের প্রতীক। প্রশ্ন হলো—যে সমাজ দেবীশক্তিকে সম্মান করে, সে সমাজ জীবিত নারীদের কতটা সম্মান করে?
বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও আমার মনে হয়, স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী নিজের বিশ্বাস নিজের মতো প্রকাশ করার অধিকার রাখেন। কেউ স্বাধীনভাবে হিজাব পরলে যেমন তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করা উচিত, তেমনি অন্যভাবে নিজের বিশ্বাস প্রকাশ করলেও সেই স্বাধীনতাকে সম্মান করা প্রয়োজন। বিশ্বাস ভালোবাসার মতো—তা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
ধর্ম তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার সঙ্গে থাকে বিনয় ও প্রশ্ন করার সাহস। প্রশ্ন বিশ্বাসকে ধ্বংস করে না; বরং তাকে আরও গভীর করে।
সমতার অর্থ নারী ও পুরুষকে একে অপরের মতো হয়ে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো—প্রত্যেক মানুষ যেন নিজের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে বাঁচতে পারে।
আমরা বহুদিন ধরে কিছু গুণকে পুরুষালি এবং কিছু গুণকে নারীত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছি। শক্তিকে পুরুষের, আর কোমলতাকে নারীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেছি। কিন্তু প্রতিটি মানুষের মধ্যেই শক্তি, মমতা, যুক্তি ও অনুভূতির সম্ভাবনা রয়েছে।
একজন নারী একই সঙ্গে শক্তিশালী ও কোমল হতে পারেন। একজন পুরুষ একই সঙ্গে সাহসী ও আবেগপ্রবণ হতে পারেন। একজন মা নেতৃত্ব দিতে পারেন। একজন বাবা যত্ন নিতে পারেন। মানবতা তখনই পূর্ণ হয়, যখন আমরা নিজেদের এই সব দিককে গ্রহণ করি।
একজন মা হিসেবে আমি আমার মেয়ে ও ছেলেকে দেখে এই সত্য আরও গভীরভাবে বুঝেছি। তারা ভিন্ন, এবং সেই ভিন্নতাই সুন্দর। তাদের একজনের শক্তি অন্যজনের মতো হতে হবে না। প্রত্যেকের নিজস্ব পথ, নিজস্ব প্রতিভা ও নিজস্ব স্বপ্ন আছে।
আমি চাই তারা এমন এক পৃথিবীতে বড় হোক, যেখানে নারী ও পুরুষ একে অপরকে ভয় নয়, কৌতূহল ও সম্মানের চোখে দেখবে।
নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও পারস্পরিক শেখার জায়গা তৈরি হওয়া জরুরি। প্রতিটি সম্পর্ককে সন্দেহ বা রোমান্টিক অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। একজন নারী ও একজন পুরুষ একসঙ্গে গান, শিল্প, প্রকৃতি, দর্শন, ব্যবসা কিংবা স্বপ্ন নিয়ে কথা বলতে পারেন—শুধু মানুষ হিসেবে।
ছেলে ও মেয়েরা যদি ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে শেখে, কাজ করে এবং বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, তবে তারা বড় হয়ে একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযাত্রী হিসেবে দেখতে শিখবে।
আমি প্রায়ই মেঘ ও বৃষ্টির কথা ভাবি। মেঘ আকাশে ঘুরে বেড়িয়ে জল সংগ্রহ করে। বৃষ্টি সেই জল পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেয়, যা থেকে জন্ম নেয় গাছ, ফসল ও জীবন। মেঘ বৃষ্টির চেয়ে বড় নয়, বৃষ্টিও মেঘের চেয়ে বড় নয়। তারা একসঙ্গে জীবন সৃষ্টি করে।
হয়তো নারী ও পুরুষও তেমনই—এক নয়, কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
‘Her Story’ আমার কাছে কোনো পুরুষবিরোধী গল্প নয়। এটি কোনো ধর্ম বা ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে গল্পও নয়। এটি সম্পূর্ণতার গল্প। এটি মনে করিয়ে দেয় যে মানবতা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন আরও বেশি মানুষের কণ্ঠ শোনা যায়।
ভবিষ্যৎ শুধু পুরুষের হাতে তৈরি হবে না। শুধু নারীর হাতেও নয়। ভবিষ্যৎ তৈরি হবে আমাদের সবার হাতে। আমাদের কন্যাদের। আমাদের পুত্রদের। আমাদের মায়েদের-বাবাদের। আমাদের শিক্ষক, শিল্পী, চিন্তক ও স্বপ্নদ্রষ্টাদের হাতে। যারা নিষ্ঠুরতার বদলে মমতা বেছে নেবে। ভয়ের বদলে কৌতূহল বেছে নেবে। বিভেদের বদলে ভালোবাসা বেছে নেবে।
হয়তো একদিন আমাদের আর ইতিহাসকে ‘His Story’ আর ‘Her Story’ হিসেবে ভাগ করতে হবে না।
আমরা শুধু বলব—এটি আমাদের গল্প। একটি গল্প, যা আমরা সবাই মিলে লিখছি। একটি গল্প, যেখানে প্রতিটি কণ্ঠের মূল্য আছে। একটি গল্প, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজের সম্পূর্ণ সত্তা নিয়ে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা পায়।
আর হয়তো সেই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টি অতীতে নয়—সেটি এখনো আমাদের অপেক্ষায় আছে, আমরা কখন তা লিখতে শুরু করব।

মানবসভ্যতার প্রতিটি প্রজন্মের সামনে একসময় একটি প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়—আমরা কি শুধু উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পৃথিবীকে গ্রহণ করব, নাকি সাহস করে এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখব, যা আমরা সত্যিই তৈরি করতে চাই?
আমরা হয়তো এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীরা লড়াই করেছেন শুধু দৃশ্যমান হওয়ার জন্য—শিক্ষার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবং নিজের কণ্ঠ প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য। আজ বিশ্বের অসংখ্য নারী বিজ্ঞানী, শিল্পী, উদ্যোক্তা, কৃষক, চিকিৎসক, শিক্ষক, লেখক, চিন্তকও নেতৃত্বের ভূমিকায় কাজ করছেন।
তারা পৃথিবীতে নতুন করে প্রবেশ করছেন না। তারা সবসময়ই পৃথিবীর অংশ ছিলেন। শুধু এখন তাদের কণ্ঠ আরও বেশি শোনা যাচ্ছে।
তবুও পথ এখনো অসম্পূর্ণ। নারীর সমতা শুধু একটি ঘরে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার বিষয় নয়; সেই ঘরে প্রবেশ করার পর তার কথা সত্যিই শোনা হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আজও বিশ্বের বহু নারী শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখোমুখি হন। অনেক নারী পরিবারের যত্ন নেওয়ার বিশাল দায়িত্ব পালন করেন, অথচ সেই শ্রমের মূল্য যথাযথভাবে স্বীকৃতি পায় না।
এগুলো শুধু নারীর সমস্যা নয়। এগুলো মানবতার সমস্যা। কারণ মানবজাতির অর্ধেক যখন তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা প্রকাশ করতে পারে না, তখন পুরো মানবসভ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের একজন নারী হিসেবে আমি আমাদের সমাজের নানা বৈপরীত্য দেখি। আমাদের দেশে দীর্ঘদিন নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করেছেন—এটি প্রমাণ করেছে যে নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারেন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও শিখিয়েছে যে শুধু একজন নারী ক্ষমতার জায়গায় এলেই সমাজের গভীর কাঠামো বদলে যায় না।
প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নেতৃত্বের ধারণাকেই নতুনভাবে ভাবা।
আমরা দীর্ঘদিন নেতৃত্বকে শক্তি, নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছি। কিন্তু আজকের পৃথিবীর প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যা শুনতে পারে, যত্ন নিতে পারে এবং বুঝতে পারে যে ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে আমাদের প্রকৃতি, সম্পর্ক ও মানবিকতার ওপরও।
প্রত্যেক মানুষের প্রথম ঘর হলো একজন নারীর শরীর। প্রতিটি মানুষ—সে নবী হোক, দার্শনিক হোক, রাজা হোক, বিজ্ঞানী হোক বা সাধারণ মানুষ—পৃথিবীতে এসেছে একজন নারীর শরীরের মাধ্যমে।
মাতৃত্ব আমাকে শরীর ও জীবনের অর্থ নতুনভাবে বুঝিয়েছে। নিজের শরীরের ভেতরে আরেকটি জীবন বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা এমন এক বিস্ময়, যার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো সৃষ্টির তুলনা হয় না। একজন মা নয় মাস ধরে শুধু একটি সন্তানকে বহন করেন না; তিনি একটি নতুন পৃথিবীর আশ্রয় হয়ে ওঠেন।
তবুও ইতিহাসজুড়ে নারীর শরীরকে ভালোবাসা যেমন হয়েছে, তেমনি তাকে ভয় করা ও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাও হয়েছে। নারীর শরীরকে অনেক সময় লজ্জা, নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে।
কিন্তু যে শরীরের ঋতুচক্র নতুন জীবনের সম্ভাবনা তৈরি করে, যে শরীর পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের প্রথম আশ্রয়—তার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই। সেখানে আছে সৃষ্টির বিস্ময়।
বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে নারীর শরীর ও ঋতুস্রাবকে বিভিন্নভাবে দেখা হয়েছে। কোথাও তা নিষেধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, কোথাও তা সৃষ্টিশীলতার প্রতীক হিসেবে সম্মান পেয়েছে। আমার কাছে এটি প্রকৃতির এক গভীর রহস্য—একটি চক্র, যা জীবনকে অব্যাহত রাখে।
হিন্দু দর্শনের ‘শক্তি’ ধারণা আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। শক্তি শুধু ক্ষমতা নয়; এটি সৃষ্টি, পরিবর্তন ও জীবনের প্রবাহের প্রতীক। প্রশ্ন হলো—যে সমাজ দেবীশক্তিকে সম্মান করে, সে সমাজ জীবিত নারীদের কতটা সম্মান করে?
বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও আমার মনে হয়, স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী নিজের বিশ্বাস নিজের মতো প্রকাশ করার অধিকার রাখেন। কেউ স্বাধীনভাবে হিজাব পরলে যেমন তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করা উচিত, তেমনি অন্যভাবে নিজের বিশ্বাস প্রকাশ করলেও সেই স্বাধীনতাকে সম্মান করা প্রয়োজন। বিশ্বাস ভালোবাসার মতো—তা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
ধর্ম তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার সঙ্গে থাকে বিনয় ও প্রশ্ন করার সাহস। প্রশ্ন বিশ্বাসকে ধ্বংস করে না; বরং তাকে আরও গভীর করে।
সমতার অর্থ নারী ও পুরুষকে একে অপরের মতো হয়ে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো—প্রত্যেক মানুষ যেন নিজের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে বাঁচতে পারে।
আমরা বহুদিন ধরে কিছু গুণকে পুরুষালি এবং কিছু গুণকে নারীত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছি। শক্তিকে পুরুষের, আর কোমলতাকে নারীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেছি। কিন্তু প্রতিটি মানুষের মধ্যেই শক্তি, মমতা, যুক্তি ও অনুভূতির সম্ভাবনা রয়েছে।
একজন নারী একই সঙ্গে শক্তিশালী ও কোমল হতে পারেন। একজন পুরুষ একই সঙ্গে সাহসী ও আবেগপ্রবণ হতে পারেন। একজন মা নেতৃত্ব দিতে পারেন। একজন বাবা যত্ন নিতে পারেন। মানবতা তখনই পূর্ণ হয়, যখন আমরা নিজেদের এই সব দিককে গ্রহণ করি।
একজন মা হিসেবে আমি আমার মেয়ে ও ছেলেকে দেখে এই সত্য আরও গভীরভাবে বুঝেছি। তারা ভিন্ন, এবং সেই ভিন্নতাই সুন্দর। তাদের একজনের শক্তি অন্যজনের মতো হতে হবে না। প্রত্যেকের নিজস্ব পথ, নিজস্ব প্রতিভা ও নিজস্ব স্বপ্ন আছে।
আমি চাই তারা এমন এক পৃথিবীতে বড় হোক, যেখানে নারী ও পুরুষ একে অপরকে ভয় নয়, কৌতূহল ও সম্মানের চোখে দেখবে।
নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও পারস্পরিক শেখার জায়গা তৈরি হওয়া জরুরি। প্রতিটি সম্পর্ককে সন্দেহ বা রোমান্টিক অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। একজন নারী ও একজন পুরুষ একসঙ্গে গান, শিল্প, প্রকৃতি, দর্শন, ব্যবসা কিংবা স্বপ্ন নিয়ে কথা বলতে পারেন—শুধু মানুষ হিসেবে।
ছেলে ও মেয়েরা যদি ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে শেখে, কাজ করে এবং বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, তবে তারা বড় হয়ে একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযাত্রী হিসেবে দেখতে শিখবে।
আমি প্রায়ই মেঘ ও বৃষ্টির কথা ভাবি। মেঘ আকাশে ঘুরে বেড়িয়ে জল সংগ্রহ করে। বৃষ্টি সেই জল পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেয়, যা থেকে জন্ম নেয় গাছ, ফসল ও জীবন। মেঘ বৃষ্টির চেয়ে বড় নয়, বৃষ্টিও মেঘের চেয়ে বড় নয়। তারা একসঙ্গে জীবন সৃষ্টি করে।
হয়তো নারী ও পুরুষও তেমনই—এক নয়, কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
‘Her Story’ আমার কাছে কোনো পুরুষবিরোধী গল্প নয়। এটি কোনো ধর্ম বা ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে গল্পও নয়। এটি সম্পূর্ণতার গল্প। এটি মনে করিয়ে দেয় যে মানবতা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন আরও বেশি মানুষের কণ্ঠ শোনা যায়।
ভবিষ্যৎ শুধু পুরুষের হাতে তৈরি হবে না। শুধু নারীর হাতেও নয়। ভবিষ্যৎ তৈরি হবে আমাদের সবার হাতে। আমাদের কন্যাদের। আমাদের পুত্রদের। আমাদের মায়েদের-বাবাদের। আমাদের শিক্ষক, শিল্পী, চিন্তক ও স্বপ্নদ্রষ্টাদের হাতে। যারা নিষ্ঠুরতার বদলে মমতা বেছে নেবে। ভয়ের বদলে কৌতূহল বেছে নেবে। বিভেদের বদলে ভালোবাসা বেছে নেবে।
হয়তো একদিন আমাদের আর ইতিহাসকে ‘His Story’ আর ‘Her Story’ হিসেবে ভাগ করতে হবে না।
আমরা শুধু বলব—এটি আমাদের গল্প। একটি গল্প, যা আমরা সবাই মিলে লিখছি। একটি গল্প, যেখানে প্রতিটি কণ্ঠের মূল্য আছে। একটি গল্প, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজের সম্পূর্ণ সত্তা নিয়ে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা পায়।
আর হয়তো সেই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টি অতীতে নয়—সেটি এখনো আমাদের অপেক্ষায় আছে, আমরা কখন তা লিখতে শুরু করব।
.png)

সিডর, আইলা বা আম্ফানের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে ঢাল হিসেবে কাজ করেছে আমাদের ম্যানগ্রোভ বন (সুন্দরবন)। এটি উপকূলের হাজারো জীবন ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করেছে। অথচ, আমাদের রক্ষাকর্তা এই বন আজ মানবসৃষ্ট কারণে চরম হুমকির মুখে।
২ ঘণ্টা আগে
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। অনেকের মনে প্রশ্ন-বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি কীভাবে নির্বাচিত হন? রাষ্ট্রপতি হতে কী যোগ্যতা প্রয়োজন? নির্বাচন কি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে, নাকি সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে হয়? সংসদ সদস্যরা কি গোপন নাকি প্রকাশ্য ভোট দেন?
৫ ঘণ্টা আগে
দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী। এখানে বড় শঙ্কার জন্ম দেয়। প্রতিযোগিতামূলক এলপিজি বাজারেই যেখানে সরকার দাম নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম, সেখানে বিদ্যুতের মতো একচেটিয়া বাজারে নিয়ন্ত্রণ কীভাবে সম্ভব?
৬ ঘণ্টা আগে
একটি বেফাঁস মন্তব্য। তারপর কয়েকটা মিম। এরপর ইনস্টাগ্রাম পেজ। দেখতে দেখতে সেই পেজই হয়ে গেল রাজপথের আন্দোলন। আড়াই মাস বয়স হওয়ার আগেই ভারতের রাজধানী কাঁপিয়ে দিল ককরোচ জনতা পার্টি—সিজেপি। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় গত ১৬ মে এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্য
২০ ঘণ্টা আগে