‘মহামান্য’ থেকে ‘মাননীয়’, সম্বোধনের ভাষা, রাষ্ট্রাচার ও ক্ষমতার সম্পর্ক

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮: ২৮
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশ-উত্তর প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিদের জন্য বিভিন্ন সম্মানসূচক সম্বোধন রীতির প্রচলন গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির জন্য ‘মহামান্য’ এবং প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক পদধারীর জন্য ‘মাননীয়’ ব্যবহারের একটি দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক রীতি বিকশিত হয়। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, সরকারি চিঠিপত্র, আমন্ত্রণপত্র, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন কিংবা বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে এসব সম্মানসূচক শব্দের ব্যবহার এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল যে অনেকের কাছে এগুলো যেন সংশ্লিষ্ট পদগুলোর অবিচ্ছেদ্য সাংবিধানিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদের সাংবিধানিক মর্যাদা এক বিষয়, রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল বা অগ্রাধিকার আরেক বিষয়, আর কোনো পদধারীকে কীভাবে সম্বোধন করা হবে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়। এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা নতুন পরিপত্রের পর। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্রে দাপ্তরিক যোগাযোগ, নথিপত্র ও সারসংক্ষেপে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর নাম বা পদের আগে প্রচলিত সম্মানসূচক ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নতুন মানদণ্ড নির্ধারিত হয়েছে।


রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক মর্যাদা

বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির ওপর তাঁর অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক মর্যাদার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদের পদক্রম ও মর্যাদা ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স দ্বারা স্বীকৃত। কিন্তু এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে সংবিধান কিংবা ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স ‘মহামান্য’ বা ‘মাননীয়’ বলে সম্বোধন করতে হবে এমন কোনো নির্দেশ দেয়নি। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদের পদমর্যাদা এবং তাঁদের সম্বোধনের সম্মানসূচক শব্দ এক বিষয় নয়। ‘প্রিসিডেন্স’ বলতে মূলত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও প্রটোকলে কোনো পদ বা ব্যক্তির অবস্থান, অগ্রাধিকার ও আনুষ্ঠানিক মর্যাদাকে বোঝায়। অন্যদিকে ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’, ‘মহোদয়’ ইত্যাদি হলো সম্বোধনের অংশ।

‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ ও ‘স্যার’ সম্বোধন কোথা থেকে এল

রাষ্ট্রীয় পদধারীদের বিশেষ সম্মানসূচক শব্দে সম্বোধনের পেছনে ইতিহাস, রাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য, ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং পরবর্তী রাষ্ট্রীয় প্রোটোকলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ব্রিটিশ সাংবিধানিক ব্যবস্থায় সম্রাট বা সম্রাজ্ঞীকে ‘His Majesty’ বা ‘Her Majesty’ বলা হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে পদবির পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক প্রেক্ষাপটে ‘The Right Honorable’ ব্যবহারের নজির রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতিকে সরাসরি সম্বোধনের ক্ষেত্রে ‘Mr. President’ প্রচলিত। কিন্তু রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক পদমর্যাদা তাঁদের সম্মানসূচক উপাধির উপর নির্ভরশীল নয়।

এই উপমহাদেশে পদাধিকারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও সম্মানীয় ব্যক্তিকে সম্বোধনের ক্ষেত্রে প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন সম্মানসূচক শব্দ ও উপাধির ব্যবহার প্রচলিত রয়েছে। ‘শ্রী’ তার একটি প্রাচীন উদাহরণ; অন্যদিকে ‘জনাব’ ফারসি-আরবি ভাষাগত ঐতিহ্য থেকে উপমহাদেশের প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যবহারে প্রতিষ্ঠিত একটি সম্মানসূচক সম্বোধন।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং নিজস্ব রাষ্ট্রীয় রীতির প্রভাবে বিভিন্ন সম্মানসূচক সম্বোধন গড়ে উঠেছে। ফলে ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’, ‘Honorable’, ‘Excellency’ ইত্যাদি শব্দকে একটি দেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থার অপরিবর্তনীয় অংশ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এগুলো মূলত রাষ্ট্রীয় ভাষা, প্রোটোকল ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির অংশ। এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। বাংলা ‘মহামান্য’ শব্দকে ইংরেজি ‘Excellency’-এর সরাসরি ও সর্বক্ষেত্রে সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করা যথাযথ নয়। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক রীতিতে এসব শব্দের ব্যবহার ও তাৎপর্য ভিন্ন। তাই এগুলোকে অনুবাদের সরল সমতুল্য হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের প্রচলিত বা আনুষ্ঠানিক সম্বোধন রীতি হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত।

সম্বোধন: শুধু সৌজন্য নয়, ক্ষমতার ভাষা

রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক পরিসরে কে কাকে কী নামে সম্বোধন করছে—তা নিছক ভাষাগত সৌজন্য নয়। সম্বোধনের মধ্য দিয়ে অনেক সময় ক্ষমতার দূরত্ব, সামাজিক মর্যাদা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পদসোপান প্রকাশ পায়। ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ কিংবা ‘মহোদয়’ ও ‘স্যার’—এসব শব্দের প্রত্যেকটির সামাজিক ও রাজনৈতিক অর্থ এক নয়। বিশেষ করে ‘স্যার’ সংস্কৃতি একটি vertical relationship বা ওপর-নিচের সম্পর্ককে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে।

এই উপমহাদেশে পদাধিকারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও সম্মানীয় ব্যক্তিকে সম্বোধনের ক্ষেত্রে প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন সম্মানসূচক শব্দ ও উপাধির ব্যবহার প্রচলিত রয়েছে। ‘শ্রী’ তার একটি প্রাচীন উদাহরণ; অন্যদিকে ‘জনাব’ ফারসি-আরবি ভাষাগত ঐতিহ্য থেকে উপমহাদেশের প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যবহারে প্রতিষ্ঠিত একটি সম্মানসূচক সম্বোধন।

তবে এখানকার আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে পদমর্যাদা, আনুষ্ঠানিকতা, সামাজিক দূরত্ব এবং ঊর্ধ্বতন-অধস্তন সম্পর্কের যে বিশেষ ধরনের প্রকাশ দেখা যায়, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকার হিসেবে দেখা হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় প্রশাসনিক পদমর্যাদা, প্রটোকল, আনুষ্ঠানিক সম্বোধন এবং কর্তৃত্বের দৃশ্যমান প্রকাশকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে উপমহাদেশের উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও আমলাতন্ত্রে এসব আচরণগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্যের অনেকাংশই বিভিন্ন রূপে টিকে থাকে।

ঔপনিবেশিক শাসনে প্রশাসক ছিলেন মূলত শাসনকারী কর্তৃপক্ষ, আর সাধারণ মানুষ ছিল প্রশাসনের অধীনস্থ প্রজা। ফলে প্রশাসনিক ভাষা ও আচরণে কর্তৃত্বের দূরত্ব প্রকাশের প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। স্বাধীন রাষ্ট্রে সকলেই নাগরিক। কেউ ‘প্রজা’ নয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির সব ভাষা ও আচরণ যে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলেছে, তা বলা যায় না। যে কারণে আমরা প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে ‘স্যার’ শব্দের প্রবল উপস্থিতি দেখতে পাই। এই ‘স্যার’ শব্দের মধ্য দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষমতা ও মর্যাদার সামাজিক প্রকাশ ঘটে। একজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ বলা তাঁর সাংবিধানিক বা আইনগত ক্ষমতার উৎস নয়। কিন্তু ক্রমাগত এমন সম্বোধন ব্যবহারের মাধ্যমে তাঁর কর্তৃত্ব, মর্যাদা এবং ক্ষেত্র বিশেষে সামাজিক দূরত্বের প্রকাশ ঘটায়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো- রাষ্ট্র কি তার উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের মর্যাদা রক্ষার জন্য নাগরিকের কাছ থেকে বিশেষ ধরনের সম্বোধন প্রত্যাশা করবে? নাকি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভাষা হবে অধিকতর প্রাতিষ্ঠানিক ও সমতাভিত্তিক?

সম্বোধন রীতির পরিবর্তন কি ক্ষমতা বা মর্যাদার পরিবর্তন ঘটায়?

রাষ্ট্রীয় সম্বোধন ও আনুষ্ঠানিকতার বিষয়টি বুঝতে ব্রিটিশ সাংবিধানিক চিন্তাবিদ ওয়াল্টার বেজট -এর বিখ্যাত বিশ্লেষণটি প্রাসঙ্গিক। তাঁর The English Constitution গ্রন্থে তিনি সংবিধানের ‘dignified’ এবং ‘efficient’ অংশের মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন। বেজট-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাংবিধানিক ব্যবস্থার কিছু প্রতিষ্ঠান ও আচার মানুষের আবেগ, আনুগত্য ও শ্রদ্ধাবোধকে ধারণ করে। এগুলো রাষ্ট্রের ‘dignified’ অংশ। অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ‘efficient’ অংশ। রাষ্ট্রীয় সম্বোধন, আনুষ্ঠানিক পোশাক, শোভাযাত্রা, অভ্যর্থনা ও বিভিন্ন প্রটোকল অনেকাংশে রাষ্ট্রের সেই ‘dignified’ বা আনুষ্ঠানিক দিকের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু এসব আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তন হলেই রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো বা ক্ষমতার সম্পর্ক পরিবর্তিত হয় না। এ কারণেই কোনো রাষ্ট্রপতিকে ‘মহামান্য’ বলা হলো কি না, অথবা কোনো প্রধানমন্ত্রীকে ‘মাননীয়’ বলা হলো কি না—তা দিয়ে তাঁদের সাংবিধানিক ক্ষমতা বা মর্যাদা নির্ধারিত হয় না।

বাংলাদেশেও রাষ্ট্রপতিকে ‘মহামান্য’, প্রধানমন্ত্রীকে ‘মাননীয়’ এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও পদাধিকারীকে ‘মহোদয়’ হিসেবে সম্বোধন করা সরকারি ও সামাজিক পরিসরে দীর্ঘদিনের পরিচিত রীতি। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, সরকারি চিঠিপত্র, আমন্ত্রণপত্র, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন কিংবা বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে এসব সম্মানসূচক শব্দের ব্যবহার এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে অনেকের কাছে এগুলো সংশ্লিষ্ট পদগুলোর আনুষ্ঠানিক মর্যাদা ও প্রোটোকলের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে প্রতীয়মান হয়। যদিও এসব সম্বোধন মূলত দাপ্তরিক রীতি, প্রোটোকল ও সামাজিক-প্রশাসনিক সংস্কৃতির অংশ; এগুলো সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক পদগুলোর সাংবিধানিক ক্ষমতা বা মর্যাদার উৎস নয়।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সাম্প্রতিক নির্দেশনাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। নির্দেশনা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের সঙ্গে দাপ্তরিক যোগাযোগ, নথিপত্র ও সারসংক্ষেপ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তাঁদের পদবির আগে ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ কিংবা অন্য কোনো সম্মানসূচক শব্দ লিখিতভাবে ব্যবহার না করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়েছে। এটি সাংবিধানিক মর্যাদার পরিবর্তন নয়; এটি কেবল সরকারি ও দাপ্তরিক ভাষার পরিবর্তন। রাষ্ট্রপতি আগের মতোই সংবিধানের অধীনে রাষ্ট্রপ্রধান এবং রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির ওপর অগ্রাধিকার বহন করেন। সম্বোধনের শব্দ পরিবর্তনের কারণে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, দায়িত্ব বা সাংবিধানিক অবস্থান পরিবর্তিত হয় না। অর্থাৎ, ‘মহামান্য’ বাদ পড়লে রাষ্ট্রপতির মর্যাদা কমে যায় না; একইভাবে ‘মাননীয়’ বাদ পড়লে প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদাও কমে যায় না।

প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রীদেরকে কীভাবে সম্বোধন করা হবে?

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা ও দাপ্তরিক সম্বোধনরীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রীদেরকে কীভাবে সম্বোধন করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে প্রেক্ষাপটের ওপর। ব্যক্তিগত বা সামাজিক কথোপকথনে প্রচলিত সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার একটি বিষয়। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক ভাষা আরেক বিষয়। আর সরকারি চিঠি, নথি, সারসংক্ষেপ ও দাপ্তরিক যোগাযোগে সরকারের নির্ধারিত সম্বোধন রীতি অনুসরণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা পরিপত্রকে শুধু ‘দুটি সম্মানসূচক শব্দ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখলে এর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনালোচিত থেকে যায়। প্রথমত, এটি সরকারি ভাষায় ব্যক্তির পরিবর্তে পদ ও প্রতিষ্ঠানকে সামনে আনার একটি উদ্যোগ। ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি’ বা ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ বললে ব্যক্তির প্রতি আনুষ্ঠানিক সম্মানের দিকটি বেশি দৃশ্যমান হয় এবং বিপরীতে শুধু ‘রাষ্ট্রপতি’ বা ‘প্রধানমন্ত্রী’ বললে সাংবিধানিক পদটি বেশি স্পষ্টভাবে সামনে আসে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মর্যাদা থেকে আসে না; তা আসে সাংবিধানিক পদ ও প্রতিষ্ঠান থেকে। সম্মানসূচক শব্দের ব্যবহারকে বাধ্যতামূলক দাপ্তরিক রীতি থেকে সরিয়ে পদবাচক পরিচয়কে সামনে আনা সেই ধারণাটিকে প্রতীকীভাবে শক্তিশালী করতে পারে। তৃতীয়ত, এটি সরকারি নথিতে ভাষাগত অভিন্নতা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করে। বিভিন্ন দপ্তর, মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের দাপ্তরিক ভাষা ব্যবহারের ফলে প্রশাসনিক যোগাযোগ আরও সংক্ষিপ্ত ও অভিন্ন হতে পারে।

জাতীয় সংসদের স্পিকারকে কীভাবে সম্বোধন করা হবে?

সরকারি দাপ্তরিক যোগাযোগ, নথিপত্র ও সারসংক্ষেপে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের সম্বোধনের ক্ষেত্রে প্রচলিত সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, জাতীয় সংসদের স্পিকারকে সম্বোধনের ক্ষেত্রেও কি একই পরিবর্তন প্রযোজ্য হবে? সরকারি দাপ্তরিক যোগাযোগের রীতি এবং সংসদের অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালির রীতি এক বিষয় নয়। সংসদ অধিবেশনে স্পিকারকে কীভাবে সম্বোধন করা হবে, তা সংসদীয় চর্চার সঙ্গে সম্পর্কিত। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে স্পিকারকে ‘মাননীয়’ বলে সম্বোধনের কোনো বিধান নেই, এটি সংসদীয় ঐতিহ্য দ্বারা নির্ধারিত। অতএব, স্পিকারের সম্বোধনরীতিতে পরিবর্তন আনতে হলে সংসদের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে হবে।


সম্বোধন রীতির পরিবর্তন মানেই মর্যাদা পরিবর্তন নয়

সরকারি দাপ্তরিক ভাষা, সম্বোধন ও প্রটোকলের মধ্যে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামো এবং পদমর্যাদার ধারণা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কে কাকে কীভাবে সম্বোধন করবে, কোন পদকে কী ধরনের সম্মানসূচক শব্দে অভিহিত করা হবে এবং সরকারি নথিতে কোন ভাষা ব্যবহার করা হবে-এসব আপাতদৃষ্টিতে ভাষাগত বিষয় হলেও এর সঙ্গে রাষ্ট্রের পদাধিকারীদের কর্তৃত্ব, প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক সম্পর্কের গভীর যোগ রয়েছে। তাই সম্মানসূচক শব্দের পরিবর্তনকে তুচ্ছ ভাষাগত সংশোধন হিসেবেও দেখা ঠিক হবে না, আবার একে সাংবিধানিক সংস্কার হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই।

সরকারী দাপ্তরিক ভাষায় সম্মানসূচক শব্দের ব্যবহার অনেক সময় ক্ষমতা ও মর্যাদার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে শব্দ পরিবর্তনকে মানুষ মর্যাদা কমে যাওয়ার সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করে। কিন্তু আধুনিক প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দাপ্তরিক ভাষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো স্পষ্টতা, অভিন্নতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। বর্তমান সরকার রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের সঙ্গে দাপ্তরিক যোগাযোগ, নথিপত্র ও সারসংক্ষেপ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তাঁদের পদবির আগে সম্মানসূচক শব্দ হিসেবে যথাক্রমে ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ শব্দ লিখিতরূপে ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক রীতি পরিবর্তনের একটি নজির তৈরি করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ছোট ভাষাগত পরিবর্তন হলেও বৃহত্তর প্রশাসনিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের গভীর যোগ রয়েছে।

ড. কে এম মহিউদ্দিন: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত