মায়ের শাড়ি থেকে জেন-জির রেট্রো লুক, পুরোনো ফ্যাশন কেন ফিরে আসে
একসময় সেকেলে মনে হওয়া স্টাইল কেন আবার ফিরে আসে? ফ্যাশন কি তাহলে সত্যিই ২০ বছর পরপর ঘুরে আসে? স্মৃতিকাতরতা, পপ কালচার আর সোশ্যাল মিডিয়ারও ভূমিকা কীভাবে এখানে প্রভাব ফেলে? পুরোনো ফ্যাশন কেন বারবার নতুন হয়ে ওঠে, সেই গল্পই এই লেখায়।
-7be686-480x270.webp)
মায়ের শাড়ির প্রতি মেয়েদের ভালবাসা আজীবনের। প্রতিটা শাড়ির পেছনে গল্পগুলোও আলাদা। কোনোটা হয়তো বাবার দেওয়া প্রথম উপহার, কোনোটা নানীর দেওয়া প্রথম শাড়ি আবার কোনো শাড়ি হয়ত দাদীর থেকে পাওয়া। তাই তো দীর্ঘ সময় পেরিয়ে মায়ের শাড়িতে যখন মেয়েকে দেখি, তাঁকে আর ‘সেকেলে’ মনে হয় না। সে হয়ে ওঠে আলাদা, অন্যরকম।
কারণ ফ্যাশন কখনো হারায় না, সময়ের সঙ্গে নতুন রূপে ফিরে আসে।
নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, পোশাকের ট্রেন্ড সাধারণত প্রতি ২০ বছর পর ঘুরে আসে। ফ্যাশন নিয়ে প্রচলিত এই ধারণার পেছনে গাণিতিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। এ জন্য গবেষকেরা ১৮৬৯ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত নারীদের পোশাকের ৩৭ হাজারের বেশি ছবি বিশ্লেষণ করেছেন।
এই গবেষণায় দেখা গেছে, ফ্যাশনের নির্দিষ্ট চক্র রয়েছে। কোনো স্টাইল প্রথমে দারুণ জনপ্রিয় হয়। পরে সেটি অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মানুষ বিরক্ত হয় এবং ধীরে ধীরে সেই ট্রেন্ড হারিয়ে যায়। কিন্তু কোনো ফ্যাশন চলে যাওয়ার দুই দশক পর যখন নতুন প্রজন্ম সেই স্টাইল প্রথমবার দেখে, তখন তাদের কাছে আবার এটা আকর্ষণীয় মনে হয়।
দেশীয় পোশাকে যেসব পরিবর্তন এসেছে
আমাদের দেশীয় পোশাকেও এই পরিবর্তনের হাওয়া স্পষ্ট। ১৯৬০-৭০ সালের সিনেমাগুলোতে শর্ট কামিজের প্রচলন ছিল। সেই শর্ট কামিজের চল আবার ফিরে এসেছিল ২০০০ সালের শুরুর দিকে। ২০০৪-০৫ সালের পর থেকে কামিজের দৈর্ঘ্য আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। এরপর আসে সেমি লং এবং ২০১২-১৫ সালের দিকে গাউন ধাঁচের লং কামিজের চল বাড়ে। এখন আবার লং কামিজের চাহিদা কমে মাঝারি ঝুলের কামিজ চলছে। বর্তমান সময়ে আবারও শর্ট কামিজের প্রচলন দেখা যাচ্ছে।
ছেলেদের পোশাকের ক্ষেত্রেও ফিটিংয়ের নানা পরিবর্তন এসেছে। স্কিন ফিটিং, স্লিম ফিটিং পেরিয়ে এখন রেগুলার ফিট চলছে। পাঞ্জাবির ক্ষেত্রে একসময় শর্ট পাঞ্জাবি চললেও এখন লং পাঞ্জাবি জনপ্রিয়। গত ২০ বছরে গলার ডিজাইন, হাতার কাটিং ও প্যাটার্নে অনেক বদল এসেছে। গত তিন-চার বছর ধরে বোট নেক গলা খুব চলছে। অথচ একসময় স্কয়ার বা রাউন্ড শেপের গলা জনপ্রিয় ছিল।
মেয়েদের হাতার ক্ষেত্রেও শর্ট হাতা পেরিয়ে এখন হাফ বা ফুল স্লিভ পছন্দের তালিকায় রয়েছে। গত কয়েক বছরে থ্রি-পিসের চেয়ে সিঙ্গেল কামিজ, ওয়ান পিস ও কুর্তির চাহিদা অনেক বেড়েছে যেগুলোতে ট্র্যাডিশনাল ও ফিউশন ডিজাইনের মিশ্রণ দেখা যায়। জেনজিদের কাছে এখন ওভারসাইজড ফ্যাশনও বেশ জনপ্রিয়। ১৯৮০-৯০ এর দশকে এমন ঢিলেঢালা শার্ট, টি-শার্ট বা প্যান্টের চল ছিল।
পোশাক কেন স্মৃতিকাতর করে
রেট্রো বা পুরোনো ধাঁচের স্টাইল জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ মানুষের অতীতের প্রতি স্মৃতিকাতরতা। পুরোনো দিনের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, আগের দিনগুলোই ভালো ছিল। ফেলে আসা অতীতকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। কিন্তু পোশাকের ডিজাইন তো ফিরিয়ে আনাই যায়। বাবার পোশাক ছেলে পরছেন কিংবা মায়ের পোশাক মেয়ে। ছেলেমেয়ের গায়ে নিজেদের পোশাকে যেন তাদের অতীতকেই খুঁজে পান বাবা-মায়েরা।

আশি বা নব্বই দশকের জামা, সোয়েটার কিংবা পুরোনো আসবাবের ডিজাইন আমাদের স্মৃতিকাতর করে। এ ছাড়া তরুণ প্রজন্মের যারা এই ফেলে আসা দিন দেখেনি, তাদের কাছে এই রেট্রো স্টাইল অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ তৈরি করে।
বিভিন্ন ডিজাইনার আর পোশাকের ব্র্যান্ড প্রায়ই আগের দশক থেকে ধারণা নিয়ে তার মধ্যে ছোটখাটো পরিবর্তন এনে আধুনিক রূপ দিয়ে থাকেন। যেমন নব্বই দশকের ঢিলেঢালা ডেনিম জ্যাকেট, মোটা সোলের স্নিকার্স, ক্রপ টপ বা ফ্লানেল শার্টের জনপ্রিয়তা এর প্রমাণ। এগুলো আধুনিক পোশাকের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে যায়।
রেট্রো স্টাইলে পরিবেশ সচেতনতা?
সারা বিশ্বেই রেস্ট্রো স্টাইল ফিরে আসার আরেকটি কারণ হলো পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা। পোশাক তৈরিতে প্রচুর পানি ও জ্বালানির প্রয়োজন হয়। অথচ এসব পোশাকের অনেকগুলোই অল্প সময়ের মধ্যেই বর্জ্যে পরিণত হয়।
ওয়ার্ল্ডওয়াইড রেসপনসিবল অ্যাক্রিডিটেড প্রোডাকশন-এর ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর শুধু যুক্তরাজ্যেই প্রায় ১৪০ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ১ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা) মূল্যের পোশাক ফেলে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে শুধু জার্মানীতেই ১১ লাখ টন কাপড় নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে ৭৩ শতাংশই ছিল প্রি-কনজিউমার বর্জ্য। অর্থাৎ, এসব পোশাক মানুষের হাতে পৌঁছানোর আগেই বা ব্যবহার হওয়ার আগেই বর্জ্যে পরিণত হয়েছে।
তবে এখন বিশ্বব্যাপী বেশ কিছু ব্র্যান্ড রয়েছে, যারা টেকসই-পরিবেশবান্ধব ফ্যাশন নিয়ে কাজ করছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল ‘ফাস্ট ফ্যাশন’ পরিবেশের যে ক্ষতি করছে, তা নিয়ে সচেতন ভোক্তারাও এখন চিন্তিত। তাই তারা সেকেন্ড-হ্যান্ড জিনিস, থ্রিফট স্টোর বা ভিন্টেজ বুটিকের দিকে ঝুঁকছে। শুধু পোশাক নয়, এর পাশাপাশি রেট্রো আসবাব, রেকর্ড প্লেয়ার বা পুরোনো রেডিওর মতো অতীতের ফেলে সামগ্রীর প্রতি চাহিদা দেখা যাচ্ছে।
পপ কালচার, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব
রেট্রো স্টাইলের এই পুনরুত্থানের পেছনে সোশ্যাল মিডিয়ার অবদানও কম নয়। ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও ইউটিউবের কারণে যেকোনো পুরোনো স্টাইল প্রায়ই ভাইরাল হয়ে যায়। ফ্যাশন ইনফ্লুয়েন্সাররা আধুনিকতার সঙ্গে ভিন্টেজ লুকের মিশ্রণ ঘটিয়ে ফ্যাশনে পরির্তন এনেছেন।
এ ছাড়া রেট্রো ফ্যাশন জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে তারকাদেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী জেনদেয়া, গায়িকা রিয়ানা বা গায়ক হ্যারি স্টাইলসকে প্রায়ই পুরোনো ধাঁচের পোশাকে দেখা যায়। শুধু তারকারাই নন, বড় বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও ডিজাইনাররাও পুরোনো স্টাইলকে আধুনিক রূপে ফিরিয়ে আনছেন।
পুরোনো নকশার সঙ্গে নতুন কাট, কাপড় ও ডিজাইনের মিশেলে তৈরি হচ্ছে নতুন কালেকশন। ফলে রেট্রো ফ্যাশন আরও জনপ্রিয় হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের কাছেও সহজে পৌঁছে যাচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সেকেন্ডহ্যান্ড পোশাক কেনাকাটার ‘থ্রিফট হল’ কিংবা পুরোনো পোশাক কেটে নতুন রূপ দেওয়ার ‘থ্রিফট ফ্লিপ’ ভিডিও এখন ভীষণ জনপ্রিয়।
পাশাপাশি, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে পুরোনো আমলের পটভূমিতে তৈরি আশির দশকের ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’ বা ষাট-সত্তরের দশকের ‘দ্য ক্রাউন’ সিরিজ মানুষের মনে পুরোনো দিনের প্রতি আগ্রহ জাগিয়েছে। চরিত্রদের ভিন্টেজ পোশাকে দেখে দর্শকেরাও সেই রেট্রো লুক লুফে নিচ্ছে।
পুরোনো পোশাকের নতুন ব্যবহার মানুষের ব্যক্তিত্ব প্রকাশের দারুণ মাধ্যম। যারা প্রচলিত ফ্যাশনের বাইরে গিয়ে একটু ভিন্ন কিছু করতে চান, রেট্রো স্টাইল তাদের সেই সুযোগ করে দিচ্ছে।
.png)





-028855.jpeg)



