লেখা:

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দুই দশকের বেশি সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে ছুটছেন। ওয়াশিংটন থেকে জাতিসংঘের মঞ্চে তিনি বিষয়টি নাটকীয়ভাবে তুলে ধরেছেন। অবশেষে সেই মুহূর্ত এসে গেছে অর্থাৎ নেতানিয়াহু যে যুদ্ধকে অনিবার্য বলতেন তা এখন শুরু হয়েছে। এই যুদ্ধে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল একা নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সামরিক শক্তি পাশে আছে।
এই হামলা কোনো সীমিত আক্রমণ বা শক্তি প্রদর্শনের কৌশল নয়। আমেরিকার প্রয়োজন কিংবা আসন্ন হুমকির কারণে এই যুদ্ধ শুরু হয়নি। এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য একটাই, মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে সাজানোর ইসরায়েলি স্বপ্ন। বছরের পর বছর ধরে নেতানিয়াহু ও তাঁর সঙ্গীরা মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে গড়ার কথা বলেছেন।
‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ বা গ্রেটার ইসরায়েলের ধারণা এখন মূলধারার রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ‘শিয়া চরমপন্থা’ ও ‘সুন্নি চরমপন্থা’ মোকাবিলার কথা বলছেন। আমেরিকানরাও তাঁদের সঙ্গে সুর মেলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি পাশে পেয়ে নেতানিয়াহু বিশ্বাস করছেন ইতিহাসকে জোর করে নিজের পথে চালানো সম্ভব।
আমাদের বলা হচ্ছে এই যুদ্ধ মিসাইল ও পরমাণু বোমা এবং আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য। মার্কিন যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মুখস্থ বুলি আউড়ে যাচ্ছেন। তাঁরা বলছেন ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের দ্বারপ্রান্তে। ইরান হুমকি, তাদের থামাতেই হবে। আমরা এই কথা আগেও শুনেছি। সাদ্দাম হোসেনের ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ নিয়ে জর্জ ডব্লিউ বুশ ও টনি ব্লেয়ার একই কথা বলেছিলেন। আমরা দেখেছি ইরাক কীভাবে ধ্বংস ও বিভক্ত হয়েছে। পরে জানা গেছে যুদ্ধের মূল কারণই ছিল বানোয়াট। সেই মিথ্যার মূল্য চুকাতে হয়েছে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ও আঞ্চলিক অরাজকতা দিয়ে।
এখন সেই পুরোনো চিত্রনাট্য আবার ধুয়েমুছে নতুন করে মঞ্চস্থ করা হচ্ছে। ওমান ও জেনেভায় আলোচনায় ইরান নমনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছিল। তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমাতে এবং নজরদারি মেনে নিতে রাজি ছিল। কিন্তু আলোচনা পরিণত হলো ইসরায়েলের আকাঙ্ক্ষার ওপরেই। কূটনীতিকরা যখন আপসের কথা বলছিলেন তখন ভারত মহাসাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলে রণতরীগুলো নিঃশব্দে অবস্থান নিচ্ছিল। সংলাপের আড়ালে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল। সেই পরিচিত কৌশল—মুখে শান্তির কথা আর তলে তলে যুদ্ধের আয়োজন।
এরপর এল আঘাত। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হলেন। রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা হলো। সার্বভৌম ভূখণ্ডে বোমা ফেলা হলো। তবুও পশ্চিমা বয়ানে ইরানকেই আক্রমণকারী হিসেবে দেখানো হচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েল নিজেকে অজেয় সামরিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। তারা দাবি করে প্রথাগত যুদ্ধে আরব বাহিনীকে বারবার হারিয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের দলিল ভিন্ন কথা বলে।
১৯৪৮ সালে তথাকথিত আরব জোট মোটেও ঐক্যবদ্ধ ছিল না। অধিকাংশ আরব দেশ তখনো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ফিলিস্তিন শাসন করত। তারাই ট্রান্সজর্ডানের আরব লিজিওনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল ও অস্ত্র দিয়েছিল। এমনকি ব্রিটিশ অফিসার গ্লাব পাশা এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সবচেয়ে দক্ষ আরব বাহিনীই স্বাধীন বা ঐক্যবদ্ধ আরব কমান্ডের অধীনে ছিল না।
জর্ডানের রাজা আবদুল্লাহ পুরো ফিলিস্তিন রক্ষার চেয়ে পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় বেশি আগ্রহী ছিলেন। জর্ডানের সেনাবাহিনী জায়নবাদী বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও তাদের কৌশল ছিল ভিন্ন। তারা সমন্বিত আরব কৌশলের চেয়ে নিজেদের ভূখণ্ড দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছিল।
১৯৪৮ সালে মিশরের ভূমিকাও ছিল হতাশাজনক। রাজা ফারুকের অধীনে মিশরীয় বাহিনী প্রস্তুতি ছাড়াই যুদ্ধে নেমেছিল। তাদের কমান্ড কাঠামোতে সমন্বয় ছিল না। পরে কায়রোতে ‘ত্রুটিপূর্ণ অস্ত্র’ কেলেঙ্কারি তোলপাড় সৃষ্টি করে। অভিযোগ ওঠে সৈন্যদের অকেজো অস্ত্র ও গুলি দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ে এবং ১৯৫২ সালে ফ্রি অফিসারদের অভ্যুত্থানের পথ তৈরি করে।
ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের অবস্থা ছিল আরও করুণ। জেরুজালেমের আশপাশে অনিয়মিত বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আবদ আল-কাদির আল-হুসেনি। তিনি বারবার অস্ত্র ও অতিরিক্ত সৈন্য চেয়েছিলেন কিন্তু তা কখনো পৌঁছায়নি। ১৯৪৮ সালের এপ্রিলে আল-কাস্তাল যুদ্ধের আগে তিনি গুলির জন্য জরুরি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। মৃত্যুর দুদিন আগে তিনি আরব লিগের মহাসচিবকে লিখেছিলেন, "বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে আমার সৈন্যদের অস্ত্র ও সমর্থন ছাড়া ফেলে রাখার জন্য আমি আপনাকে দায়ী করছি।"
তিনি ও তাঁর লোকেরা শেষ গুলি পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন। যুদ্ধে তিনি নিহত হন। তাঁর বাহিনীর পেছনে কোনো ঐক্যবদ্ধ আরব কমান্ড ছিল না। তারা একাই লড়েছিল।
১৯৪৮ সালে কোনো সমন্বিত বা সার্বভৌম ও ঐক্যবদ্ধ আরব যুদ্ধযন্ত্র ছিল না। ছিল বিভক্ত রাষ্ট্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজতন্ত্র এবং ঔপনিবেশিক জটিলতা। তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল ভিন্ন এবং সামরিক সক্ষমতাও ছিল অসমান। ইসরায়েল কোনো সংহত প্যান-আরব বাহিনীকে হারায়নি। তারা এমন এক আরব বিশ্বে আবির্ভূত হয়েছিল যা তখনো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির ছায়ায় ছিল। ইসরায়েল উন্নত সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের সুবিধা পেয়েছিল। ইসরায়েলের ‘আরব বাহিনীকে হারানোর’ গল্প পরে জাতীয় কিংবদন্তি হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
১৯৬৭ সালে ইসরায়েলের জয়ের মূল কারণ ছিল অতর্কিত বিমান হামলা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিশরের বিমান বাহিনী মাটিতেই ধ্বংস হয়ে যায়। আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ফলাফল মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। এই লড়াই সমশক্তির বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই ছিল না। পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আগেই পঙ্গু করে দেওয়ার মতো আঘাত হানা হয়েছিল।
১৯৭৩ সালের যুদ্ধ এই মিথকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে। সেই বছরের অক্টোবরে মিশরীয় সেনাবাহিনী সুয়েজ খাল অতিক্রম করে। তারা বার লেভ লাইন ভেঙে সিনাইয়ে প্রবেশ করে। এই আকস্মিক আক্রমণে ইসরায়েলি কমান্ড স্তম্ভিত হয়ে যায়। ১৯৬৭ সালের অজেয় ভাবমূর্তি ভেঙে পড়ে। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো কোনো আরব বাহিনী এমন পরিকল্পনা ও সমন্বয় দেখিয়েছিল যা ইসরায়েলকে রক্ষণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দেয়। তবে সামরিক গতিবেগকে কৌশলগত রূপান্তরে বদলানো যায়নি। আমেরিকা বিশাল এয়ারলিফটের মাধ্যমে ইসরায়েলের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়। এতে ভারসাম্য আবার বদলে যায়। মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকতে এবং রাজনৈতিক সমাধানের জন্য দ্রুত আলোচনায় বসেন। সামরিক ধাক্কা দিয়ে যা শুরু হয়েছিল তা শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক মেরুকরণে রূপ নেয়। এর ফলেই ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এরপর থেকে ইসরায়েল মূলত রাষ্ট্র নয় এমন শক্তিগুলোর বা নন-স্টেট অ্যাক্টরদের সঙ্গে লড়েছে। লেবাননে তারা হিজবুল্লাহর মুখোমুখি হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। গাজায় আমেরিকার বিপুল সমর্থন ও অগাধ শক্তি প্রয়োগ করেও তারা হামাসকে নির্মূল করতে পারেনি। জিম্মিদের উদ্ধার করা হয়েছে আলোচনার মাধ্যমে। যুদ্ধের ময়দানে জয়ের মাধ্যমে নয়। ইসরায়েল আকাশপথে হামলা চালিয়ে খণ্ডবিখণ্ড শত্রুদের দমনে অভ্যস্ত। ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে থাকা কোনো বড় ও সংগঠিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে তারা অভ্যস্ত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থাও একই। ২০০৩ সালে ইরাক ছিল পঙ্গু। বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞায় তারা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাদের সামরিক বাহিনী, অবকাঠামো এবং সমাজ ছিল বিধ্বস্ত। আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনী লড়েছিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে। লিবিয়া, সোমালিয়া এবং সিরিয়ায় তারা বিভক্ত রণাঙ্গন ও ভঙ্গুর শক্তির মোকাবিলা করেছে। ওয়াশিংটন দুর্বল সরকার বা বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলনের বিরুদ্ধে লড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাদের কৌশল পরিচিত—দ্রুত হস্তক্ষেপ ও ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ এবং জয়ের ঘোষণা।
এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। দশকের পর দশক পর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সংগঠিত সামরিক বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছে। এই বাহিনী এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত যা ধারাবাহিকতা ও পুনর্গঠনে সক্ষম। ইরান ২০০৩ সালের ইরাক নয়। ২০০১ সালের আফগানিস্তানও নয়। ইরানের ভৌগোলিক সুবিধা, জনসংখ্যা এবং শক্তিশালী সামরিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের আছে অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ মিসাইল ভান্ডার। পশ্চিমাদের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান কয়েক দশক ধরে দেশীয় অস্ত্র শিল্প ও ড্রোন প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষামূলক অবকাঠামো গড়ে তুলেছে।
আজকের যে ইরানকে বৈশ্বিক পরিসরে আমরা দেখি, তা মূলত তাদের দীর্ দিনের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের আদল। তারা জাতীয়তাবাদী ও আদর্শিক এবং প্রবলভাবে স্বাধীনচেতা। তারা পশ্চিমা সমর্থিত রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেছে। তারা দশকের পর দশক ধরে অবরোধের মধ্যে থেকেও স্বায়ত্তশাসন গড়ে তুলেছে। তারা নিজেদের অস্ত্র নিজেরাই বানায়। নিজেদের জোট নিজেরাই গড়ে। ইরানের নেতৃত্বকে ‘মোল্লা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া কোনো যৌক্তিক আলাপ নয় বরং অগভীর ব্যঙ্গচিত্র। এই ব্যঙ্গ ‘যা বুঝে না, তাকে ছোট করার’ আমেরিকার স্বভাবজাত প্রবণতার অংশ।
গত ৩ মার্চের পেন্টাগনের সংবাদ সম্মেলনে সেই ব্যঙ্গচিত্রই দেখা গেছে। হেগসেথ ইরানি সরকারকে ‘পাগল’ ও ‘নবুওয়তি ইসলামি বিভ্রান্তিতে মগ্ন’ বলে অভিহিত করেছেন। রুবিও ঘোষণা করেছেন ইরান ‘র্যাডিক্যাল বা উগ্রবাদী আলেমদের’ দ্বারা চালিত। তারা নাকি ভূ-রাজনীতির বদলে ‘অ্যাপোক্যালিপ্টিক’ বা কেয়ামত সংক্রান্ত ধর্মতত্ত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এই কথাগুলো আসছে এমন এক প্রশাসনের কাছ থেকে যারা খ্রিস্টান জায়নবাদীদের সঙ্গে যুক্ত। ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী সরকারও বাইবেলের দাবিতে বিশ্বাসী। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি নিয়মিত ধর্মগ্রন্থ ও ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতির দোহাই দিয়ে ভূখণ্ড দখলের সাফাই গান।
তবে বক্তৃতাবাজির বাইরে এক কঠিন বাস্তবতা রয়েছে। ইরান কেবল ইসরায়েলের সঙ্গে লড়ছে না। তারা এই অঞ্চলে আমেরিকার পুরো ক্ষমতার কাঠামোর মুখোমুখি হয়েছে। সেই কাঠামোতে আমেরিকা হলো ইসরায়েলি আধিপত্যের পৃষ্ঠপোষক ও সরবরাহকারী এবং জামিনদার। তেহরান ইসরায়েলকে বিচ্ছিন্ন শত্রু মনে করে না। তারা মনে করে ইসরায়েল মার্কিন আধিপত্যের সবচেয়ে সুরক্ষিত ঘাঁটি। শক্তির উৎস তেল আবিবে থামে না, বরং সোজা আমেরিকার ঘাঁটিগুলোর নেটওয়ার্কে চলে যায়। বাহরাইন থেকে কুয়েত ও ইউএই এবং ইরাক পর্যন্ত এই ঘাঁটিগুলোই ওয়াশিংটনের সামরিক ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছে।
ইরানের এই উত্তেজনা বৃদ্ধি কোনো দুর্ঘটনা নয়। তাদের পাল্টা হামলা সুচিন্তিতভাবে মার্কিন সম্পদ ও আমেরিকান বাহিনীকে আশ্রয় দেওয়া উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তেহরান বুঝিয়ে দিচ্ছে তারা তাদের শত্রুকে একক কোনো বাহিনী মনে করে না। তারা একে আমেরিকার লজিস্টিক ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ওপর দাঁড়িয়ে একটি বৈশ্বিক কৌশলগত ব্যবস্থা হিসেবে দেখে। ইরান ইতিমধ্যেই উপসাগরীয় অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রবাহ এবং কৌশলগত নৌপথকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই পথগুলোই বিশ্ব পুঁজিবাদ ও মার্কিন নেতৃত্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে। বিশেষ করে পেট্রো-ডলার ব্যবস্থা যা ওয়াল স্ট্রিট ও ওয়াশিংটনকে সচল রাখে। উপসাগর অস্থিতিশীল হলে তার ঢেউ জ্বালানি ও মুদ্রা বাজারে লাগবে। আমেরিকার ক্ষমতার ভিত্তি যে আর্থিক কাঠামো তার ওপরও আঘাত আসবে।
একজন বেপরোয়া প্রেসিডেন্টের নেওয়া এই পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিযান হতে পারে। এই যুদ্ধ ইসরায়েলের কল্পনামতো নতুন মধ্যপ্রাচ্যের জন্ম নাও দিতে পারে। সাম্রাজ্যগুলো যখন তাদের আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকে তখন তারা নিজেদের মিথ বা অতিকথায় বিশ্বাস করতে শুরু করে। তারা সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে কৌশলগত প্রজ্ঞা বলে ভুল করে। তারা নিজেদের বোঝায় যে শক্তি দিয়ে ইতিহাস নতুন করে লেখা সম্ভব। কিন্তু সাম্রাজ্য দুর্বলতার কারণে পতন হয় না, পতন হয় নিজেদের শক্তিকে বাড়িয়ে দেখার ভুলের কারণে। ক্ষমতার অভাব নয় বরং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা দম্ভই তাদের পতনের কারণ হয়।
১৯৫৬ সালে ব্রিটেন এই শিক্ষা পেয়েছিল। তারা নিশ্চিত ছিল তাদের কর্তৃত্ব অটুট। তারা ভেবেছিল দেশের বাইরেও তারা ঘটনার গতিপথ ঠিক করতে পারবে। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল সংকটে ব্রিটেন ভেবেছিল শক্তি প্রয়োগ করে মিশরকে শায়েস্তা করবে এবং নিজেদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখবে। কিন্তু বাস্তবে সেই যুদ্ধ ব্রিটেনের দুর্বলতা ফাঁস করে দিয়েছিল এবং বিশ্বমঞ্চে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করেছিল। যা শক্তি প্রদর্শন হওয়ার কথা ছিল তা কৌশলগত পিছুহটায় পরিণত হলো।
সুয়েজ রাতারাতি ব্রিটিশ সাম্রাজ্য শেষ করেনি কিন্তু এই অভিযান একটি মারাত্মক সত্য উন্মোচন করেছিল। রাজনৈতিক বৈধতা ছাড়া সামরিক সক্ষমতা এবং সংযম ছাড়া শক্তিপ্রয়োগ পতনকে রোধ করে না বরং ত্বরান্বিত করে। ইতিহাস হুবহু পুনরাবৃত্তি হয় না। কিন্তু তার যুক্তি বা লজিক বারবার ফিরে আসে। ইরান হয়তো ওয়াশিংটনের সুয়েজ খাল হতে যাচ্ছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দুই দশকের বেশি সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে ছুটছেন। ওয়াশিংটন থেকে জাতিসংঘের মঞ্চে তিনি বিষয়টি নাটকীয়ভাবে তুলে ধরেছেন। অবশেষে সেই মুহূর্ত এসে গেছে অর্থাৎ নেতানিয়াহু যে যুদ্ধকে অনিবার্য বলতেন তা এখন শুরু হয়েছে। এই যুদ্ধে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল একা নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সামরিক শক্তি পাশে আছে।
এই হামলা কোনো সীমিত আক্রমণ বা শক্তি প্রদর্শনের কৌশল নয়। আমেরিকার প্রয়োজন কিংবা আসন্ন হুমকির কারণে এই যুদ্ধ শুরু হয়নি। এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য একটাই, মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে সাজানোর ইসরায়েলি স্বপ্ন। বছরের পর বছর ধরে নেতানিয়াহু ও তাঁর সঙ্গীরা মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে গড়ার কথা বলেছেন।
‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ বা গ্রেটার ইসরায়েলের ধারণা এখন মূলধারার রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ‘শিয়া চরমপন্থা’ ও ‘সুন্নি চরমপন্থা’ মোকাবিলার কথা বলছেন। আমেরিকানরাও তাঁদের সঙ্গে সুর মেলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি পাশে পেয়ে নেতানিয়াহু বিশ্বাস করছেন ইতিহাসকে জোর করে নিজের পথে চালানো সম্ভব।
আমাদের বলা হচ্ছে এই যুদ্ধ মিসাইল ও পরমাণু বোমা এবং আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য। মার্কিন যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মুখস্থ বুলি আউড়ে যাচ্ছেন। তাঁরা বলছেন ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের দ্বারপ্রান্তে। ইরান হুমকি, তাদের থামাতেই হবে। আমরা এই কথা আগেও শুনেছি। সাদ্দাম হোসেনের ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ নিয়ে জর্জ ডব্লিউ বুশ ও টনি ব্লেয়ার একই কথা বলেছিলেন। আমরা দেখেছি ইরাক কীভাবে ধ্বংস ও বিভক্ত হয়েছে। পরে জানা গেছে যুদ্ধের মূল কারণই ছিল বানোয়াট। সেই মিথ্যার মূল্য চুকাতে হয়েছে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ও আঞ্চলিক অরাজকতা দিয়ে।
এখন সেই পুরোনো চিত্রনাট্য আবার ধুয়েমুছে নতুন করে মঞ্চস্থ করা হচ্ছে। ওমান ও জেনেভায় আলোচনায় ইরান নমনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছিল। তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমাতে এবং নজরদারি মেনে নিতে রাজি ছিল। কিন্তু আলোচনা পরিণত হলো ইসরায়েলের আকাঙ্ক্ষার ওপরেই। কূটনীতিকরা যখন আপসের কথা বলছিলেন তখন ভারত মহাসাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলে রণতরীগুলো নিঃশব্দে অবস্থান নিচ্ছিল। সংলাপের আড়ালে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল। সেই পরিচিত কৌশল—মুখে শান্তির কথা আর তলে তলে যুদ্ধের আয়োজন।
এরপর এল আঘাত। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হলেন। রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করা হলো। সার্বভৌম ভূখণ্ডে বোমা ফেলা হলো। তবুও পশ্চিমা বয়ানে ইরানকেই আক্রমণকারী হিসেবে দেখানো হচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েল নিজেকে অজেয় সামরিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। তারা দাবি করে প্রথাগত যুদ্ধে আরব বাহিনীকে বারবার হারিয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের দলিল ভিন্ন কথা বলে।
১৯৪৮ সালে তথাকথিত আরব জোট মোটেও ঐক্যবদ্ধ ছিল না। অধিকাংশ আরব দেশ তখনো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ফিলিস্তিন শাসন করত। তারাই ট্রান্সজর্ডানের আরব লিজিওনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল ও অস্ত্র দিয়েছিল। এমনকি ব্রিটিশ অফিসার গ্লাব পাশা এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সবচেয়ে দক্ষ আরব বাহিনীই স্বাধীন বা ঐক্যবদ্ধ আরব কমান্ডের অধীনে ছিল না।
জর্ডানের রাজা আবদুল্লাহ পুরো ফিলিস্তিন রক্ষার চেয়ে পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় বেশি আগ্রহী ছিলেন। জর্ডানের সেনাবাহিনী জায়নবাদী বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও তাদের কৌশল ছিল ভিন্ন। তারা সমন্বিত আরব কৌশলের চেয়ে নিজেদের ভূখণ্ড দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছিল।
১৯৪৮ সালে মিশরের ভূমিকাও ছিল হতাশাজনক। রাজা ফারুকের অধীনে মিশরীয় বাহিনী প্রস্তুতি ছাড়াই যুদ্ধে নেমেছিল। তাদের কমান্ড কাঠামোতে সমন্বয় ছিল না। পরে কায়রোতে ‘ত্রুটিপূর্ণ অস্ত্র’ কেলেঙ্কারি তোলপাড় সৃষ্টি করে। অভিযোগ ওঠে সৈন্যদের অকেজো অস্ত্র ও গুলি দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ে এবং ১৯৫২ সালে ফ্রি অফিসারদের অভ্যুত্থানের পথ তৈরি করে।
ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের অবস্থা ছিল আরও করুণ। জেরুজালেমের আশপাশে অনিয়মিত বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আবদ আল-কাদির আল-হুসেনি। তিনি বারবার অস্ত্র ও অতিরিক্ত সৈন্য চেয়েছিলেন কিন্তু তা কখনো পৌঁছায়নি। ১৯৪৮ সালের এপ্রিলে আল-কাস্তাল যুদ্ধের আগে তিনি গুলির জন্য জরুরি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। মৃত্যুর দুদিন আগে তিনি আরব লিগের মহাসচিবকে লিখেছিলেন, "বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে আমার সৈন্যদের অস্ত্র ও সমর্থন ছাড়া ফেলে রাখার জন্য আমি আপনাকে দায়ী করছি।"
তিনি ও তাঁর লোকেরা শেষ গুলি পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন। যুদ্ধে তিনি নিহত হন। তাঁর বাহিনীর পেছনে কোনো ঐক্যবদ্ধ আরব কমান্ড ছিল না। তারা একাই লড়েছিল।
১৯৪৮ সালে কোনো সমন্বিত বা সার্বভৌম ও ঐক্যবদ্ধ আরব যুদ্ধযন্ত্র ছিল না। ছিল বিভক্ত রাষ্ট্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজতন্ত্র এবং ঔপনিবেশিক জটিলতা। তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল ভিন্ন এবং সামরিক সক্ষমতাও ছিল অসমান। ইসরায়েল কোনো সংহত প্যান-আরব বাহিনীকে হারায়নি। তারা এমন এক আরব বিশ্বে আবির্ভূত হয়েছিল যা তখনো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির ছায়ায় ছিল। ইসরায়েল উন্নত সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের সুবিধা পেয়েছিল। ইসরায়েলের ‘আরব বাহিনীকে হারানোর’ গল্প পরে জাতীয় কিংবদন্তি হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
১৯৬৭ সালে ইসরায়েলের জয়ের মূল কারণ ছিল অতর্কিত বিমান হামলা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিশরের বিমান বাহিনী মাটিতেই ধ্বংস হয়ে যায়। আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ফলাফল মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। এই লড়াই সমশক্তির বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই ছিল না। পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আগেই পঙ্গু করে দেওয়ার মতো আঘাত হানা হয়েছিল।
১৯৭৩ সালের যুদ্ধ এই মিথকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে। সেই বছরের অক্টোবরে মিশরীয় সেনাবাহিনী সুয়েজ খাল অতিক্রম করে। তারা বার লেভ লাইন ভেঙে সিনাইয়ে প্রবেশ করে। এই আকস্মিক আক্রমণে ইসরায়েলি কমান্ড স্তম্ভিত হয়ে যায়। ১৯৬৭ সালের অজেয় ভাবমূর্তি ভেঙে পড়ে। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো কোনো আরব বাহিনী এমন পরিকল্পনা ও সমন্বয় দেখিয়েছিল যা ইসরায়েলকে রক্ষণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দেয়। তবে সামরিক গতিবেগকে কৌশলগত রূপান্তরে বদলানো যায়নি। আমেরিকা বিশাল এয়ারলিফটের মাধ্যমে ইসরায়েলের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়। এতে ভারসাম্য আবার বদলে যায়। মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকতে এবং রাজনৈতিক সমাধানের জন্য দ্রুত আলোচনায় বসেন। সামরিক ধাক্কা দিয়ে যা শুরু হয়েছিল তা শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক মেরুকরণে রূপ নেয়। এর ফলেই ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এরপর থেকে ইসরায়েল মূলত রাষ্ট্র নয় এমন শক্তিগুলোর বা নন-স্টেট অ্যাক্টরদের সঙ্গে লড়েছে। লেবাননে তারা হিজবুল্লাহর মুখোমুখি হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। গাজায় আমেরিকার বিপুল সমর্থন ও অগাধ শক্তি প্রয়োগ করেও তারা হামাসকে নির্মূল করতে পারেনি। জিম্মিদের উদ্ধার করা হয়েছে আলোচনার মাধ্যমে। যুদ্ধের ময়দানে জয়ের মাধ্যমে নয়। ইসরায়েল আকাশপথে হামলা চালিয়ে খণ্ডবিখণ্ড শত্রুদের দমনে অভ্যস্ত। ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে থাকা কোনো বড় ও সংগঠিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে তারা অভ্যস্ত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থাও একই। ২০০৩ সালে ইরাক ছিল পঙ্গু। বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞায় তারা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাদের সামরিক বাহিনী, অবকাঠামো এবং সমাজ ছিল বিধ্বস্ত। আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনী লড়েছিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে। লিবিয়া, সোমালিয়া এবং সিরিয়ায় তারা বিভক্ত রণাঙ্গন ও ভঙ্গুর শক্তির মোকাবিলা করেছে। ওয়াশিংটন দুর্বল সরকার বা বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলনের বিরুদ্ধে লড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাদের কৌশল পরিচিত—দ্রুত হস্তক্ষেপ ও ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ এবং জয়ের ঘোষণা।
এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। দশকের পর দশক পর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সংগঠিত সামরিক বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছে। এই বাহিনী এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত যা ধারাবাহিকতা ও পুনর্গঠনে সক্ষম। ইরান ২০০৩ সালের ইরাক নয়। ২০০১ সালের আফগানিস্তানও নয়। ইরানের ভৌগোলিক সুবিধা, জনসংখ্যা এবং শক্তিশালী সামরিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের আছে অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ মিসাইল ভান্ডার। পশ্চিমাদের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান কয়েক দশক ধরে দেশীয় অস্ত্র শিল্প ও ড্রোন প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষামূলক অবকাঠামো গড়ে তুলেছে।
আজকের যে ইরানকে বৈশ্বিক পরিসরে আমরা দেখি, তা মূলত তাদের দীর্ দিনের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের আদল। তারা জাতীয়তাবাদী ও আদর্শিক এবং প্রবলভাবে স্বাধীনচেতা। তারা পশ্চিমা সমর্থিত রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেছে। তারা দশকের পর দশক ধরে অবরোধের মধ্যে থেকেও স্বায়ত্তশাসন গড়ে তুলেছে। তারা নিজেদের অস্ত্র নিজেরাই বানায়। নিজেদের জোট নিজেরাই গড়ে। ইরানের নেতৃত্বকে ‘মোল্লা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া কোনো যৌক্তিক আলাপ নয় বরং অগভীর ব্যঙ্গচিত্র। এই ব্যঙ্গ ‘যা বুঝে না, তাকে ছোট করার’ আমেরিকার স্বভাবজাত প্রবণতার অংশ।
গত ৩ মার্চের পেন্টাগনের সংবাদ সম্মেলনে সেই ব্যঙ্গচিত্রই দেখা গেছে। হেগসেথ ইরানি সরকারকে ‘পাগল’ ও ‘নবুওয়তি ইসলামি বিভ্রান্তিতে মগ্ন’ বলে অভিহিত করেছেন। রুবিও ঘোষণা করেছেন ইরান ‘র্যাডিক্যাল বা উগ্রবাদী আলেমদের’ দ্বারা চালিত। তারা নাকি ভূ-রাজনীতির বদলে ‘অ্যাপোক্যালিপ্টিক’ বা কেয়ামত সংক্রান্ত ধর্মতত্ত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এই কথাগুলো আসছে এমন এক প্রশাসনের কাছ থেকে যারা খ্রিস্টান জায়নবাদীদের সঙ্গে যুক্ত। ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী সরকারও বাইবেলের দাবিতে বিশ্বাসী। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি নিয়মিত ধর্মগ্রন্থ ও ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতির দোহাই দিয়ে ভূখণ্ড দখলের সাফাই গান।
তবে বক্তৃতাবাজির বাইরে এক কঠিন বাস্তবতা রয়েছে। ইরান কেবল ইসরায়েলের সঙ্গে লড়ছে না। তারা এই অঞ্চলে আমেরিকার পুরো ক্ষমতার কাঠামোর মুখোমুখি হয়েছে। সেই কাঠামোতে আমেরিকা হলো ইসরায়েলি আধিপত্যের পৃষ্ঠপোষক ও সরবরাহকারী এবং জামিনদার। তেহরান ইসরায়েলকে বিচ্ছিন্ন শত্রু মনে করে না। তারা মনে করে ইসরায়েল মার্কিন আধিপত্যের সবচেয়ে সুরক্ষিত ঘাঁটি। শক্তির উৎস তেল আবিবে থামে না, বরং সোজা আমেরিকার ঘাঁটিগুলোর নেটওয়ার্কে চলে যায়। বাহরাইন থেকে কুয়েত ও ইউএই এবং ইরাক পর্যন্ত এই ঘাঁটিগুলোই ওয়াশিংটনের সামরিক ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছে।
ইরানের এই উত্তেজনা বৃদ্ধি কোনো দুর্ঘটনা নয়। তাদের পাল্টা হামলা সুচিন্তিতভাবে মার্কিন সম্পদ ও আমেরিকান বাহিনীকে আশ্রয় দেওয়া উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তেহরান বুঝিয়ে দিচ্ছে তারা তাদের শত্রুকে একক কোনো বাহিনী মনে করে না। তারা একে আমেরিকার লজিস্টিক ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ওপর দাঁড়িয়ে একটি বৈশ্বিক কৌশলগত ব্যবস্থা হিসেবে দেখে। ইরান ইতিমধ্যেই উপসাগরীয় অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রবাহ এবং কৌশলগত নৌপথকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই পথগুলোই বিশ্ব পুঁজিবাদ ও মার্কিন নেতৃত্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে। বিশেষ করে পেট্রো-ডলার ব্যবস্থা যা ওয়াল স্ট্রিট ও ওয়াশিংটনকে সচল রাখে। উপসাগর অস্থিতিশীল হলে তার ঢেউ জ্বালানি ও মুদ্রা বাজারে লাগবে। আমেরিকার ক্ষমতার ভিত্তি যে আর্থিক কাঠামো তার ওপরও আঘাত আসবে।
একজন বেপরোয়া প্রেসিডেন্টের নেওয়া এই পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিযান হতে পারে। এই যুদ্ধ ইসরায়েলের কল্পনামতো নতুন মধ্যপ্রাচ্যের জন্ম নাও দিতে পারে। সাম্রাজ্যগুলো যখন তাদের আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকে তখন তারা নিজেদের মিথ বা অতিকথায় বিশ্বাস করতে শুরু করে। তারা সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে কৌশলগত প্রজ্ঞা বলে ভুল করে। তারা নিজেদের বোঝায় যে শক্তি দিয়ে ইতিহাস নতুন করে লেখা সম্ভব। কিন্তু সাম্রাজ্য দুর্বলতার কারণে পতন হয় না, পতন হয় নিজেদের শক্তিকে বাড়িয়ে দেখার ভুলের কারণে। ক্ষমতার অভাব নয় বরং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা দম্ভই তাদের পতনের কারণ হয়।
১৯৫৬ সালে ব্রিটেন এই শিক্ষা পেয়েছিল। তারা নিশ্চিত ছিল তাদের কর্তৃত্ব অটুট। তারা ভেবেছিল দেশের বাইরেও তারা ঘটনার গতিপথ ঠিক করতে পারবে। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল সংকটে ব্রিটেন ভেবেছিল শক্তি প্রয়োগ করে মিশরকে শায়েস্তা করবে এবং নিজেদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখবে। কিন্তু বাস্তবে সেই যুদ্ধ ব্রিটেনের দুর্বলতা ফাঁস করে দিয়েছিল এবং বিশ্বমঞ্চে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত করেছিল। যা শক্তি প্রদর্শন হওয়ার কথা ছিল তা কৌশলগত পিছুহটায় পরিণত হলো।
সুয়েজ রাতারাতি ব্রিটিশ সাম্রাজ্য শেষ করেনি কিন্তু এই অভিযান একটি মারাত্মক সত্য উন্মোচন করেছিল। রাজনৈতিক বৈধতা ছাড়া সামরিক সক্ষমতা এবং সংযম ছাড়া শক্তিপ্রয়োগ পতনকে রোধ করে না বরং ত্বরান্বিত করে। ইতিহাস হুবহু পুনরাবৃত্তি হয় না। কিন্তু তার যুক্তি বা লজিক বারবার ফিরে আসে। ইরান হয়তো ওয়াশিংটনের সুয়েজ খাল হতে যাচ্ছে।

৪ মার্চ ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ইরানের 'ট্রুথফুল প্রমিজ ৪' অপারেশনের আওতায় গত কয়েকদিনে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও বুর্জ আল আরবের মতো আইকনিক স্থাপনায় নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত
৩ ঘণ্টা আগে
জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও আমাদের প্রার্থীদের তৃতীয় স্থানে নামিয়ে আনা হয়েছে। এমনকি দু-এক জায়গায় জামানত বাজেয়াপ্ত করানো হয়েছে। অসংখ্য কেন্দ্রে জাপার জিরো বা সিঙ্গেল ডিজিট ভোট দেখানোটা পুরোপুরি অস্বাভাবিক। আমি মনে করি, এটি জাপাকে শূন্য আসন এবং ১%-এর কম ভোটে নামিয়ে আনার একটি কেন্দ্রীয় ব্লুপ্রিন্ট।
৪ ঘণ্টা আগে
রপ্তানিতে বৈচিত্র্য নেই, বাজারে নির্ভরতা একমুখী, কারখানার ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলার প্রস্তুতি অপর্যাপ্ত এবং বড় শক্তির সঙ্গে দরকষাকষিতে আমাদের কূটনৈতিক শক্তি এখনও দুর্বল।
৭ ঘণ্টা আগে
ইরানে মার্কিন হামলা চীনের জন্য এক মহাবিপর্যয়। বেইজিংয়ের পুরো মধ্যপ্রাচ্য নীতি এক মুহূর্তে ধসে পড়েছ। তেহরানের এই বিশৃঙ্খলার ধাক্কা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তাকে চুরমার করে দিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানির বাজার ধসিয়ে দিয়েছে এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মতো বিশাল প্রকল্পকে থামিয়ে দিয়েছে।
৯ ঘণ্টা আগে