লেখা:

একসময় ‘জোটনিরপেক্ষ’ নীতির বেশ কদর ছিল। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পাওয়া নতুন দেশগুলোর জন্য এটি কেবল একটি পররাষ্ট্রনীতি ছিল না, ছিল নিজেদের স্বাধীন পরিচয়ের এক বলিষ্ঠ ঘোষণা। কিন্তু সময় এখন বদলে গেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর আগের মতো নেই। বিশ্ব এখন আর ঠান্ডা যুদ্ধের মতো দুই শিবিরে বিভক্ত নয়। এমনকি নব্বইয়ের দশকের সেই একমেরু বিশ্বব্যবস্থাও আজ অতীত।
আমরা এখন ভূ-রাজনীতির এক জটিল দাবার ছকে দাঁড়িয়ে আছি। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলছে প্রযুক্তি ও কৌশলগত আধিপত্যের তীব্র লড়াই। অন্যদিকে রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত এবং উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের প্রভাব বাড়াতে মরিয়া। এই নতুন বাস্তবতায় জোটনিরপেক্ষতার ধারণাটি হারিয়ে যায়নি ঠিকই, তবে এর প্রয়োগের ধরন পুরোপুরি বদলে গেছে।
আধুনিক জোটনিরপেক্ষতা মানে এখন আর চুপচাপ বসে থাকা নয়। এটি এখন পুরোপুরি একটি লেনদেনের খেলা, যাকে বলা যেতে পারে ‘বহুমুখী জোট’ বা মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট। দেশগুলো এখন আর ভূ-রাজনৈতিক কোন্দল থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে না। বরং, তারা পরাশক্তিগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য সেরা সুবিধাটা আদায় করে নিচ্ছে। কূটনীতি এখন আর কেবল সুন্দর সুন্দর কথার বিষয় নয়। বরং এটি দেশের জন্য নানা সুযোগ ও বিকল্প খোলা রাখার বাস্তব হাতিয়ার।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হতে পারে ভারত, ইন্দোনেশিয়া বা ব্রাজিলের মতো উদীয়মান দেশগুলো। ভারত পশ্চিমা চাপ পাত্তা দিচ্ছে না। তারা রাশিয়ার কাছ থেকে কম দামে তেল কিনছে। আবার ঠিক একই সময়ে ‘কোয়াড’-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করছে।
ইন্দোনেশিয়ার কথা ধরা যাক। তারা তাদের নিকেলের বিশাল ভান্ডারকে দারুণভাবে কাজে লাগাচ্ছে। বিশ্বের বড় বড় বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে তারা বাধ্য করছে নিজেদের দেশে বিনিয়োগ করতে। অন্যদিকে ব্রাজিল তাদের বিশাল বাজার ও ভৌগোলিক অবস্থানকে হাতিয়ার করেছে। তারা ওয়াশিংটন ও বেইজিং—উভয়ের কাছ থেকেই সমানতালে সুবিধা আদায় করছে। এই দেশগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট পক্ষে আটকে নেই। তারা নিজেদের নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিকে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, এই নতুন ও কঠিন বাস্তবতার সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ কি তার কূটনীতিতে কোনো পরিবর্তন আনছে?
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো আমাদের সংবিধান। সেখানে বলা আছে, “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়।” এটি আমাদের ঐতিহাসিক পটভূমি ও উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি নীতি। কিন্তু তীব্র প্রতিযোগিতার এই যুগে কেবল ‘সবার বন্ধু’ হওয়ার ঘোষণাই কি যথেষ্ট? আজকাল কূটনীতির সাফল্য মাপা হয় একটি মানদণ্ডে, তা হলো— জাতীয় স্বার্থ কতটা আদায় হলো।
বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলাই এখন আর শেষ কথা হতে পারে না। নিজেদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে হবে। এখানেই বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে আছে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সাধারণত ঝুঁকি এড়ানোর কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকে। সংঘাত এড়িয়ে চলার এই নীতি অনেক সময় অতিরিক্ত সতর্ক ও রক্ষণাত্মক মনে হয়। এটি দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বের সাথে একেবারেই বেমানান।
বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ও সম্ভাবনা বিশাল। বঙ্গোপসাগরের তীরে কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের আলোচনার কেন্দ্রে। আমাদের অর্থনীতি দ্রুত বড় হচ্ছে। আমাদের রয়েছে তরুণ জনগোষ্ঠীর বিশাল শক্তি। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই সম্পদগুলোকে যদি ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবে রূপান্তর করতে হয়, তবে ঢাকাকে নতুন ধারার কূটনীতি গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমানে আমাদের একটি বড় দুর্বলতা হলো রপ্তানি খাত। আমাদের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক থেকে। আর এই পোশাক রপ্তানির জন্য আমরা অল্প কয়েকটি পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরশীল। উন্নয়নের অর্থায়নের জন্যও আমরা কয়েকটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর ভরসা করি। স্বল্প মেয়াদে তা স্বস্তি দিলেও, দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন করে ফেলতে পারে।
এই ঝুঁকি কমাতে হলে বাংলাদেশকে আসিয়ান, মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার নতুন বাজারগুলোতে প্রবেশ করতে হবে। আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও বহুমুখী করতে হবে।
প্রকৃত কূটনৈতিক শক্তি অর্জন করতে হলে বাংলাদেশকে ‘কৌশলগতভাবে অপরিহার্য’ হয়ে উঠতে হবে। ইন্দোনেশিয়া যেমন নিকেলকে বা ব্রাজিল যেমন আমাজন বনকে হাতিয়ার করেছে, বাংলাদেশেরও তেমন সুযোগ রয়েছে।
মাতারবাড়ির মতো গভীর সমুদ্রবন্দর, আমাদের কৌশলগত উপকূল এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগের সেতু হওয়ার সম্ভাবনা—এসব কিছুই বাংলাদেশকে বড় শক্তিগুলোর কাছে অপরিহার্য করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ যদি একটি আঞ্চলিক ‘এনার্জি হাব’ এবং ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সামুদ্রিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিতে পারে, তবে আমাদের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যাবে।
বাংলাদেশের গুরুত্ব যখন বাড়বে, তখন বিশ্বমঞ্চে আমাদের দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়বে। তখন অন্য দেশের তৈরি করা ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের ছকে বাংলাদেশকে চলতে হবে না। বরং বাংলাদেশ নিজেই জলবায়ু ন্যায্যতা, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং নিরাপদ অভিবাসনের মতো বৈশ্বিক আলোচনায় নেতৃত্ব দিতে পারবে। মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে তারাই শক্তিশালী, যারা আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে।
এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হলে অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কেবল প্রথাগত কূটনৈতিক কাজের মধ্যে আটকে রাখলে চলবে না। দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে তাদের কাজ করতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে গতানুগতিক কাজের বাইরে আসতে হবে। সেগুলোকে একেকটি বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করতে হবে। তাদের মূল লক্ষ্য হবে—নতুন প্রযুক্তি দেশে আনা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে। প্রথম পথটি হলো—অতিরিক্ত সতর্ক থেকে এবং কাউকে না চটিয়ে চলার পুরনো নীতি আঁকড়ে ধরে থাকা। দ্বিতীয় পথটি হলো—একটি স্মার্ট ও কৌশলী নীতি গ্রহণ করা, যেখানে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও কঠোরভাবে দর-কষাকষির মাধ্যমে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ আদায় করা যাবে।
প্রথম পথটি আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ মনে হলেও তা আসলে একটি মরীচিকা। আর দ্বিতীয় পথটিই হলো এই অস্থির ও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার এবং শক্তিশালী হওয়ার একমাত্র উপায়।
“সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব”—এই নীতি বাংলাদেশের বিশ্ব দেখার মূলভিত্তি হয়েই থাকবে। কিন্তু এই বহুমেরুর যুগে এর সাথে একটি অলিখিত অংশ যোগ করার সময় এসেছে। তা হলো, “আমরা সবার সাথেই সম্পর্ক রাখব, কিন্তু আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে জাতীয় স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হবে।”
ঢাকাকে এখন কেবলই ভারসাম্য রক্ষার কূটনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এখন সময় এসেছে ক্ষমতা, সক্ষমতা ও কৌশলগত লক্ষ্যের ভাষায় কথা বলতে শেখার।
লেখক: মো. ওবায়দুল্লাহ
এশিয়া টাইমস থেকে ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম

একসময় ‘জোটনিরপেক্ষ’ নীতির বেশ কদর ছিল। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পাওয়া নতুন দেশগুলোর জন্য এটি কেবল একটি পররাষ্ট্রনীতি ছিল না, ছিল নিজেদের স্বাধীন পরিচয়ের এক বলিষ্ঠ ঘোষণা। কিন্তু সময় এখন বদলে গেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর আগের মতো নেই। বিশ্ব এখন আর ঠান্ডা যুদ্ধের মতো দুই শিবিরে বিভক্ত নয়। এমনকি নব্বইয়ের দশকের সেই একমেরু বিশ্বব্যবস্থাও আজ অতীত।
আমরা এখন ভূ-রাজনীতির এক জটিল দাবার ছকে দাঁড়িয়ে আছি। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলছে প্রযুক্তি ও কৌশলগত আধিপত্যের তীব্র লড়াই। অন্যদিকে রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত এবং উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের প্রভাব বাড়াতে মরিয়া। এই নতুন বাস্তবতায় জোটনিরপেক্ষতার ধারণাটি হারিয়ে যায়নি ঠিকই, তবে এর প্রয়োগের ধরন পুরোপুরি বদলে গেছে।
আধুনিক জোটনিরপেক্ষতা মানে এখন আর চুপচাপ বসে থাকা নয়। এটি এখন পুরোপুরি একটি লেনদেনের খেলা, যাকে বলা যেতে পারে ‘বহুমুখী জোট’ বা মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট। দেশগুলো এখন আর ভূ-রাজনৈতিক কোন্দল থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে না। বরং, তারা পরাশক্তিগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য সেরা সুবিধাটা আদায় করে নিচ্ছে। কূটনীতি এখন আর কেবল সুন্দর সুন্দর কথার বিষয় নয়। বরং এটি দেশের জন্য নানা সুযোগ ও বিকল্প খোলা রাখার বাস্তব হাতিয়ার।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হতে পারে ভারত, ইন্দোনেশিয়া বা ব্রাজিলের মতো উদীয়মান দেশগুলো। ভারত পশ্চিমা চাপ পাত্তা দিচ্ছে না। তারা রাশিয়ার কাছ থেকে কম দামে তেল কিনছে। আবার ঠিক একই সময়ে ‘কোয়াড’-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করছে।
ইন্দোনেশিয়ার কথা ধরা যাক। তারা তাদের নিকেলের বিশাল ভান্ডারকে দারুণভাবে কাজে লাগাচ্ছে। বিশ্বের বড় বড় বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে তারা বাধ্য করছে নিজেদের দেশে বিনিয়োগ করতে। অন্যদিকে ব্রাজিল তাদের বিশাল বাজার ও ভৌগোলিক অবস্থানকে হাতিয়ার করেছে। তারা ওয়াশিংটন ও বেইজিং—উভয়ের কাছ থেকেই সমানতালে সুবিধা আদায় করছে। এই দেশগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট পক্ষে আটকে নেই। তারা নিজেদের নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিকে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, এই নতুন ও কঠিন বাস্তবতার সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ কি তার কূটনীতিতে কোনো পরিবর্তন আনছে?
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো আমাদের সংবিধান। সেখানে বলা আছে, “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়।” এটি আমাদের ঐতিহাসিক পটভূমি ও উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি নীতি। কিন্তু তীব্র প্রতিযোগিতার এই যুগে কেবল ‘সবার বন্ধু’ হওয়ার ঘোষণাই কি যথেষ্ট? আজকাল কূটনীতির সাফল্য মাপা হয় একটি মানদণ্ডে, তা হলো— জাতীয় স্বার্থ কতটা আদায় হলো।
বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলাই এখন আর শেষ কথা হতে পারে না। নিজেদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে হবে। এখানেই বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে আছে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সাধারণত ঝুঁকি এড়ানোর কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকে। সংঘাত এড়িয়ে চলার এই নীতি অনেক সময় অতিরিক্ত সতর্ক ও রক্ষণাত্মক মনে হয়। এটি দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বের সাথে একেবারেই বেমানান।
বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ও সম্ভাবনা বিশাল। বঙ্গোপসাগরের তীরে কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের আলোচনার কেন্দ্রে। আমাদের অর্থনীতি দ্রুত বড় হচ্ছে। আমাদের রয়েছে তরুণ জনগোষ্ঠীর বিশাল শক্তি। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই সম্পদগুলোকে যদি ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবে রূপান্তর করতে হয়, তবে ঢাকাকে নতুন ধারার কূটনীতি গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমানে আমাদের একটি বড় দুর্বলতা হলো রপ্তানি খাত। আমাদের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক থেকে। আর এই পোশাক রপ্তানির জন্য আমরা অল্প কয়েকটি পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরশীল। উন্নয়নের অর্থায়নের জন্যও আমরা কয়েকটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর ভরসা করি। স্বল্প মেয়াদে তা স্বস্তি দিলেও, দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন করে ফেলতে পারে।
এই ঝুঁকি কমাতে হলে বাংলাদেশকে আসিয়ান, মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার নতুন বাজারগুলোতে প্রবেশ করতে হবে। আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও বহুমুখী করতে হবে।
প্রকৃত কূটনৈতিক শক্তি অর্জন করতে হলে বাংলাদেশকে ‘কৌশলগতভাবে অপরিহার্য’ হয়ে উঠতে হবে। ইন্দোনেশিয়া যেমন নিকেলকে বা ব্রাজিল যেমন আমাজন বনকে হাতিয়ার করেছে, বাংলাদেশেরও তেমন সুযোগ রয়েছে।
মাতারবাড়ির মতো গভীর সমুদ্রবন্দর, আমাদের কৌশলগত উপকূল এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগের সেতু হওয়ার সম্ভাবনা—এসব কিছুই বাংলাদেশকে বড় শক্তিগুলোর কাছে অপরিহার্য করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ যদি একটি আঞ্চলিক ‘এনার্জি হাব’ এবং ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সামুদ্রিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিতে পারে, তবে আমাদের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যাবে।
বাংলাদেশের গুরুত্ব যখন বাড়বে, তখন বিশ্বমঞ্চে আমাদের দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়বে। তখন অন্য দেশের তৈরি করা ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের ছকে বাংলাদেশকে চলতে হবে না। বরং বাংলাদেশ নিজেই জলবায়ু ন্যায্যতা, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং নিরাপদ অভিবাসনের মতো বৈশ্বিক আলোচনায় নেতৃত্ব দিতে পারবে। মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে তারাই শক্তিশালী, যারা আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে।
এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হলে অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কেবল প্রথাগত কূটনৈতিক কাজের মধ্যে আটকে রাখলে চলবে না। দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে তাদের কাজ করতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে গতানুগতিক কাজের বাইরে আসতে হবে। সেগুলোকে একেকটি বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করতে হবে। তাদের মূল লক্ষ্য হবে—নতুন প্রযুক্তি দেশে আনা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে। প্রথম পথটি হলো—অতিরিক্ত সতর্ক থেকে এবং কাউকে না চটিয়ে চলার পুরনো নীতি আঁকড়ে ধরে থাকা। দ্বিতীয় পথটি হলো—একটি স্মার্ট ও কৌশলী নীতি গ্রহণ করা, যেখানে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও কঠোরভাবে দর-কষাকষির মাধ্যমে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ আদায় করা যাবে।
প্রথম পথটি আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ মনে হলেও তা আসলে একটি মরীচিকা। আর দ্বিতীয় পথটিই হলো এই অস্থির ও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার এবং শক্তিশালী হওয়ার একমাত্র উপায়।
“সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব”—এই নীতি বাংলাদেশের বিশ্ব দেখার মূলভিত্তি হয়েই থাকবে। কিন্তু এই বহুমেরুর যুগে এর সাথে একটি অলিখিত অংশ যোগ করার সময় এসেছে। তা হলো, “আমরা সবার সাথেই সম্পর্ক রাখব, কিন্তু আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কঠোরভাবে জাতীয় স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হবে।”
ঢাকাকে এখন কেবলই ভারসাম্য রক্ষার কূটনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এখন সময় এসেছে ক্ষমতা, সক্ষমতা ও কৌশলগত লক্ষ্যের ভাষায় কথা বলতে শেখার।
লেখক: মো. ওবায়দুল্লাহ
এশিয়া টাইমস থেকে ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম

বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তির প্রধান মাপকাঠি ছিল ভারী ট্যাঙ্ক, শক্তিশালী বিমানবাহিনী এবং বিশাল পদাতিক বাহিনী। কিন্তু ২০২৬ সালের যুদ্ধক্ষেত্র আমাদের দেখাচ্ছে এক ভিন্ন বাস্তবতা, যেখানে প্রথাগত শক্তির দাপট ম্লান হয়ে আসছে। সিগন্যাল জ্যামিং এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের দাপটে যখন প্রচলিত রেডিও-নিয়ন্ত
৫ ঘণ্টা আগে
জুলাই বর্ষা বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জনতার প্রত্যাশা। মানুষ ভেবেছিল, শুধু সরকার বদলাবে না; বদলাবে রাষ্ট্রের চরিত্রও। বদলাবে প্রশাসনের সংস্কৃতি। বদলাবে ক্ষমতার ব্যবহার। বিশেষ করে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে মানুষের যে ক্ষোভ ছিল, সেটির একটি জবাব আসবে।
৫ ঘণ্টা আগে
গতকাল এক সহকর্মীর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম। কথা হচ্ছিল আজকের মা দিবসে পত্রিকায় কী কাজ হবে, নিজেরা কী করব— এসব নিয়েই। হঠাৎ তিনি বলে বসলেন, ‘মায়েরা আসলে মাকড়সা’।
৬ ঘণ্টা আগে
দক্ষিণ এশিয়ায় আজ পরিচয়কে সরলীকরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ তার হিন্দু অতীতকে আড়াল করছে। ভারত তার মুসলিম ইতিহাসকে মুছে ফেলছে। এর মাধ্যমে ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয় না—বিকৃতি করা হয়।
৭ ঘণ্টা আগে