জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

আতঙ্ক কিংবা মজুত নয়, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সচেতনতা ও পরিমিত ব্যবহার

প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬, ১৮: ০০
আতঙ্ক কিংবা মজুত নয়, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সচেতনতা ও পরিমিত ব্যবহার। এআই জেনারেটেড ছবি

সম্প্রতি দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে একধরনের অস্থিরতা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি, অনেক দূর থেকে এসে তেল না পেয়ে ফিরে যাওয়ার অভিযোগ এবং কোথাও কোথাও স্টেশন বন্ধ রাখার খবর—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ অস্বস্তিকর।

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং তেলবাহী জাহাজ পথেই আছে। কিন্তু বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা এবং দেশের মজুদের তথ্য ফাঁসের গুজবে মানুষের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এই আতঙ্কের বশবর্তী হয়েই মানুষ ঝুঁকছে ‘প্যানিক বায়িং’ বা অতিরিক্ত কেনাকাটার দিকে।

আতঙ্ক থেকে অতিরিক্ত মজুদ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই, তবে মানুষের মধ্যে একবার ভীতি তৈরি হলে তারা আর যুক্তি মানতে চায় না। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার বিভিন্ন যানবাহনের জন্য জ্বালানি কেনার পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি সিদ্ধান্ত।

ধরা যাক, আমাদের কাছে স্বাভাবিক ব্যবহারের জন্য ১৫ দিনের জ্বালানি মজুদ রয়েছে। এখন মানুষ যদি ভয় পেয়ে তাদের প্রয়োজনের দ্বিগুণ কেনা শুরু করে, তবে ১৫ দিনের মজুদ মাত্র সাড়ে ৭ দিনেই শেষ হয়ে যাবে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে এবং অতিরিক্ত তেল মানুষের কাছে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকবে। যেমন—কারও প্রতিদিন ১ লিটার তেল লাগে, কিন্তু সে যদি এখন প্রতিদিন ২ লিটার করে কেনে, তবে দ্রুতই স্টেশনের মজুত ফুরিয়ে যাবে। কেনার পরিমাণ সীমিত করে দেওয়ার ফলে মজুত দ্রুত শেষ হওয়ার শঙ্কা কমেছে। বর্তমান মজুত দিয়েই পরবর্তী চালান আসা পর্যন্ত অনায়াসে চলা সম্ভব।

আতঙ্ক থেকে অতিরিক্ত মজুদ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই, তবে মানুষের মধ্যে একবার ভীতি তৈরি হলে তারা আর যুক্তি মানতে চায় না। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার বিভিন্ন যানবাহনের জন্য জ্বালানি কেনার পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি সিদ্ধান্ত।

জ্বালানি মজুদের ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা অন্তত ৩০ থেকে ৪০ দিনের। তবে সাধারণত আমাদের হাতে ১৫ দিনের মজুদ থাকে, যাকে বলা যায় ‘চলমান মজুদ’ (রানিং ইনভেনটরি)। এর একটি স্বাভাবিক চক্র রয়েছে। একটি চালান আসলে তা দিয়ে ১৫ দিন চলে। মজুত কমতে কমতে যখন ৭-৮ দিনে নেমে আসে, তখন নতুন চালানের অর্ডার দেওয়া হয়। হাতে ৩-৪ দিনের মজুত থাকতে থাকতেই নতুন চালান দেশে পৌঁছে যায় এবং পুনরায় ১৫ দিনের মজুত তৈরি হয়। আমাদের চলমান মজুদের যে সক্ষমতা (৩০-৪০ দিন), তা নিয়ে সমস্যা নেই।

তবে আমাদের মূল ঘাটতি রয়েছে ‘স্ট্র্যাটেজিক স্টোরেজ’ বা ‘কৌশলগত মজুদে’। কৌশলগত মজুদ হলো এমন এক স্থায়ী মজুদ, যা সম্পূর্ণ আলাদা রাখা হয় এবং শুধু চরম আপৎকালীন সময়েই ব্যবহার করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের এমন কোনো স্থায়ী কৌশলগত মজুদ নেই। যেকোনো বৈশ্বিক বিপর্যয়ের কথা মাথায় রেখে আমাদের অন্তত ১৫ থেকে ৩০ দিনের একটি কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলা জরুরি, যা কখনো সাধারণ অবস্থায় ছোঁয়া হবে না।

তেলের সঙ্গে অর্থনীতির সরাসরি সম্পর্ক। জ্বালানি তেল বা গ্যাসের অভাব দেখা দিলে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে এবং অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। বিশ্বের ১৫-২০টি দেশ বাদে বাকি সব দেশকেই তেল আমদানি করতে হয়। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এশিয়ার আমদানি-নির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে

তবে আমাদের মূল ঘাটতি রয়েছে ‘স্ট্র্যাটেজিক স্টোরেজ’ বা ‘কৌশলগত মজুদে’। কৌশলগত মজুদ হলো এমন এক স্থায়ী মজুদ, যা সম্পূর্ণ আলাদা রাখা হয় এবং শুধু চরম আপৎকালীন সময়েই ব্যবহার করা হয়।

আমাদের সরকার জ্বালানি খাতের ভর্তুকি থেকে সরে এসেছে। এর আগে এক লাফে জ্বালানির যে বিপুল মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছিল, মূলত সেখান থেকেই দেশে বর্তমান মূল্যস্ফীতির সূচনা, যা থেকে আমরা এখনো বেরিয়ে আসতে পারিনি। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানিতে ভর্তুকি দিয়ে চলা কোনো দেশের পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে বিশ্ববাজারে যদি তেলের দাম নাগালের বাইরে চলে যায় (যেমন- ব্যারেল প্রতি ১৫০ বা ২০০ ডলার হয়ে যায়) এবং দেশে প্রতি লিটার তেলের দাম ২৫০ টাকায় গিয়ে ঠেকে, তখন সাধারণ মানুষের পক্ষে তা কেনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সেরকম চরম আপৎকালীন পরিস্থিতিতে হয়তো সরকারকে সাময়িক ভর্তুকির পথে হাঁটতে হতে পারে।

তাহলে এখন আমাদের করণীয় কী? বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃচ্ছ্রতা সাধন ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। এটি মূলত চাহিদা ও সরবরাহের একটি সমীকরণ। পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে আমাদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে জ্বালানির ব্যবহার বা চাহিদা কমাতে হবে।

এই মুহূর্তে বিশ্ববাজার থেকে বাড়তি দামেই আমাদের তেল কিনতে হবে। পাশাপাশি আমাদের আশা করতে হবে, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির যেন দ্রুত অবসান ঘটে। এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে সমগ্র অর্থনীতির ওপর এক মারাত্মক ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই এখন থেকেই সচেতনতা ও পরিমিত ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে।

লেখক: জ্বালানি বিশ্লেষক ও ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য

সম্পর্কিত