ত্বকী হত্যার ১৩ বছর
মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ১৩ বছর পূর্ণ হতে চললেও আজও অধরা ন্যায়বিচার। গত ৫ মার্চ এই মামলার চার্জশিট দাখিলের ১০২তম ধার্য তারিখ থাকলেও এদিনও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি। নতুন করে ১০৩তম তারিখ নির্ধারিত হয়েছে আগামী ২৬ এপ্রিল।
ত্বকী হত্যাকাণ্ডের আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট প্রদীপ ঘোষ। তদন্তের গতিহীনতা, নেপথ্যের বাধা এবং বিচারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ঢাকা স্ট্রিম-এর মুখোমুখি হয়েছিলেন অ্যাডভোকেট প্রদীপ ঘোষ। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন স্টাফ রিপোর্টার ইমরান হোসাইন।
ইমরান হোসাইন

স্ট্রিম: ১০৩ বারের মতো অভিযোগপত্র দাখিলের তারিখ পেছাল। আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় বা আইনে কি এমন কোনো দুর্বলতা আছে, যার সুযোগ নেওয়া হচ্ছে?
প্রদীপ ঘোষ: আমরা এখনো ১৮৮৬ সালের ব্রিটিশ আমলের দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধির ওপর নির্ভর করে চলছি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো বিশেষ আইনের দু-একটি ধারা ছাড়া মূল আইনে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। একদিকে আইনে বলা আছে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগপত্র দিতে হবে; অন্যদিকে এ-ও বলা আছে যে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তার কাজে হস্তক্ষেপ বা বাধা দেওয়া যাবে না। তবে মূল বিষয় হলো, রাষ্ট্র যখন মনে করে কোনো ঘটনার বিচার হওয়া উচিত নয়, তখন যত ভালো আইনই থাকুক না কেন, তাতে কোনো কাজ হয় না।
স্ট্রিম: ২০১৩ সালে এই মামলার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?
প্রদীপ ঘোষ: ২০১৩ সালের ৬ মার্চ ত্বকী নিখোঁজ হয় এবং ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই দিনই অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করা হয়। কিন্তু মামলার প্রকৃত সূত্র বা ক্লু পাওয়া যায় এর চার-পাঁচ দিন পর।
স্ট্রিম: সেই সূত্রটি কী ছিল? কীভাবে আপনারা আসামিদের বিষয়ে নিশ্চিত হলেন?
প্রদীপ ঘোষ: একটি ফোনালাপের মাধ্যমে। নাসিম ওসমান তাঁর ছেলে আজমেরী ওসমানকে ফোন করে জানতে চান, ‘এই কাজ কারা ঘটিয়েছে?’ আজমেরী ওসমান জবাবে বলেন, ‘ছোটটায়’। ‘ছোটটা’ বলতে এখানে শামীম ওসমানের ছেলেকে বোঝানো হয়েছে। নাসিম ওসমান তখন জিজ্ঞেস করেন, ‘তুইও তো ছিলি?’ আজমেরী তখন চুপ থাকেন, অর্থাৎ মৌনতা সম্মতির লক্ষণ। এরপর নাসিম ওসমান তাঁকে গালাগাল করে বলেন, তোদের জন্য চলতে পারছি না, থানায় লাখ লাখ টাকা দিয়ে এলাম।
স্ট্রিম: এই ফোনালাপের তথ্য আপনাদের কে জানিয়েছিল বা আপনারা কীভাবে পেয়েছিলেন?
প্রদীপ ঘোষ: একটি বিশ্বস্ত সূত্র থেকে এই কথোপকথনের রেকর্ড আমাদের কাছে আসে। পাওয়ার পরপরই ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রকাশ্যে এটি ঘোষণা করেন। যদিও পরে ওই রেকর্ডটি তারা নষ্ট করে ফেলে। এরপর ১১-১২ জনের নাম উল্লেখ করে পুলিশ সুপারের (এসপি) কার্যালয়ে একটি দরখাস্ত দেওয়া হয়। তারা সেটি গ্রহণ করলেও মামলার নথির সঙ্গে সংযুক্ত করেননি। কারণ, তখনকার স্থানীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে এসপি পর্যন্ত সবাই ছিলেন তাদের নিজস্ব লোক।
স্ট্রিম: ২০১৪ সালে তদন্তকারী সংস্থা র্যাব তো অভিযোগপত্র দেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিল। এরপর কী হলো?
প্রদীপ ঘোষ: ত্বকী হত্যার ঠিক এক বছরের মাথায়, ২০১৪ সালের ৫ মার্চ র্যাব-১১ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের গণমাধ্যমকর্মীদের ডেকে একটি খসড়া অভিযোগপত্র সরবরাহ করে। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে ১১ জনের একটি ঘাতক দল ত্বকী হত্যার পেছনে কাজ করেছে এবং আজমেরী ওসমান এর প্রধান। ২০১৪ সালেই অভিযোগপত্রটি আদালতে জমা দেওয়ার পুরোপুরি প্রস্তুতি তাদের ছিল।
স্ট্রিম: প্রস্তুতি থাকার পরও সেটি আদালতে জমা পড়ল না কেন?
প্রদীপ ঘোষ: এর পরপরই ওপরের মহলের চাপে পুরো প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সরাসরি ঘোষণা দেন, ‘আমরা ওসমান পরিবারের সঙ্গে আছি।’ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এমন ঘোষণার পর র্যাব বা সেনাবাহিনীতে কর্মরত কোনো সাধারণ চাকরিজীবীর পক্ষে তো আর এর বাইরে গিয়ে কিছু করা সম্ভব ছিল না।
স্ট্রিম: শুনেছি, আওয়ামী লীগ আমলে আপনারা আদালতে মামলার নথিও ঠিকমতো দেখতে পেতেন না?
প্রদীপ ঘোষ: হ্যাঁ, পরিস্থিতি এমনই ছিল। আমরা নথি দেখতে চাইলে আদালতের কর্মচারীদের মধ্যে একধরনের ভীতি কাজ করত। তাদের মনে হতো, এই নথি দেখালে চাকরি থাকবে কি না। পুরো আওয়ামী লীগের শাসনামলে এই মামলাটি পুরোপুরি স্থবির ছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে আসতেন না, এমনকি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটও তাকে ডেকে কিছু বলার মতো বাস্তবতায় ছিলেন না। ২০১৫-১৬ সালের দিকে রফিউর রাব্বিকে সঙ্গে নিয়ে আমরা একটি তাগিদপত্র দিয়েছিলাম। এরপর বছরের পর বছর পেরিয়ে গেছে—মামলার ৭০, ৮০, ৯৫তম ধার্য তারিখ চলে গেছে, কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি। আসামিরা গ্রেপ্তার হয়েছে, জামিন পেয়েছে এবং শুধু হাজিরা দিয়ে গেছে।
স্ট্রিম: এই মামলায় বর্তমানে আসামিদের অবস্থা কী?
প্রদীপ ঘোষ: মোট ১১ জন আসামির মধ্যে ৯ জন আদালতে হাজিরা দেয়। ভ্রমর ও অপর একজন আসামি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিল। তারা এখন হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে পলাতক; ধারণা করা হয়, তারা বিদেশে পালিয়েছে।
আর একমাত্র জমশেদ এখন কারাগারে আছে। সে আজমেরী ওসমানের গাড়ি চালাত এবং তাদের ভালো-মন্দ সব খবর জানত। হাইকোর্ট তাকেও জামিন দিয়েছিলেন, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই জামিন বাতিল করে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। সে আত্মসমর্পণ করে এখন কারাগারে আছে। অর্থাৎ পুরো মামলায় এখন শুধু একজনই জেল খাটছে।
স্ট্রিম: দীর্ঘ এই বিলম্বে আদালত কি তাঁর নিজস্ব ক্ষমতা বা ইনহেরেন্ট পাওয়ার প্রয়োগ করে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারতেন না?
প্রদীপ ঘোষ: সেভাবে আদালতের ক্ষমতা প্রয়োগ হতে আমরা দেখিনি। তবে আমরা আদালতে সব সময়ই বলি যে অভিযোগপত্রটি দ্রুত দাখিল হওয়া উচিত। অভিযোগপত্র দাখিল হলে উচ্চ আদালতে গিয়ে আসামিরা হয়তো খালাসও পেয়ে যেতে পারে, কিন্তু অন্তত বিচারপ্রক্রিয়াটি তো শুরু হওয়া দরকার। গতকালও (চার্জশিট দাখিলের ১০২তম দিন) আমরা বিজ্ঞ আদালতকে অনুরোধ করেছি, তিনি যেন অন্তত তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়ার জন্য তাগিদ দেন।
স্ট্রিম: গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই মামলার ক্ষেত্রে আপনারা কি কোনো পরিবর্তন লক্ষ করেছেন?
প্রদীপ ঘোষ: ৫ আগস্টের পর আমরা কিছুটা আশার আলো দেখতে শুরু করি। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একটি সদিচ্ছা ছিল যে ত্বকী হত্যাসহ অন্যান্য চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর দ্রুত বিচার হবে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আমি যখন আদালতে মামলার নথি দেখতে যাই, প্রথমে সেটি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে কোর্ট ইন্সপেক্টরের কক্ষে গিয়ে দেখি, সেখানে র্যাবের একজন কর্মকর্তা নথিটি দেখছেন।
স্ট্রিম: ওই র্যাব কর্মকর্তা তখন আপনাদের কী বলেছিলেন বা এরপর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল?
প্রদীপ ঘোষ: তিনি আমাকে অনুরোধ করে বলেন, ‘দয়া করে এটি রেকর্ড করবেন না। এই কয়েক দিন আপনারা চুপ থাকুন। আমরা যেভাবে জাল বিস্তার করছি, আমাদের একটু সময় দিন; অন্তত পাঁচটা দিন সময় দিন।’ এরপর আমরা দেখলাম, কয়েক দিনের ব্যবধানে র্যাব চারজনকে গ্রেপ্তার করল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। সেপ্টেম্বর, অক্টোবর পেরিয়ে এখন নতুন বছর চলে এল, কিন্তু এরপর আর কোনো অগ্রগতি নেই।
স্ট্রিম: ১৩ বছরে এই মামলায় মোট কতজন তদন্তকারী কর্মকর্তা বদল হয়েছেন?
প্রদীপ ঘোষ: সুনির্দিষ্ট সংখ্যাটি বলা মুশকিল, তবে ৮ থেকে ১০ জনের মতো তদন্তকারী কর্মকর্তা বদল হয়েছেন। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর একেকজন কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন, কিন্তু তাঁরা মামলার কোনো কাজই করেননি। এমনকি আওয়ামী শাসনামলে তাঁরা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য বাড়তি সময় চেয়েও কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদনও করতেন না। সম্প্রতি আদালতের তাগিদের কারণে এখন তাঁরা সময় চেয়ে আবেদন দিচ্ছেন।
স্ট্রিম: ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করতে গিয়ে আপনাকে কি সরাসরি কোনো হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল?
প্রদীপ ঘোষ: শুধু হুমকি নয়, আমার চেম্বার তছনছ করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে আমার চেম্বারে—যেখানে বর্ষীয়ান আইনজীবী মন্টু ঘোষও বসতেন—তালা ভেঙে এমনভাবে ফাইলপত্র ফেলে দেওয়া হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, কোনো স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র দিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে তালাটি খোলা হয়েছিল। শহীদ মিনারে আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমার বন্ধু, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হাফিজুর ইসলামকে ডেকে নিয়ে শামীম ওসমান গালিগালাজ করেছেন। আর নাসিম ওসমান তো সরাসরি জনসভায় বক্তব্য দিয়ে বলেছিলেন যে, আমাদের কেটে টুকরো টুকরো করে শীতলক্ষ্যায় ফেলে মাছেদের খাওয়াবেন।
স্ট্রিম: আগামী ২৬ এপ্রিলও যদি অভিযোগপত্র জমা না পড়ে, তাহলে আপনাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে?
প্রদীপ ঘোষ: আমরা নিশ্চয়ই তখন বৃহত্তর পরিসরে প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করব। আজকে যতটা নরম ভাষায় বলছি, আগামীতে হয়তো আরও কঠোর ভাষায় বলতে হবে।
স্ট্রিম: আপনি কি মনে করেন সদিচ্ছা থাকলে রাষ্ট্র দ্রুত এই মামলার সুরাহা করতে পারে?
প্রদীপ ঘোষ: অবশ্যই পারে। একটি শিশুকে পাম্প করে হত্যার (খুলনায় রাকিব হত্যা) ঘটনা দেখুন; আসামিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ধরে এনে তিন দিনে বিচার করা হয়েছিল। সরকার চাইলে বিচার সম্ভব। আমাদের পুলিশ প্রশাসনে এমন অনেক দক্ষ কর্মকর্তা আছেন, যাঁরা ক্লুলেস (সূত্রবিহীন) মামলারও সুন্দর সমাধান করতে পারেন। কিন্তু আমার কাছে কেন যেন মনে হয়, ত্বকী হত্যার আসামিদের নামগুলো প্রকাশ্যে চলে আসাই যেন একটি ‘অপরাধ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে; আর এ কারণেই বিচারপ্রক্রিয়া বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে।
স্ট্রিম: এত দীর্ঘ বঞ্চনা ও বিলম্বের পরও কি আপনি ন্যায়বিচারের বিষয়ে আশাবাদী?
প্রদীপ ঘোষ: মানুষ তো আশার মধ্য দিয়েই বাঁচে। আমাদের সংবিধানে প্রত্যেক মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সংবিধান; একইভাবে ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদেরও সংবিধান। প্রত্যেক মানুষ সম-অধিকার ভোগ করবে—এই দাবি নিয়েই তো ২৪-এর গণ-আন্দোলন হয়েছে। সেই ’৭১-এর চেতনা ও ’২৪-এর প্রেরণাকে যদি আমরা ধারণ করি, তবে ত্বকীর এই বিচারের দাবি আমাদের চলমান মুক্তিযুদ্ধেরই একটি অংশ।

মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ১৩ বছর পূর্ণ হতে চললেও আজও অধরা ন্যায়বিচার। গত ৫ মার্চ এই মামলার চার্জশিট দাখিলের ১০২তম ধার্য তারিখ থাকলেও এদিনও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি। নতুন করে ১০৩তম তারিখ নির্ধারিত হয়েছে আগামী ২৬ এপ্রিল।
ত্বকী হত্যাকাণ্ডের আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট প্রদীপ ঘোষ। তদন্তের গতিহীনতা, নেপথ্যের বাধা এবং বিচারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ঢাকা স্ট্রিম-এর মুখোমুখি হয়েছিলেন অ্যাডভোকেট প্রদীপ ঘোষ। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন স্টাফ রিপোর্টার ইমরান হোসাইন।
স্ট্রিম: ১০৩ বারের মতো অভিযোগপত্র দাখিলের তারিখ পেছাল। আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় বা আইনে কি এমন কোনো দুর্বলতা আছে, যার সুযোগ নেওয়া হচ্ছে?
প্রদীপ ঘোষ: আমরা এখনো ১৮৮৬ সালের ব্রিটিশ আমলের দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধির ওপর নির্ভর করে চলছি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো বিশেষ আইনের দু-একটি ধারা ছাড়া মূল আইনে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। একদিকে আইনে বলা আছে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগপত্র দিতে হবে; অন্যদিকে এ-ও বলা আছে যে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তার কাজে হস্তক্ষেপ বা বাধা দেওয়া যাবে না। তবে মূল বিষয় হলো, রাষ্ট্র যখন মনে করে কোনো ঘটনার বিচার হওয়া উচিত নয়, তখন যত ভালো আইনই থাকুক না কেন, তাতে কোনো কাজ হয় না।
স্ট্রিম: ২০১৩ সালে এই মামলার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?
প্রদীপ ঘোষ: ২০১৩ সালের ৬ মার্চ ত্বকী নিখোঁজ হয় এবং ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই দিনই অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করা হয়। কিন্তু মামলার প্রকৃত সূত্র বা ক্লু পাওয়া যায় এর চার-পাঁচ দিন পর।
স্ট্রিম: সেই সূত্রটি কী ছিল? কীভাবে আপনারা আসামিদের বিষয়ে নিশ্চিত হলেন?
প্রদীপ ঘোষ: একটি ফোনালাপের মাধ্যমে। নাসিম ওসমান তাঁর ছেলে আজমেরী ওসমানকে ফোন করে জানতে চান, ‘এই কাজ কারা ঘটিয়েছে?’ আজমেরী ওসমান জবাবে বলেন, ‘ছোটটায়’। ‘ছোটটা’ বলতে এখানে শামীম ওসমানের ছেলেকে বোঝানো হয়েছে। নাসিম ওসমান তখন জিজ্ঞেস করেন, ‘তুইও তো ছিলি?’ আজমেরী তখন চুপ থাকেন, অর্থাৎ মৌনতা সম্মতির লক্ষণ। এরপর নাসিম ওসমান তাঁকে গালাগাল করে বলেন, তোদের জন্য চলতে পারছি না, থানায় লাখ লাখ টাকা দিয়ে এলাম।
স্ট্রিম: এই ফোনালাপের তথ্য আপনাদের কে জানিয়েছিল বা আপনারা কীভাবে পেয়েছিলেন?
প্রদীপ ঘোষ: একটি বিশ্বস্ত সূত্র থেকে এই কথোপকথনের রেকর্ড আমাদের কাছে আসে। পাওয়ার পরপরই ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রকাশ্যে এটি ঘোষণা করেন। যদিও পরে ওই রেকর্ডটি তারা নষ্ট করে ফেলে। এরপর ১১-১২ জনের নাম উল্লেখ করে পুলিশ সুপারের (এসপি) কার্যালয়ে একটি দরখাস্ত দেওয়া হয়। তারা সেটি গ্রহণ করলেও মামলার নথির সঙ্গে সংযুক্ত করেননি। কারণ, তখনকার স্থানীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে এসপি পর্যন্ত সবাই ছিলেন তাদের নিজস্ব লোক।
স্ট্রিম: ২০১৪ সালে তদন্তকারী সংস্থা র্যাব তো অভিযোগপত্র দেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিল। এরপর কী হলো?
প্রদীপ ঘোষ: ত্বকী হত্যার ঠিক এক বছরের মাথায়, ২০১৪ সালের ৫ মার্চ র্যাব-১১ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের গণমাধ্যমকর্মীদের ডেকে একটি খসড়া অভিযোগপত্র সরবরাহ করে। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে ১১ জনের একটি ঘাতক দল ত্বকী হত্যার পেছনে কাজ করেছে এবং আজমেরী ওসমান এর প্রধান। ২০১৪ সালেই অভিযোগপত্রটি আদালতে জমা দেওয়ার পুরোপুরি প্রস্তুতি তাদের ছিল।
স্ট্রিম: প্রস্তুতি থাকার পরও সেটি আদালতে জমা পড়ল না কেন?
প্রদীপ ঘোষ: এর পরপরই ওপরের মহলের চাপে পুরো প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সরাসরি ঘোষণা দেন, ‘আমরা ওসমান পরিবারের সঙ্গে আছি।’ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এমন ঘোষণার পর র্যাব বা সেনাবাহিনীতে কর্মরত কোনো সাধারণ চাকরিজীবীর পক্ষে তো আর এর বাইরে গিয়ে কিছু করা সম্ভব ছিল না।
স্ট্রিম: শুনেছি, আওয়ামী লীগ আমলে আপনারা আদালতে মামলার নথিও ঠিকমতো দেখতে পেতেন না?
প্রদীপ ঘোষ: হ্যাঁ, পরিস্থিতি এমনই ছিল। আমরা নথি দেখতে চাইলে আদালতের কর্মচারীদের মধ্যে একধরনের ভীতি কাজ করত। তাদের মনে হতো, এই নথি দেখালে চাকরি থাকবে কি না। পুরো আওয়ামী লীগের শাসনামলে এই মামলাটি পুরোপুরি স্থবির ছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে আসতেন না, এমনকি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটও তাকে ডেকে কিছু বলার মতো বাস্তবতায় ছিলেন না। ২০১৫-১৬ সালের দিকে রফিউর রাব্বিকে সঙ্গে নিয়ে আমরা একটি তাগিদপত্র দিয়েছিলাম। এরপর বছরের পর বছর পেরিয়ে গেছে—মামলার ৭০, ৮০, ৯৫তম ধার্য তারিখ চলে গেছে, কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি। আসামিরা গ্রেপ্তার হয়েছে, জামিন পেয়েছে এবং শুধু হাজিরা দিয়ে গেছে।
স্ট্রিম: এই মামলায় বর্তমানে আসামিদের অবস্থা কী?
প্রদীপ ঘোষ: মোট ১১ জন আসামির মধ্যে ৯ জন আদালতে হাজিরা দেয়। ভ্রমর ও অপর একজন আসামি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিল। তারা এখন হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে পলাতক; ধারণা করা হয়, তারা বিদেশে পালিয়েছে।
আর একমাত্র জমশেদ এখন কারাগারে আছে। সে আজমেরী ওসমানের গাড়ি চালাত এবং তাদের ভালো-মন্দ সব খবর জানত। হাইকোর্ট তাকেও জামিন দিয়েছিলেন, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই জামিন বাতিল করে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। সে আত্মসমর্পণ করে এখন কারাগারে আছে। অর্থাৎ পুরো মামলায় এখন শুধু একজনই জেল খাটছে।
স্ট্রিম: দীর্ঘ এই বিলম্বে আদালত কি তাঁর নিজস্ব ক্ষমতা বা ইনহেরেন্ট পাওয়ার প্রয়োগ করে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারতেন না?
প্রদীপ ঘোষ: সেভাবে আদালতের ক্ষমতা প্রয়োগ হতে আমরা দেখিনি। তবে আমরা আদালতে সব সময়ই বলি যে অভিযোগপত্রটি দ্রুত দাখিল হওয়া উচিত। অভিযোগপত্র দাখিল হলে উচ্চ আদালতে গিয়ে আসামিরা হয়তো খালাসও পেয়ে যেতে পারে, কিন্তু অন্তত বিচারপ্রক্রিয়াটি তো শুরু হওয়া দরকার। গতকালও (চার্জশিট দাখিলের ১০২তম দিন) আমরা বিজ্ঞ আদালতকে অনুরোধ করেছি, তিনি যেন অন্তত তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়ার জন্য তাগিদ দেন।
স্ট্রিম: গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই মামলার ক্ষেত্রে আপনারা কি কোনো পরিবর্তন লক্ষ করেছেন?
প্রদীপ ঘোষ: ৫ আগস্টের পর আমরা কিছুটা আশার আলো দেখতে শুরু করি। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একটি সদিচ্ছা ছিল যে ত্বকী হত্যাসহ অন্যান্য চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর দ্রুত বিচার হবে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আমি যখন আদালতে মামলার নথি দেখতে যাই, প্রথমে সেটি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে কোর্ট ইন্সপেক্টরের কক্ষে গিয়ে দেখি, সেখানে র্যাবের একজন কর্মকর্তা নথিটি দেখছেন।
স্ট্রিম: ওই র্যাব কর্মকর্তা তখন আপনাদের কী বলেছিলেন বা এরপর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল?
প্রদীপ ঘোষ: তিনি আমাকে অনুরোধ করে বলেন, ‘দয়া করে এটি রেকর্ড করবেন না। এই কয়েক দিন আপনারা চুপ থাকুন। আমরা যেভাবে জাল বিস্তার করছি, আমাদের একটু সময় দিন; অন্তত পাঁচটা দিন সময় দিন।’ এরপর আমরা দেখলাম, কয়েক দিনের ব্যবধানে র্যাব চারজনকে গ্রেপ্তার করল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। সেপ্টেম্বর, অক্টোবর পেরিয়ে এখন নতুন বছর চলে এল, কিন্তু এরপর আর কোনো অগ্রগতি নেই।
স্ট্রিম: ১৩ বছরে এই মামলায় মোট কতজন তদন্তকারী কর্মকর্তা বদল হয়েছেন?
প্রদীপ ঘোষ: সুনির্দিষ্ট সংখ্যাটি বলা মুশকিল, তবে ৮ থেকে ১০ জনের মতো তদন্তকারী কর্মকর্তা বদল হয়েছেন। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর একেকজন কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন, কিন্তু তাঁরা মামলার কোনো কাজই করেননি। এমনকি আওয়ামী শাসনামলে তাঁরা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য বাড়তি সময় চেয়েও কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদনও করতেন না। সম্প্রতি আদালতের তাগিদের কারণে এখন তাঁরা সময় চেয়ে আবেদন দিচ্ছেন।
স্ট্রিম: ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করতে গিয়ে আপনাকে কি সরাসরি কোনো হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল?
প্রদীপ ঘোষ: শুধু হুমকি নয়, আমার চেম্বার তছনছ করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে আমার চেম্বারে—যেখানে বর্ষীয়ান আইনজীবী মন্টু ঘোষও বসতেন—তালা ভেঙে এমনভাবে ফাইলপত্র ফেলে দেওয়া হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, কোনো স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র দিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে তালাটি খোলা হয়েছিল। শহীদ মিনারে আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমার বন্ধু, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হাফিজুর ইসলামকে ডেকে নিয়ে শামীম ওসমান গালিগালাজ করেছেন। আর নাসিম ওসমান তো সরাসরি জনসভায় বক্তব্য দিয়ে বলেছিলেন যে, আমাদের কেটে টুকরো টুকরো করে শীতলক্ষ্যায় ফেলে মাছেদের খাওয়াবেন।
স্ট্রিম: আগামী ২৬ এপ্রিলও যদি অভিযোগপত্র জমা না পড়ে, তাহলে আপনাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে?
প্রদীপ ঘোষ: আমরা নিশ্চয়ই তখন বৃহত্তর পরিসরে প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করব। আজকে যতটা নরম ভাষায় বলছি, আগামীতে হয়তো আরও কঠোর ভাষায় বলতে হবে।
স্ট্রিম: আপনি কি মনে করেন সদিচ্ছা থাকলে রাষ্ট্র দ্রুত এই মামলার সুরাহা করতে পারে?
প্রদীপ ঘোষ: অবশ্যই পারে। একটি শিশুকে পাম্প করে হত্যার (খুলনায় রাকিব হত্যা) ঘটনা দেখুন; আসামিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ধরে এনে তিন দিনে বিচার করা হয়েছিল। সরকার চাইলে বিচার সম্ভব। আমাদের পুলিশ প্রশাসনে এমন অনেক দক্ষ কর্মকর্তা আছেন, যাঁরা ক্লুলেস (সূত্রবিহীন) মামলারও সুন্দর সমাধান করতে পারেন। কিন্তু আমার কাছে কেন যেন মনে হয়, ত্বকী হত্যার আসামিদের নামগুলো প্রকাশ্যে চলে আসাই যেন একটি ‘অপরাধ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে; আর এ কারণেই বিচারপ্রক্রিয়া বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে।
স্ট্রিম: এত দীর্ঘ বঞ্চনা ও বিলম্বের পরও কি আপনি ন্যায়বিচারের বিষয়ে আশাবাদী?
প্রদীপ ঘোষ: মানুষ তো আশার মধ্য দিয়েই বাঁচে। আমাদের সংবিধানে প্রত্যেক মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এটি ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সংবিধান; একইভাবে ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদেরও সংবিধান। প্রত্যেক মানুষ সম-অধিকার ভোগ করবে—এই দাবি নিয়েই তো ২৪-এর গণ-আন্দোলন হয়েছে। সেই ’৭১-এর চেতনা ও ’২৪-এর প্রেরণাকে যদি আমরা ধারণ করি, তবে ত্বকীর এই বিচারের দাবি আমাদের চলমান মুক্তিযুদ্ধেরই একটি অংশ।

এক সপ্তাহ ধরে ইরান তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়ে চলেছে। শুরুতে এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকলেও ইতিমধ্যে দেশটি বেসামরিক এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলোতেও হামলা করছে।
৫ ঘণ্টা আগে
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২০টিরও বেশি প্রদেশ নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়।
৭ ঘণ্টা আগে
প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে আঙুল তুলে এই দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ত্বকীর বাবা, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি। হামলা, হুমকি আর সাতটি মামলার বোঝা মাথায় নিয়েও তিনি দমে যাননি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন করে আশার আলো দেখলেও বাধার দেয়াল এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
১৪ ঘণ্টা আগে
ভারতের রাজনীতিতে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় বা জেএনইউ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বয়ান। কেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন থাকেন? এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং আদর্শিক কারণ।
১৫ ঘণ্টা আগে